Email: info@kokshopoth.com
July 15, 2026
Kokshopoth

অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ৮- তিস্তা

Jul 10, 2026

ধারাবাহিক আখ্যান
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব # ৮- তিস্তা

তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।

‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।

কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখছেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।

আচার

রবিবার দুপুরগুলো পাড়াটা কেমন অন্যরকম লাগে।  

সপ্তাহের অন্যদিন সকাল থেকেই সবাই কোথাও না কোথাও ছোটে— অফিস, স্কুল, কলেজ, টিউশন। রবিবারে সেই তাড়া থাকে না। মানুষের হাঁটার ভঙ্গিও যেন বদলে যায়। কেউ আর ঘড়ি দেখে হাঁটে না। বারান্দাগুলো একটু বেশি সময় ধরে খোলা থাকে। জানলার গরাদে কনুই রেখে আনমনে সিগারেট খায় কেউ। সপ্তাহজুড়ে যে শব্দগুলো একে অন্যের গায়ে লেগে থাকে, রবিবারে সেগুলো আলাদা করে শোনা যায়।

             এই যেমন পাশের বাড়ির বারান্দা থেকে পুরোনো বাংলা গান ভেসে আসছে। গানের কথাগুলোও আলাদা করে ধরা পড়ছে। আরেকটা বাড়িতে টিভিতে খবর চলছে।

গলির ভেতর দিয়ে একটা সাইকেল চলে গেল। ঘণ্টিটার শব্দ অনেক দূর গিয়ে থেমে গেল, অথচ চারপাশ যেন আরও কিছুক্ষণ সেই শব্দটাকে ধরে রাখল! তখনই মনে হয়, নীরবতারও বুঝি নিজস্ব স্তর আছে। অন্যদিন যেগুলো চোখ এড়িয়ে যায়, রবিবারের দুপুরে সেগুলোই ধরা দেয়। রোদেরও যেন আজ কোথাও পৌঁছনোর তাড়া নেই। বাড়ির কার্নিশ, বারান্দা, জানলার গ্রিল ছুঁয়ে সে ধীরে ধীরে পাড়ার ওপর নেমে আসে।

         জানলার কাছে এসে দাঁড়ালাম। সামনের ফাঁকা জায়গায় পাড়ার কয়েকটা ছেলে ক্রিকেট খেলছে। প্লাস্টিকের স্টাম্প, টেনিস বল। ব্যাটে বল লাগলেই একসঙ্গে চিৎকার। আউট নিয়ে তর্ক। যে আউট হয়েছে, সে কিছুতেই মানতে চাইছে না। একদিন আমরাও খেলতাম এই রাস্তায়। তখন ছুটির দুপুর মানেই ক্রিকেট ম্যাচ। কার বাড়ির জানলার কাচ ভাঙল, কে নর্দমায় বল ফেলল, কার মা বারান্দা থেকে চিৎকার করে বাড়ি ডাকছেন— এসব নিয়েই পৃথিবী ভরে থাকত। এখন সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে শুধু অন্যদের খেলা দেখা হয়। সময় কবে যে খেলোয়াড় থেকে দর্শক বানিয়ে দেয়, সেটা আলাদা করে টেরও পাওয়া যায় না।

রবিবার দুপুরে বই পড়ারও একটা আলাদা আমেজ আছে। কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। ফোনও খুব একটা বাজে না। দু-চার পাতা পড়ে আবার জানলার বাইরে তাকানো যায়। খাওয়া-দাওয়া সেরে বই নিয়ে বসেছিলাম। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠল। 

দরজা খুলে দেখি সেনকাকিমা। হাতে একটা কাচের বয়াম। ভেতরে কাঁচা আমের আচার। বয়ামটার মুখে পুরোনো কাপড় বেঁধে তার ওপর রাবার ব্যান্ড লাগানো। আমাকে দেখেই বললেন,

“নে, এটা রাখ।”

আমি অবাক হয়ে বললাম,

“এটা কী!” 

“আচার।”

বয়ামটা আমার হাতে দিয়ে যেন চলে যাবেন, এমন সময় বললাম,

“ভেতরে আসুন না।”

সেনকাকিমা একটু ইতস্তত করলেন। তারপর বললেন,

“না রে, পরে আসব।”

আমি জোর করতেই ভেতরে এলেন।

ড্রয়িংরুমে এসে সোফার এক কোণায় বসলেন সেনকাকিমা। বসেই চারদিকে তাকালেন। এই বাড়িতে তিনি বহুবার এসেছেন। মা বেঁচে থাকতে তো প্রায়ই। কখনও বিকেলে গল্প করতে, কখনও কোনো দরকারে, কখনও আবার কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই। আজ তাঁর চোখ দুটো ঘরের এদিক-ওদিক একটু বেশি সময় ঘুরে বেড়াল। মনে হল, যেন কিছু একটা মিলিয়ে নিতে চাইছেন। অথচ মিলছে না। চেনা জায়গাও কখনও কখনও অচেনা হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগে না। আমি রান্নাঘরে গিয়ে একটা লেবুর সরবত করে আনলাম।

          “আরে, এটা আবার করতে গেলি কেন!”

গ্লাসটা হাতে নিয়ে একটু হেসে বললেন, 

“কবে যে এত বড় হয়ে গেলি, টেরই পেলাম না।”

চুলে পাক ধরেছে আমার, বয়সও নেহাত কম হল না। তবু সেনকাকিমার কাছে আমি এখনও বড় হইনি। মাতৃস্থানীয় মানুষদের এ-এক আশ্চর্য স্নেহান্ধতা। মনে মনে হাসলাম। বয়ামটার দিকে তাকিয়ে বললাম,

“হঠাৎ আচার?”

সেনকাকিমা খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,

“কাঁচা আম উঠেছে তো। ভাবলাম, তোকে দিয়ে যাই।”

আমি বললাম,

“কিন্তু…”

তিনি আমার কথা শেষ করতে দিলেন না। হেসে বললেন,

“তোর বাবার জন্য প্রতি বছর এই সময় একটা বয়াম বরাদ্দ থাকত।”

আমি চুপ করে গেলাম। তিনিও একটু থামলেন। আঙুল দিয়ে বয়ামটার গায়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে নিলেন। তারপর বললেন,

“বলত, বাজারের আচার খেতে ভালো লাগে না।”

আমি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম। বাবা আচার খুব পছন্দ করত, সেটা জানতাম। কিন্তু এই কথাটা জানতাম না। সেনকাকিমা যেন একটু দূরে কোথাও তাকিয়ে বললেন,

“আমি বানিয়ে রোদে দিতাম। তোর বাবা বারান্দা থেকে দেখে বলত, ‘হয়ে গেলে একটা বয়াম যেন এ বাড়িতেও আসে।’”

কথাটা বলতে বলতে একটু হেসে ফেললেন। সেই হাসিটা খুব ছোট। খুব পুরোনো। 

আমি যেন প্রথমবার বাবাকে এইভাবে দেখলাম। যেন আমার বাবা নয়, পাশের বাড়ির একজন  মানুষ—যিনি প্রতিবেশীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আচার নিয়ে কথা বলতেন, বাজারের আচার নিয়ে নিন্দেমন্দ করতেন! আমি কোনোদিন এমন মুহূর্তের সাক্ষী হইনি। হয়তো তখন কলেজ কিংবা অফিসে থাকতাম। অথবা হয়তো খেয়ালই করিনি। আসলে, মানুষ নিজের বাবা-মাকে খুব নির্দিষ্ট কয়েকটা ভূমিকাতেই দেখে; তার বাইরের মানুষটা চোখ এড়িয়ে যায়। সেনকাকিমা বললেন,

“আবার বলত, ‘সরষের তেলটা একটু বেশি দিয়ো।’”

আমি হেসে ফেললাম।

“বাবা তো রান্নায় বেশি তেল দেখলেই বকুনি দিত।”

সেনকাকিমাও হেসে ফেললেন,

“জানি তো। বলত, ‘আচারে ওই তেলটাই তো আসল।’”

কথাটা শুনে মনে হল, একজন মানুষকে আমরা আসলে কতটুকুই বা চিনে উঠতে পারি! বাবা আমার কাছে শুধু বাবা ছিলেন। তার বাইরের মানুষটাকে আলাদা করে দেখার প্রয়োজনই কোনোদিন হয়নি। অথচ সেনকাকিমার স্মৃতিতে তিনি সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ—যিনি এক বয়াম আচারের জন্য অপেক্ষা করে থাকতেন বছরভর! সেই মানুষটার সঙ্গে আজই যেন আমার প্রথম দেখা হল।

কিছুক্ষণ পরে সেনকাকিমা উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,

“বয়ামটা রোদে দিস না। যেমন আছে, তেমনই থাকবে।”

আমি তাঁকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেলাম। বেরিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ ফিরে বললেন,

“এবার আচার বানিয়ে রোদে দিতে গিয়েই তোর বাবার কথা মনে পড়ল। প্রতি বছর এই সময়…”

বাকিটা আর বললেন না। বলার দরকারও ছিল না।

দরজা বন্ধ করে বয়ামটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। কাচের ভেতর সরষের তেলে ডুবে আছে কাঁচা আমের টুকরো, মেথি, মৌরি, শুকনো লঙ্কা। দুপুরের আলো পড়ে তেলটা সোনালি হয়ে উঠেছে। বাইরে থেকে দেখলে একটা সাধারণ আচার। অথচ এ নিছক আচার নয়। এর ভেতরে জারিত রয়েছে দীর্ঘদিনের অভ্যাস, দুটো বাড়ির নীরব যাতায়াত, আর কয়েকটা বারান্দা-জোড়া কথাবার্তা। যার কিছুই আমার জানা ছিল না।

বাবার অজস্র পরিচয়ের মধ্যে একটা পরিচয় ছিল— তিনি সেনকাকিমার আচার খেতেন। এত ছোট একটা তথ্য। তবু এতদিন জানতাম না।

আমরা যাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ বলে মনে করি, তাদেরও একটা জীবন থাকে। যেখানে আমাদের প্রবেশাধিকার থাকে না। তারা চলে যাওয়ার পর সেই জীবনের খবর আমরা পাই—একটা বইয়ের পাতায়। পুরোনো ছবিতে। অথবা এক বয়াম আচারে…

1 Comment

  • তিস্তার গদ্য, কবিতার মতোই পড়ার পরে রেশ রেখে যায়। খুব ভালো

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *