অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১৩-তিস্তা
ধারাবাহিক আখ্যান
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১৩-তিস্তা
তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।
নামফলক
আজ অফিস থেকে ফেরার পথে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কোনও বিশেষ কারণ ছিল না। এমনিই।
অফিস থেকে আজ একটু আগে বেরিয়েছিলাম। বাস ধরার তাড়া ছিল না। রাস্তার মোড়ে চা খাওয়ার কথাও মনে হয়েছিল, পরে মনে হল বাড়ি গিয়েই খাব। এইসব ছোটখাটো সিদ্ধান্তের কোনও ইতিহাস থাকে না। অথচ কখনও কখনও সেই সিদ্ধান্তই মানুষকে এমন একটা দৃশ্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেটা না দেখলেও জীবন চলে যেত।
বাড়িটা বহুদিনের। দোতলা। লোহার গেট। গেটের মাথায় গোলাকার নকশা। বারান্দার রেলিংয়ে পুরোনো দিনের কারুকাজ। দেওয়ালের রং অনেক জায়গায় উঠে গেছে। জানলার পাল্লাগুলো বন্ধ। বাড়িটার দিকে তাকালে মনে হয়, অনেক কিছু বদলেছে, শুধু বাড়িটা নিজে খুব একটা বদলায়নি।
গেটের সামনে দুজন লোক কাজ করছিল। একজন স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে একটা নামফলক খুলছিল। আরেকজন হাতে নতুন একটা ফলক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
আমি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কেন দাঁড়ালাম জানি না। হয়তো নামফলক বদলানোর দৃশ্যটা অদ্ভুত লেগেছিল। বাড়ির রং করা হচ্ছে—দেখেছি। নতুন গেট বসানো হচ্ছে—দেখেছি। বাড়ি ভাঙা হচ্ছে—দেখেছি। কিন্তু একটা বাড়ির নাম বদলাতে দেখিনি কখনও।
পুরোনো পিতলের ফলকটা খুলতে একটু সময় লাগছিল। অনেক বছরের ধুলো-ময়লার আস্তরণ জমা স্ক্রুগুলো শক্ত হয়ে গেছে। মরচে ধরা স্ক্রু থেকে ধাতব গুঁড়ো ঝরে পড়ছে। লোকটা স্ক্রুর মাথায় স্ক্রু-ড্রাইভারটাকে যতটা সম্ভব চেপে ধরে ধীরে ধীরে ঘোরাচ্ছিল। মাঝেমধ্যে খুব ক্ষীণ একটা ধাতব শব্দ হচ্ছে! একসময় শেষ স্ক্রুটা খুলে পড়তেই পিতলের ফলকটা লোকটার হাতে খসে পড়লো। লোকটা ফলকটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর মাটিতে রেখে দিল।
তখনও পুরোনো নামটা পড়া যাচ্ছে। তবে অক্ষরগুলো একটু ঝাপসা হয়ে গেছে। রোদে-জলে ফিকে হয়েছে। তবু স্পষ্ট।
প্রবুদ্ধ সেন। নামের নীচে একটা ঠিকানা। খুব ছোট করে। আমি আরও একটু এগিয়ে গেলাম।
নামটা আমার পরিচিত মনে হল। কোথায় যেন দেখেছি। মনে করার চেষ্টা করলাম। হয়তো কোনও পুরোনো চিঠিতে। হয়তো স্কুলের কোনও অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে। হয়তো কোনও বইয়ের প্রথম পাতায় লেখা উৎসর্গে। এমনও হতে পারে, কোথাও দেখিনি। শুধু নামটা পরিচিত লাগছে। এই বয়সে নামের সঙ্গে এই ব্যাপারটা হয়। কাউকে দেখলে মনে হয় চিনি। কথা বলতে গিয়ে বোঝা যায়, চিনি না। আবার কোনও নাম বহু বছর না শুনেও হঠাৎ মনে পড়ে যায়।
নতুন ফলকটা লাগানো শুরু হল। আমি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।
দ্বিতীয় লোকটা পিতলের চকচকে নতুন ফলকটা ফাঁকা জায়গায় বসাল। এই ফলকটা আগেরটার চাইতে একটু বড়ো। লোকটা ফলকটা দেয়ালে চেপে, একটু মেপে নিল–সোজা হল কিনা। তারপর স্ক্রু- ড্রাইভারটা ঘোরাতে শুরু করল। প্রতিটা প্যাঁচের সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের গায়ে একটা অজানা পরিবার শক্ত হয়ে বসে যেতে লাগল। নতুন নাম। নতুন পদবি। বুঝলাম, বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে। নামের জায়গায় লেখা– অনিমেষ চৌধুরী। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে একটা আস্ত বাড়ির অতীত সরিয়ে তিনি এর বর্তমান হয়ে উঠলেন!
ভাবছিলাম, পুরোনো নামটা কতদিন ছিল এখানে? দশ বছর? পঁচিশ? নাকি চল্লিশ? কত কত ঝড়বৃষ্টিতে এই নামটা এই গেটের গায়ে লেগে ছিল! এটাই হয়তো সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার। মানুষ চলে যায় আগে, নাম পরে। কেউ মারা যায়। কেউ অন্য বাড়িতে চলে যায়। কেউ শহর ছেড়ে চলে যায়। কেউ সম্পর্ক ছিন্ন করে। কেউ আর ফিরে আসে না। অথচ তার নাম একটা গেটের সামনে বছরের পর বছর থেকে যেতে পারে। প্রতিদিন ডাকপিয়ন এই নাম পড়ে চিঠি দিয়েছে। কুরিয়ারের লোক বেল টিপেছে। বিদ্যুতের বিল এসেছে। অতিথিরা ঠিকানা মিলিয়েছে।
আজ থেকে তারা অন্য একটা নাম পড়বে। অন্য একটা পদবি উচ্চারণ করবে। বাড়িটার অবশ্য তাতে বিশেষ কিছু এসে যাবে না। একই বারান্দা। একই সিঁড়ি। একই জানলা। শুধু যারা ভেতরে ঢুকবে, তারা অন্য মানুষ।
মনে হল, আমরা আসলে বাড়ি কিনি না। আমরা কিছুদিনের জন্য একটা ঠিকানা ব্যবহার করি। কিছুদিনের জন্য একটা ছাদের নিচে আশ্রয় নিই। তারপর একদিন আমাদের নাম খুলে ফেলা হয়। অন্য কারও নাম উঠে আসে। বাড়ি থেকে বেরোনো হাসির শব্দ বদলে যায়। রান্নাঘরের গন্ধ বদলে যায়। ড্রয়িংরুমের ছবি বদলে যায়।
আমি নিজের নামটার কথাও ভাবলাম। আমার নাম কত জায়গায় লেখা আছে?
অফিসের আইডি কার্ডে। ব্যাঙ্কে। বিদ্যুতের বিলের কাগজে। কিছু পুরোনো বইয়ের প্রথম পাতায়। একটা আলমারির ভিতরে রাখা কয়েকটা সার্টিফিকেটে। আর বাড়ির দরজার পাশে ছোট্ট একটা প্লেটে। আমি কখনও ভেবে দেখিনি, নাম আসলে কত জায়গায় আমাদের হয়ে কাজ করে। আমরা না থাকলেও। হয়তো এটাই নামের সুবিধা। মানুষকে ছাড়িয়ে কিছুদিন বেঁচে থাকার ক্ষমতা।
কিন্তু নাম কতদিন বাঁচে? এই প্রশ্নটার উত্তর আমার জানা নেই। আমি তখনও বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে। নতুন ফলক লাগানো হয়ে গেছে। পুরোনো নামটা তার ঠিক নিচেই মাটিতে রাখা। দুটো নাম ওপরে-নিচে, কাছাকাছি। একটা পুরোনো বাড়ির সামনে দুটো পরিবার যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য একই ঠিকানায় দাঁড়িয়ে আছে। একটা নাম অতীত হয়ে গেছে, অন্যটা বর্তমান।
একজন লোক পুরোনো ফলকটা তুলে নিল। একটা পুরোনো খবরের কাগজে ফলকটা জড়িয়ে নিয়ে সে চলে গেল। আমিও হাঁটতে শুরু করলাম।
কিছুদূর গিয়ে হঠাৎ আমার মনে হল, নামটা আমি সত্যিই চিনি। প্রবুদ্ধ সেন। মনে পড়ল, কলেজে পড়ার সময় আমাদের এক অধ্যাপক ছিলেন, পি.সি—প্রবুদ্ধ সেন।
তিনি বাংলা পড়াতেন। খুব বেশি কথা বলতেন না। ক্লাসে ঢুকে বই খুলতেন। চশমাটা মুছে চোখের ওপর বসাতেন। কোনও কবিতা পড়ানোর সময় হঠাৎ থেমে যেতেন। কবিতার মাঝামাঝি এসে আটকে যেতেন। তারপর জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। আমরা অপেক্ষা করতাম তিনি আবার কখন পড়া শুরু করবেন। কখনও কখনও করতেন। কখনও করতেন না। চুপচাপ বইটা বন্ধ করে উঠে চলে যেতেন।
একবার তাঁর বাড়িতে যাওয়ার কথা হয়েছিল। কলেজের কয়েকজন ছাত্র মিলে। কোনও অনুষ্ঠানের জন্য। আমি যাইনি। যাওয়ার কথা ছিল, শেষ পর্যন্ত যাইনি। সেই বাড়ির ঠিকানা কী ছিল? মনে পড়ছে না। বহু পুরোনো কোনো ডায়েরির পাতায় হয়তো আজও লেখা আছে।
আমি হাঁটা থামালাম। পেছনে তাকালাম। নতুন নামফলকটা দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে। পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে পড়েছে তার ওপর।
প্রবুদ্ধ সেন কি ওই বাড়িতে থাকতেন? নিশ্চিত নই। সত্যিটা জানা আর কোনোদিন সম্ভব নয়।
সেদিন বাড়ি ফিরে নিজের বাড়ির দরজার পাশে আমার নামফলকটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। খুব সাধারণ একটা ফলক। আমার নাম লেখা। ভাবলাম, একদিন এটা খুলে ফেলবে কেউ। হয়তো আমি থাকব না। হয়তো থাকব, কিন্তু অন্য কোথাও চলে যাব।
কেউ একজন স্ক্রু-ড্রাইভার হাতে নিয়ে আমার নাম খুলবে। ধুলোমাখা স্ক্রুগুলো সরাবে। তারপর নতুন একটা নাম লাগাবে। বাড়িটা থাকবে। গেট থাকবে। বারান্দা থাকবে। জানলা থাকবে। কেউ নতুন করে সেখানে চা বানাবে। নতুন মানুষ বেল বাজাবে। নতুন ডাকপিয়ন নতুন নাম পড়বে।
শুধু একটা নাম আর পড়া হবে না। আমার মনে হল, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় হারিয়ে যাওয়া হয়তো মৃত্যু নয়। কোনও একদিন নিজের নামটা এমন একটা জায়গা থেকে মুছে যেতে দেখা, যেখানে একসময় মনে হত নামটা স্থায়ী।
আজ উপলব্ধি করলাম, কোনও নামেরই স্থায়ী ঠিকানা নেই। নাম কিছুদিন বাড়ির গায়ে থাকে। তারপর কাগজে থাকে। তারপর কয়েকজন মানুষের মনে। তারপর কারও মনেই না।
কিন্তু সেই শেষ মুহূর্তটা কে জানে?
হয়তো নামটা তখনও কোথাও আছে। কোনও পুরোনো খাতার পাতায়। কোনও বন্ধ আলমারিতে রাখা চিঠিতে। কোনও মানুষের হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া একটি বিকেলে। অথবা এমন কোনও বাড়ির সামনে, যেখানে নতুন নাম লাগানোর পরও একজন পথচারী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। একটা নাম খুলে যাওয়া দেখতে দেখতে যে নিজের নামের ভবিষ্যৎ প্রথমবার খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পায়।