অর্জুনের ডায়েরি পর্ব #৩ – তিস্তা
ধারাবাহিক
অর্জুনের ডায়েরি পর্ব #৩ - তিস্তা
তাঁর নিজের কথায়, ‘বিশেষ কোন পরিচয় নেই। এ পর্যন্ত দশটি কবিতাগ্ৰন্থ ।
‘এ’টুকুই’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এ’টুকুই শব্দের অর্থ এখানে এ’টুকু নয়। ওঁর কবিতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।
কক্ষপথে তিস্তা এবার গদ্য লিখবেন। ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহেই। ‘অর্জুনের ডায়েরি’। এবারে পর্ব # তিন। পাঠক হতাশ হবেন না। এ’টুকু বিশ্বাস আমাদের আছে।
দরজা
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগে একটা আলো থাকে। দিনের সবচেয়ে অনিশ্চিত আলো সম্ভবত। যেন পৃথিবী ঠিক এই সময়টুকুতে সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়ে— আর একটু দৃশ্যমান থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে নিজেকে অন্ধকারের হাতে তুলে দেবে। বাড়িটাও এই সময়ে সবচাইতে ফাঁকা লাগে। আলমারির কাঁচে নিজের মুখটাও তখন পুরো নিজের বলে মনে হয় না।
মৃত্যুর পর প্রথম কয়েকদিন বাড়ির ভেতরে একটা অদ্ভুত ভুল বোঝাবুঝি চলতে থাকে। দরজায় শব্দ হলেই মনে হয়, এই বুঝি বাবা ফিরে এল। বাথরুমে জল পড়ার শব্দ শুনলে মনে হয়, বাবা উঠেছে। এমনকি এর মধ্যে একদিন দুপুরে ঘুম ভেঙে কিছুক্ষণের জন্য সত্যি সত্যি ভুলে গিয়েছিলাম, বাবা নেই। তারপর মনে পড়েছিল। শোক সম্ভবত একবারে প্রকাশ পায় না। একটু একটু করে সে তার পাপড়ি মেলে। ব্যাপারটা গ্রহণ করতে শরীর কিছুটা সময় নেয়।
আমি রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলাম। চা করব ভেবেছিলাম। এই ক’দিনে চা খাওয়া বেড়ে গেছে। ঠিক তখনই শব্দ হল দরজায়। প্রথমে মনে হল ভুল শুনছি। কারণ বেল বাজেনি। আবার শব্দ হল। কড়া নাড়ার শব্দ। খুব জোরে নয়। কিন্তু অদ্ভুত রকমের অস্থির! একবার থামছে। আবার নাড়ছে। ছন্দ নেই। ধৈর্যও নেই। বার্তাও কি আছে কোনো?
আমি চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। কড়া নাড়ার অভ্যাসটা পুরনো মানুষদের। যারা এখনো দরজাকে দরজার মতো ব্যবহার করে, যন্ত্রের মতো নয়। কিন্তু কে? এসময় কে এল! আবার শব্দ হল। এবার একটু দ্রুত। আমি এগিয়ে গেলাম। খুললাম।
পিসি।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে। হাতে পুরনো কাপড়ের একটা ব্যাগ। চুল এলোমেলো। শাড়িটাও ঠিকঠাক পরা নয়। এক পায়ের চপ্পল আরেক পায়ে। যেন খুব তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়েছে।
একাই এসেছে! আমি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলাম।
পিসিও দাঁড়িয়ে। যেন ঠিক বুঝতে পারছে না, কেন এসেছে।
পিসি এখন একা বেরোয় না। বছর দুয়েক ধরে পিসির স্মৃতি আসে-যায়। কখনো সব চিনতে পারে। মনে করতে পারে। কখনো পারে না। কখনো আমাকে দেখে ঠিক নাম ধরে ডাকে। কখনো অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে, যেন কোথায় দেখেছে মনে করার চেষ্টা করছে।
রাধা থাকে পিসির সঙ্গে। দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়া। মূলত পিসিকে দেখাশোনা করাই তার কাজ। বাজারে যাওয়া থেকে ওষুধ খাওয়ানো, সব। রাধা পিসিকে একা ছাড়ে না। পিসির বাড়ি এখান থেকে দুটো বাসস্টপ। রাস্তা খুব জটিল নয়। হেঁটেও আসা যায়। তবু এই বয়সে, এই অবস্থায়, একা আসাটা বিপজ্জনক।
হঠাৎ মনে হল, পিসি যদি রাস্তা ভুলে করত? যদি অন্য কোথাও চলে যেত? যদি শেষপর্যন্ত চিনতে না পারত?
বললাম, “পিসি…।”
পিসি আমার কথা শেষ হতে দিল না। তার আগেই বলল,
“কানাই আছে?”
কানাই বাবার নাম। পিসিকে খবরটা জানানো হয়নি। পিসির অসুস্থতার জন্যই জানানো হয়নি।
অথচ এই মুহূর্তে পিসি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বাবাকে খুঁজছে। যেন পৃথিবীতে কিছুই বদলায়নি। এত অসহায় লাগছিল নিজেকে!
বললাম, “একটু বেরিয়েছে। এসো ভেতরে।”
কথাটা বলতেই একটা অস্বস্তি শুরু হল ভেতরে। কারণ মিথ্যে বলার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। গত বারো দিনে অনেক কথা বলেছি। আত্মীয়দের সঙ্গে। পাড়ার লোকেদের সঙ্গে। হাসপাতালের কাগজপত্র, মৃত্যুসনদ… ইত্যাদি অনেক কিছু নিয়ে। কে কখন আসবে, কী লাগবে, কোন ব্রাহ্মণকে খবর দেওয়া হয়েছে… এইসব। এই প্রথম বাবাকে নিয়ে সরাসরি একটা মিথ্যে বললাম।
বাক্যটা এত স্বাভাবিকভাবে মুখ থেকে বেরিয়ে এল যে, নিজেই অবাক হলাম! যেন বাবা সত্যিই কোথাও গেছে। বাজারে। ওষুধ আনতে। অথবা সন্ধ্যায় হাঁটতে। একটু পরেই ফিরে আসবে।
পিসি ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। আমি দরজা বন্ধ করলাম। দরজা বন্ধ করার সময় হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল! মনে হল, আমি যেন এইমাত্র বাড়ির ভেতরে একটা মিথ্যে ঢুকিয়ে নিলাম। দরজাটা বন্ধ হতেই সেটাও এ বাড়ির বাতাসের অংশ হয়ে গেল। এখন সেটা ঘুরে বেড়াবে এই ঘরের মধ্যে।
আশ্চর্যের ব্যাপার কথাটাকে পুরোপুরি মিথ্যে লাগছিল না আর তখন।
আসলে এই বাড়ির এত কিছু এখনো বাবার ফেরার অপেক্ষায় আছে যে, মাঝে মাঝে আমারও ভুল হয়ে যাচ্ছে— এই অপেক্ষা আর কোনোদিন শেষ হবে না, এ অনন্ত।
পিসি চারদিক দেখছিল। চেনা বাড়ি। তবু যেন পুরো চিনতে পারছে না। এই বাড়িতে পিসি বহুবার এসেছে। ভাইফোঁটায়। পুজোয়। মা বেঁচে থাকতে মাঝেমধ্যে দুপুরবেলা হঠাৎ চলে আসত। দুজনে ঘর বসে গল্প করত। বাবা বাইরে থেকে বিরক্ত গলায় বলত, “চা-ঠা বানাবে না কি!” তারপর নিজেও এসে বসত।
পিসিকে সোফায় বসিয়ে রাধাকে ফোন করলাম। রাধা সঙ্গে সঙ্গেই ফোন ধরল। তার গলা কাঁপছে।
বলল, “দাদা, আমি দোকান থেকে ফিরে দেখি মাসি নেই। সারা পাড়া খুঁজেছি। পাশের ব্লকেও গেছি। ভাবছিলাম থানায় যাব এবার…।”
পেছনে লোকজনের গলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। সম্ভবত পাড়ার লোক খুঁজতে বেরিয়েছে। আমি বললাম, “আমাদের এখানে এসেছে। ভালো আছে। চিন্তা করিস না। আমি পৌঁছে দেব।”
রাধা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর এমনভাবে একটা নিঃশ্বাস ফেলল, যেন অনেকক্ষণ দম আটকে ছিল। বলল, “কী করে যে বেরিয়ে গেল বুঝতেই পারিনি।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে। আমি আছি।”
ফোনটা কেটে গেল। আমি কিছুক্ষণ মোবাইলটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। পিসি তখন ঘরের মধ্যে বসে। যে মানুষটার জন্য এতদূর একা চলে এসেছে, সে আর নেই— এটা না জেনেই।
পিসি আমার দিকে তাকাল। বলল, “কাকে ফোন করলি?”
“রাধাকে। তুমি না বলে বেরিয়েছ, ও চিন্তা করছিল।”
পিসি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনে হল, কথাটা বোঝার চেষ্টা করছে। অথবা কিছু একটা মনে করার। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “আমি কি না বলে বেরিয়েছি?”
বললাম, “হ্যাঁ।”
পিসির মুখে একটা হালকা বিস্ময় ফুটে উঠল! খুব ক্ষণিকের। যেন নিজের কাছেই একটু লজ্জা পেল। আর কিছু বলল না। জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “কানাইয়ের কথা মনে পড়ছিল সকাল থেকে। তাই এলাম।”
এই কথা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। সকাল থেকে মনে পড়ছিল। তারপর একসময় বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করেনি সম্ভবত। রাধা বাজারে গেছে। আর পিসি সেই ফাঁকে বেরিয়ে পড়েছে। একা।
দুটো বাসস্টপ পেরিয়ে এখানে চলে এসেছে। হয়তো পথটা ভেবে আসেনি। হয়তো এমনিই বেরিয়েছিল। তারপর রাস্তা নিজেই তাকে টেনে নিয়ে এসেছে এই বাড়ির সামনে।
মানুষের ভেতরে কিছু কিছু পথ এত পুরনো হয়ে যায়, সেগুলো আর আলাদা করে মনে রাখতে হয় না। যেমন অন্ধকার ঘরেও হাত বাড়িয়ে আমরা নিজের বাড়ির সুইচ খুঁজে পাই।
পিসি জানালার দিকে তাকিয়ে বসেছিল। আমি পিসির দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম— মানুষ শেষ পর্যন্ত আসলে কোথায় ফিরে যেতে চায়?
একসময় বললাম, “পিসি, চা খাবে তো?”
পিসি আমার দিকে তাকাল। যেন প্রশ্নটা পুরোটা বুঝতে একটু সময় লাগল। তারপর মাথা নাড়ল আস্তে। আমি বললাম, “দাঁড়াও, চাটা বসিয়ে আসি।”
রান্নাঘরে ঢুকে আলোটা জ্বালালাম। আলো জ্বলে উঠতেই কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলাম ওদিকেই।
এই ক’দিনে লক্ষ্য করেছি, মানুষ শোকের সময় খুব ছোট ছোট কাজের মধ্যে আশ্রয় খোঁজে। জল বসানো। কাপ ধোওয়া। চামচ খোঁজা। যে কাজগুলো ভাবনা ছাড়াই করা যায়।
গ্যাস জ্বালিয়ে জল বসালাম। বাইরে ঘর থেকে পিসির কাশির শব্দ এল একবার। তারপর আবার চুপ।
হঠাৎ মনে হল, এই বাড়িতে এই মুহূর্তে যে দুজন জীবিত অস্তিত্ব রয়েছে, তারা দুজনেই কাউকে খুঁজছে।
পিসি খুঁজছে কানাইকে। আর আমি সম্ভবত সেই মানুষটাকে খুঁজছি, যে এইমাত্র পিসিকে মিথ্যে কথা বলল।
চা নিয়ে ঘরে ফিরে এলাম। পিসি তখনও জানালার দিকে তাকিয়ে বসে। সন্ধ্যা আরও ঘন হয়েছে।
আমি কাপটা এগিয়ে দিলাম। পিসি চায়ে চুমুক দিল। তারপর হঠাৎ বলল, “কানাই ছোটবেলা থেকেই খুব রসিক ছিল, জানিস? বিশেষ করে কারও মনখারাপ দেখলেই তাকে হাসানোর চেষ্টা করত। এমনকি তাকে হাসিয়েই ছাড়ত।”
আমি হাসলাম। বললাম, “তাই নাকি? কী করতো?”
পিসিও সামান্য হাসল। বহুদিনের পুরনো একটা দরজা যেন অল্প খুলে গেল মুখের ওপর। বলল, “আমার তখন নতুন বিয়ে হয়েছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রথমবার বাপের বাড়ি এসেছি। খুব মনখারাপ করছিল। সারাদিন কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বলিনি। রাতে দেখি কানাই কোথা থেকে একটা ভাঙা হারমোনিয়াম জোগাড় করে এনেছে। বাজাতেও পারে না ঠিকমতো। তবু বসে বসে গান গাওয়ার চেষ্টা করছে।”
পিসি একটু থামল। চায়ের কাপটা দুহাতে ধরে রইল।
“গলাও ছিল ভয়ানক খারাপ। আমি রাগ করে বললাম, থাম তো। মাথা ধরেছে। তখন বলল, তুই মন খারাপ করে আছিস কেন তাহলে?”
পিসির মুখে সামান্য মৃদু হাসি। অনেক পুরনো, খুব ক্লান্ত একটা হাসি।
“নিজের মতো করে মানুষকে ভালো রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু সেটা মুখে বলতে পারত না কোনোদিন।”
বাবার এই ছবিটা আমার জানা ছিল না। বাবাকে আমি যেভাবে দেখেছি— কম কথা বলা, একটু দূরের মানুষ। সেই বাবা এমন মজা করত, হাসাতে পারতো! এমন মুহূর্ত দেখিনি কোনোদিন। পিসি দেখেছে। একটা মানুষের সবটা সবাই দেখতে পায় না। দেখা যায় না।
হঠাৎ ভাইফোঁটার দিনগুলোর কথা মনে পড়ল। বাবারা তিন ভাই, বোন নেই কোনো। এই পিসি বাবার জ্যেঠতুতো দিদি। প্রতি বছর ভাইফোঁটার দিন পিসি চলে আসত সকাল সকাল। অনেক সকাল। তখন বাড়িতে পুরো রোদও পড়েনি হয়তো। দরজায় বেল বাজত। খুললেই দেখা যেত, পিসি দাঁড়িয়ে আছে। চোখমুখে একধরনের ব্যস্ত আনন্দ! যেন এই দিনটার জন্য আলাদা করে তৈরি হয়ে এসেছে। হাতে উপহার, মিষ্টির প্যাকেট।
বাবাও ওই একদিনই যেন অন্য মানুষ হয়ে যেত। সকাল থেকে স্নান সেরে তৈরি। ধোপদুরস্ত পাঞ্জাবি। চুল আঁচড়ানো। এমনকি গলাটাও নরম থাকত সেদিন। ছোটবেলায় আমার অবাক লাগত! একজন মানুষ কি শুধু আরেকজন নির্দিষ্ট মানুষের সামনে গিয়েই বদলে যেতে পারে?
পিসি বসত ড্রয়িংরুমে। সামনে থালা। সেই থালায় প্রদীপ, ধানদুব্বো, সন্দেশ। ধূপও জ্বলত একটা। সেই ধূপের গন্ধে রোজকার আটপৌরে ঘরটাই একদম অন্যরকম হয়ে যেত।
তারপর কপালে ফোঁটা দিতে দিতে বলত,
“ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।”
এই লাইনটা ছোটবেলায় খুব সাধারণ মনে হত। সব বাড়িতেই বলা হয় বোধহয়। আজ হঠাৎ মনে হচ্ছে, মানুষ আসলে মৃত্যুর কাছে অসহায় বলেই এইসব বাক্য বানায়। যেন কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করেই প্রিয় মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে।
ফোঁটা নেওয়ার সময় বাবাকে খুব শান্ত, সৌম্য লাগতো। মাথাটা সামান্য নিচু। মুখে এমন একটা অভিব্যক্তি, যেটা আমি অন্য কোনোদিন দেখিনা। যেন ওই কয়েক মিনিটের জন্য বাবা আবার ছোট হয়ে যেত। আবার কারও ছোট ভাই হয়ে যেত।
মাও সেদিন বেশ খুশি খুশি থাকত। আসলে পিসির সাথে মায়ের একটা আলাদা বন্ডিং ছিল। ননদ বৌদি থকেও ওঁরা বন্ধু ছিলো বেশি। পিসি এলেই দুজনে রান্নাঘরে ঢুকে যেত। তারপর শুরু হত রান্না, গল্প, হাসাহাসি। বাড়িটার ভেতরের শব্দই বদলে যেত সেদিন। কথাবার্তা, বাসনের আওয়াজ, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা হাসি— সব মিলিয়ে মনে হত, এই একই বাড়ির ভেতর আরও একটা বাড়ি খুলে গেছে কোথাও।
আজ ভাবছি, ওই হাসির মুহূর্তগুলোই হয়তো সম্পর্কগুলোকে এত বছর ধরে বাঁচিয়ে রাখে। বড় বড় কিছু নয়। এই ছোট ছোট উৎসব।
অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর পিসি হঠাৎ বলল, “আমি আজ উঠি। কানাই এলে বলিস, ভাইফোঁটার আগে যেন একটা ফোন করে।”
কথাটা এমন স্বাভাবিক গলায় বলল, যেন সামনে এখনও অনেক সময় পড়ে আছে। আরেকটা ভাইফোঁটা আসবে। তার আগে ফোন হবে। তারপর আবার তার এই বাড়িতে আসা।
আমি বললাম, “বলব।”
শব্দটা খুব সহজেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল।
সম্ভবত মানুষ একবার মিথ্যে বলতে শুরু করলে পরেরগুলো একটু সহজ হয়ে যায়। অথবা হয়তো কিছু কিছু মিথ্যে আসলে কাউকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বলা হয়। কিন্তু কাকে— যে শুনছে, না যে বলছে— সেটা অবশ্য স্পষ্ট নয়।
পিসি ধীরে ধীরে উঠল।
আমি বললাম, “পিসি, আমি পৌঁছে দেব।”
পিসি বলল, “একা যেতে পারব।”
বললাম, “জানি। তবু আমি যাবো।”
পিসি আর আপত্তি করল না।
জুতো পরতে গিয়ে দেখলাম চটিটা উল্টো পায়ে পরে ফেলেছে। আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। খুব আস্তে চটিটা খুলে ঠিক করে পরিয়ে দিলাম। এই ছোট ছোট কাজগুলো মানুষ কবে থেকে উল্টো দিকে করতে শুরু করে?
একসময় যারা হাত ধরে রাস্তা পার করাত, তাদেরই একদিন হাত ধরে নামাতে হয় সিঁড়ি দিয়ে।
পিসি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর খুব আস্তে মাথায় হাত রাখল। কিছু বলল না।
আমিও না।
বাইরে বেরিয়ে এলাম দুজনে। আমি পিসির হাত ধরেছিলাম। হাতটা খুব হালকা লাগছিল। বয়স বাড়লে মানুষের হাতের ওজনও কমে যায় সম্ভবত। শুধু শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটু হাঁটার পর পিসি বলল, “কানাই ছোটবেলায় এইভাবে হাত ধরে হাঁটত।”
আমি কিছু বললাম না।
পিসি আবার বলল, “তুইও ঠিক ওর মতো।”
এবারও কিছু বললাম না আমি। শুধু পিসির হাতটা আরেকটু শক্ত করে ধরলাম।
পিসি কি কোনদিন বুঝতে পারবে, বাবা আর ফিরবে না। হয়তো পিসি একদিন নিজেই ভুলে যাবে বাবার কথা। তার কানাইয়ের কথা।
এই ভুলে যাওয়া আর সত্যিটা জানা— দুটোর কোনটা বেশি নিষ্ঠুর? এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।
আমরা হাঁটছি…