যে কালো ভ্রমরা
১.
কোনও উদাসীনতা নয়
সত্যিই একটা ট্রাম চলে গেল ডালহৌসির দিকে
একটা নীল রঙের মানুষ! ঘন নীল, হাতে যাদুকরী বাঁশি
যদিও কোনও দেবপুরুষ নয়
কত লোক, কত রমণীরা দু’হাত বাড়িয়ে রয়েছে তার দিকে
কিছু কি চাইছে? কী চাইছে ওরা!
কস্তুরী গন্ধে ভরে গেছে আমাদের চালতাবাগান
নীলে নীলে ছয়লাপ হেদুয়া থেকে বিডন রো
সারা শহর পরেছে নীলাম্বরী সমুদ্রশাড়ি
আমি কি জন্ম নেব বড়াই পুনরায় এই তিলোত্তমায়?
আমার কৃষ্ণ যদিও কোনও বহুরূপী নয়
২.
রোহিণী নক্ষত্রের রাত
বন্ধন থেকে মুক্তি আর মুক্তি থেকে পুনর্জন্ম
সারারাত উথালপাথাল। যুদ্ধক্লান্ত কুরুক্ষেত্র
খন্ড খন্ড দেহাংশ শায়িত রয়েছে ধুলোয়
ঠিক ওইখানে প্রগাঢ় অন্ধকারে
তোমার ভয়াবহতা দেখে স্তম্ভিত হচ্ছি কাহ্ন!
অপরাধ কোথায় ঢেকেছ তুমি? রক্তে নাকি নিশ্বাসে!
ভালবাসা কোথায় লুকিয়েছ? বিশ্বরূপে নাকি বিশ্বাসে!
প্রেমযোগিনী বলে আজও বেঁচে আছি দগ্ধহ্লাদিনী
পুনর্জন্ম চাইনি কখনও চেয়েছি অন্তর্যামী
৩.
কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি সখা!
বাঁদিকে মথুরা নগর, ডানদিকে জোনাকির দেশ
ঠিক মাঝখানে ভুঁইরাস্তা। নীল পদচিহ্ন আঁকা
আমি কি গড়াগড়ি খাব? আমি কি হলুদ মেখে নেব গায়ে?
নাভিকুণ্ডলী বাঁচিয়ে রেখে দেহ দেব বৃন্দাবনে!
ওগো বড়ায়ি!
কদমবৃক্ষের তলে কাকে দেখি! কপালে ময়ূরপালক!
ও ছায়া নয়, পার্থিব মানবী। আমি যাব ওর কাছে
দেহে আমার কামের প্রজাপতি বসে আছে
৪.
এই বর্ষায় বৃষ্টি হল না
কোনও অপার্থিব রিংটোন বাজেনি মেঘের
জল আর মাছরাঙা আর দূরের কিংশুক বন
সমস্ত না ফেরার মতো নীল রং
মহাকালের বিষন্ন কুহুডাক শুনিয়ে চলে গেল
শরীর জুড়ে চূড়ান্ত গ্রাভেটি, একটা দিকভ্রান্ত চলাচল
আচ্ছন্ন করে রেখেছে পান্থজনের মতো
এই কালো ভ্রমরা, কুঞ্জ বাগান, ভাঙা চন্দ্রমা
আহা! প্রিয় যমুনানগর, হরি হে! নিভে গেছে আমার
শহরজুড়ে এমনই যুদ্ধ! ব্রহ্মান্ড তোলপাড় হচ্ছে
আয়ানের ঘরে একা, অন্ধকারে হাত পেতে আছি
তোমার রাধিকা
2 Comments
অপূর্ব কবিতাগুলি পড়লাম। খুব ভালো লাগল।
পৌরাণিক আবেগের পুনর্নির্মাণ
✍️
কবি দেবদাস রজকের এই গুচ্ছ কবিতাগুলি রাধা-কৃষ্ণের চিরন্তন পৌরাণিক প্রেম, বিরহ এবং আধ্যাত্মিক আকুলতাকে অত্যন্ত আধুনিক নাগরিক প্রেক্ষাপটে ও মনস্তাত্ত্বিক ছাঁচে পুনর্নির্মাণ করেছে। ঐতিহ্যবাহী বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা-কৃষ্ণ ও সখী (বড়াই)-এর রূপকগুলি এখানে কলকাতা শহরের অলিগলি, ট্রামের ঘর্ঘর শব্দ এবং একবিংশ শতাব্দীর যান্ত্রিক জীবনের সঙ্গে মিশে এক অনন্য শিল্পরূপ ধারণ করেছে।
প্রথম কবিতা নাগরিক অভয়ে অলৌকিক সন্ধান যার মূল সুর প্রাত্যহিক শহরের বাস্তবতার সঙ্গে অলোকসামান্য কৃষ্ণের উপস্থিতি। কলকাতার ডালহৌসি, চালতাবাগান, হেদুয়া, বিডন রো এবং ট্রামের মতো চেনা অনুষঙ্গগুলির ব্যবহার কবিতাকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে। ব্যস্ত এই নাগরিক জীবনের মাঝে হঠাৎই নীল রঙের এক রহস্যময় মানুষের আবির্ভাব ঘটে, যিনি সাধারণ বহুরূপী নন, বরং সত্যিকরের যাদুকরী বাঁশির সুরকার। পুরো শহর যেন এক অদ্ভুত ঘোরে ‘নীলাম্বরী সমুদ্রশাড়ি’ পরে নেয়। শেষ চরণে কবির আকুল প্রশ্ন—”আমি কি জন্ম নেব বড়াই পুনরায় এই তিলোত্তমায়? / আমার কৃষ্ণ যদিও কোনও বহুরূপী নয়”—পৌরাণিক ভক্তির আধুনিক ও নাগরিক পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছে।
দ্বিতীয় কবিতা ঠোক্লান্ত মনস্তত্ত্ব ও অন্তর্যামী প্রেম যার মূল সুর দ্বৈরথ, আত্মিক মুক্তি এবং অপরাধবোধের জটিলতা। রোহিণী নক্ষত্রের রাতের পটভূমিতে রচিত এই কবিতায় কুরুক্ষেত্রের ধ্বংসলীলার মতো এক মানসিক যুদ্ধের চিত্র ফুটে উঠেছে। কৃষ্ণ বা ‘কাহ্ন’-এর কর্মকাণ্ডের মাঝে কবি যেন এক ভয়াবহতা ও ধোঁয়াশা খুঁজে পান। অপরাধ বা ভালোবাসা কোথায় লুকিয়ে আছে—বিশ্বরূপে নাকি বিশ্বাসে, রক্তে নাকি নিশ্বাসে—এই গভীর দার্শনিক প্রশ্নটি এখানে সামনে এসেছে। নিজেকে ‘প্রেমযোগিনী’ ও ‘দগ্ধহ্লাদিনী’ হিসেবে চিহ্নিত করে রাধার মতো কবিও পুনর্জন্মের চেয়ে অন্তর্যামী ঈশ্বরের সান্নিধ্যকে বড় করে দেখেছেন।
তৃতীয় কবিতা পথ হারানো ওই রাস্তা ও পার্থিব কামানোর দ্বন্দ্ব যার মূল সুর দ্বিধা, দ্বি-মুখী টান এবং কামনার জাগরণ। একদিকে মথুরা আর অন্যদিকে জোনাকির দেশের মাঝখানের ভুঁইরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা এক দিশাহারা সত্তার সন্ধান মেলে এই কবিতায়। হলুদ মাখা বা দেহ বৃন্দাবনে সঁপে দেওয়ার ভাবনার মাঝেও কদম তলার কৃষ্ণের রূপটি ভিন্ন। কপালে ময়ূরপালকধারী সেই সত্তা কেবল কোনো ছায়া নয়, বরং এক পার্থিব মানবী। কবির কথায়, “দেহে আমার কামের প্রজাপতি বসে আছে”—এই লাইনটি রাধার পৌরাণিক আকুলতাকে রক্তমাংসের মানুষের জৈবিক ও তীব্র কামনার সঙ্গে অত্যন্ত মুন্সিয়ানায় যুক্ত করেছে।
চতুর্থ কবিতা যন্ত্রণাদীর্ণ বর্ষা এবং রাধার একাকী অপেক্ষার অন্তিম রূপ, যার মূল সুর অপ্রাপ্তির বিষাদ, বর্ষার শূন্যতা এবং আত্মোপলব্ধি। গুচ্ছের শেষ কবিতাটি যেন এক বিয়োগান্তক সমাপ্তি। বর্ষা এলেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি নামে না, মেঘের গর্জন কোনো অপার্থিব বার্তা বয়ে আনে না। মহাকালের বিষণ্ণ ডাক এবং শরীরের অন্তিম গ্র্যাভিটি বা অভিকর্ষের টানে এক দিকভ্রান্ত চলাচল তৈরি হয়। শহরজুড়ে চলা যুদ্ধের মাঝে, আয়ানের ঘরে একা অন্ধকারে হাত পেতে থাকা ‘তোমার রাধিকা’ চরিত্রের মধ্য দিয়ে চরম একাকিত্ব ও আত্মসমর্পণের আবহ তৈরি হয়েছে। নিভে যাওয়া শহর এবং যমুনানগরের বেদনার্ত স্মৃতি এই কবিতাকে গভীর বিষাদময় করে তুলেছে।
দেবদাস রজকের এই চারটি কবিতা মূলত রাধার অনুভূতির আধুনিক সংস্করণ। বৈষ্ণব পদাবলীর ‘বড়াই’ চরিত্র, যমুনা, কদমগাছ এবং কৃষ্ণের নীল রূপ এখানে কলকাতা শহরের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। কবি খুব সফলভাবে পৌরাণিক মিথ বা রূপককে বর্তমান সময়ের হতাশা, নিঃসঙ্গতা, প্রেম ও কামনার দোলাচলের সঙ্গে মিলিয়ে এক নতুন কাব্যভাষা সৃষ্টি করেছেন।