সুপর্ণা সরকারের গল্পঃ চক্র
গল্প
সুপর্ণা সরকারের গল্পঃ চক্র
জন্ম জলপাইগুড়ি। ‘তিস্তাগুড়ি’ পত্রিকার সম্পাদক। একটি প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের লেখক। বাংলা সাহিত্যের নবীন প্রজন্মের একজন সাহিত্যকর্মী। কবিতা, গল্প ও গদ্যচর্চার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।
চক্র
সুপর্ণা সরকার
শীতের সেই সকালটা অস্বাভাবিক শান্ত ছিল। এমন এক শান্তি, যা প্রথমে প্রশান্তির মতো মনে হলেও, একটু গভীরভাবে তাকালেই তার ভেতরে ধরা পড়ে চাপা অস্বস্তির রেখা। মনে হচ্ছিল, কোনো শব্দ হঠাৎ করে পৃথিবী থেকে মুছে গেছে, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি এখনো দেয়ালের গায়ে, হাওয়ার স্তরে, ঘরের নিস্তব্ধ কোণগুলোতে আটকে রয়েছে।
মেঘলা শুয়ে আছে। নিথর। চোখ বন্ধ। মুখে যন্ত্রণার কোনো চিহ্ন নেই। বরং এমন এক স্বাভাবিকতা, যেন সে শুধু গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। বিছানা পরিপাটি। জানালার পর্দা থেকে থেকে শীতের হাওয়ায় সামান্য দুলে উঠছে। বাইরে কুয়াশা ঝুলে আছে নিঃশব্দ পর্দার মতো। ঘরের প্রতিটি জিনিস নিজের নির্ধারিত জায়গায় রয়েছে, যেন দৈনন্দিন জীবনের কোনো ছন্দই ভেঙে যায়নি। আর সেই কারণেই দৃশ্যটা এত অসহনীয়। কারণ মৃত্যু কখনো কখনো ঝড়ের মতো আসে না; আসে এমনভাবে, যেন জীবনের ভেতর থেকে শুধু একটি উপস্থিতি নিঃশব্দে মুছে ফেলা হয়েছে। চারপাশ একই থাকে, শুধু অর্থ বদলে যায়।
সৃঞ্জয় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এই সমস্তটা দেখছে। তার চোখে কোনো জল নেই। কোনো আর্তনাদ নেই। শুধু এক ধরনের অস্বাভাবিক স্থিরতা, যেমন কোনো ভাঙনের আগে নদীর জল হঠাৎ স্থির হয়ে যায়। বাইরে থেকে তাকে শান্ত দেখায়, অথচ গভীরে কোথাও অদৃশ্য স্রোত দিক বদলাতে শুরু করেছে। তার মাথার ভেতর থেকে থেকে শুধু একটি ছবিই বারবার ফিরে আসছে। একটা বালিশ। একটা থেমে যাওয়া নিঃশ্বাস। একটা দীর্ঘ নীরবতা। কিন্তু সে জানে, এইবার সেই হাত তার ছিল না। অথবা; ছিল!
এই বাড়িতে মেঘলার উপস্থিতি একসময় আলোর মতো ছড়িয়ে ছিল। দোতলার ঘরগুলোতে হাসি ছিল, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত গানের সুর, সন্ধ্যেবেলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে আকাশ দেখত। খুব সহজভাবে ভালোবাসতে পারত মেঘলা। যেন ভালোবাসা তার কাছে কোনো প্রচেষ্টা নয়, বরং স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস।
- ওই মেঘটা দেখেছ?
- সব মেঘই তো একরকম।
- না, সব মেঘ একরকম নয়… যেমন সব মানুষও নয়।
এই সহজ কথাগুলোর মধ্যেই মেঘলার একটা আলাদা উজ্জ্বলতা ছিল। সৃঞ্জয়ের জীবনে সেটাই ছিল আশ্রয়। তার ভেতরের অযোগ্যতা, ব্যর্থতার বোধ সবকিছুকে ঢেকে রাখত মেঘলার নিশ্চুপ আস্থা।
মেঘলা খুব বেশি চোখে পড়ার মতো কেউ ছিল না। মাঝারি গড়ন, শান্ত মুখ, আর চোখে এক ধরনের স্থির কোমলতা যেন তার উপস্থিতির চেয়ে তার বিশ্বাসটাই বেশি অনুভব করা যেত। আর সৃঞ্জয় ছিল ঠিক তার উল্টো। লম্বাটে, রোগা, কাঁধে সবসময় সামান্য ঝুঁকে থাকা ভঙ্গি। চেহারার মধ্যে একধরনের অসম্পূর্ণতা, যা সে নিজেও গভীরভাবে টের পেত। তবুও, এই জায়গায় পৌঁছনোর আগে তাদের পথটা এত সহজ ছিল না।
বহুদিনের সম্পর্ক তাদের। কলেজজীবন থেকেই একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করা, ছোট ছোট সুখের হিসেব কষা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের ভিতরে অদৃশ্য চাপ জমতে শুরু করেছিল। চাকরি পাচ্ছিল না সৃঞ্জয়। একটার পর একটা ব্যর্থতা এসে জমা হচ্ছিল জীবনে, আর তার সঙ্গে বাড়ছিল চারপাশের প্রশ্ন, সন্দেহ আর অস্বস্তিকর নীরবতা।
সময় যখন দরজার ওপার থেকে কড়া নাড়ছে, সেরকমই একদিন মেঘলা খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল,
- আমরা কি সত্যিই পারব?
সৃঞ্জয়ের কাছে কথাটি যেন দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অনিশ্চয়তারই ভাষা হয়ে কানে এসে বিঁধে ছিল। প্রশ্নটির আগমন সে টের পেয়েছিল আগেই, শুধু উত্তরটুকু খুঁজে পায়নি।
- আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না… কিন্তু এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে…
বাকিটা আর শেষ করতে পারেনি মেঘলা। কথাগুলো যেন গলায় আটকে গিয়েছিল। শুধু তার সেই শান্ত চোখের ভিতরে জমে উঠেছিল একরাশ ক্লান্তি আর অজানা আশঙ্কা।
নিয়তির খেলায় ভাগ্যের চাকা ঘুরে চলে। ঠিক তার কিছু দিনের মধ্যেই হঠাৎ করে সব বদলে যায়। বাবার মৃত্যুর পর ব্যাংকের চাকরিটা সৃঞ্জয়ের হাতে আসে। জীবনে প্রথমবারের মতো একটা স্থিরতা, একটা সামাজিক স্বীকৃতি তার নাগালের মধ্যে আসে। যে জিনিসগুলো এতদিন শুধু অনুপস্থিতই ছিল না, বরং তার আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিটাকেও প্রতিদিন মনে করিয়ে দিত। মেঘলার বাড়ি থেকেও আর কোনো আপত্তি থাকে না। সৃঞ্জয়ের মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর যেন সবকিছু ধীরে ধীরে নিজের জায়গায় বসে যাচ্ছে।
তাদের ছেলে ঋদ্ধ জন্মানোর পর সেই ছোট্ট সংসারটা যেন আরও পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। দৈনন্দিনতার ছোট ছোট ব্যস্ততা, ভবিষ্যতের সাধারণ স্বপ্ন, আর একসঙ্গে বেঁচে থাকার অভ্যস্ত ছন্দ। সব মিলিয়ে যেন এক স্বাভাবিক, শান্ত, স্থির জীবনের ছবি। কিন্তু এখন ফিরে তাকালে, সৃঞ্জয়ের মনে হয়, সেই স্বাভাবিকতার ভেতরেও কি কোথাও একটা ফাঁক ছিল? কোনো অদৃশ্য অসম্পূর্ণতা, যা বাইরে থেকে ধরা পড়ত না। হয়তো খুব সূক্ষ্ম, খুব নিঃশব্দ একটা চিড় জন্ম নিচ্ছিল সময়ের ধুলোয় ঢাকা পড়ে, চোখের আড়ালে। আর সে, স্বস্তির আলোয় দাঁড়িয়ে তার অস্তিত্ব টেরই পায়নি।
এই বাড়ির একতলায় থাকেন মায়া দেবী। সৃঞ্জয়ের মা। তার উপস্থিতি সবসময়ই ছিল কিন্তু যেন দূরে কোথাও। শরীর শুকনো, মুখে প্রায় কোনো অভিব্যক্তি নেই। কিন্তু তার চেহারার মধ্যে উপস্থিত সেই স্থির দুটো চোখে এমন কিছু ছিল, যেটা সৃঞ্জয় এড়িয়ে যেতে পারত না। মেঘলা তাকে যত্ন করত। খুব স্বাভাবিকভাবেই। খাবার দেওয়া, ওষুধ মনে করিয়ে দেওয়া, কথা বলা সবকিছুতেই একটা আন্তরিকতা ছিল। তবুও মাঝে মাঝে সৃঞ্জয়ের মনে হত মা সবকিছু দেখছেন। শুধু দেখছেন না, বুঝছেনও। আর সেই বোঝার ভেতরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা জমে থাকতো।
‘অ্যালঝেইমার্স’ প্রথম যখন বলেছিলেন ডাক্তার, তখন সবকিছু সহজ মনে হয়েছিল। ভুলে যাওয়া, আচরণে পরিবর্তন, এসবের একটা নাম পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সৃঞ্জয় বুঝতে শুরু করল এই ভুলে যাওয়া সবসময় সমান নয়। কখনো মায়া দেবী সম্পূর্ণ অচেনা। কখনো আবার এমন কিছু কথা বলেন, যেগুলো তিনি জানার কথা নয়। কখনো তার দৃষ্টি শূন্য। আবার কখনো সেই দৃষ্টি এতটাই সচেতন, যেটা সহ্য করা কঠিন হয়ে ওঠে। এই অসামঞ্জস্যই সৃঞ্জয়ের মনে প্রথম সন্দেহের বীজ বপন করে।
সেই রাতটা, যেদিন মেঘলা মারা গেল। অন্য ঘরে অফিসের কাজ করতে করতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল সৃঞ্জয়, সে নিজেও টের পায়নি। কোনো শব্দে নয়, কোনো দুঃস্বপ্নে নয় তবু এক অজ্ঞেয় অস্বস্তি যেন গভীর ঘুমের স্তর ভেদ করে তাকে মাঝরাতে হঠাৎ জাগিয়ে তুলেছিল। যেন অন্ধকারের ভেতর কোথাও কোনো অদৃশ্য সুর বদলে গেছে, আর তার প্রতিধ্বনি এসে ছুঁয়ে গেছে তাকে।
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে ছিল সে। বাড়ির ভেতর নিস্তব্ধতা এতটাই ঘন ছিল যে নিজের শ্বাসের শব্দও ভারী লাগছিল। মেঘলার ঘরের দরজা আধখোলা। তারপর, ধীরে ধীরে ঘরের অন্ধকারে চোখ অভ্যস্ত হয়ে উঠতেই, সেই দৃশ্য; মায়া দেবী দাঁড়িয়ে আছেন ড্রয়িংরুমে। তার চোখ স্থির, হাঁটা ধীর, যেন তিনি নিজে নন, কোনো অদৃশ্য নির্দেশ তাকে চালাচ্ছে। একাই পায়চারি করছেন তিনি। তার হাঁটার মধ্যে অদ্ভুতভাবে নিয়মিততা, কিন্তু উদ্দেশ্যহীন। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া, তারপর আবার ফিরে আসা। একই ছন্দ, একই পুনরাবৃত্তি। যেন কোনো অদৃশ্য বৃত্তের মধ্যে আটকে পড়ে তিনি শুধু তার পরিধিটুকুই মেপে চলেছেন।
সৃঞ্জয়কে তিনি খেয়াল করেননি, অথবা খেয়াল করেও তা প্রকাশ করেননি। দূর থেকে বোঝার কোনো উপায় ছিল না। সৃঞ্জয় সেই নির্দিষ্ট দূরত্বে স্থির দাঁড়িয়ে ছিল। তার শরীরের ভেতর যেন ধীরে ধীরে এক ধরনের অবশতা জমে উঠছিল। সে জানত, তার এগিয়ে যাওয়া উচিত। এই নিস্তব্ধতার ভিতরে ঢুকে পড়া উচিত। তবু সে এগোয়নি। ওর মনে হচ্ছিলো কোনো কোনো মুহূর্ত মানুষের সামনে দ্বিতীয়বার ফিরে আসে না, শুধু তার ছায়াটা ফিরে আসে। আর সেই ছায়ার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ আবারও নিজের পুরোনো দ্বিধার বন্দি হয়ে পড়ে। ঠিক যেমন একদিন…।
রাতের সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বাবার মুখটা ভেসে ওঠে সৃঞ্জয়ের মনে। অরুণবাবু ছিলেন কঠোর, নিয়মমাফিক, আপসহীন একজন মানুষ। তার কাছে জীবনের মূল্য নির্ধারিত হতো সাফল্যের মাপে। অর্জন, প্রতিষ্ঠা, স্বীকৃতি এই শব্দগুলোর বাইরের পৃথিবী যেন তার কাছে বিশেষ অর্থ বহন করত না। মানুষকেও তিনি প্রায়শই ফলাফলের নিরিখে বিচার করতেন; যেন জীবনের প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি প্রত্যাশা, এমনকি ভালোবাসারও একটি হিসাবের খাতা আছে, যেখানে লাভ-ক্ষতির অঙ্কই শেষ কথা। আর সেই অঙ্কের কাছে সৃঞ্জয় বরাবরই ঘাটতির দিকটায় পড়ে থাকত।
তার ব্যর্থতাগুলো অরুণবাবুর কাছে শুধু হতাশার কারণ ছিল না, যেন ব্যক্তিগত পরাজয়ের এক স্থায়ী স্মারক। ফলে বাবার থেকে প্রাপ্ত প্রতিদিনের তাচ্ছিল্য, কটূক্তি আর অদৃশ্য চাপ সৃঞ্জয় নীরবে সহ্য করত। সে কখনো প্রতিবাদ করেনি। শুধু একের পর এক অপমান নিজের ভেতরে স্তর জমতে দিয়েছিল, যেমন নদীর তলায় বছরের পর বছর পলি জমে অদৃশ্য চর তৈরি হয়।
ছোটবেলায় তার কোনো কিছুর অভাব ছিল না। পড়াশোনা, পোশাক, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সবই পেয়েছিল। কিন্তু প্রাপ্তির সেই দীর্ঘ তালিকার কোথাও বাবার উষ্ণ স্পর্শ বা নিঃশর্ত স্নেহের জন্য কোনো জায়গা ছিল না। তাকে বড় করা হয়েছিল যত্ন দিয়ে, কিন্তু কাছে টেনে নয়। যেন তিনি একজন সন্তানকে নয়, একটি অসমাপ্ত প্রকল্পকে বড় করে তুলছিলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অদৃশ্য শীতলতা শুধু বাবা-ছেলের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাড়ির ভেতরেও ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য দূরত্ব জন্ম নিয়েছিল। মায়া দেবী আর অরুণবাবু আর একসঙ্গে শুতেন না। বাড়ির দুই প্রান্তে ছিল তাদের আলাদা ঘর, আলাদা নীরবতা। একই ছাদের নিচে থেকেও তারা যেন ক্রমশ দুটো পৃথক জীবনে বাস করতে শুরু করেছিলেন। কখন, কীভাবে সেই দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, সৃঞ্জয় কখনো স্পষ্ট করে বুঝতে পারেনি। শুধু অনুভব করত, বাড়িটার ভেতরে এমন এক নীরবতা জমে আছে, যার কোনো শব্দ নেই, অথচ যার ভার প্রতিটি ঘর, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। যেন সংসারটা বাইরে থেকে অটুট দেখালেও ভেতরে ভেতরে কোথাও একটা সূক্ষ্ম ফাটল অনেকদিন ধরেই বিস্তার লাভ করছিল।
তারপর শ্রাবণের সেই ঢেকে যাওয়া রাতটা। আজও ফিরে তাকালে সৃঞ্জয়ের মনে হয়, যেন শুরু থেকেই রাতটা কোনো অনিবার্য ঘটনার প্রতীক্ষায় ছিল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল ছন্দহীনভাবে। কখনো তীব্র, কখনো থেমে থেমে। সেই বৃষ্টির শব্দ বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেয়াল, সিঁড়ি, জানলার কাচ আর দরজার ফাঁক জুড়ে এক অদ্ভুত ভার ছড়িয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, বাড়িটা যেন নিঃশব্দে নিজের শ্বাস আটকে রেখেছে।
সৃঞ্জয় বইয়ের টেবিলের সামনে মাথা হেলিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। কিন্তু তার সেই নীরবতার মধ্যে কোনো প্রশান্তি ছিল না। সেখানে স্তরে স্তরে জমে ছিল বহু বছরের অপমান, অবদমিত ক্রোধ, আর এক গভীর অসহায়তার পলিমাটি। দীর্ঘদিনের না-বলা কথাগুলো যেন তার ভেতরে জমাট বেঁধে ছিল। তার জীবনের প্রেম তখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে ঝুলছিল, হাতের নাগালে থেকেও যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল দূরে।
ঠিক সেই সময়, দরজাটা হঠাৎ প্রচণ্ড ধাক্কায় খুলে গেল। অরুণবাবু ঢুকলেন। শরীর টলমল, চোখ রক্তাভ, গলায় কটু মদের গন্ধ। যেন বাইরে চলতে থাকা ঝড়েরই আরেকটি রূপ দরজার ওপাশ থেকে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেছে।
- এই সময়ে ঘুমোচ্ছিস?
অরুণবাবুর কণ্ঠস্বর ঘরের নীরবতা চিরে এলো।
সৃঞ্জয় মাথা তুলে তাকাল।
- আমি জেগেই আছি।
- জেগে আছিস?
অরুণবাবু ঠোঁটের কোণে শুষ্ক, বিদ্রূপমাখা হাসি নিয়ে বললেন,
- জেগে থেকে কী করিস? জীবনটাকেই তো ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিস।
সৃঞ্জয় কোনো উত্তর দিলো না।
- একটা চাকরি জোটাতে পারলি না, কিছু করতে পারলি না… আমার নামটাই ডুবিয়ে দিলি, সালা!
- আমি চেষ্টা করছি, বাবা…
- চেষ্টা?
শব্দটা যেন তার মুখে এসে আরও ধারালো হয়ে উঠল।
- চেষ্টা করে কেউ মানুষ হয় না। ফল দেখাতে হয়।
- সবকিছু এত সহজ নয়…
অরুণবাবু আরও কাছে এগিয়ে এলেন।
- তোর জন্যই সব কঠিন! তোর শরীরে আদৌ আমার রক্ত বইছে কি না সন্দেহ! খালি বাড়িতে বসে গিলছে, আর আমার অন্ন ধ্বংস করছে। তোর থেকে একটা কুকুর পুষলেও…
বাকিটা আর উচ্চারিত হলো না। তবু অসমাপ্ত কথারও কখনো কখনো পূর্ণ বাক্যের চেয়েও বেশি ওজন থাকে। শব্দগুলো থেমে গেলেও তাদের অর্থ ঘরের ভেতর দীর্ঘক্ষণ ভাসতে থাকল।
সেই মুহূর্তে সৃঞ্জয়ের ভেতরে যেন বহুদিনের চাপা স্তরের নিচে কিছু নড়ে উঠল। কোনো তাৎক্ষণিক ক্রোধ নয়, কোনো আকস্মিক প্রতিক্রিয়াও নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা এক অন্ধকার, যা এতকাল শুধু নীরবে অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল।
খুব নিচু স্বরে বলে উঠলো,
- চুপ করো।
অরুণবাবু যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারলেন না।
- কী বললি?
সৃঞ্জয় এবার মাথা তুলল।
- বললাম, চুপ…
শব্দটা খুব জোরে উচ্চারিত হয়নি। অথচ ঘরের নিস্তব্ধতায় সেটাই যেন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল। বহু বছরের নীরবতার মধ্যে এ ছিল এক অচেনা স্বর। অরুণবাবু এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে জমল তাচ্ছিল্যের রেখা।
- তুই আমাকে থামাবি? শুয়ারের বাচ্চা!
তেড়ে এলেন সৃঞ্জয়ের দিকে। আরও কাছে, এতটাই কাছে যে প্রতিটি শব্দের সঙ্গে মদের গন্ধ আর থুথুর ছিটে এসে লাগছিল তার মুখে। আবার শুরু হলো, মুখের সামনে ঝরে পড়তে লাগল একের পর এক বিষাক্ত বাক্য। ক্রমশ আরও কটু, আরও ব্যক্তিগত, আরও নির্মম। যেন বহুদিনের জমে থাকা অবজ্ঞা, ক্ষোভ আর অপমান একসঙ্গে ভাষা খুঁজে পেয়েছে। প্রতিটি শব্দ সৃঞ্জয়ের শরীরকে নয়, তার অস্তিত্বকেই আঘাত করছিল।
এরপর আর কিছু স্পষ্ট শুনতে পেল না সৃঞ্জয়। শব্দগুলো ধীরে ধীরে অর্থ হারিয়ে ফেলল। যেন বাক্যগুলো দূরে কোথাও উচ্চারিত হচ্ছে, আর সে ক্রমশ সরে যাচ্ছে তাদের নাগালের বাইরে। চারপাশের সবকিছু ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল। মাথার ভেতর জমতে থাকল একটানা এক গুঞ্জন ভারী, ঘন, অবিরাম। বহু বছরের অপমান, দমিয়ে রাখা ক্ষোভ আর অসহায়তা যেন সেই গুঞ্জনের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। তারপর হঠাৎ— সব চুপ।
সে জানে না ঠিক কখন উঠে দাঁড়িয়েছিল। কখন হাতের কাছে থাকা বালিশটা তুলে নিয়েছিল। শুধু মনে হয়েছিল, এই অবসান ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তারপর, একটা দমবন্ধ করা ছটফটানি। হাতের নিচে একটা শরীর প্রাণপণে লড়ছে। ধীরে ধীরে সেই প্রতিরোধ ক্ষীণ হয়ে আসে। ছটফটানি থেমে যায়। আর তারপর; সম্পূর্ণ নীরবতা।
সৃঞ্জয় দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার বুক ওঠানামা করছে, কিন্তু সে যেন নিজের ভেতর নেই। শূন্য হয়ে আসা শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোয়। অথচ দরজা খুলতেই সে থেমে যায়। ড্রয়িংরুমে একটা হালকা আলো জ্বলছে। মায়া দেবী সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। কতক্ষণ ধরে? সে জানে না। তিনি নড়ছেন না। শুধু দাঁড়িয়ে আছেন, একটু পাশ ফিরিয়ে। যেন ভেতরের ঘরের দিকেই কান পেতে ছিলেন।
সৃঞ্জয়ের মনে হয় তিনি সব শুনেছেন। আবার পরের মুহূর্তেই মনে হয় হয়তো কিছুই না। তার চোখ মায়া দেবীর চোখের সঙ্গে মেলে। সেই চোখে কোনো ভয় নেই। কোনো চমক নেই। বরং এক অদ্ভুত স্থিরতা। যেন তিনি আগে থেকেই জানতেন, এই রাত এমন কিছু নিয়ে আসবে।
মায়া দেবী এক পা-ও এগিয়ে আসেন না। কোনো প্রশ্ন করেন না। শুধু তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে সৃঞ্জয়ের মুখ থেকে সরে গিয়ে একবার ভেতরের ঘরের বন্ধ দরজার ওপর স্থির হয়। কয়েক মুহূর্ত সেখানে থেমে থেকে আবার ফিরে আসে। সেই ক্ষণিক দৃষ্টিবদলটুকুই যেন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। সৃঞ্জয়ের শরীরের ভেতর ধীরে ধীরে এক শীতলতা ছড়িয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে না, এই নীরবতা কি অজানা? নাকি সব জেনেও চুপ করে থাকা?
মায়া দেবীর ঠোঁট একবার কেঁপে ওঠে। মনে হয়, তিনি কিছু বলতে যাচ্ছেন। কোনো প্রশ্ন, কোনো বিস্ময়, কিংবা কোনো আর্তনাদ। কিন্তু কিছুই উচ্চারিত হয় না। বরং খুব ধীরে, প্রায় অদৃশ্যভাবে, তার মুখের ওপর নেমে আসে এক কঠিন স্তর। একটা সিদ্ধান্তের মতো।
সেই মুহূর্তে সৃঞ্জয়ের মনে হয়, এই রাতটা শুধু একটি ঘটনার সমাপ্তি নয়। এর ভেতরে আরও কিছু বাকি রয়ে গেলো। যেন কোনো অদৃশ্য সমঝোতা, কোনো অনুচ্চারিত চুক্তির শুরু। বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। ভেতরে দু’জন মানুষ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একজন জানে, সে কী করেছে। আরেকজন জানে কি জানে না, সেই প্রশ্নটাই যেন রাতের সবচেয়ে গভীর রহস্য হয়ে তাদের মাঝখানে স্থির হয়ে থেকে যায়।
পরের দিন সবকিছু যেন অস্বাভাবিকভাবে সহজ হয়ে যায়। “হৃদরোগ” একটি মাত্র শব্দেই সব ব্যাখ্যা মিলে যায়। সমাজ বরাবরই সহজ ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করতে স্বচ্ছন্দ। সৃঞ্জয়ও ধীরে ধীরে নিজেকে বিশ্বাস করাতে থাকে, এটা নিছকই একটি দুর্ঘটনা ছিল। তবু তার ভেতরের কোনো গভীর স্তরে সেই রাতটা নিঃশব্দে বেঁচে থাকে।
এখন, মেঘলার মৃত্যুর পর দাঁড়িয়ে সৃঞ্জয়ের সন্দেহ আরো বেড়ে যায়, সেই রাতটার সত্যিকারের সমাপ্তি কখনো ঘটেনি। সময়ের অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকলেও তা নিঃশেষ হয়নি। যেন এতদিন ধরে শুধু অপেক্ষা করছিল আবার ফিরে আসার।
মায়া দেবী এখন অনেকটাই বদলে গেছেন। তার ভুলে যাওয়ার প্রবণতা যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। কথাবার্তায় আর আগের সেই অসংলগ্নতা নেই, উচ্চারণও স্পষ্ট। চোখের দৃষ্টিতে ফিরে এসেছে এক ধরনের স্থির সচেতনতা। সবকিছুই যেন অস্বাভাবিকভাবে স্বাভাবিক।
দিন এগিয়ে যেতে থাকে। একদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরে সৃঞ্জয় দেখে, ড্রয়িংরুমের সোফায় মায়া দেবী বসে আছেন। আর মেঝেতে বসে টি-টেবিলের ওপর ঝুঁকে অঙ্ক করছে ঋদ্ধ। মায়া দেবী হাত বাড়িয়ে আলতো করে তার মাথায় হাত রাখলেন।
- পড়া শেষ করেছ?
- না, অঙ্কটা পারছি না।
- দেখি তো।
তিনি খাতাটা নিজের দিকে টেনে নিলেন।
- এখানে ভুল করেছ… আবার করো।
ঋদ্ধ একটু মুখ বাঁকাল।
- তুমি তো সব জানো, ঠাম্মি!
মায়া দেবী হালকা হেসে বললেন,
- সব না… কিছু কিছু মনে থাকে।
সৃঞ্জয় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। একটা বিকেলের সাধারণ ছবি। একজন ঠাকুমা, তার নাতি, পড়ার খাতা খুলে বসা, ছোটখাটো কথাবার্তা। সবকিছু এতটাই স্বাভাবিক, এতটাই পরিচিত, যেন এই বাড়িতে কোনোদিন কোনো অস্বাভাবিকতা ঘটেইনি। যেন সময় নিঃশব্দে সব দাগ মুছে দিয়ে জীবনের দৈনন্দিনতার নিজস্ব ছন্দ ফিরিয়ে এনেছে।
সন্ধ্যা নেমে আসে। বাইরে আবহাওয়ার রং বদলাতে শুরু করে। হওয়ার শব্দ ধীরে ধীরে ঘন হয়ে ওঠে, জানলার কাচে এসে লাগে তার দীর্ঘশ্বাসের মতো ধাক্কা। সেই আবহের মধ্যেই মায়া দেবী একবার সৃঞ্জয়ের দিকে তাকান। কোনো বাক্য নয়, শুধু শব্দহীন চাওনি। কিন্তু সেই দৃষ্টির ভেতরে একটা স্পষ্টতা আছে যেন বহুদিন ধরে জমে থাকা কোনো হিসাব মিটে গেছে।
সৃঞ্জয়ের মনে তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্মায়। ভয়? অপরাধবোধ? নাকি স্বস্তি? সে বুঝতে পারে না। শুধু মনে হয়, পুরো ঘটনাটা যেন এক অদৃশ্য চক্রের অংশ। যার শুরু বহু বছর আগে। সে একদিন সেই চক্রকে ঘুরতে দিয়েছিল। মায়া দেবী তাকে থামাননি, শেষও করেননি, শুধু ফিরিয়ে দিয়েছেন।
রাতে সে ছেলের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। ঋদ্ধ ঘুমোচ্ছে। তার নিঃশ্বাসের ছন্দ স্বাভাবিক, নিশ্চিন্ত। সৃঞ্জয়ের ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে ওঠে। সেই হাসি আনন্দের নয়। বরং এক ধরনের কৌতুক। নিয়তির প্রতি, নিজের প্রতি, আর এই নীরবতার প্রতি। যেটা কখনো ভাঙে না, শুধু রূপ বদলায়।
বাইরে আবার বৃষ্টি পড়ছে। আর বাড়িটার দেয়াল সব শব্দ শুষে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
1 Comment
খুব ভালো গল্প। খুবই ভালো লেগেছে। চমক এবং চরিত্র গঠন ঈর্ষণীয়। বলিষ্ঠ লেখক