Email: editors.kokshopoth@gmail.com
September 16, 2026
Kokshopoth

সাম্য রাইয়ান-এর জার্নালঃ পৃথিবী ও তার ক্লান্ত নাবিকেরা

Sep 11, 2026

নিয়মিত কলম
সাম্য রাইয়ান-এর জার্নালঃ পৃথিবী ও তার ক্লান্ত নাবিকেরা
পর্ব# ১৫

সাম্য রাইয়ানের জন্ম বাঙলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায়। ২০০৬ থেকে সম্পাদনা করছেন শিল্প-সাহিত্যের অন্যতর লিটল ম্যাগাজিন ‘বিন্দু। কবিতা, প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি লিখেছেন নতুন ধরনের আখ্যানধর্মী গদ্য৷

সাম্য রাইয়ানকে নিয়ে ভারতের  সাহিত্য পত্রিকা ‘তারারা’ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ‘মনমানচিত্র’, ভারতের ‘এবং পত্রিকা’ তাকে নিয়ে বিশেষ একক সংখ্যা ও বাংলাদেশের প্রখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন ‘নিসর্গ’ বিশেষ মূল্যায়ন (ক্রোড়পত্র) প্রকাশ করেছে৷ ভারতের নব্বই দশকের কবি সুবীর সরকার সাম্য রাইয়ান প্রসঙ্গে ‘সাম্যপুরাণ’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ: সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট [গদ্য, ২০১৪]; বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা [কবিতা, ২০১৫]; মার্কস যদি জানতেন [কবিতা, ২০১৮]; হলুদ পাহাড় [কবিতা, ২০১৯]; চোখের ভেতরে হামিং বার্ড [কবিতা, ২০২০]; লোকাল ট্রেনের জার্নাল [গদ্য, ২০২১]; লিখিত রাত্রি [কবিতা, ২০২২] ও হালকা রোদের দুপুর [কবিতা, ২০২৩]; জলের অপেরা [কবিতা, ২০২৪]; সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের [উপন্যাস, ২০২৫]৷ সম্পাদিত গ্রন্থ: উৎপলকুমার বসু [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২২]; জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ [পর্যালোচনামূলক প্রবন্ধ সংকলন, ২০২৩]; শম্ভু রক্ষিত: পাঠ ও বিবেচনা [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২৫]।

ঈশ্বর, ভালোবাসা আর হাস্যরসের দার্শনিক

 

“গায়ে জোর নেই বলে রিক্সা টানতে পারি না‚ তাই কলম টানি। কলমের প্রতি টান আমার ওইটুকুই। লিখতে আমার একটুও ভালো লাগে না। লিখতে মেহনত‚ বহু পরিশ্রমের ফল সেই লেখার গা থেকে ঘাম মুছতে মেহনত আবার। আদৌ সাহিত্যিক নই আমি‚ মেহনতি জনতারই একজন—মজদুরের সগোত্র। মুটেও বলতে পারেন আমায়। মোট ফেলেই আমার খাওয়া; মোটামুটি লিখে মোটের ওপর কিছু পেয়ে যাওয়া।”

–শিবরাম চক্রবর্তী

 

শৈশবের পাঠ-স্মৃতি আমাদের মনে যেমন থাকে, তেমনি থাকে সেই পাঠের ভেতর দিয়ে পৃথিবীকে প্রথম চিনে নেওয়ার অনুভূতি। শিবরাম চক্রবর্তীকে আমি প্রথম পড়েছিলাম প্রাইমারি স্কুলে পড়াকালীন— ‘বাড়ী থেকে পালিয়ে’। হয়তো সেই সময় ‘পালিয়ে পড়া’ মানে ছিল নিজের ছোটো পৃথিবীটাকে ভাঙা এবং তার বাইরে এক ঝলক উঁকি দেওয়া। বই-ই ছিল সেই বাইরে দেখা, যেখানে হাসি, খুনসুটি, অদ্ভুত সব কাহিনি, আর শিবরামের নির্ভার বাচনভঙ্গি হাত ধরে নিয়ে যেতো অচেনা রাস্তায়। শিশু বয়সে শিবরামের বই পড়তে পড়তে প্রথম যে জিনিসটা শিখেছিলাম, তা হলো—কৌতুকও হতে পারে গভীর সত্য বলার এক অভিনব ভাষা।

 

শিবরামের ভঙ্গি অনন্য। তিনি কেবল হাসাতে জানেন না, বরং হাসির আড়াল থেকে জীবনের গাম্ভীর্যও টেনে আনেন। একে একে যত পড়েছি, মনে হয়েছে শিবরাম যেন আমাদের ঘরেরই একজন—একজন এমন আত্মীয়, যিনি বকেন না, পড়তে বাধ্য করেন না, শুধু গল্প শোনান আর অকারণে আমাদের হাসিয়ে দেন।

 

কিন্তু তাঁর রসবোধের ভেতরে লুকিয়ে থাকে দার্শনিক গভীরতা। যেমন ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ আর ‘ভালোবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’—এই দুই গ্রন্থ পড়ার সময় মনে হয়েছিল, তিনি আমার হাতে লাড্ডুর মতো সহজভাবে এক মহাজাগতিক সত্য তুলে দিচ্ছেন।

 

শিরবাম এক অদ্ভুত ব্যঙ্গাত্মক অথচ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঈশ্বর, ধর্ম, আর মানুষের জটিল সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন। মনে হয়, ঈশ্বরকে তিনি আক্ষরিক অর্থে মাটিতে নামিয়ে আনছেন, যেখানে হাসির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রশ্ন—মানুষের দুঃখকষ্ট, ক্ষুধা, অপমান কি ঈশ্বর দেখেন না? শিবরামের উত্তর মজার মতো হলেও আসলে ভয়াবহ গভীর, কারণ তিনি জানেন এই প্রশ্ন কোনোদিন শেষ হয় না। তিনি শুধু ব্যঙ্গ করেন না, বরং মানুষের ভেতরে লুকোনো এক সহজ বিশ্বাসকে সামনে আনেন। পৃথিবীর দুঃখ, শোক, রক্তাক্ত ইতিহাসের মাঝেও ভালোবাসা নামের যে শক্তি আছে, তার মতে—সেটাই মানুষের আসল আশ্রয়।

 

শিবরাম আমাদেরকে হাসির সিঁড়ি বেয়ে এমন এক জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে জীবনের সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলো হালকা মনে করা যায়। তাঁর এই কাজ একেবারেই অনন্য—কারণ সাহিত্য ইতিহাসে এমন খুব কম লেখক আছেন, যাঁরা কৌতুকের ভেতর দিয়ে পাঠককে দার্শনিক চিন্তার মুখোমুখি দাঁড় করান।

 

শৈশবে বাড়ি থেকে পালিয়ে হাতে পাওয়া বইয়ের হাস্যরস আর কৈশোরে পৌঁছে পাওয়া দার্শনিক গভীরতা—শিবরামের লেখার এই দ্বিমুখী শক্তিই আজও আমাকে আকর্ষণ করে। তাঁর বই পড়ার সময় মনে হয়, জীবন আসলে এক অদ্ভুত মিশ্রণ—হাসি ও বেদনার, সরলতা ও জটিলতার, ঈশ্বর আর ভালোবাসার। শিবরাম আমাদের শিখিয়েছিলেন, পৃথিবীকে ভালোবাসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *