Email: info@kokshopoth.com
February 19, 2026
Kokshopoth

জিল্লুর রহমান শুভ্র

Feb 18, 2026

গল্প/আখ্যান

জিল্লুর রহমান শুভ্র

 

বুধিগ্রাম নামের পেছনের কাহিনি

১৯০৭ সাল। সিরাজ—উদ—দৌলার পতনের প্রায় দেড়শ বছর পর। ইংরেজরা তখন বরেন্দ্রভূমিতে জেঁকে বসেছে। সাঁওতাল যুবক বুধি মুণ্ডা গ্রামে গ্রামে ঘুরে মোরগের লড়াই দেখিয়ে ধান—চাল সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। সাঁওতালদের যে সুঠাম দেহ তেমন ছিল না তার; লিকলিকে পাতলা গড়ন, ঝাঁকড়া চুল। ধুতির উপর হাফহাতা গেঞ্জি। বাঁ হাতের বাহুতে পুঁতি দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী এক ধরনের বাজু।

তার খেলা দেখতে দেখতে প্রগাঢ় মায়ার ছায়াবৃত্ত তৈরি হয় একই গ্রামের আলাদা পল্লির সাঁওতাল যুবতী লতিকা হেমব্রমের অখণ্ড মানসচিত্তে। তার একতরফা প্রেম শাখা—প্রশাখা বিস্তার করে। অবেণীবদ্ধ চুল, গায়ের রং মিশকালো; একেবারে নিগ্রো যুবতির ভাস্কর্য। তার মনের গহিন চরে সারাক্ষণ যুবক বুধির দুটো লাল ঝুটির মোরগ। কাকভোরে তার অবচেতন মনে মোরগদুটোর কু—কু—রুত কু ডাক নৈঃশব্দ্যের খোলস ভেঙে তৈরি করত জাদুময় আবহ; সেই আবহের টানে নেশাগ্রস্থের মতো চুর হয়ে পড়ত সে। সুযোগ খুঁজত তার সঙ্গে কথা বলার।

একদিন বুধি মুণ্ডা দূরগ্রাম থেকে ফিরছিল।

তখন সায়ংকালের লীলাময় আকাশ ডুবন্ত তরীর মতো ডুবছিল, আর অসংহত পানকৌড়ির দল বিশেষ শব্দতরঙ্গ বাতাসে ছড়িয়ে দিতে দিতে দূর অচেনায় মিলিয়ে যাচ্ছিল। আরণ্যক ছায়া ভেজা রাস্তায় নেতানো। প্রথম দৃষ্টিতে বুধি যাতে মুগ্ধ হয় সেজন্য সে সাজগোছ করেছে। লালপেড়ের সাদাশাড়ি, কোমরে বিছা, খোপায় মোরগফুল। তারপর ডেহুয়া গাছের আড়ালে নিজেকে আড়াল করল সে। চমকে দেবে তাকে। বুধি তার সামনে আসামাত্র আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো ঠিক; কিন্তু তার মধ্যে গুজগুজে ভাবের উপস্থিতি হঠাৎ বেড়ে গেল। যে মানসিক শক্তি এতক্ষণ তার ভেতর কাজ করছিল তা নিস্তেজ হয়ে পড়ল। লজ্জাজনিত কারণে হয়ত। ফলে মুখে কুলুপ আঁটল সে।

বুধি তার বাবাকে ভয় পায়। কারণ, তিনি মাঁঝি হাড়াম। তার জমিজমা ও অনেকগুলো শূকর আছে। সাঁওতালরা তাকে মান্য করে। সে—ও কথা বলে না। পাশ কেটে চলে যায়। লতিকা বিষণ্ণ মুখে তাকিয়ে থাকে তার অপসৃয়মাণ পথের দিকে। মনের মধ্যে অশান্ত ঝড়। কী করবে বা করা উচিত, তাও ভাবতে পারছিল না সে। হঠাৎ করেই তার ভাবনার দোলাচল থেকে বেরিয়ে আসার মওকা পায়। কিছুদূর হাঁটার পর বুধির হাত থেকে একটি মোরগ মাটিতে লাফিয়ে পড়ে তার দিকেই ছুটে আসতে থাকে। মোরগ কী তার তীব্র মনোবেদনার দহন আঁচ করতে পেরেছিল? হয়ত তাই। বুধি দাঁতখামটি দিয়ে মোরগটি ধরতে আসে। ততক্ষণে তার হয়ে কাজটি সেরে ফেলে লতিকা।

বুধি তার কাছে এলে মোরগটি তার হাতে তুলে দিয়ে এবার মুখের কুলুপ খুলল সে, ‘দেখেছ, মোরগটি আমাকে কত ভালোবাসে! তুমি কেমন মানুষ গো?’

বুধি মুণ্ডা যেন তার সঙ্গে কথা না বলার পণ করেছে। এবারও নিরুত্তর। তবে তার হাত থেকে মোরগটি নেওয়ার পর তার ঝুঁটিতে চুমু খেল সে। আর তাতেই লতিকার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। মনে হচ্ছিল তার বুধি তার উদ্দেশেই চুমুটা খেয়েছে।

আকাশ যতটা গম্ভীর মেঘ হয়ে ঝরে পড়ার সম্ভাবনাও তত প্রবল। লতিকা হেমব্রম বেশ বোধসম্পন্ন। একেবারে অপোগণ্ড পর্যায়ের নয় সে। তার মনের জানালায় সম্ভাবনার যে ছায়া উঁকি দিল, তা দেখে ফেলল সে। ফলে রহস্যময় হাসির আভাস তার ঠোঁটের কোণে অঙ্কুরিত হলো।

বাড়িতে ফিরল সে। তখন আকাশে অনেক তারা, আর তাদের দেউড়িতে ঝুলানো ছিল টিমটিমে আলোর হ্যারিকেন। তার নিচে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন তার মা। তার বুকে ব্লাউজবিহীন এক চিলতে কাপড়। দুপাশে তার পীনোন্নত পয়োধর যেন ঘাই মারছিল আলো—অন্ধকারে।

মাকে সরিয়ে ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করলে বাধা দিলেন তিনি।

‘কোথায় ছিলিরে তুই? হামাক বল।’

নিঃসন্দেহে আজকের মতো এতটা মিথ্যে কথা বলার বেসাতি ছিল না তখন। সত্য তখন অনড়ভঙ্গিতে প্রকাশ পেত। লতিকার বুক একটুও কাঁপল না। তরতর করে বলে ফেলল, ‘বুধিকে দেখতে গেছিনু।’

‘ক্যানে?’

‘তাকে ভাল্লাগে, তাই।’

‘ওদের বাড়িতে শূকর আছে?’

‘না।’

‘মোরগ ছাড়া তার আর কী আছে?’

‘হামি জানি না।’

‘ওরা ছোটজাত।’

‘হামরাও সাঁওতাল, ওরাও সাঁওতাল। ছোটজাত হলো ক্যানে?’

‘হামরাও মানুষ, সাদা চামড়ার বাবুরাও মানুষ। ওরা নিজেদের ব্রাহ্মণ ভাবে ক্যানে? উপরতলা নিচতলা আছে রে মা। এগুলা ভাবি চলতে হবে।’

প্রতিটি ধর্ম—বর্ণ— গোত্রে কিছু মানুষ থাকে যারা অপরকে হেয় করে উপরতলায় উঠতে চায়। যে মেথর সে—ও নিজেকে মনে করে অন্য মেথরদের চাইতে কুলীন সে। এরকম Narcissistic Personality Disorder কম—বেশি সব মানুষের মধ্যে আছে। তবে লতিকার মায়ের মধ্যে একটু বেশিমাত্রায় বটে। বুধিকে নিয়ে এবার তাচ্ছিল্য করলেন, ‘বুধি আবার সাঁওতাল নাকি!’ পরক্ষণে অহংবোধে তাড়িত হলেন, ‘তোর বাবা শূকরছানা পুড়িয়ে সাদা বাবুদের মতো কাঁটা চামচ দিয়ে খায়। এমনি এমনি!’

লতিকা তার মায়ের এহেন কথাবার্তায় রেগে ফায়ার। ধাক্কা দিয়ে মাকে সরিয়ে গটগট করে ভেতরে ঢুকে তার ঘর পর্যন্ত গেল সে। মাসকালাইয়ের মোটা রুটি ভাজা ছিল, ছিঁড়েফেঁড়ে কয়েকটি রুটি খেয়ে জল ঢালল গলায়; তাতেও তার স্বস্তি মিলছিল না। বুকের পাঁজরে খচখচ করছিল কী এক অমসৃণ পাথর! পাথরটা সরাতে চাইলে তার ঘুম দরকার; গভীর ঘুম। এক হাঁড়ি পচাই ঢকঢক করে গলায় ঢেলে ঘুমুতে গেল সে।

কিন্তু ঘুম কোথায়? তার চোখের দু’পাতা জোড়া লাগছিল না কিছুতেই। খেজুরপাটির বিছানায় গড়াগড়ি করল কতক্ষণ। বুধি কখনই তাকে প্রভাবিত বা প্ররোচিত করার চেষ্টা করেনি; বরং সে নিজেই প্রভাবিত, চূর্ণ—বিচূর্ণ। তার অবচেতন মনে বুধি যেন মায়াময় সাপুড়ে। তার বীন তাকে ঘরছাড়া করতে পারে যখন—তখন।

বাইরে নীল অন্ধকার। তুমদার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। সাঁওতালদের শিকার উৎসব। বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করে সেই কাঠের আগুনে তাদের শিকার করা প্রাণী রান্না করে একশা হয়ে খাওয়া। ভঁুড়িভোজের পর পচাই আবশ্যিক। তারপর তুমদার তালে তালে বিশেষ ধরনের নৃত্যের কসরত।

উৎসবটা চলছিল এক প্রাচীন মন্দিরের সামনে। লতিকার মনে হলো বুধি সেখানে থাকতে পারে। কিন্তু একা একা যাওয়ার সাহস হলো না তার। কারণ, মন্দিরটা নদীর পাড়ে এক ভীতিকর স্থানে। ঘন জঙ্গল পেরিয়ে যেতে হয় সেখানে। শেয়াল ইতোমধ্যে দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করেছে। তাদের ভয় জাগানিয়া হুক্কি—হুয়া ডাক সাঁওতালদের পল্লি পর্যন্ত আছড়ে পড়ছিল। অগত্যা পাশের বাড়ির বান্ধবীকে চুপিসারে ডেকে নিল সে।

দমকা বাতাসে ঝাউগাছ দুলছিল। ভয়ঙ্কর সাপের হিসহিস শব্দের মতো জঙ্গলের গা ছমছমে ফিসফিসানি। ভয়—আতঙ্কে তাদের হৃৎপিণ্ড দ্রিমদ্রিম করছিল। কখনও তাদের শ^াস—প্রশ^াস বেড়ে যাচ্ছিল। তবুও তারা সংকল্পবদ্ধ। কখনও গুটিগুটি পায়ে, কখনও জোরেশোরে। আকাশ থেকে কেউ যেন হঠাৎ হঠাৎ আগুনের গোলা নিক্ষেপ করছিল তাদের দিকে; যা দেখে তারা ভয়ে শিহরিত হচ্ছিল। জঙ্গলের তিনভাগ পেরিয়ে আসার পর তারা পেল্লায় সাইজের একটি নিকষ—কালো বেড়ালের মুখোমুখি হলো। তার জ¦লজ¦লে চোখ এতটাই ভয় ধরিয়ে দিল তাদের শরীরের লোম শজারুর কাঁটার মতো দাঁড়িয়ে গেল। এতকিছুর পর যখন তারা সেখানে পেঁাছুল, ততক্ষণে উৎসবস্থলে শোরগোল, কান্না, চিৎকার। আগুন ধরে গিয়েছিল সেখানে। আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে পচাই খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকা বুধি লাশের মতো পড়েছিল। তখন তার শরীরেও বিক্ষিপ্ত আগুন। চোখের সামনে স্বপ্নের মানুষকে পুড়তে দেখে তড়পাচ্ছিল সে। কালবিলম্ব না করে বান্ধবীর সহায়তা নিয়ে বুধিকে টেনে বের করল তারা। তারপর জল ছিটিয়ে রক্ষা করল তাকে।

তবে হুঁশ হওয়ার পর বুধি মুণ্ডা ওই দুর্ঘটনার কথা জানতে পারলেও কে বা কারা তাকে আগুন থেকে বাঁচিয়েছে, সে বিষয়ে কিছুই জানত না। সপ্তাহখানেক পর ললিতার বান্ধবীর মুখ থেকে শুনলেও বরাবরের মতোই নির্বিকার, নিস্পৃহ সে। তাকে কঠিন হৃদয়ের মনে হলেও আসলে কী তাই? তার মনের খাল—বিলে কী বৃষ্টি নামে না? শাপলা ফোটে না? জোছনাফুলের রেণু গায়ে মাখিয়ে আকাশের দিকে উদাসভাবে তাকায় না? না, লতিকার প্রতি তার নীরব ভালোবাসা মর্মতলে গুছিয়ে রেখেছে?

আপাত তার নির্মোহ ও নিরাসক্ত দৃষ্টিতে কেবল জীবনসংগ্রাম, কেবল লাল ঝঁুটির দুটো মোরগ। বৃদ্ধ মাকে ভক্তি, মোরগ দুটোর যত্নআত্তি, খুদকুঁড়ো খাওয়ানো, এসব ছিল তার নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম। আর বিকেলে খেলা দেখানোর উদ্দেশে বেরিয়ে পড়া। সেদিনও বেরিয়েছিল সে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাকে নিয়ে খেলে। তখন ঠগিরা চলে গেলেও বাংলার মাটিতে রেখে যায় তাদের প্রেতাত্মা; যাদের দমন—পীড়নের উদ্দেশে সশস্ত্র সিপাইরা টহল দিত। টহল দিতে এসে দুজন ইংরেজ সিপাই ঘোড়াপৃষ্টে বসে মোরগলড়াই দেখছিল। একসময় তাদের মনে হলো প্রতীকি অর্থে এ লড়াই ইংরেজদের বিরুদ্ধে। সাঁওতালদের ক্ষেপিয়ে তোলার কৌশল। ক্ষুধা ও দারিদে্র্যর বিরুদ্ধে তার লড়াইকে তারা ভুল বুঝল। একজন সিপাই ঘোড়াপৃষ্ট থেকে গুলি করে মোরগ দুটোকে হত্যা করল। তারপর বুধির উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করল, হবাবৎ ঃৎু ঃড় ঃযরং সড়ৎব!

বুধি মুণ্ডা বেকার হয়ে পড়ে। মানুষের কাছে হাতপাতা স্বভাব নেই তার। ফলে প্রায় অর্ধাহারে অনাহারে ঘরের মধ্যে পড়ে থাকতে হচ্ছিল তাকে।

খবরটা লতিকার কানে পৌঁছে। মনস্থির করে যেকোনো উপায়ে বুধির পাশে দাঁড়াতে হবে তাকে। তবে সে যে ধাতের মানুষ, তাতে সহসাই তার কাছ থেকে সাহায্য নেবে না। বিকল্প চিন্তা করল, তার মায়ের মাধ্যমে সাহায্যটা পৌঁছানো যেতে পারে। তার হাতে নগদ অর্থকড়িও নেই। অবশেষে নিজেদের গোলার ধান চুরি করে সেই ধান হাটে বেচে বড়োসড় দুটো মোরগ কিনল সে। তাদের ঝুটি টকটকে লাল। পালক লাল—কালোর মিশেল। একটার ঠোঁট তুরমতি বাজের ঠোঁটের মতো। তার গলকম্বলটাও বেশ আকর্ষণীয়। সে তুলনায় অপরটা দুর্বল ও অপেক্ষাকৃত ছোট।

পরদিন দুপুর। পশ্চিমা রুক্ষ হাওয়া বইছিল।

মোরগ দুটো সঙ্গে নিয়ে বুধিদের বাড়িতে এলো সে। তার মায়ের সঙ্গে বাৎচিত করার সময় বুধি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। পরনে এক প্রস্থ কাপড়। চালের খুঁটিতে হেলান দিয়ে শুকনো মুখে দৃষ্টি বিনিময় করল; তবে আগের মতোই নীরব। যেন নীরবতার গুমোট পাহাড়; কেউ টলাতে পারবে না তাকে।

এই প্রথম বুধিকে খালি গায়ে দেখল সে। বিস্ময়াবিষ্ট মুগ্ধতা নিয়ে তাকালেও পরক্ষণেই বেদনার নোনাজলে তার দেহ ও মন সিক্ত হলো। এ কী হাল হয়েছে বুধির? আঁতকে উঠল সে। খেতে না পাওয়ার কারণে পিঠের সঙ্গে পেট ঠেকে গেছে। বুকের কাঠি গোণা যাচ্ছিল।

লতিকার চোখের সরোবর উপচে উঠতে চাইছিল, কষ্টেসৃষ্টে থামিয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘হামি জানি, তুমি রাগ করবে। এ ছাড়া উপায় কী?’

বুধি মুণ্ডার কঙ্কালসার শরীরের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল আত্মমর্যাদা। মোরগ দুটো নেওয়ার ব্যাপারে তার মধ্যে অনাগ্রহ ভাব প্রবল। কিন্তু মায়ের পীড়াপীড়িতে নিতে রাজি হলো সে। আর না নিয়ে তার উপায়ও ছিল না। সৎ পরামর্শ নিয়ে কেউ এগিয়ে আসছিল না। ব্যাটাছেলে হয়ে ঘরের মধ্যে মুখ থুবড়ে কতদিন পড়ে থাকা যায়!

বুধি মোরগ দুটো গ্রহণ করতে রাজি হওয়ায় লতিকা হেমব্রমের আনন্দের শেষ ছিল না। তার আনন্দময় রেশ যেন ছড়িয়ে পড়ল গ্রহমণ্ডলের আনাচ—কানাচ। মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করে তাদের বাড়ি ফিরে গেল সে।

মোরগ দুটো হাতে পাওয়ার পর বুধির মৃতপ্রায় শুষ্ক জীবনে নতুন করে প্রাণসঞ্চার হলো। কীভাবে লড়াই প্রদর্শন করে দর্শকদের মনোরঞ্জন করতে হয়, তা মোরগ দুটোকে শেখাতে লাগল। এবার নতুন উদ্যমে মোরগলড়াই দর্শকদের উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আগের মোরগ জোড়ার উপর কোনও নাম আরোপ করেনি সে। এবার করল। গায়েগতরে বড়োসড় ও শক্তিশালী মোরগটির নাম দিল বুধি, আর অপেক্ষাকৃত দুর্বলটির নাম ফুলার। তখন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর ছিলেন ব্যামফিল্ড ফুলার। তিনি ১৯০৬ সালে পদত্যাগ করলেও আমজনতা জানত তিনিই গভর্নর।

ডুগডুগি বাজিয়ে গ্রামবাসীকে জড়ো করত, আর তাদের উদ্দেশে গলা ফাটিয়ে বলত সেÑ

‘আসুন আসুন

বুধি বনাম ফুলার বাবু

সার্কাস দেখুন।’

বুধির কাছে ফুলার বাবু ধরাশায়ী। তা দেখে দর্শকরা আনন্দে ফেটে পড়ত, হাততালি দিত, সিটি বাজাত। বুধির এই দ্বিতীয় পর্বের মোরগলড়াই বেশ জমল। দূর—দূরান্ত থেকে ডাক আসতে থাকে। তার আয় বাড়তে থাকে। শনৈঃশনৈঃ তার উন্নতি দেখে লতিকা বেজায় খুশি। এতটাই খুশি পূজা—অর্চনা ও পশু বলিদানও করে সে। আর এই পশু বলিদান দিতে গিয়ে বুধির প্রতি তার ভালোবাসার কথা জানাজানি হয়। তার বাবার কানেও খবরটা পেঁৗছে। তার খেসারত দিতে হয় বেদম পিটুনি হজম করার মধ্য দিয়ে। তবুও থেমে থাকে না সে। বুধির প্রতি তার ভালোবাসা ও সমর্থন আরও তীব্রতর হয়; যা দেখে তার বাবা আতঙ্কবোধ করেন।

মেয়েকে সামলাতে না পেরে তার বাবা ফন্দি আঁটেন বুধিকে ফাঁদে ফেলবেন। গোপনে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলান। ফুলার বাবুকে নিয়ে বুধি যে তামাশা করছে, তা তাদের জানিয়ে দেন। এবং তাদের কাছ থেকে উপযুক্ত শাস্তি প্রত্যাশা করেন।

বুধি মুণ্ডার পক্ষ থেকে সব ঠিকঠাক চলছিল; কিন্তু ভুল একটাইÑফুলার বাবু। একদিন হাটে গেল খেলা দেখাতে। কুপিবাতির আলোয় জমজমাট শতবর্ষী পাঁচকড়ির হাট। অনেক হাটুরে ভিড় করল তার খেলা দেখতে। অর্থকড়ি বেশ জমা হলো তার কাছে। হঠাৎ মেঘের চ’ড়োয় বিজলির পাখসাট। ঝড়—বৃষ্টির আভাস। খেলা গুটিয়ে মোরগ দুটো সঙ্গে নিয়ে শিস ফুটাতে ফুটাতে বাড়ি ফিরছিল সে; পথিমধ্যে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। তার সঙ্গে ছাতা ছিল না; দৌড়ে গিয়ে ঘনপাতার শাখা—প্রশাখাবিশিষ্ট প্রকাণ্ড গাছ ঘেঁষে অবস্থান নিল। তবুও বৃষ্টির উৎপাত; তারচে’ বেশি খিদের উৎপাত। মা তাকে কয়েকটি মোয়া খেতে দিয়েছিল। সেই মোয়া কোমরের কাপড়ে বাঁধা ছিল, বের করে কেবল কামড় বসাবে, তখুনি একদল অশ^ারোহী সিপাই ঘিরে ধরল তাকে। গ্রেফতার করে দু’হাত একত্রে বেঁধে অমানবিকভাবে টানতে টানতে নিয়ে গেল তাদের ডেরায়। জলকাদায় লেপ্টালেপ্টি সে। একটা সিংহের খাঁচার পাশে অপর একটি খাঁচায় ঠেলে দেওয়া হলো তাকে। বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে পাহারা বসানো হলো।

খেতে দেওয়া হতো শুকনো রুটি, ময়লা পানি। দিনশেষে ঠ্যাংগানি। পাশের খাঁচার সিংহের হুমকি তো ছিলই। তার মেজাজ শান্ত থাকলে মাটিতে বসে লেজ নাড়াত, কখনও মাটিতে মুখ রেখে আধবোজা চোখে তার দিকে তাকাত। আর মেজাজ বিগড়ে গেলে তো কথাই নেই। মুখ হা করে গর্জন গর্জন করতে করতে তার দিকে ছুটে আসত। বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ফিরে গিয়ে আবার আগের জায়গায় বসত, মধ্যম স্বরে গর্জন করে বোঝাতে চাইত, যা, এবার ছেড়ে দিলাম!

বুধি ফিরে না আসায় তার মা চিন্তিত হয়ে পড়ল। ছেলের শোকে তিনদিন ধরে মুখে জল পর্যন্ত দিল না সে। চিন্তার মাত্রাটা যখন অপ্রতিরোধ্য তখন লাঠিতে ভর করে ঠুকঠুক করে বুড়ি লতিকাদের বাড়িতে এলো। দরজায় পা রাখতেই হ্যাপা। বুড়িকে অপমান করলেন লতিকার বাবা। বুড়ি তার অপমান গায়ে মাখল না। ভেঙেও পড়ল না। শক্তমন নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকল। উঠোনে পা রাখতেই লতিকা তাকে দেখে ফেলল। এক দৌড়ে এসে তার হাত ধরল। টেনে নিয়ে গেল তার শোবার ঘরে। বুড়িকে এভাবে আচমকা তাদের বাড়িতে আসতে দেখে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সংশয়ের চোখে বুড়ির দিকে তাকালে সে ভাঙা ভাঙা গলায় তার ছেলের নিরুদ্দেশ হওয়ার কথা জানাল। লতিকার মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা যেন দ্রুত ডানা মেলল, আকাশের এপ্রান্ত সেপ্রান্ত উড়ে বেড়াল; তারপর মাটিতে নামলে বুড়িকে প্রবোধ দিল সে।

ছেলে নিখেঁাজ হওয়ার পর থেকে বুড়ি তার মুখে কিছু দেয়নি, শোনার পর হড়পা বানের মতো দয়ার বান বয়ে গেল লতিকার হৃদয়তটিনীতে। কলাগাছের বাকলে ভাত আর আটার ডাল এনে তার সামনে দিল। গবগব করে খেল সে। খাওয়ার পর পানের আবদার করলে সে আবদারও পূরণ করল তার। পান চিবুতে চিবুতে বুড়ি বিদায় নিল।

বৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে সবকিছু যেমন লণ্ডভণ্ড হয় তেমনি বুধিকে ঘিরে তার স্বপ্ন লণ্ডভণ্ড। তবে সহসাই হাল ছাড়ার পাত্রী নয় সে। ধনুক ভাঙা পণ করল যেকোনো ভাবেই হোক তার ভালোবাসার পাত্রকে খুঁজে বের করবে। করবেই সে! অতঃপর সুলুকসন্ধানে জোর দিল। আর এভাবেই তার কাছে খবর এলো বুধি বন্দি।

তখন গোধূলির রং নিয়ে হলি খেলছিল আকাশ। বনভূমির উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছিল নীরব শূন্যতা। গোপনে উপস্থিত হলো সে ইংরেজদের ডেরায়। রেকি করতে গিয়ে বুধি তার কনীনিকায় ধরা পড়ল। বুকটা ধক করে উঠল তার। হৃদয় দুমড়েমুচড়ে গেল। তার প্রিয় মানুষ ভালোবাসার মানুষ পশুর মতো খাঁচায় বন্দি। পাশেই সিংহের খাঁচা। কতটা পাশবিক তারা! তার চোখেমুখে প্রতিশোধের আগুন দপ করে জ¦লল। সেই আগুনে নিভে যাওয়ার আভাস ছিল না। তৎক্ষণাৎ বাড়িতে ফিরে এলো। হাতে নিল বাবার তির—ধনুক। সন্তর্পণে আবার বেরিয়ে পড়ল সে।

ডেরাটা ঝোপঝাড় পরিবেষ্টিত। তবে বৃটিশদের সহজাত কারণে চমৎকারিত্ব লক্ষণীয়। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন এলাকা। ধবধবে আলোর অভাব প্রকট। তবে একটু পর পর মোমবাতি লণ্ঠন। তারা এমনভাবে স্থিরিকৃত ছিল, মনে হচ্ছিল তারা পরস্পরের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলছে। পাহারাদার ছাড়া কেউ ছিল না; ফলে সুনসান পরিবেশ। লতিকা ছিল ঝোপের আড়ালে। সাঁওতালকন্যা হিসেবে তির—ধনুক চালানোর কৌশল তার মজ্জাগত। পাহারাদারকে লক্ষ করে প্রথম তিরটি ছুঁড়ল সে; কিন্তু তিরটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার কানের পাশ দিয়ে সাঁই করে চলে গেল। অনুমান করল সে, কিছু একটা খারাপ ঘটতে চলেছে তার সঙ্গে। ত্রস্তপদে ঝোপের দিকে এগোচ্ছিল সে। এবার আর ব্যর্থ হলো না লতিকা; তার ছেঁাড়া দ্বিতীয় তিরটা সরাসরি গিয়ে বিঁধল পাহারাদারের বুকে। দাপাতে দাপাতে মাটিতে ঢলে পড়ল সে। তির—ধনুক ফেলে দিয়ে দৌড়ে গেল তার কাছে; কোমর থেকে ছিনিয়ে নিল খাঁচার চাবি।

বুধিকে উদ্ধার করলেও সে তার চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। লতিকার কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটতে লাগল সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। ডেরার কেউ টের পেল না।

প্রাতঃকালে পাহারাদারের লাশ পড়ে থাকতে দেখে টনক নড়ল অত্যাচারী ও দখলদার বাহিনীর। তদন্তে নামল। গলদঘর্ম হওয়ার আগেই হত্যার সূত্র পেয়ে গেল তারা। ঝোপের মধ্যে পড়ে ছিল তির—ধনুক। সাঁওতালদের তির—ধনুক তো অবশ্যই; তবে কার হতে পারে? লতিকার বাবা মাঁঝি হাড়াম হওয়ার কারণে তাকে তারা তাদের ডেরায় ডাকল। তিনি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। এক ইংরেজ অফিসারের জেরার মুখে স্বীকার করলেন এই তির—ধনুক তার। তবে তিনি কাউকে হত্যা করেননি বলে সাফ জানিয়ে দিলেন।

হত্যাকারী কে ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে বিষয়টা খতিয়ে দেখার আশ^াস দিলেন তাদের।

বাড়িতে এসে শান্তি পাচ্ছিলেন না। মুষড়ে পড়লেন। কাউকে সন্দেহ করতেও পারছিলেন না। হঠাৎ তার সামনে হত্যাবিষয়ক রহস্যের পর্দাটা একটু একটু করে উন্মোচিত হলো। আচ্ছা, বুধি তো তাদের কাছে বন্দি ছিল; কে তাকে পালাতে সাহায্য করল? সন্দেহের তিরটা গিয়ে পড়ল তার একমাত্র কন্যার উপর। বুধিকে সে ভালোবাসে। এ নিয়ে বাপবেটির মধ্যে কম বাকবিতণ্ডা হয়নি। সে—ই বুধিকে পালাতে হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য কাজটা করেছে। কিন্তু মেয়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহস হচ্ছিল না তার। এদিকে ইংরেজদের কঠোর শাস্তির ভয় তাড়া করছিল তাকে।

বাবার দুশ্চিন্তা, তার এলোমেলো পদবিক্ষেপ, সবকিছু ভুলে যাওয়ার প্রবণতা, চেহারার ভাঁজে ভাঁজে আলো—আঁধারির রহস্যময়তা লতিকাকে ভাবিত ও সন্দিগ্ধ করল। বাবাকে বাঁচাতে এবার সে অকুতোভয় চিত্তে পাহারাদারকে হত্যার দায় স্বীকার করে ডেরায় গিয়ে স্যারেন্ডার করল। তার মনে একটাই সান্ত্বনা ভালোবাসার মানুষকে সে খাঁচাবন্দি থেকে মুক্ত করতে পেরেছে।

সব প্রমাণ তাদের হাতে। ঝঢ়ববফু ঃৎধরষ শেষে গ্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসির রায় হলো। বুধবার রায় কার্যকরের দিন হিসেবে সাব্যস্ত হলো। এই বুধবার দিনটা তার জীবনে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই বুধবারেই মোরগলড়াই দেখতে গিয়ে বুধির প্রেমে পড়ে সে। যে প্রেম তাকে ভাসিয়ে নেয় উতল হাওয়ায়, জন্ম দেয় অত্যাসক্ত অনুরাগ, আবেগঘন পঙ্ক্তিমালার মতো তাকে ছন্দোবদ্ধ করে।

লতিকার প্রকাশ্য ফাঁসি দেখতে সাঁওতালরা জড়ো হয়েছে। ভিড়ের মধ্যে বুধিও বসে আছে; তবে সে নির্বিকার। কাপড়ে ঢাকা তির—ধনুক এমনভাবে তার সঙ্গে রেখেছে কারও মনে সন্দেহ জাগতে না পারে। ফাঁসির মঞ্চ তৈরি। ফাঁসির দড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পেছনে হাতবাঁধা লতিকার চোখ ভিড়ের মধ্যে বুধিকে খুঁজছিল। অন্তত শেষ দেখাটা। কিন্তু বুধিকে দেখতে না পেয়ে তার মুখটা বেজায় ছোট হয়ে এলো। জল্লাদ তার মুখ কালো কাপড়ে ঢেকে দিল।

এদিকে একজন ঘড়ি দেখছিলেন। কখন জল্লাদকে সঙ্কেত দেবেন। ফাঁসি কার্যকর করার সময় ফুরিয়ে আসছিল। ভিড়ের মধ্য থেকে বুধি হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। প্রথমে জল্লাদকে লক্ষ করে তির ছুঁড়ল। তিরটা লক্ষ্যভেদ করে। এরপর যিনি ঘড়ি দেখছিলেন তার দিকে দ্বিতীয় তির। তিনিও কুপোকাত। দৌড়ে গিয়ে মঞ্চের ওপর উঠল সে। লতিকার মুখের কালো কাপড় সরিয়ে ফেলল।

 

রে রে রে হাঁক দিয়ে সাঁওতালরা ইংরেজদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লেগে গেল হাতাহাতি। এ সুযোগে লতিকা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো; তবে পালাতে পারল না বুধি। পেছন থেকে সিপাইয়ের গুলি এসে লাগে তার পিঠে। গুলিটা তার হৃৎপিণ্ড ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছিল, চেপে ধরল ছিদ্রপথটা; কিন্তু তার প্রাণবায়ু নিজেদের বাসভূমে থাকতে চাইছিল না আর। বাইরের আলো—বাতাসে পরিভ্রমণের জন্য ছটফট করছিল। মুহূর্তেই মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে সে। হাতদুটো বিছিয়ে দেয় সামনের দিকে। চোখে অশ্রম্নপ্লাবন। অস্ফুট স্বরে দীর্ঘশ^াসের মতো তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটি নাম, লতিকা…! সিপাই তার একহাত টেনে উপরের দিকে তুলে আরেক সিপাইকে নির্মম রসিকতার সুরে বলল, ‘ঐব’ং ফবধফ! ঘবাবৎ পড়সরহম নধপশ!’

একটি শব্দ বা বাক্য প্রকাশ না করেও যে কাউকে কঠিন ভালোবাসা যায়, বুধি মুণ্ডা তার জ¦লন্ত প্রমাণ। তাকে নিয়ে লতিকার সংশয় ছিল সে তাকে ভালোবাসে কিনা! তার সংশয়াবিষ্ট অপ্রশস্ত মনে বুধির আত্মত্যাগ চন্দ্র—সূর্য—গ্রহ—তারার মতো যখন প্রকটিত হলো তখন তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে আমৃত্যু চোখের জলে স্মরণ করেছে তাকে। কোনও পরপুরুষের মুখ সে আর চিন্তা করেনি। তাকে বিয়ে দিতে প্রবল ইচ্ছুক বাবা—মায়ের চোখরাঙানি পরোয়া করেনি। নিজের সুখ—স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে একটুও দ্বিধা করেনি। প্রতিদিন মন্দিরে গিয়ে তার জন্য পুজো করেছে। ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে বৃক্ষ ছায়াতলে বিশ্রামরত পশুরা যখন জাবর কাটত তখন স্মৃতির অ্যালবাম খুলে নীরবে নিভৃতে বসেছে সে। যখন সন্ধ্যায় বৃষ্টি নেমেছে, মানকচু পাতায় সুরতরঙ্গ উঠেছে, তখন সে একলা একলা ঘরে বন্দি থেকে অঝোরে কেঁদেছে। শীতের ঘন কুয়াশার ভেতর কোনও আবছায়া দেখলে বুধি মনে করে ছুটে গেছে সেদিকে। যখন বসন্তের বিষণ্ণ বিকেল গোধূলির দিকে ধাবিত, পাখিরা উড়ি—উড়ি করছিল তাদের গৃহে ফেরার তাগিদে, তখন তার ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি বুধিকে ইতস্তত খুঁজে বেড়িয়েছে। কিন্তু হায়! কোথাও বুধির চিহ্নমাত্র নেই। তবুও তার সংগুপ্ত বেদনা থেকে উৎসারিত বুধিপ্রেম থেমে থাকেনি। গাছের বাকলে বাকলে, লতাপাতায়, মাটির দেয়ালে দেয়ালে খড়িমাটি দিয়ে, দিনের পর দিন মাসের পর মাস, লিখে গেছে বুধির নাম। পাথরে পাথরে খোদাই করেছে বুধির নাম। খেতে বসে ভাতের থালায় চোখের জলে লিখেছে বুধির নাম।

জনশ্রম্নতি, এভাবেই তাদের গ্রাম বুধিগ্রাম হিসেবে লোকমুখে পরিচিতি পেতে থাকে।

1 Comment

Leave a Reply to গল্প/আখ্যান – Kokshopoth Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *