Email: editors.kokshopoth@gmail.com
October 9, 2026
Kokshopoth

গল্পঃ বিশ্বজিৎ মণ্ডল

Oct 9, 2026

গল্পঃ বিশ্বজিৎ মণ্ডল

জন্ম ১৯৭৩ বহরমপুর শহরে। শিক্ষাগত যোগ্যতা: স্নাতক, পেশা শিক্ষকতা, প্রকাশিত গ্রন্থ: মোট ১৫ টি। সম্পাদনা : গল্পনগর ও উষ্ট্রযান পত্রিকা। 

জৌলুস

প্রথম

বছর কুড়ি হল, পুরনো জীবিকাটা হারিয়েছে ভিকা হাজরা।

ঘোড়ামারার হাজরা পাড়ার মানুষ ভিকা। দেহাতি সরলতা আর মাটির গন্ধ মিশে আছে তার কথাবার্তায়। খুব বেশি পড়াশোনা শেখেনি সে, কিন্তু মানুষের মন বোঝার ক্ষমতা ছিল তার সহজাত। গ্রামের মানুষ কী চায়, কোন জিনিসে তাদের আনন্দ—এই হিসেবটা ভিকা ভালই বুঝত।

এক সময় এই ভিকার নাম শুনলেই গ্রামের মানুষ বলত, “ওই যে ভিকা ভিডিওওয়ালা যাচ্ছে।”

আজ সেই নামটাও যেন সময়ের ধুলোয় চাপা পড়েছে।

বিলের ধারে বেড়া দেওয়া ঝঙ্কার ক্লাবের একচিলতে ঘরটিই ছিল তার স্বপ্নের রাজ্য। ছাব্বিশ ইঞ্চির একটা রঙিন টিভি, একটা ভিডিও প্লেয়ার আর কয়েকটা কাঠের বেঞ্চ—এই সামান্য জিনিস নিয়েই একসময় সে তৈরি করেছিল গ্রামের মানুষের বিনোদনের এক ছোট্ট দুনিয়া।

সেই ঘরে সন্ধ্যা নামলেই ভিড় জমত। কেউ আসত সাইকেল ঠেলে, কেউ আসত হেঁটে, কেউ আবার দূরের গ্রাম থেকে ভ্যান ভাড়া করে। সিনেমা শুরু হওয়ার আগে থেকেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত ছেলেদের দল।

কেউ বলত, —”ভিকা দা, আজকের ছবিতে নায়ক মারপিট করে তো?”

ভিকা হেসে বলত, —”মারপিটও আছে, গানও আছে। শেষে মন ভালো কইরা বাড়ি যাবি।”

কখনও বাংলা ছবি, কখনও হিন্দি ছবি। নায়ক যখন খলনায়ককে ঘুষি মারত, তখন ঘরের ভেতর থেকে হাততালির শব্দ উঠত। নায়িকা কাঁদলে দর্শকের চোখেও জল আসত। সিনেমা তখন শুধু পর্দায় চলা গল্প ছিল না, ছিল গ্রামের মানুষের একসঙ্গে থাকার উপলক্ষ।

কিন্তু সেই দিন আজ আর নেই।

ঝঙ্কার ক্লাবের ঘরের তালা খুলতে এখন ভিকার হাত কাঁপে। অনেকদিন পর এক সকালে সে ঘরে ঢোকে। দরজা খুলতেই ভেতর থেকে পুরনো ধুলো আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ বেরিয়ে আসে।

এক কোণে পড়ে আছে তার পুরনো টিভি। পর্দার ওপর ধুলোর আস্তরণ। পাশে ভিডিও প্লেয়ার। তারগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে।

ভিকা একটা পুরনো কাপড় দিয়ে টিভির গা মুছতে মুছতে বলে, —”কত মানুষরে আনন্দ দিছিস রে তুই। এখন কেউ তোর দিকে ফিরেও তাকায় না।”

তার নিজের কথাতেই যেন তার বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসে।

বাইরে বেরিয়ে সে কিছুক্ষণ ক্লাবঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। যে উঠোনে একসময় মানুষের ভিড় সামলানো যেত না, সেখানে এখন ছাগল ঘাস খায়।

ঠিক তখন পাশ দিয়ে কয়েকজন ছেলে যেতে যেতে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে হাসছিল।

একজন আরেকজনকে বলল, —”দ্যাখ দ্যাখ, নতুন সিনেমার ক্লিপ আইছে!”

ভিকা শুনে মৃদু হেসে ফেলে।

তার মনে পড়ে যায়, এক সময় একটা নতুন সিনেমা আনতে তাকে কত কষ্ট করতে হতো। বাজার থেকে ক্যাসেট আনতে হতো, পোস্টার লাগাতে হতো, ভ্যানে মাইক নিয়ে প্রচার করতে হতো। আর এখন? একটা ছোট্ট মোবাইলেই হাজার হাজার ছবি।

গ্রামের চায়ের দোকান এখন নতুন আড্ডার জায়গা। সেখানে বসে ভিকা মাঝে মাঝে মানুষের কথা শোনে।

চায়ের দোকানের মালিক রমেশ একদিন বলল, —”ভিকা, তোর হল আবার চালু করবি নাকি?”

ভিকা হেসে বলল, —”কার লাইগা চালামু রে? মানুষ এখন ঘর থেইকাই সিনেমা দেখে।”

পাশে বসা কালু, যে আগে তার ভিডিও হলের নিয়মিত দর্শক ছিল, মোবাইল বের করে বলল, —”এই দ্যাখ ভিকা দা, আমার ফোনে কত ছবি আছে। যেইটা চাই, সেইটাই দেখি।”

আরেকজন দিনমজুর বলল, —”আগে কাজ শেষ কইরা সন্ধ্যায় হল যাইতাম। এখন ঘরে গিয়া ফোনটা হাতে নিলেই সময় কই যায় বুঝি না।”

সবাই হাসে। কিন্তু ভিকার মনে হাসি আসে না।

সে জানে, পরিবর্তনকে আটকানো যায় না। নতুন প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করেছে। গ্রামের গরিব মানুষও এখন পৃথিবীর খবর জানতে পারে, দূরের জিনিস দেখতে পারে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে গেছে অনেক ছোট ছোট আনন্দ।

আগে সিনেমা দেখতে যাওয়া মানে ছিল একটা অনুষ্ঠান। বাড়ির লোকজন জানত, আজ রাতে সবাই ঝঙ্কার ক্লাবে যাবে। পথ চলতে চলতে গল্প হবে। সিনেমা শেষে নায়কের অভিনয় নিয়ে তর্ক হবে।

এখন সেই জায়গা নিয়েছে একাকী পর্দা।

বৃদ্ধ নসু মিয়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে একদিন বলেছিল, —”মোবাইল খারাপ জিনিস না রে ভিকা। কিন্তু মানুষ যদি মানুষের কাছ থেক্যে দূরে যাতে থাকে, তাইলে মুশকিল।”

কথাটা ভিকার মনে গেঁথে আছে।

সন্ধ্যা নামলে সে এখনও মাঝে মাঝে ঝঙ্কার ক্লাবের সামনে বসে। দূরে কোথাও মোবাইল থেকে গান ভেসে আসে। কিন্তু সেই গানের সঙ্গে আর কোনো মানুষের কোলাহল মেশে না।

আকাশে চাঁদ ওঠে। বিলের জলে আলো পড়ে।

ভিকা একা বসে ভাবে—কী অদ্ভুত এই সময়! একদিন তার ছোট্ট ঘর আলোয় ভরে থাকত, আর আজ সেই আলো মানুষের হাতের মুঠোয় বন্দি।

তবু জীবন তো থেমে থাকে না।

ভিকা জানে না সামনে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। শুধু জানে, পুরনো দিন ফিরে আসবে না।

ঝঙ্কার ক্লাবের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়, একটা যুগ শেষ হয়ে গেছে।

দ্বিতীয় 

ভিকার চোখের সামনে হঠাৎ করে বর্তমানের ছবিটা ঝাপসা হয়ে যায়। ঝঙ্কার ক্লাবের ভাঙা দেওয়াল, ধুলো জমা টিভি, ফাঁকা উঠোন—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে।

মনে পড়ে যায় কুড়ি বছর আগের সেই দিনগুলো।

তখন ভিকা শুধু ভিকা ছিল না, সে ছিল গ্রামের মানুষের বিনোদনের ঠিকানা। ঘোড়ামারা, দৌলতপুর, চাঁদপুর, ফতেপুর—চারদিকের মানুষের কাছে ঝঙ্কার ভিডিও হল ছিল একমাত্র আনন্দের জায়গা।

সেই সময় গ্রামের সন্ধ্যা নামত অন্যরকমভাবে।

ধানখেত থেকে কৃষক ফিরছে, গরু নিয়ে রাখাল বাড়ি যাচ্ছে, আর বাজারের মোড়ে মোড়ে শোনা যাচ্ছে ভিকার মাইকের আওয়াজ।

ভিকার পুরনো ভ্যানগাড়ির সামনে বাঁশের খুঁটি বাঁধা। তার ওপর লাগানো লাউডস্পিকার। ভ্যানের পাশে ঝুলছে রঙিন পোস্টার। ব্যাটারি চালিত মাইক হাতে নিয়ে ভিকা গ্রাম ঘুরে বেড়াত।

তার গলা শুনলেই মানুষ বুঝত—নতুন ছবি এসেছে।

“শুনেন, শুনেন, শুনেন! ঘোড়ামারা আর আশপাশের গ্রামের সকলের জানার জন্য জানানো যাইতেছে—আজ ঝঙ্কার ভিডিও হলে নতুন বাংলা ছবি! বিকেল চারটার শো, সন্ধ্যা সাতটার শো। আর রাইত দশটার বিশেষ শো। টিকিট আগে কাটেন, পরে জায়গা পাবেন না!”

মাইকের শব্দ শুনে বাড়ির উঠোনে কাজ করতে থাকা মহিলারাও একবার মুখ তুলে তাকাত।

কেউ বলত, —”আবার নতুন ছবি আনেছে ভিকা।”

কেউ বলত, —”ছেলেপুল্যাকে লিয়ে যাতে হবে ।”

দৌলতপুরের মোড়ে চায়ের দোকানের সামনে বসে থাকা লোকেরা ভ্যান থামিয়ে জিজ্ঞেস করত, —”ভিকা, ছবিডা কেমন?”

ভিকা বুক ফুলিয়ে বলত, —”দেখেন, মন ভরে যাব্যে ।”

তার আত্মবিশ্বাস দেখে লোকেরাও হাসত।

সন্ধ্যার আগেই ঝঙ্কার ক্লাবের সামনে ভিড় জমে যেত। কারও হাতে চিনাবাদাম, কারও হাতে চানাচুরের ঠোঙা। ছোট ছেলেরা বাবার হাত ধরে আসত। যুবকেরা দল বেঁধে আসত। বয়স্ক লোকেরাও বসত সামনের বেঞ্চে।

সিনেমা শুরু হলে ঘর অন্ধকার হয়ে যেত। টিভির পর্দায় ছবি ফুটে উঠতেই সবাই চুপ।

তারপর শো শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠত হাততালি।

কেউ চেঁচিয়ে বলত, —”এইবার দে একটা ঘুষি!”

কেউ আবার নায়িকার দুঃখের দৃশ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলত।

ভিকার জীবনে তখন কী আনন্দ! দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সে মানুষের মুখ দেখত। মনে হতো, সে শুধু সিনেমা দেখাচ্ছে না—সে মানুষকে কিছু মুহূর্তের সুখ দিচ্ছে।

কিন্তু সব কিছুরই একটা অন্ধকার দিক থাকে।

ঝঙ্কার ভিডিও হলের রাতের শেষ শো নিয়ে ধীরে ধীরে গ্রামের মধ্যে নানা কথা ছড়াতে শুরু করেছিল।

বিকেলের চারটার শো, সন্ধ্যার সাতটার শো ছিল সাধারণ মানুষের জন্য। কিন্তু রাত দশটার শোতে আসত অন্য ধরনের কিছু দর্শক। উঠতি বয়সের কিছু ছেলে, বাইরে থেকে আসা কিছু যুবক আর মদ খেয়ে আসা কয়েকজন মানুষ।

ভিকা বুঝত, ওই শো থেকে আয় বেশি। কিন্তু সে এটাও বুঝত, সবকিছু ঠিক পথে যাচ্ছে না।

পাড়ার মানুষদের মধ্যে কানাঘুষো শুরু হলো।

চায়ের দোকানে বসে কেউ বলত, —”রাইতের শো লিয়্যা ভালো কথা শুনছি না।”

কেউ বলত, —”ব্যবসা করুক, কিন্তু গ্রামের পরিবেশটাও তো দেখতে হবে ।”

একদিন হাজরা পাড়ার কয়েকজন মুরুব্বি ভিকাকে ডেকে পাঠালেন।

নসু মিয়া গম্ভীর মুখে বললেন, —”ভিকা, তুই ভালো ছেলে। এতদিন ভালোই চলছিলি। কিন্তু ওই রাইতের ব্যাপারডা বন্ধ কর।”

ভিকা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

আরেকজন বললেন, —”গ্রামের ছেলেপুলা আছে। সবকিছুর একটা সীমা থাকা দরকার।”

নসু মিয়া একটু কঠিন গলায় বললেন, —”আবার যদি শুনি, তাইলে নওদা থানায় জানাইতে বাধ্য হোবো ।”

ভিকার মুখ শুকিয়ে গেল।

সে মাথা নিচু করে বলল, —”ঠিক আছে কাকা। খেয়াল রাখবো ।”

সেদিন বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল ভিকা। সে বুঝেছিল, শুধু টাকা রোজগার করলেই হয় না, মানুষের বিশ্বাসটাও ধরে রাখতে হয়।

এরপর সে রাতের শো নিয়ে সাবধান হয়ে গেল।

কিন্তু তার অজান্তেই আরেকটা বড় পরিবর্তন দরজায় কড়া নাড়ছিল।

গ্রামে মোবাইল ঢুকতে শুরু করল।

প্রথমে হাতে গোনা কয়েকজনের কাছে। তারপর প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে।

যুবকেরা আর সিনেমার জন্য অপেক্ষা করত না। বাজার থেকে মেমোরি কার্ড কিনে আনত। পরে এল ইন্টারনেট। তারপর স্মার্টফোন।

ভিকা প্রথমে বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি।

সে ভাবত, “মোবাইল আর সিনেমা হল এক জিনিস নাকি?”

কিন্তু সময় তাকে ভুল প্রমাণ করল।

একসময় যে ছেলেরা শুক্রবারের শোর জন্য সকাল থেকে টিকিটের কথা জিজ্ঞেস করত, তারা এখন চায়ের দোকানে বসে মোবাইলে সিনেমা দেখে।

দর্শক কমতে শুরু করল দিন দিন।

চারটার শোতে বেঞ্চ খালি। সাতটার শোতে অল্প মানুষ। রাতের শোও আর আগের মতো জমে না।

একদিন ভিকা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে খালি ঘরটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই ঘরটা শুধু ফাঁকা হচ্ছে না, তার জীবনের একটা অংশও ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

যে জৌলুস একদিন ঝঙ্কার ক্লাবকে আলোয় ভরিয়ে দিয়েছিল, সেই আলো তখন ম্লান হতে শুরু করেছে।

ভিকা তখনও জানত না, সামনে তাকে আরও কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হবে।

তবে সে এটাও জানত না—জীবন কখনও শুধু কেড়ে নেয় না, কখনও কখনও অন্য দরজাও খুলে দেয়।

তৃতীয় 

ঝঙ্কার ভিডিও হলের সেই পুরনো জৌলুস আর ফিরল না।

প্রথমে ভিকা ভেবেছিল, সময়ের সঙ্গে হয়তো আবার মানুষ ফিরে আসবে। নতুন কোন ছবি আনলে, ভাল কোনো প্রচার করলে, আগের মতো ভিড় হবে। সেই আশাতেই সে দিনের পর দিন হল খুলে বসে থাকত।

কিন্তু সময়ের স্রোত তখন অন্যদিকে বয়ে গেছে।

এখন গ্রামের মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন। যে দিনমজুর সারাদিন মাঠে কাজ করে, সেও সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মোবাইলের পর্দায় চোখ রাখে। কেউ খবর দেখে, কেউ সিনেমা দেখে, কেউ গান শোনে। বিনোদন এখন আর একটা ঘরের মধ্যে আটকে নেই।

ভিকা নিজের চোখে দেখেছে, পরিবর্তন কত নিঃশব্দে মানুষের অভ্যাস বদলে দেয়।

আগে নতুন সিনেমার ক্যাসেট আনলে সে পোস্টার লাগাত। গ্রামের ছেলেরা পোস্টার দেখতে ভিড় করত। এখন কেউ জিজ্ঞেসও করে না—”নতুন ছবি এসেছে?”

একদিন বিকেলের শোতে মাত্র দুজন দর্শক এল।

তাদের একজন ছিল বৃদ্ধ নসু মিয়া। সিনেমা শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ভিকার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, —”মন খারাপ করিস ন্যা ভিকা। সুমায়ের সঙ্গে সবকিছু বদলায়। তুইও বদলাস।”

কথাটা সেদিন ভিকার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল।

সেই রাতে সে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারেনি। ঘরের চালের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল—একটা কাজ শেষ হয়েছে মানেই কি জীবন শেষ?

পরদিন সকালে সে ঝঙ্কার ক্লাবের ঘর খুলল। টিভি, ভিডিও প্লেয়ার, বেঞ্চ—সবকিছুর দিকে একবার তাকাল। মনে হল , এরা তার পুরনো সঙ্গী। কিন্তু এখন তাদের বিদায় দেওয়ার সময় এসেছে।

এক মাস আর্থিক ক্ষতি সহ্য করার পর অবশেষে ভিকা সিদ্ধান্ত নিল।

ভিডিও হল বন্ধ করে দেবে ।

চাবিটা ক্লাবের সম্পাদকের হাতে দিয়ে সে শুধু বলেছিল, —”দাদা, আর চালাইতে পারল্যাম না। মানুষ আর আসে না।”

ক্লাব সম্পাদক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন, —”সময় বদলাইছে ভিকা। তুইও নতুন কিছু কর।”

বাড়ি ফিরে ভিকার মন খারাপ ছিল। কিন্তু তার স্ত্রী তাকে সাহস দিয়েছিল।

—”সারা জীবন কি এক কাজই করতে হয়? তুমি মানুষের মন বুঝতে পারো। নতুন কিছু করো।”

এই কথাটাই যেন ভিকার ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা সাহসটাকে জাগিয়ে দিল।

কয়েকদিন এদিক-ওদিক ঘোরার পর সে ঠিক করল, কালিতলা ব্রিজের ধারে একটা তেলেভাজার দোকান দেবে।

ছোট্ট দোকান। বাঁশের খুঁটি, টিনের ছাউনি, সামনে কাঠের বেঞ্চ। নাম দিল—”ভিকার তেলেভাজা।”

প্রথম দিন সকালে সে কড়াই বসাল। তেলে যখন প্রথম আলুর চপটা ছেড়ে দিল, তখন তার মনে হল—নতুন জীবনের প্রথম প্রদীপ জ্বলে উঠল।

শুরুতে ক্রেতা কম ছিল। দু-একজন পথচারী থামত। কেউ চপ খেত, কেউ মসলা মুড়ি নিত।

ভিকা আগের মতোই হাসিমুখে বলত, —”আরেকট্যা লেন দাদা, গরম গরম আছে।”

তার ব্যবহারে মানুষ ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হতে লাগল।

সন্ধ্যা নামলে কালিতলা ব্রিজের ধারে অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হতো। কাজ শেষে ফেরত আসা শ্রমিক, ভ্যানচালক, বাজারের লোক—সবাই একটু দাঁড়াত ভিকার দোকানে।

কয়েকজন মদ্যপ লোকও নিয়মিত আসতে শুরু করল। তারা চপ, মুড়ি, তেলেভাজা নিয়ে আড্ডা দিত।

একজন বলত, —”ভিকা, তোর হাতের চপের স্বাদ আলাদা রে।”

আরেকজন বলত, —”ভিডিও হল বন্ধ করছিস ভালোই করেছিস। এই ব্যবসায় তোর জায়গা আছে।”

ভিকা শুধু হাসত।

সে বুঝেছিল, মানুষের প্রয়োজন বদলায়, কিন্তু মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মূল্য বদলায় না।

কয়েক মাসের মধ্যেই দোকানের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ল। সন্ধ্যা হলেই ভিড় জমতে লাগল। দূরের গ্রাম থেকেও কেউ কেউ আসত।

একদিন হঠাৎ জ্বরে পড়ায় ভিকা দোকান খুলতে পারেনি।

পরদিন সকালে যখন সে দোকানে এল, তখন রমেশ চায়ের দোকান থেকে ছুটে এসে বলল, —”কী হইছিল রে? কাল তো সবাই তোর খোঁজ করছিল।”

ভিকা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, —”আমার খোঁজ?”

রমেশ হেসে বলল, —”হ রে , তোর দোকান বন্ধ দেখ্যে সবাই বুলছিল—ভিকা কই?”

কথাটা শুনে ভিকার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল।

কুড়ি বছর আগে মানুষ তার ভিডিও হলের জন্য অপেক্ষা করত। আজ মানুষ অপেক্ষা করে তার তেলেভাজার দোকানের জন্য।

জায়গা বদলেছে, কাজ বদলেছে, কিন্তু মানুষের ভালবাসা একই আছে।

সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে ভিকা কালিতলা ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। নিচে নদীর জলে চাঁদের আলো পড়ে। দূরে গ্রামের বাড়িগুলোতে মোবাইলের আলো জ্বলছে।

সে ভাবে, প্রযুক্তি তার পুরনো ব্যবসা কেড়ে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু জীবন তাকে নতুন একটা রাস্তা দিয়েছে।

জৌলুস আসলে শুধু আলো ঝলমলে কোনো জিনিস নয়। জৌলুস হল মানুষের আস্থা, ভালবাসা আর নিজের পরিশ্রমে আবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।

ঝঙ্কার ভিডিও হলের পর্দা একদিন অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কালিতলা ব্রিজের ধারে ছোট্ট দোকানের চুলোর আগুনে আবার আলো জ্বলেছে।

সেই আলোতেই ভিকা হাজরা নিজের নতুন জীবনকে দেখতে পায়।

আর মনে মনে বলে—

“পুরনো দিন যায়, নতুন দিন আসে। মানুষ যদি চলতে জানে, তবে জৌলুস কখনও হারায় না।”

চতুর্থ

সেদিন রাতের শেষ ক্রেতা চলে যাওয়ার পর ভিকা দোকানের বাতিটা নিভিয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করল।

কালিতলা ব্রিজ তখন প্রায় ফাঁকা। নদীর জলে চাঁদের আলো কাঁপছে। দূরে কোথাও কারো মোবাইলের ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে।

হঠাৎ পেছন থেকে কেউ ডাকল—

—”ভিকা দা!”

ভিকা ঘুরে দাঁড়াল।

দেখল, বছর কুড়ি-বাইশের এক যুবক দৌড়ে তার দিকে আসছে। ছেলেটাকে সে চেনে—নাম অয়ন। প্রায়ই তার দোকানে চপ খেতে আসে।

অয়ন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—”ভিকা দা, একটা কথা ছিল।”

—”কী কথা?”

অয়ন একটু ইতস্তত করে বলল,

—”আপনার ওই পুরনো ভিডিও হলটা… এখনও কি বন্ধ পড়ে আছে?”

ভিকার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

—”হ্যাঁ,ক্যানে ?”

অয়ন বলল,

—”আমরা কয়েকজন মিলে ওটা আবার চালু করতে চাই।”

ভিকা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

—”কী বলিস রে ? সিনেমা দেখাবি?”

অয়ন হেসে মাথা নাড়ল।

—”না। সিনেমা হল হিসেবে না।”

—”তাহালে?”

অয়ন পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল।

—”আমরা ভাবছি, ওই ঘরটাকে গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য একটা কোচিং সেন্টার প্লাস মিলনকেন্দ্র বানাব। গ্রামের মানুষকে সিনেমা দেখানো হবে, খবর দেখানো হবে, পড়াশোনার অনুষ্ঠান হবে, গ্রামের মানুষ এসে নিজেদের কাজের কথা বলবে। সপ্তাহে একদিন পুরনো দিনের সিনেমাও দেখাব।”

ভিকা কিছু বলতে পারল না তৎক্ষণাৎ ।

অয়ন আবার বলল,

—”আপনি থাকবেন আমাদের সঙ্গে। আপনি তো মানুষ জড়ো করতে জানেন।”

ভিকার চোখ চলে গেল নদীর দিকে।

কত বছর আগে এই একই জায়গা থেকে সে মাইকে ঘোষণা করত—

“আজ ঝঙ্কার ভিডিও হলে নতুন ছবি!”

আর আজ অন্য এক প্রজন্ম তাকে ডাকছে নতুন কিছু গড়ে তুলতে।

সে ধীরে ধীরে বলল,

—”কিন্তু ওই ঘর তো অনেকদিন বন্ধ। টিভি-টিভি কিছুই তো নাই।”

অয়ন হেসে বলল,

—”টিভির দরকার নেই ভিকা দা। এখন প্রজেক্টর আছে।”

ভিকা হেসে ফেলল।

—”তাই নাকি! তাইলে তো আমার আবার সিনেমা দেখানোর দিন এলো !”

অয়ন বলল,

—”শুধু সিনেমা না। এবার মানুষও মানুষকে দেখবে।”

কথাটা শুনে ভিকা থমকে গেল।

মানুষও মানুষকে দেখবে।

এই কথাটাই যেন তার সমস্ত জীবনের গল্পকে এক মুহূর্তে বুঝিয়ে দিল।

পরদিন সকালেই ভিকা ঝঙ্কার ক্লাবের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

দরজায় তখনও সেই পুরনো তালা।

সে হাত বাড়িয়ে তালাটায় স্পর্শ করল।

কুড়ি বছর আগের ভিড়, হাততালি, মাইকের আওয়াজ, সিনেমার গান—সব যেন একসঙ্গে তার কানে বাজতে লাগল।

কিন্তু এবার সে দরজাটা খুলল অন্য উদ্দেশ্যে।

ভেতরের ধুলো পরিষ্কার হতে লাগল। পুরনো বেঞ্চগুলো বেরিয়ে গেল। দেওয়ালে নতুন রং লাগল। ছেলেমেয়েরা এসে ঝাড়ু দিল। কেউ তার এনে দিল, কেউ পুরনো পোস্টার খুলল।

সবচেয়ে শেষে অয়ন দেওয়ালে একটা নতুন বোর্ড লাগাল।

বোর্ডে লেখা—

“ঝঙ্কার—মানুষের জন্য।”

ভিকা অনেকক্ষণ বোর্ডটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে হেসে বলল,

—”নামটা বদলে ফেলিস নি ?”

অয়ন বলল,

—”পুরনো নামেরও তো জৌলুস আছে ভিকা দা। শুধু তার মানেটা বদলেছে।”

সন্ধ্যায় উদ্বোধনের দিন ঘরটা আবার মানুষে ভরে গেল।

কেউ পুরনো দিনের গল্প করছে, কেউ নতুন প্রজন্মের কথা বলছে। এক কোণে কয়েকজন ছাত্র পড়ছে। অন্যদিকে গ্রামের মহিলারা বসে নিজেদের কাজ নিয়ে আলোচনা করছে।

হঠাৎ আলো নিভে গেল।

ঘর অন্ধকার।

কয়েক সেকেন্ড পর সামনে সাদা পর্দায় আলো ফুটে উঠল।

প্রথমে দেখা গেল পুরনো ঝঙ্কার ভিডিও হলের একটি ছবি।

তারপর পর্দায় ভেসে উঠল ভিকার তরুণ বয়সের ছবি—মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে।

ভিকা চমকে উঠল।

—”এই ছবি কতি পেলি ?”

অয়ন মুচকি হেসে বলল,

—”আপনার ছেলে দিয়েছে।”

ঘরের সবাই হাততালি দিতে লাগল।

ভিকার চোখ ভিজে উঠল অভাবনীয় আনন্দে।

সে ধীরে ধীরে পর্দার সামনে এগিয়ে গেল।

তারুণ্যের সেই মুখটার দিকে তাকিয়ে মনে হল—কেউ যেন পর্দার ওপার থেকে তাকে বলছে,

“দেখছিস ভিকা? তুই হারিস নাই।”

ঠিক তখন অয়ন মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলল,

—”আজ থেকে ঝঙ্কার আবার শুরু হলো। তবে এবার এই ঘরের মালিক কোনো একজন না। এই ঘর গিরামের সবার।”

হাততালিতে ঘরটা কেঁপে উঠল।

ভিকা চোখ মুছে হেসে ফেলল।

সেই মুহূর্তে তার মনে হল, কুড়ি বছর আগে যে জৌলুস হারিয়ে গিয়েছিল, সেটা আসলে হারায়নি।

সেটা শুধু অপেক্ষা করছিল—নতুন সময়ের নতুন রূপে ফিরে আসার জন্য।

আর সবচেয়ে বড় চমক ছিল অন্য জায়গায়।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে ভিকা পুরনো ট্রাঙ্ক খুলতে গিয়ে একটা জিনিস পেল—তার সেই পুরনো মাইক।

যে মাইকে দাঁড়িয়ে সে একসময় ঘোষণা করত,

“শুনেন, শুনেন, আজ ঝঙ্কার ভিডিও হলে নতুন ছবি!”

ভিকা মাইকটা হাতে তুলে নিল।

অনেকদিন পর তার মুখে সেই পুরনো দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।

পরদিন সন্ধ্যায় ঝঙ্কার ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে সে আবার মাইক হাতে নিল।

গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে চারদিক থেকে ছুটে এল।

ভিকা মাইকের সুইচ অন করে বলল—

—”শুনেন, শুনেন, শুনেন! ঘোড়ামারা আর আশপাশের গ্রামের সকলের জানার জন্য জানানো যাইতেছে—ঝঙ্কার আবার খুলছে! তবে এবার শুধু সিনেমা দেখার লেগ্যে না, আবার মানুষের কাছে ফিরিয়্যা আনার লেগ্যে !”

এক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এল। তারপর চারদিক থেকে হাততালির শব্দ উঠল।

ভিকা চোখ বন্ধ করে সেই শব্দ শুনতে লাগল।

কুড়ি বছর আগে যে হাততালি তাকে পরিচিতি দিয়েছিল, আজকের হাততালি তাকে ফিরিয়ে দিল তার নিজের কাছে।

কালিতলা ব্রিজের ধারে তার ছোট্ট তেলেভাজার দোকানের বাতি তখনও জ্বলছিল।

আর ঝঙ্কার ক্লাবের নতুন আলোও জ্বলে উঠেছিল।

দুটো আলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভিকা বুঝল—

জীবন কখনও পুরনো আলো নিভিয়ে শুধু অন্ধকার দেয় না। কখনও কখনও সে পুরনো আলোকে নতুন প্রদীপে জ্বালিয়ে দেয়।

সেই রাতেই ভিকা প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল—

জৌলুস হারায়নি।

জৌলুস শুধু তার ঠিকানা বদলেছে।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *