Email: editors.kokshopoth@gmail.com
September 5, 2026
Kokshopoth

তিস্তা-র ধারাবাহিক আখ্যান

Sep 4, 2026

তিস্তা-র ধারাবাহিক আখ্যান
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১৪

তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।

নোটিশ

 

আজ অফিসে ঢোকার সময় নোটিশ বোর্ডে একটা নতুন নোটিশ দেখলাম।

অফিসের মেইন এন্ট্রান্সের ঠিক পাশেই কাঠের নোটিশ বোর্ড। সাদা একটা কাগজ কাঠের ওপর ড্রাই-পিন দিয়ে আটকে দেওয়া। উপরে মোটা অক্ষরে কালো কালিতে লেখা— নোটিশ। তার নিচে সোজাসাপটা হরফে কয়েক লাইন।

‘আগামী সোমবার থেকে অফিসের সময় পরিবর্তিত হবে। সকাল দশটার পরিবর্তে সাড়ে ন’টায় উপস্থিত হতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের পরে উপস্থিত হলে দেরি হিসেবে গণ্য করা হবে।’

নিচে আজকের তারিখ। তার নিচে কর্তৃপক্ষের একটা কঠিন স্বাক্ষর। আমি নোটিশটা পড়লাম। ‘নোটিশ’। অদ্ভুত একটা শব্দ।

কাউকে কিছু জানাতে হলে তার কাছে পৌঁছনোর অনেক পথ আছে। মেইল করা যায়, ফোন করা যায়। চাইলে সামনাসামনি দাঁড়িয়েও কথাটা বলা যায়। নোটিশে কাউকে আলাদা করে বলা হয় না। একই কথা একসঙ্গে অনেক মানুষকে জানিয়ে দেওয়া হয়। একটা অদৃশ্য আঙুল তুলে নির্দেশ দেওয়া হয়— সবাইকে সমানভাবে। যে পড়বে, সে জানবে। যে পড়বে না, তার জন্যও কথাটা একই থাকবে।

নোটিশ বোর্ডের সামনে দু-তিনজন দাঁড়িয়েছিল। একজন দাঁড়িয়ে ভালো করে লেখাটা পড়ল, তারপর ঘড়ি দেখতে দেখতে চলে গেল। আরেকজন মোবাইল বের করে ছবি তুলে রাখল— যেন প্রমাণটা রেখে দেওয়া দরকার। একজন পড়লই না। পকেটে হাত গুঁজে পাশ দিয়ে যেতে যেতে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে রে?” বন্ধু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

“টাইম বদলেছে। সাড়ে ন’টা।”

সে হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“ও।”

তারপর দুজনেই পা চালিয়ে ক্যান্টিনের দিকে চলে গেল।

সারাদিনে বেশ কয়েকবার কাজের ফাঁকে ওই নোটিশটার সামনে দিয়ে গেছি। ওয়াশরুমে যাওয়ার সময়, চায়ের কাপ হাতে ফেরার সময়। প্রতিবারই দেখেছি। সাদা কাগজটা সামান্য ফাঁক হয়ে নড়ছে মাথার ওপর ঘুরতে থাকা পুরোনো ফ্যানের হাওয়ায়।

মনে হল, নোটিশের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। সে কারও সঙ্গে তর্ক করে না। কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করে না। কোনো যুক্তি দেখায় না। কেউ তার নিয়ম মানল কি মানল না, সেটাও তার মাথা ব্যথার বিষয় নয়। সে শুধু একটা পরিবর্তনের কথা নিঃশব্দে জানিয়ে দেয়। তারপর চুপচাপ বোর্ডে আটকে থেকে অপেক্ষা করে।   

কিছু নোটিশ খুব সাধারণ। আগামীকাল জল বন্ধ থাকবে। সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত মেরামতির জন্য আজ লিফট বন্ধ থাকবে। পার্কিংয়ে অনিয়মিত গাড়ি রাখা নিষেধ। কিন্তু কিছু নোটিশ পড়ার পর আর আগের জায়গায় ফেরা যায় না। পড়তে পড়তে বুকের ভেতরে একটা অদৃশ্য মোচড় ওঠে।

স্কুলে পড়ার সময় একবার নোটিশ এসেছিল— আগামী সপ্তাহ থেকে ক্লাস শুরু হবে নতুন ভবনে। আমরা সবাই নতুন ঘরের আনন্দে মেতে উঠেছিলাম। আরেকবার লেখা হয়েছিল— চরম আবহাওয়ার কারণে আগামীকাল থেকে স্কুল বন্ধ থাকবে। সেটা ছিল অপ্রত্যাশিত আনন্দের নোটিশ। তখন বুঝিনি, একই শব্দ কখনো আনন্দ নিয়ে আসে, কখনো ভয়। নোটিশ নিজে কিছু নয়। যে পরিবর্তনের খবর সে বহন করে, আসল ব্যাপারটা সেখানে।

বিকেলের দিকে বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আবার নোটিশটা পড়ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নোটিশের নিচে ছোট করে লেখা—

“এই নোটিশটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।”

লাইনটা আগে খেয়াল করিনি। কী অদ্ভুত। পরবর্তী নির্দেশ। মানে, আমরা জানি না, কতদিন। শুধু জানি— আপাতত এটাই নিয়ম। এই অনিশ্চয়তাটুকুই এখন আমাদের ভবিষ্যৎ। 

আমরা আসলে জীবনের অধিকাংশ নিয়মই তো এই ‘পরবর্তী নির্দেশ’-টুকু না আসা পর্যন্ত বয়ে নিয়ে চলি।  প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা, নির্দিষ্ট ট্রেনে বা বাসে চেপে একই মোড়ে এসে জমা হওয়া, আর চেনা করিডোর দিয়ে হেঁটে নিজের চেয়ারটায় গিয়ে বসা— সবই যেন এক অদৃশ্য আদেশের অধীনে। ‌যে যার নিজের মতো করে একটু প্রতিবাদ করতে চায়। হয়তো বিরক্তিও প্রকাশ করে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার কাঁধের ব্যাগটা সোজা করে নিয়ে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পা মেলায়। এই বাধ্যতাগুলোর কোথাও কোন উত্তর চাওয়ার সুযোগ থাকে না; শুধু চুপচাপ নিজের ভেতরের পুরোনো অভ্যাসটা বদলে নেওয়া ছাড়া।  

হঠাৎ মনে হল, জীবনের কতগুলো পরিবর্তনও এমন। কেউ এসে বলে না, এটা চিরদিনের জন্য। শুধু বলে— আজ থেকে আর আগের মতো হবে না। কখনো কখনো তো কথাটা উচ্চারণও করা হয় না। একদিন ফোন কমে যায়। একদিন দেখা হওয়া বন্ধ হয়। একদিন যে বাড়িতে অবলীলায় ঢুকে পড়তাম, সেখানে যাওয়ার আগে ফোন করতে হয়।

একদিন কোনো একটা প্রিয় চেয়ার খালি হয়ে যায়। মানুষটা আর বসে না। কিন্তু কেউ বোর্ডে নোটিশ টাঙায় না। কেউ তারিখ লিখে রাখে না। তবু আমরা ভেতরে ভেতরে ঠিক বুঝে যাই—একটা কিছু খুব বড় পরিবর্তন হয়ে গেছে। আর এই বদলটা কতদিন থাকবে, কেউ জানে না।

নোটিশ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অফিস প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল। সিলিং ফ্যানের ঘড়ঘড় আওয়াজটা এখন স্পষ্ট। আলোর সুইচগুলো এক এক করে নিভে গেল। আমি বোর্ডের গায়ে আটকে থাকা কাগজটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম।

ভাবছিলাম, একটা নোটিশের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক বোধহয় তার ভাষা নয়। তার কড়া কড়া শব্দগুলোও নয়। এমনকি নিচের ওই তারিখটাও নয়। সবচেয়ে ভীতিজনক দিক হলো— এটা আমাদের জানিয়ে দেয়, আমরা চাই বা না চাই, আমাদের সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, কিছু একটা এখন থেকে সম্পূর্ণ অন্যরকম হবে। আমাদের মতামতের কোনো মূল্য নেই সেখানে।   

আমরা অনেক সময় পরিবর্তনের সঙ্গে একমত হই না। মনের ভেতরে বিদ্রোহ তৈরি হয়। তবু আমরা চুপচাপ তাকে মেনে নিই। নিজের রুটিন বদলে ফেলি। কারণ নোটিশের নিচে সাধারণত একটা শক্ত স্বাক্ষর থাকে। আর স্বাক্ষর মানে— আইনি প্রক্রিয়া শেষ, সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।  

আমি ধীরে ধীরে নোটিশ বোর্ড থেকে সরে এলাম। দরজার কাছে পৌঁছে বেরোনোর আগে আবার একবার পিছন ফিরে তাকালাম। আধো-অন্ধকারে সাদা কাগজটা তখনও ঝুলে আছে। কাল সকালেও এটা থাকবে। পরশুও থাকবে। তারপর কোনো একদিন কাজের প্রয়োজন ফুরোলে, কেউ এসে পিন উপড়ে কাগজটা খুলে ফেলবে। তার ওপর আটকে দেবে নতুন একটা কাগজ। নতুন কোনো নিয়ম। নতুন আর একটা নির্দয় তারিখ। নতুন একটা স্বাক্ষর।

এই পুরোনো নোটিশটা তখন কোথায় যাবে, কেউ জানবে না। কেউ খোঁজও নেবে না। হয়তো ডাস্টবিনে। হয়তো কোনো প্রশাসনিক ফাইলের মধ্যে চাপা পড়ে যাবে। হয়তো আর কোথাও থাকবে না।

অথচ একটা সময় এই এক টুকরো কাগজই ছিল কতগুলো মানুষের ব্যস্ততা, বিরক্তি কিংবা উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। পিনের ছুঁচলো মুখটা যখন কাঠ ভেদ করে বসেছিল, তখন সব যেন এই পুরো দপ্তরের সময়টাকে একটা নির্দিষ্ট বন্ধনীতে বেঁধে ফেলছিল। কিন্তু সময়ের কী অমোঘ স্বভাব— নতুন নিয়ম এসে পুরোনো নিয়মকে এমনভাবে মুছে দেয়, যেন তার কোনো অস্তিত্বই ছিল না কোনোদিন। মানুষের মনও বোধহয় ঠিক এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। পুরোনো আঘাত, পুরোনো নির্দেশ কিংবা পুরোনো মানুষদের হারিয়ে ফেলে আমরা আবার নতুন নির্দেশের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। 

হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় নেমে এলাম। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। মনে হলো, মানুষের জীবনেরও যদি একটা নোটিশ বোর্ড থাকত! তাহলে কত সহজ হত জীবনটা।

কোনো সম্পর্ক হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়ার আগে দেওয়ালের গায়ে একটাও নোটিশ লাগত। কেউ চলে যাওয়ার আগে একটা তারিখ দেওয়া থাকত। কোনো প্রিয় শহর চিরকালের মতো ছাড়ার আগে দেওয়ালে লেখা থাকত— এই ঠিকানায় আপনার আজই শেষ দিন। কোনো প্রিয় মানুষকে শেষবার দেখার আগে যদি কেউ জানিয়ে দিত— এই শেষ দেখা।  

তাহলে হয়তো আমরা শেষবারের মতো সেই মানুষটার মুখের দিকে একটু বেশি মন দিয়ে তাকাতাম। কথা বলার সময় গলার স্বরটা একটু নরম করতাম। নিজের সমস্ত তাড়াহুড়ো দূরে সরিয়ে রেখে বিদায়টাও ঠিক মতো জানাতাম। কিন্তু জীবনের কোনো নোটিশ বোর্ড নেই। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাগুলোই কোনোদিন নোটিশ হয়ে আসে না। 

কোনো আড়ম্বর ছাড়াই নিঃশব্দে সব বদলে যায়। আমরা শুধু অনেক পরে, একদিন ফাঁকা ঘরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি— নোটিশটা আসলে অনেক আগেই ঝুলেছিল। আমরাই পড়িনি।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *