অর্জুনের ডায়েরি পর্ব #৫ – তিস্তা
ধারাবাহিক
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব #৫ - তিস্তা
তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। এবারে পর্ব # পাঁচ। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।
খবর
ইছামতীর ধারে তখন পুরোপুরি সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ওপারের আলো আরও স্পষ্ট। নদীর কালো জলের ওপর তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভেঙে পড়ছে। আমি আরও কিছুক্ষণ বসে সেই দৃশ্য দেখালাম।
ফিরতে ফিরতে অন্ধকার হয়ে গেল। লজে ঢুকতেই রিসেপশনের ছেলেটা মাথা তুলে তাকাল। আমি বললাম, “এক কাপ চা ঘরে পাঠিয়ে দেবে?”
সে মাথা নাড়ল।
সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে এলাম। ঘরটা সারাদিন বন্ধ ছিল। দরজা খুলতেই এক ধরনের গুমোট গন্ধ বেরিয়ে এল। ফ্যান চালিয়ে, জানলা খুলে দিলাম। দূর থেকে নদীর হাওয়া আসছে। জামাকাপড় বদলে বিছানায় এসে বসলাম।
বাইরে কোথাও একটা টিভির শব্দ ভেসে আসছিল। সম্ভবত পাশের ঘরে। কিছুক্ষণ পরে বেয়ারা চা দিয়ে গেল। কাপটা টেবিলে রেখে দরজা বন্ধ করলাম। একলা হোটেল রুমে সন্ধ্যেগুলো একটু বেশি দীর্ঘ হয়। সময় কাটানোর জন্য টিভির সুইচ অন করে দিলাম।
তেরোজন মারা গেছে।
টিভির পর্দার নিচে লাল রঙের একটা টিকার ক্রমাগত ছুটে যাচ্ছে। সাদা অক্ষরে লেখা — “ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা। মৃত ১৩। আহত বহু।”
আমি সোফায় বসে খবরটা দেখছিলাম।
সংবাদ পাঠিকার গলায় কোনো শোক নেই। আছে এক ধরনের প্রশিক্ষিত উন্মাদনা— যে উন্মাদনায় একটি বাস খাদে পড়া আর একটি সিনেমার ট্রেলার মুক্তি পাওয়া প্রায় একই ঘটনা। মৃত্যুকে এমনভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে, যেন দর্শক রিমোট টিপে অন্য চ্যানেলে না চলে যায়।
“এই মুহূর্তের সবচাইতে বড় খবর… “এক্সক্লুসিভ ছবি…” “আপনারা দেখতে পাচ্ছেন…” – বাক্যগুলো একটার পর একটা ভেসে আসছে। যেন পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনাই এক ধরনের জরুরি বিনোদন।
একজন মন্ত্রী দল বদলেছেন। একটা সেতু ভেঙে পড়েছে। একটা শিশু নিখোঁজ। সব খবরই একই স্বরে পরিবেশিত হচ্ছে। একই রকম চোখ বড় বড় করে। একই রকম শ্বাস আটকে আসা উত্তেজনায়।
তবে সবের মধ্যেও পর্দার নিচে সেই লাল টিকার ছুটছে। মৃত তেরো।
মনে হচ্ছিল, মৃত্যুর থেকেও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে মৃত্যুর সম্প্রচার। পর্দায় উল্টে যাওয়া বাসের ছবি দেখানো হচ্ছে। একটা চাকা এখনও আকাশের দিকে উঠে আছে, যেন শেষ মুহূর্তের আতঙ্কে কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল! চারদিকে ভাঙা কাচ ছড়িয়ে। লোকজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ সাহায্য করছে, কেউ দেখছে, কেউ মোবাইলে ছবি তুলছে।
একজন মহিলা কাঁদছেন।
ক্যামেরা বারবার তাঁর মুখের কাছে চলে যাচ্ছে। জুম করে দেখাচ্ছে মহিলাটির মুখ। কান্নাটা যেন ঘটনার অংশ নয়, সম্প্রচারের অংশ। তাঁর শোককে যতটা সম্ভব স্পষ্ট, যতটা সম্ভব কাছ থেকে দেখানোর চেষ্টা চলছে।
আমি তাকিয়ে আছি।
মহিলার কান্না, উল্টে থাকা বাস, লাল টিকার আর প্রতিবেদকের উত্তেজিত গলা— সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি হয়েছে। কোথাও একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, আর এখানে তার দৃশ্যায়ন চলছে।
মৃত তেরো। সংখ্যাটা পর্দার নিচে অবিরাম ছুটে চলেছে। তেরোজন মারা গেছে। সংখ্যাটা কিছুক্ষণ মাথার ভেতর ঘুরতে থাকল। তেরো।
আমি চেষ্টা করলাম সংখ্যাটাকে মানুষে পরিণত করতে। তেরোটা আলাদা মুখ। তেরোটা আলাদা ঘর। তেরোটা আলাদা জীবন। যাদের প্রত্যেকের নিজস্ব সকাল ছিল, নিজস্ব অভ্যাস ছিল। কেউ হয়তো বেরনোর আগে দরজায় তালা দিতে ভুলে গিয়েছিল। কেউ হয়তো বলেছিল, “ফিরে এসে কথা বলব।” কারও মোবাইলে হয়তো এখনও মিসড কল জমছে।
কিন্তু আমি পারলাম না। শেষপর্যন্ত সংখ্যা সংখ্যাই রয়ে গেল। তেরো— মানুষ হয়ে উঠল না।
অস্বস্তি হল। সমস্যাটা কোথায়? ঘটনায়, না আমার মধ্যে? এতগুলো মানুষের মৃত্যু আমার কাছে কেন একটা তথ্যের বেশি হয়ে উঠছে না? আগে কি মানুষ এমনই ছিল? নাকি সবসময়ই ছিল, শুধু এখন আমরা সেটা আরও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। খবরের মাঝখানে বিজ্ঞাপন ঢুকে পড়ল।
একজন অভিনেত্রী সাবান মেখে স্নান করছেন। সাদা ফেনার ভিতর তাঁর উজ্জ্বল হাসি। কয়েক সেকেন্ড আগেও পর্দায় ছিল উল্টে যাওয়া বাস, ভাঙা কাচ, আতঙ্কে ছুটে বেড়ানো মানুষ। এখন শুধু মসৃণ ত্বক আর ঝকঝকে আলো। তারপর একটা ঠান্ডা পানীয়র বিজ্ঞাপন। তারপর নতুন ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসছে এক সুখী পরিবার। বাবা, মা, সন্তান…তাদের পৃথিবীতে কোনো দুর্ঘটনা নেই। কোনো মৃত্যু নেই। কোনো খবর নেই।
মনে হল— পৃথিবী সম্ভবত কোনো শোকই বেশিক্ষণ বহন করে না। সে একটা দৃশ্য থেকে অন্য আরেকটা দৃশ্যে সরে যায়। একটা কান্নার উপর এসে পড়ে আরেকটা হাসি। তারপর আরও একটা বিজ্ঞাপন। আরও একটা গল্প। পর্দা এগিয়ে চলে…
চ্যানেল আবার খবরে ফিরল। পর্দার নিচের টিকারে এবার লেখা— “মৃত বেড়ে ১৪”
খবরটা আর নতুন নয়। কেবল সংখ্যাটা নতুন। কিন্তু পর্দার উত্তেজনা দেখে মনে হচ্ছিল গল্পে নতুন মোড় এসেছে। চোদ্দো। মাত্র একটা সংখ্যা বেড়েছে।
কিন্তু বাস্তবে একটা পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে। কোথাও একজনের বাবা আর ফিরবেন না। কোথাও একজনের স্ত্রী হঠাৎ করে অতীত হয়ে গেলেন। কোথাও একটা শিশু এখনও বুঝতে পারেনি যে তার জীবনের মানচিত্র এইমাত্র বদলে গেছে।
আমি এসবই ভাবছিলাম। তারপর হঠাৎ টের পেলাম, ভীষণ খিদে পেয়েছে। বিকেল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। নদীর ধারে বসে থাকতে থাকতে খেয়ালই ছিল না। লজের নিচের ডাইনিং হলটা কখন বন্ধ হয় তাও জানি না। এখন নেমে গেলে হয়তো ভাত পাওয়া যাবে। নইলে বিস্কুট খেয়েই রাত কাটাতে হবে।
কয়েক সেকেন্ড আমি শুধু খাবারের কথাই ভাবলাম। তারপর অস্বস্তি হল। মনে হল, আমি খুব খারাপ মানুষ। আবার পরক্ষণেই মনে হল, হয়তো সবাই এমনই। মানুষের মস্তিষ্কেরও তো একটা সীমা আছে। নিজের শোকই যেখানে সামলানো কঠিন। সেখানে পৃথিবীর সব শোক বয়ে বেড়ানো কি সম্ভব? প্রতিটি দুর্ঘটনা, প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি কান্নাকে যদি সমান গুরুত্ব দিয়ে অনুভব করতে হয়, তাহলে হয়তো মানুষ আর স্বাভাবিকভাবে বাঁচতেই পারবে না।
রিমোটটা হাতে নিয়ে চ্যানেল পাল্টালাম।
একটা রান্নার অনুষ্ঠান চলছে। কেউ পনিরের নতুন রেসিপি শেখাচ্ছে। অন্য চ্যানেলে ক্রিকেট। আরেকটায় সিরিয়াল। কোথাও কেউ মারা যাচ্ছে। কোথাও কেউ প্রেমে পড়ছে। কোথাও কেউ নাচছে। কোথাও কেউ নতুন বাড়ির বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে।
সবকিছু একই সময়ে ঘটছে। মনে হল, পৃথিবী সম্ভবত সবসময়ই এমন ছিল। একই মুহূর্তে কোথাও শোক, কোথাও উৎসব, কোথাও জন্ম, কোথাও মৃত্যু। শুধু আগে আমরা একসঙ্গে এত কিছু দেখতে পেতাম না। এখন পর্দাগুলো পাশাপাশি সাজিয়ে দেয় সব।
টিভিটা বন্ধ করলাম। খিদেও পেয়েছিল। নিচে নেমে লজের ছোট্ট ডাইনিং হলে গিয়ে রাতের খাবার নিলাম। ভাত, ডাল, ডিমের ঝোল। পাশের টেবিলে দুজন পর্যটক জোরে জোরে কথা বলছিল। তাদের আলোচনার বিষয় মাছ ধরার নৌকো। ইঞ্জিন লাগানো নৌকো ভালো, না বৈঠার নৌকা। সেটা নিয়ে বেশ তর্ক চলছিল। একজন হাত নেড়ে নেড়ে নিজের যুক্তি বোঝানোর চেষ্টা করছে, অন্যজন কিছুতেই মানতে রাজি নয়।
আমি চুপচাপ খাচ্ছিলাম। কয়েক মিনিট আগে টিভিতে চোদ্দজন মানুষের মৃত্যুর খবর দেখেছি। এই টেবিলে বসে দুজন মানুষ নৌকো নিয়ে তর্ক করছে। কোথাও কোনো অসংগতি নেই। জীবন সম্ভবত এভাবেই এগিয়ে চলে। খাওয়া শেষ করে রুমে ফিরে এলাম।
বিছানায় শুয়ে মোবাইলটা হাতে নিলাম। অভ্যাস। এখন আর কেউ সচেতনভাবে মোবাইল খোলে না। আঙুল নিজেই তার পথ চেনে। একটা রিল। তারপর আরেকটা…
একটা ভিডিওর ওপর লেখা— “শেষ পর্যন্ত না দেখলে বিশ্বাস করবেন না।”
আমি দেখলাম না। আঙুল ওপরে ঠেলে দিলাম। পরের ভিডিও।
একজন ডাক্তার বলছেন, “এই লক্ষণগুলোকে কখনও অবহেলা করবেন না।”
তারপরের ভিডিওতে একজন জ্যোতিষী বলছেন, “আগামী সাত দিনের মধ্যে আপনার জীবনে বড় পরিবর্তন আসছে।”
একটা বিড়াল সোফার উপর থেকে লাফ দিতে গিয়ে পড়ে গেল। হাজার হাজার মানুষ হাসির ইমোজি দিয়েছে। আমিও হাসলাম।
তারপর একজন কাঁদতে কাঁদতে নিজের বিচ্ছেদের গল্প বলছে।
তারপর একটা রান্নার ভিডিও।
একজন বলছে পাঁচ মিনিটে কীভাবে ধনী হওয়া যায়।
তারপর একটা কুকুর।
একটা জোকস।
একটা গান।
একটা মুখ।
আরও একটা মুখ।
আরেকটা।
পৃথিবী একটার পর আর একটা দৃশ্য হয়ে আমার আঙুলের নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। আমি স্ক্রল করছি, স্ক্রল করছি, স্ক্রল করছি…। পৃথিবী আরও কিছুক্ষণ আমার আঙুলের নিচ দিয়ে বয়ে গেল। তারপর আর কিছু মনে নেই।
ভোরে ঘুম ভাঙল অ্যালার্মে। কিছুক্ষণ বিছানায় পড়ে রইলাম। রাতে রিসেপশনের ছেলেটাকে বলে রেখেছিলাম, পাঁচটার মধ্যে যেন এক কাপ চা পাঠিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পরে দরজায় টোকা পড়ল। চা নিয়ে এল ছেলেটা। কাপটা টেবিলে রেখে চলে গেল।
আমি চা খেতে খেতে টিভি চালালাম।
একই খবর। একই বাস। একই ভাঙা কাচ। একই কান্না। শুধু নিচের সংখ্যাটা বদলে গেছে।
“মৃত ১৫”।
সারারাতে একটা সংখ্যা বেড়েছে। কালও সংখ্যা ছিল। আজও সেই সংখ্যাই। আমি জানি আর কিছুক্ষণ পর এই সংখ্যাটাও সব আমার কাছে একটা তথ্য হয়ে যাবে। যেমন আবহাওয়ার খবর। যেমন শেয়ার বাজার। যেমন পেট্রোলের দাম।
টিভির প্রতিবেদক বলছিলেন, উদ্ধারকাজ এখনও চলছে। উদ্ধারকাজ কী কেবল দুর্ঘটনাস্থলেই চলে? উদ্ধারকাজ চলে আমাদের ভেতরেও।
প্রতিদিন এত খবর, এত ছবি, এত মৃত্যু, এত কান্না এসে জমা হচ্ছে যে অনুভব করার জায়গা কমে আসছে। আমরা ধীরে ধীরে অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। কেউ সেটা খেয়ালও করছে না। কত রকমের খবর।
কোথাও যুদ্ধ। কোথাও বন্যা। কোথাও খুন। কোথাও ধর্ষণ। কোথাও দুর্নীতি। কোথাও আগুন।
সব খবরই জরুরি। সব খবরই ভয়ংকর। সব খবরই ব্রেকিং। এত ব্রেকিং যে কিছুই আর ভাঙে না।
আমাদের ভেতরটা পর্যন্ত না।
লজের ডাইনিং স্পেসে গেলাম সকালের জলখাবারের জন্য। খাওয়ার ঘরে আরও কয়েকজন বোর্ডার ছিল। কেউ সেদিন কোথায় কোথায় ঘুরতে যাবে, সেই পরিকল্পনা করছে। কেউ ট্রেনের সময় জিজ্ঞেস করছে। কারও হাতে মোবাইল, কেউ খবরের কাগজ উল্টে দেখছে। আমি খাওয়া শেষ করে নদীর ধারের রাস্তায় একটু হাঁটতে বেরোলাম।
নদীর ধারের রাস্তাটা তখন প্রায় ফাঁকা। মাঝেমধ্যে দু-একটা মোটরবাইক চলে যাচ্ছে। দূরে জেলেদের কয়েকটা নৌকা ভেসে ছিল। আমি কিছুক্ষণ নদীর ধারে হাঁটলাম। নদী নিজের মতো বয়ে যাচ্ছে। গতকালের খবরের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
রোদ চড়ছিল ধীরে ধীরে। আর বেশি দূর যাওয়ার ইচ্ছে হল না। লজের দিকে ফিরে হাঁটতে শুরু করলাম। সকাল ইতিমধ্যেই নিজের ছন্দে ঢুকে পড়েছে। রাস্তার পাশে দোকানপাট খুলছে। লোকজন বাজারের ব্যাগ হাতে ফিরছে। পৃথিবী কোথাও থেমে নেই। রাস্তার ধারের একটা চায়ের দোকানে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। তারা সেই দুর্ঘটনার খবর নিয়ে আলোচনা করছিল।
একজন বলল, “খুব খারাপ হয়েছে।”
আরেকজন বলল, “রাস্তাঘাটে বেরোনোই মুশকিল হয়ে গেছে।”
তৃতীয়জন বলল, “আরেকটা চা দাও তো।”
আলোচনা শেষ। কথাগুলো বাতাসে কিছুক্ষণ ভেসে রইল, তারপর মিলিয়ে গেল।
লজে ফিরতে ফিরতে মনে হল, আসলে আমরা অনুভব করি না, তা নয়। সমস্যাটা অন্য। আমরা অনুভব করি। তবে তা খুব অল্প সময়ের জন্য। তারপর নতুন একটা ছবি এসে পুরোনোটাকে সরিয়ে দেয়। নতুন একটা ভিডিও। নতুন একটা খবর। নতুন একটা মৃত্যু। নতুন একটা হাসি।
কিছুই বেশিক্ষণ থাকে না। একটা দৃশ্যের জায়গায় আরেকটা দৃশ্য এসে বসে। একটা মুখের উপর আরেকটা মুখ। একটা ঘটনার উপর আরেকটা ঘটনা। আমাদের স্মৃতির ভেতর যেন ক্রমাগত ভিড় বাড়ছে। কেউ বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা পাচ্ছে না।
বাইরে এখন রোদ। আমি রুমে ফিরে এলাম। জানলার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে বিছানার উপর। একটু শুয়ে বিশ্রাম নেব ভেবেছিলাম। মোবাইলটা হাতে নিলাম।
আবার রিল। আবার স্ক্রল। হঠাৎ একটা খবরের ভিডিও উঠে এল। একজন সাংবাদিক বলছেন— “মৃতের সংখ্যা বেড়ে ষোলো।” আমি ভিডিওটা শেষ পর্যন্ত দেখলাম না। আঙুল দিয়ে ওপরে ঠেলে দিলাম। পরের ভিডিওতে একটা কুকুর পিয়ানো বাজাচ্ছে।
আমি আনমনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তারপর একসময় অনুভব করলাম— ষোলো নম্বর মানুষটা ঠিক এইমাত্র দ্বিতীয়বার মারা গেল। প্রথমবার দুর্ঘটনায়।
দ্বিতীয়বার আমার আঙুলের সামান্য ঠেলায়—
1 Comment
তিস্তা এবং তিস্তার শব্দনির্মান –
আমি এই দুজনেরই সমান প্রেমিক। আমার মোবাইলে তিস্তা এলে আমি স্ক্রল করে অতিক্রম করিনা। অতিক্রমের স্পর্ধাও নেই। কারণ, ওর শব্দের মধ্যে নিহিত অনুভূতি চিত্ররা, যারা আমার স্ক্রিনে সারাক্ষণ ছিলো, কিন্তু প্রতিবার তিস্তা নতুন করে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়।
ওর আবেগের সংরক্ষণ দরকার। মানবিক আগামীর একান্ত পাঠ্যবিষয়।