অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১০-তিস্তা
ধারাবাহিক আখ্যান
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ১০-তিস্তা
তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।
সমবেদনা
অর্ণব বেডে শুয়ে আছে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক।
কেবিনে ঢুকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েই রইলাম। হাসপাতালের ঘরে ঢুকলে প্রথম কয়েক সেকেন্ড কী করা উচিত, আমি কখনও বুঝতে পারি না। তারপর পাশের চেয়ারটা টেনে বসলাম।
মনিটরে একটা সবুজ রেখা উঠছে নামছে। সংখ্যা বদলাচ্ছে। এই সংখ্যাগুলো অর্ণবের শরীরের ভেতরের কথা বলছে, কিন্তু আমি পড়তে পারছি না। একটা অদ্ভুত অসহায়ত্ব। সামনে মানুষটা আছে। অথচ তার সম্পর্কে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কথাটাই আমি জানি না। শুনলাম ডাক্তার বলেছে, সিরিয়াস। কতটা সিরিয়াস, সেটা বলেনি। ডাক্তাররা সেভাবে বলেও না। বলে, দেখছি। বলে, অপেক্ষা করুন। এই ভাষার একটা সুবিধে আছে। এর ভেতরে আশা রাখারও জায়গা থাকে, ভয় পাওয়ারও। কোনো কথাই শেষ কথা হয়ে ওঠে না।
অর্ণব চোখ বুজে আছে। ঘুমাচ্ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। আমি বসে রইলাম।
অর্ণবকে চিনি বারো বছর। কলেজ থেকে। একই হোস্টেলে ছিলাম দুবছর। তারপর যে যার জীবনে। ফোনে কথা হয়। দেখা হয় বছরে এক-দুবার।
বন্ধু। এই শব্দটার ভেতরে অনেক কিছু ধরা থাকে। কতটা ধরা থাকে, সেটা পরিস্থিতিই ঠিক করে।
হোস্টেলে একবার অর্ণব তিন রাত জেগে আমার থিসিস টাইপ করে দিয়েছিল। আমার হাত কাঁপছিল। জ্বর ছিল। সাবমিশন পরদিন। ও শুধু বলেছিল, “ঘুমা।” আমি ঘুমিয়েছিলাম।
অর্ণবকে কখনও কাউকে সান্ত্বনা দিতে দেখিনি। অথচ বিপদে পড়লেই ওর কথাই আগে মনে পড়ত। আজ বসে থাকতে থাকতে ভাবলাম, আমি কোনোদিন ওর জন্য তেমন কিছু করেছি কিনা। মনে পড়ল না। বরং একটার পর একটা মনে পড়তে লাগল, কখন কখন ও আমার পাশে ছিল।
বন্ধুত্বের হিসেব হয় না। কিন্তু যদি হত, অর্ণব অনেক এগিয়ে থাকত।
আজ সকালে ফোন এল অর্ণবের বউয়ের কাছ থেকে। বলল, “অর্জুনদা, একটু আসবে? অর্ণব হাসপাতালে।”
অর্জুনদা। এইভাবে ডাকলে আসতে না পারার উপায় নেই। এই সম্বোধনের একটা আলাদা দায় আছে। প্রশ্নটা করাই উচিত হয়নি। কিন্তু সে করেছে, কারণ সে জোর করতে জানে না। এলাম।
বেরোতে বেরোতে মনে করার চেষ্টা করছিলাম, শেষ কবে অর্ণবের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ঠিক মনে পড়ল না। শুধু এটুকু মনে পড়ল, দেখা হওয়ার সময় কখনও মনে হয়নি, পরেরবার দেখা হবে হাসপাতালে।
এই কেবিনে অর্ণবের বউ আছে। শাশুড়ি আছে। আরও দুই-একজন আছে, চেনা নয়। সবাই চুপ করে বসে। মাঝে মাঝে কেউ উঠে বাইরে যায়। কেউ আসে। হাসপাতালের একটা নিজস্ব সময় আছে। সেখানে বাইরের পৃথিবী খুব একটা ঢোকে না।
আমি অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বসে আছি। কিছু একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। ঠিক কী, বুঝতে পারছিলাম না। একটু পরে বুঝলাম, আমার পেট খালি। দুপুরে খাওয়া হয়নি। ফোন পেয়েই বেরিয়ে পড়েছিলাম। এই মুহূর্তে এটা ভাবা উচিত কিনা জানি না। ভাবলাম।
পাশের বেডে একজন বৃদ্ধ আছেন। এই মুহূর্তে তাঁর কাছে কেউ নেই। নার্স এসে কিছু একটা করে চলে গেল। বৃদ্ধ চেয়ে রইলেন সিলিংয়ের দিকে। আমি ভাবলাম, এই অবস্থায় একা থাকাটা কেমন লাগে। তারপর মনে হল, অর্ণব কি জানে আমি আছি। জানলে কী ভাবছে। একসময় মাথায় এল, গত পাঁচ বছরে অর্ণবের সাথে ঠিকমতো কথাও বলিনি। দেখা হয়েছে বছরে এক-দুবার। কিছু মেসেজ। ব্যস। ব্যস্ততার কথা বলতাম। ব্যস্ততা ছিল, মিথ্যে নয়। কিন্তু সময় বার করতে চাইলেই কি পারতাম না।
এই কথাটা আগে কোনোদিন মাথায় আসেনি। আজ বারবার আসছে। হাসপাতালের চেয়ারে বসে ব্যস্ততার অজুহাতগুলো সম্ভবত আর তেমন জোর পায় না।
অর্ণবের বউ এক কাপ চা দিল। বলল, খাও। চা খেলাম। তারপর বলল, আসার জন্য ধন্যবাদ। কী বলব বুঝলাম না। ধন্যবাদের উত্তরে যা বলা যায় এইসময়, সেটাই বললাম। সে চলে গেল।
আমি ভাবলাম, ধন্যবাদ কেন বলল। আসাটাই স্বাভাবিক। না আসাটা অস্বাভাবিক হত। তারপর ভাবলাম, হয়তো অনেকে আসেনি। তারপর ভাবলাম, অনেকে কারা। তারপর, ভাবা বন্ধ করলাম।
এমন সময় নার্স একটা প্রেসক্রিপশন আমার হাতে দিয়ে বলল, ওষুধগুলো এনে দিতে। নিচের ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে ফিরতেই বলল, কাউন্টার থেকে রক্তের রিপোর্টটাও নিয়ে আসতে হবে। আবার নিচে গেলাম। রিপোর্ট নিয়ে ফিরে দেখি, অর্ণবের বউ ওর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। রিপোর্টটা নার্সের হাতে দিয়ে চুপচাপ নিজের জায়গায় এসে বসলাম।
বিকেলে অর্ণব একবার চোখ খুলল। প্রথমে চোখ দুটো এদিক-ওদিক ঘুরল। তারপর আমার দিকে স্থির হল। আমি নড়লাম না। হাসব কিনা বুঝলাম না। অর্ণবের ঠোঁট নড়ল। মাস্কের জন্য স্পষ্ট শোনা গেল না। হয়তো নাম ধরে ডাকল। হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিল। বুঝলাম না।
আমি বললাম, আছি। সে চোখ বুজল। দুটো অক্ষর। এই মুহূর্তে কী বলা উচিত ছিল জানি না। সব ঠিক হয়ে যাবে, এটা বলা যেত। কিন্তু সত্যি কিনা জানি না। আর মিথ্যে সান্ত্বনা দেওয়ার অভ্যেস নেই। তাছাড়া অর্ণব সবসময় বুঝে ফেলত, কখন আমি জোর করে বলছি। আছি বললাম। এটুকু সত্যি। ঘরে আবার শুধু মনিটরের শব্দ। আমার চোখ একটু ভিজল কিনা জানি না। মুছলাম না।
সন্ধেবেলা বাইরে গেলাম একটু। হাসপাতালের নিচে একটা চায়ের দোকান। বসলাম। একটা ডিমটোস্ট আর চা খেলাম। পেট একটু ঠান্ডা হল। ফোন এসেছে কয়েকটা। বন্ধুরা জানতে চাইছে অর্ণব কেমন আছে। উত্তর দিলাম। ডাক্তার দেখছে। একজন বলল, যেতে পারলাম না, তুই গেছিস ভালো হল। আমি কিছু বললাম না। ফোনটা কেটে দিলাম।
এই কথাটার মানে কী, ভাবলাম। ‘যেতে পারলাম না’ আর ‘যাইনি’—দুটো কথা এক নয়। তবু অনেক সময় একটার বদলে আরেকটা বলি। দ্বিতীয় কথাটা শুনতে একটু শক্ত। প্রথম কথাটা বেশি ভদ্র শোনায়।
তবে হাসপাতালে আসা অস্বস্তির। এটা সত্যি। অসুস্থ মানুষ দেখলে নিজের অসুস্থতার কথা মনে পড়ে। মৃত্যুর কথা মনে পড়ে। মানুষ সেটা এড়াতে চায়। আমিও কি চেয়েছিলাম? সকালে ফোন পেয়ে কি এক মুহূর্তও ইচ্ছে হয়েছিল এড়িয়ে যাওয়ার কথা? হয়েছিল। এক সেকেন্ডের জন্য। তারপর উঠে পড়েছিলাম। এই এক সেকেন্ড আর না-আসার মধ্যে পার্থক্যটা ঠিক কোথায়, বুঝলাম না। হয়তো শুধু এটুকু—পরে যেন অনুশোচনা করতে না হয়।
রাতে অর্ণবের বউ বলল, “তুমি এখন যাও অর্জুনদা। পারলে কাল এসো।”
বললাম, “ঠিক আছে।”
সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল।
আমি বললাম, “রাতে খেয়েছ?”
বলল, “পরে খাব।”
পরে মানে কখন, জিজ্ঞেস করলাম না। জানি, পরে মানে হয়তো খাবে না। হয়তো খাবে। এই মুহূর্তে ওর খাওয়ার কথা ভাবার অবস্থাই নেই। আমার ছিল। সেটা ভেবে একটু অস্বস্তি হল।
সে ঘুরে বলল, “অর্ণব তোমার কথা খুব বলত। বলত, কতদিন ওর সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া হয়নি।”
কথাটা শুনে কী বলব বুঝলাম না। চুপ করে রইলাম। সেও আর কিছু বলল না।
আমি উঠে পড়লাম। অর্ণবের দিকে একবার তাকালাম। চোখ বুজে আছে। বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় বেরিয়ে বুঝলাম, ক্লান্ত লাগছে খুব। সারাদিন প্রায় চেয়ারেই বসেছিলাম। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ছোটাছুটি। বাকিটা শুধু ছিলাম। শুধু থাকাটাও ক্লান্তিকর।
ট্যাক্সিতে উঠলাম। জানালা দিয়ে রাস্তা দেখলাম। রাস্তা নিজের নিয়মেই ব্যস্ত। মানুষ হাঁটছে। দোকানপাট খোলা। কোথাও উত্তেজিত গলা, কোথাও হালকা হাসির শব্দ। হাসপাতালের বাইরে পৃথিবী এভাবেই চলে। ভেতরে সময় থমকে থাকে। বাইরে শুধু ছুটে চলা। কাল আবার যাব। এটুকু জানি। গেলে অর্ণব জানবে, আমি আছি। শুধু থাকাটাও এ সময় অনেকটা মানসিক জোর দেয়।
ট্যাক্সি এগিয়ে চলেছে।
অর্ণব সুস্থ হবে কিনা জানি না। ডাক্তারই জানে না, আমি জানব কোথা থেকে।
তারপর ভাবলাম, বাড়ি ফিরে কী খাব।
দুটো ভাবনা পাশাপাশি ছিল। একটা অন্যটাকে সরিয়ে দিল না।
দুটোই সত্যি ছিল।