তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরা
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ
তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।
পর্ব ১২
ডায়াল ডি ফর ডায়েট
ইন্টারভিউ পড়া বা পডকাস্টে ইন্টারভিউ দেখা আমার এক প্রিয় ব্যসন। সে লেখক , অভিনেতা, চোর, বাটপাড়, রাঁধুনী (সাজুনিটা অত সহ্য হয় না) – সব শিল্পের আঁতের কথাটা আমি এইভাবে আত্মসাৎ করার চেষ্টা করি। সেই ভাবেই একদিন একটি পডকাস্টে দুরন্ত অভিনেতা বিজয় সেথুপতির সাক্ষাৎকারে আমি যাকে বলে গেঁথে গেলাম। আহা কী বলিলেন, জন্ম জন্মান্তরে না ভুলিবার একটি ওয়ান লাইনার-
‘আমি ডায়েট করি না। কারণ ওইসব বোরিং খাবার খেলে আমি একটা বোরিং লোক হয়ে যাব’ হয়তো অক্ষরে অক্ষরে এই শব্দগুলিই বলেননি, কিন্তু যা বলেছেন তার মর্মার্থ এইটুকু। এবং এর সম্প্রসারণ করলে দাঁড়াবে ‘ওইসব বোরিং খাবার খেলে আমি একটা বোরিং লোক হয়ে যাব আর আমার অভিনয়ও রোরিং থেকে বোরিং হয়ে যাবে’
শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল ‘এতদিন কোথায় ছিলি বাপ! আয় বুকে আয়’
যখন এই ক্যাংলাস নেহাতই ছোট, তখন উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত কোন বাঙালি পরিবারেই ডায়েটের নামগন্ধ ছিল না। মানে ডায়েট শব্দটি উচ্চারিত হতে শুনিনি। কিন্তু যা খাওয়া হত, তা এখনকার তুলনায় স্বাস্থ্যকর, সময় ও পকেট সাশ্রয়কারী বলেই আমার ধারণা। কারণ সকালে বেশিরভাগ লোকেই চিঁড়ে দই, বা দুধ মুড়ি খেয়ে নিতেন, বাগানের ফলফুলুরি, কিছু না কিছু থাকতই, দুপুরে তেতো শাক, তরকারি মাছের ঝোল টকের আহারটি বেশ কম তেলেই, তেল মশলায় গরগরায়িত নয় এবং এখনকার ইউটিউব বা ফুড ব্লগ বাহিত বিটকেল ও দুঃসাধ্য কিছু নয়, যা নাকি টমেটো পিউরি, জিঞ্জার গার্লিক পেস্ট, ফুল ক্রিম আর কসুরি মেথি কিংবা সেজুয়ান সস বা চিলি অয়েল ছাড়া রাঁধাই সম্ভব না!
বিকেলে মুড়ি মাস্ট, তাতে নারকেল কুচি বা শসা, কিংবা চিনেবাদাম চাটুতে সেঁকে নেওয়া, বাচ্চারা স্কুল থেকে ফিরে বেশিরভাগ ভাতই খেত, তখন স্কুল ছিল পায়ে হেঁটে এবং ছুটিও হত একটা ভদ্র সময়ে, তারপর আর কোন কিছুই মানে সাঁতার, ইউকেলেলে, টিউশন ছিল না। কোনরকমে খেয়ে দৌড় দৌড়, ডাকছে মাঠ। তখন মাঠ ছিল, মাঠে ঘাস ছিল, তাতে নজর পড়েনি প্রমোটার রাজের। আলাদা জিমে যাওয়ার দরকার হত না, জিম করবেট ছাড়া অন্য কোন জিম যে হয় তা বাপের জন্মে কেউ শোনেনি সেই মায়া মফস্বলে। ফলে টিভির সামনে বসে বা মোবাইল-মুখো হয়ে মোটা হওয়ার সুযোগ ছিল না বাচ্চাদের। ফিরে এলে অনেক মা-ই দুধের গেলাস ধরতেন মুখের সামনে , সেটা খেয়ে হারিকেনের সামনে, পরে বিজলিবাতির আলোয় ঢুলতে ঢুলতে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ পড়তে পড়তেই রাতের খাওয়ার সময় হয়ে যেত। সেখানে খান কতক রুটি, একটা টাটকা করা নিরামিষ তরকারি, কখনো ডিমের ডালনা, কপালের ওপর মাথা থাকলে ফুলকপি দিয়ে ভেটকির কালিয়া বা খাসির মাংস জুটত। এর সঙ্গে অনেকেই দুধ রুটি এবং একটা মিষ্টি খেতেন। বাঙাল বাড়িতে রাতে রুটি চলবে না, এক থালা ভাত ও বিবিধ তরকারি, আর ভাত পাতে মিষ্টি খাবার কথা তাঁদের শোনাও পাপ।
এই যে সারাদিনের খাওয়ার ফর্দ, এখানে খাইয়ে লোকেরা আইনের ফাঁক খুঁজে নিজেদের মতো ইম্প্রোভাইজ করে নিতেন বেড়াল ডিঙ্গোতে না পারা ভাত বা খান বিশেক রুটি খেয়ে। আর মিস্টির কথাটা না তোলাই ভাল। নয়ীমের খাওয়া আমাদের বাড়ির ইতিহাসে মিথ হয়ে আছে। সে ছিল আমাদের দেশের বাড়ি বোলসিদ্ধির জন খাটিয়ে। কাজ সেরে সে আমাদের বাড়ি ভাত খেয়ে ঘরে যেত। মায়েরা ভাত দিয়ে ডাল আনতে যাওয়ার জন্যে ঘুরতেই শুধু ভাতই শেষ নিমেষের মধ্যে! ডালের পর প্রতিটি তরকারি, মাছের ঝোল অব্দি এটাই চলত।
বিশ্বায়নের হাওয়ায় অনেক কিছুর সঙ্গে ডায়েট ভেসে ভেসে এল। আর আমাদের মতো নিরীহ খাদ্যরসিকদের ওপর বিশ্রী অপরাধবোধের দাবাও ডালল। দেখা গেল দুনিয়ায় দু ধরনের লোক বাস করে- একদল যারা ডায়েট করে, অন্য দল, যারা ডায়েট করে না।
আর মুসিবতের সেদিন থেকেই শুরু।
যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তখন কোথাও কোন নেমন্তন্নে গিয়ে কোন খাবারে না করলে সবাই বলত ‘কী রে ডায়েট করছিস নাকি?’ আর অমনি হাসির হুল্লোড় পড়ে যেত। সে সময় অব্দি ডায়েট করাটা যথেষ্ট হাসির কথা ছিল। ডায়েট তো করে সিনেমার নায়িকারা, বড় বড় প্লেয়ারদের বিশেষ করে জিমন্যাস্টদেরও কড়া ডায়েটে থাকতে হয়, তাই নাকি খেলা ছেড়ে দেবার পর এরা এত গোগ্রাসে খায় যে পুরো গোল আলু হয়ে যায়। আমাদের মতো ছেলেমেয়েরা ডায়েট করবে কেন? এক গ্রাস ভাত কম খেলে মায়েদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে যেত।
‘এই এক ফ্যাশন হয়েছে কম ভাত খাওয়া। ওরে এখন তোদের খাওয়ার বয়স। যা পাবি হাঁস মুরগির মতো টাউ টাউ করে খাবি’ (এই টাউ টাউ করে খাওয়াটাও আমার মা ছাড়া কারো মুখে শুনিনি কখনো)। তা আমরা খেতেও পারতাম যথেষ্ট প্রশংসনীয়ভাবে। যেদিন ছটা লুচি খেতাম, মা এসে কপালে হাত দিয়ে দেখত, ‘শরীর খারাপ নাকি রে? পাশের পাড়ার এক একশ কেজি ওজনের তরুণকে নাকি তার মা বসিয়ে লুচি খাওয়াতেন আর পিঠে হাত বুলিয়ে বলতেন ‘কত রোগা হয়ে গেছিস বাবু, আর দুটো লুচি খা’
শুধু আমরা কেন, মায়েরাও তো এই ব্যাপারে তুখোড় ছিলেন। তাঁদের বছরে কয়েকটা ষষ্ঠীর ব্রত ছিল। যেমন দুর্গা ষষ্ঠী, নীল ষষ্ঠী বা সরস্বতী পুজোর পরদিন শীতল ষষ্ঠী। সেখানে উপোসের নামগন্ধ নেই, ভাতের বদলে আরও চিত্তাকর্ষক খাওয়াদাওয়া। সাবুর ফলার, লুচি আর মিস্টির বন্যা। বাঙ্গালরা বলত ‘ঘটিগো উপাস বইলা কিছুই নাই’ আমার বাবাই বলত এ হচ্ছে মুখ বদলাবার বাহানা। তাই আমরা কী করেই বা ডায়েট করতে পারি? জিন জিনিসটা তো ফেলনা নয়।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে ডায়েট মোটেই হাসির ব্যাপার থাকল না। হয়ে উঠল একটা সিরিয়াস বিজনেস। ডায়েটেশিয়ান কোর্স চালু হল। একেকেকজন রীতিমতো সেলিব্রিটি ডায়েটেশিয়ান হয়ে উঠলেন। আপিসে দেখি একটি দিব্যি ছিপছিপে মেয়ে কী একটা বিদঘুটে ডায়েট করছে , তাতে সারাদিন বারোটা কলা খেতে হবে। সম্ভবত বজরং ডায়েট। সে ডায়েটের কলা আবার চাঁদের কলার মতো দিনে দিনে বৃদ্ধি পাবে, মানে প্রথম দিন দুটো কলা, তারপর দিন চারটে, এইভাবে বাড়বে। তবে এরিথমেটিক প্রগ্রেশনে, জিওমেট্রিক প্রগেশনে নয় এটাই রক্ষে। তাহলে তো একা একটি মেয়েই পৃথিবী কলাশূন্য করে দিত!। চারপাশে যাকেই দেখি, সে-ই ডায়েট করে। আর বিচিত্র সে সব নাম। সত্য সেলুকাস কী বিচিত্র এ দেশ! একদলের পাতে খাবার নেই, একমুঠো খাবার জোটাতে কী না করছে, আর একদলের কাছে প্রচুর খাবার, তবু তারা কিছুতেই খাবে না!
এরা অব টেররের মতো এরা অব ডায়েটে প্রবেশ করে গেছি বুঝতে পারি, আর আমিও পিয়ার প্রেশারে পড়ে যাই। আম্মো ডায়েট করব। কোন ডায়েটেশিয়ান ছাড়াই ঠিক করি সপ্তায় যেহেতু শনি রবি মাছ মাংস চর্ব্য চোষ্য খাওয়া হয় তাই সোমবার খুব কম খাব। মানে নিরামিষ খাব এবং ভাত খাব না ।
তো সেই ডায়েটে ভোর আটটায় (!) অফিস বেরোই খান কতক পরোটা খেয়ে, ওইরকম কতক কি তারও বেশি নিয়ে যাই, তাতেও এক ঘণ্টার মধ্যে খিদে পায়, আর ফেরার পথে তো কথাই নেই, পারলে ট্রেনের কামরাগুলোকেও খেয়ে নিতে পারি। নিজের হাত দুটো দেখে চমকে উঠি। আহা রে একদিনেই কি কংকালের মতো দেখাচ্ছে! মায়া হয়, বড় মায়া হয় নিজের ওপর। সেই মায়ায় আরও বেশি খাই, পরের দিন। দেখা গেল এক মুঠো মাছের ঝোল ভাত খেলে যে পরিমাণ খেতাম, তার চতুর্গুণ খাচ্ছি এই ডায়েটের চক্করে। কারণ নিজের ওপর বড় মায়া জন্মাচ্ছে কিনা। আহা রে, তোর কত কষ্ট! শরীর ধারণ করলেই কষ্ট পেতে হয় এ মর্ত্যে, এ কথা তো মহাপুরুষরা বলেই গেছেন, আর এ শরীর মেন্টেন করা আরও কষ্ট।
ফলে ব্যাক টু পুরনো ফর্ম। যদিও এই সুবাদে একটা বিশ্ব রেকর্ড করা হয়ে গেছে। আমিই পৃথিবীতে একতম ব্যক্তি, যে কিনা ডায়েট করে ওজন বাড়িয়েছে!
এমন ক্যাংলাস কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি!!
এই দুখভরি কহানি শেষ করি আমার দিদার ডায়েট দিয়ে, যিনি আজীবন স্বামীর আর দশ ছেলেমেয়ের খাওয়ার বায়না মিটিয়ে আদৌ কী খেতে পেতেন, আমার ঘোর সন্দেহ আছে। আমার স্মৃতিতে আছে তাঁর শেষ বেলার খাবার রুটিন, যা নিত্য খেয়ে তিনি নব্বই পার করে দিব্যি খুশ মেজাজে বেঁচেছিলেন। ঠিক সকাল ছটায় চা বিস্কুট, নটায় এক কাপ কমপ্ল্যান, ঠিক বেলা বারোটায় এক মুঠো ভাত, কিছু সবজি, যার মধ্যে একটা তেতো মাস্ট, আর শেষে চাটনি, না থাকলে জেলি। তিনটেয় চা আর রাত আটটার মধ্যে একবাটি সদ্য রান্না সবজি, পেঁপের ডালনা জাতীয় আর অবশ্যই একটা মিষ্টি। রাত আটটার পরে আর কিচ্ছু না। না, দিদা হাল আমলের ‘সূর্যাস্তের পর আর কিছু খাওয়া যাবে না’, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং- এসবের বিন্দু বিসর্গ জানতেন না। কিন্তু পৃথিবীর সেরা ডায়েটেশিয়ানের হাতে বানানো এই ডায়েট কোনদিন ফলো করতে পারলে আমি বর্তে যাব। ডায়েটেশিয়ানের নাম জানতে চাইবেন তো? সংযম, মশাই সংযম ।