Email: info@kokshopoth.com
June 5, 2026
Kokshopoth

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ

May 29, 2026

ধারাবাহিক
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ

তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।

 

হাতে রইল

 

 সদ্য একটা নির্বাচন চোখের ওপর দিয়া চলে গেল। মরমেও পশিল বেশ। একদল জিতল একদল হারল, নতুন  সরকার গড়ল, অথচ পুরোনোরা নাকি মোটেই হারেনি!  আর চড়চড়ে রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়ে শেষ অব্দি আমাদের, মানে জনতা জনার্দনের হাতে কী রইল?, কিছু মিম  আর চড়াম চড়াম রিল? এই সেদিন পর্যন্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলতেন  হাতে রইল পেনসিল! তবে  পেনসিলের মাহাত্ম্য তাঁরা কতটা জানতেন সন্দেহ আছে। মানে ‘উট’ পেনসিলের কথা বলছি!

 

এ কথা বেশ গর্বের সঙ্গেই বলা যায়, আমরাই সেই শেষ প্রজন্ম যারা ‘উট’ পেনসিল দেখেছে শুধু না, দস্তুরমত ব্যবহার করেছে, চিবিয়েছে, তাই দিয়ে লিখে নতুন ক্লাসে উঠেছে, এমনকি অকৃতার্থ হয়ে উঠতেও পারেনি,  আনমনা হয়ে সেই ‘উট’ পেনসিল দিয়েই হিজিবিজি কেটে গেছে। যদি ক্লাসে বসে পড়া না শুনে আঁকিবুকির একটা যথাযথ আর্কাইভ গড়ে তোলা যেত, তবে  দেখা যেত, শিল্পকলার আসল ডনদের আমরা ক্লাসরুমে বসিয়েই মেরে ফেলেছি।

যাক সে মহতী বিনষ্টির কথা। এই উট পেনসিল জিনিসটি আমাদের প্রজন্মের একটি অতি গুরুতবপূর্ণ উপাদান। এবং আমরা সবাই জানতাম, এটি উটের লোম থেকে তৈরি হয়। সেই সময় উট কেবল শিশু প্রাইমারে দেখা। ‘উট চলেছে মুখটি তুলে, দীর্ঘ ঊ টি আছে ঝুলে’, ঊ টি কোথায় ঝুলে থাকে কে জানে, জন্ম ইস্তক  বাঙালি শিশুর মাথার ওপর যে  পরীক্ষার  দীর্ঘ ঈ টি যে ঝুলে থাকে, তা তো জানা কথা।

বাংলা রচনা বইয়ে প্রাপ্ত জ্ঞানে বলীয়ান হয়ে এটুকু জানতাম উটকে ম্রুভূমির জাহাজ বলা হয়, তাই ভাবতাম যে  এই উটের লোমে প্রস্তুত পেনসিল দিয়েই পরীক্ষা ম্রুভূমি নির্ভয়ে পার হয়ে যাব । সেই যে কবি লিখিয়াছেন-

 

আমি    মারের সাগর পাড়ি দেব বিষম ঝড়ের বায়ে

আমার  ভয়ভাঙা এই নায়ে ॥

          মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে   ছেঁড়া পালে বুক ফুলিয়ে

তোমার ওই পারেতেই যাবে তরী ছায়াবটের ছায়ে ॥

 

‘মারের সাগর’ বলিতে যে কবি পরীক্ষারূপ অথৈ সাগরই বুঝাইয়াছেন, তাহা তো স্পষ্ট। এই মারের সাগরের ভয়েই যে তিনি স্কুল ড্রপ  হইয়াছিলেন, তাও বেশ  বোঝা যায়। আর এখানে যে মাভৈ বাণী, তা উট পেনসিল ছাড়া কেই বা দিতে পারে?

  

যখন পরে জানা গেল কথাটা হচ্ছে উড পেনসিল, কাঠের তৈরি কেঠো জিনিস বলে এই নাম, তখন পেনসিলের  গা থেকে সেই মিথ ঝরে গেল আর জীবনটাও ভারি কেঠো আর কেজো হয়ে পড়ল। সেই আরব বেদুইনের ভাইবসটাই চলে গেল। জীবন সত্যি সত্যি মরুভূমি হয়ে উঠল।

 

সেই সময় আমাদের লেখার সরঞ্জাম যৎসামান্য ছিল। বেশ কিছু বছর পেনসিলে হাত মকশো করার পর কলম ব্যবহারে প্রোমোশন হত। সে তো এখনো হয়। কিন্তু এত বাহারি পেনসিল বক্স, এত বিচিত্র লেখার ও আঁকার সরঞ্জাম দুর্ল্ভ ছিল। বিশেষ করে আমাকে ক্লাস ফোর অব্দি পড়তে পাঠানো হয়েছিল আনন্দময়ী পাঠশালা বলে একটি প্রাইমারি ইস্কুলে, সেখানে একটি ঢকঢকে টিনের সুটকেস থাকাই ছাত্র জীবনের সর্বোচ্চ পাওয়া আমরা জানতাম। পেনসিল নিশ্চয় ছিল, ঐ উট পেনসিল, কিন্তু পাঠশালা পড়াকালীন ইরেজার বা শার্পেনার ইত্যাদি ছিল কিনা আদৌ মনে পড়ে না। না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।  কাকে যেন একবার গোল মতো একটা ইরেজার দিয়ে হাতের লেখা মুছতে দেখেছিলাম, তার পেছনে আবার একটা ঝাঁটা  টাইপের ছিল, ঘষে তোলা অংশ সাফাইয়ের জন্যে, দেখে মনে হয়েছিল সে যেন স্বপন পারের মেয়ে!  সে যখন সেই ইরেজার একটু শুঁকতে দিয়েছিল,  ধন্য হয়ে গেলাম। কী মিষ্টি গন্ধ। পেনসিল বাড়িতেই বড়রা কেটে দিত ব্লেড দিয়ে। আর মোছার দরকার হলে হাত দিয়ে ঘসা বা ইয়ে মানে থুতু তো আর শুকিয়ে যায়নি।

সরঞ্জাম যেমন কম ছিল তেমনি উপহারের চল ছিল না বললেই হয় । কথায় কথায় পেনসিল বক্স , আঁকার সেট কেউ দেয়নি। জন্মদিনে বড়জোর ভস্তক বা রাদুগার মোটাসোটা লোভনীয় বই, অতি ভাল সেইসব বইয়ের দাম ছিল বড় জোর পাঁচ টাকা। নিশ্চয় সমাজ খুব উচ্চ আদর্শে বাঁধা ছিল। বাচ্চাদের উপহার দিলে তারা যে বখে যায়, তা তাদের খুব জানা ছিল। এতদিনে যে বখে যাইনি, এখন নিযযস বুঝতে পারছি, এ সেই উচ্চ আদর্শে মানুষ হবার ফল। অথচ এক দেড় কিলোমিটারের মধ্যে একটা দিব্যি স্কুল ছিল, রামকৃষ্ণ স্কুল, সেই এলাকার প্রথম ইংরেজি মাধ্যম। সেই স্কুলের ভর্তির ফরমের সঙ্গে পরীক্ষার স্যাম্পল প্রশ্ন দিত। সেই প্রশ্ন পড়ে নাকি আমার মা জননীর মনে হয়েছিল এসব উত্তর দেওয়া আমার কম্মো নয়! ভাবুন আমার  সম্পর্কে ভদ্রমহিলার কী উচ্চ ধারণা! আমি লক্ষ্য করেছি উনি বরাবর আমার সঙ্গে এমন বিমাতৃসুল্ভ ব্যবহার করে এসেছেন। ইলিশের জন্যে যে আমার জন্মটাই দিতে চাননি সে তো আপনারা জানেন। তাঁর জন্যে আমার রামকৃষ্ণ স্কুলে পড়ে জাতে ওঠা আর হল না।  সেখানে কিন্তু বাচ্চাদের একটু আধটু নষ্ট করে ফেলার প্রচেষ্টা ছিল। তাদের ছিল বাহারি পেনসিল বক্স, সুগন্ধি ইরেজার, রঙ্গিন শার্পেনার সুদ্ধু। এই আনন্দময়ী এবং রামকৃষ্ণ স্কুলের মেয়েরা একদিন  রাসমনি বালিকা বিদ্যালয়ের ক্লাস ফাইভে এসে মিলে গেল। পরস্পর  সম্পর্কে মিথ অনেক শোনা ছিল। কিন্তু দেখলাম ওদেরও আমাদের মতোই দুটো হাত দুটো পা, গুড মরনিং মিস ছাড়া বিশেষ কোন তফাত নেই, মোটকথা আমরাও বেশ ভাল লোক, ওরাও বেশ ভাল লোক। ওরাও কেউ বখে যায়নি বলেই মনে হল।  যদিও  ওদের সবার বাহারি পেনসিল বক্স ছিল। আর হাতের লেখা প্রত্যেকের এক ধরনের, গোটা গোটা। শুনলাম ওদের নাকি  বৈজ্ঞানিকভাবে হাতের লেখা শেখানো হয়। তবে, আমাকে ছাত্রী হিসেবে পেলে বুঝতাম ওদের এলেম!  হলফ করে বলতে পারি আমাকে শেখানোর (চেষ্টার) পর, ওরা ওদের ঐ বৈজ্ঞানিক প্রকল্প তুলে দিত। অনেক পরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় আমার পরীক্ষার খাতায় পরীক্ষক যে ‘হরিবল হ্যান্ডরাইটিং!’ লিখে দিয়েছিলেন, সে কি এমনি এমনি!

 

 অংকে  জ্যামিতি ব্যাপারটা জোটার আগে পর্যন্ত  কোন জ্যামিতি বক্স ছিল না। অবাক কাণ্ড! সেই জ্যামিতি বক্সেও উটের ছবি। তখন মনে পড়ে গেল উট পেনসিলের কথা, উট পেনসিল, আরও পেছোলে স্লেট, খড়ি জলন্যাকড়া। নাহ, উপহার যে একদম ছিল না, তা নয়। তবে উপহার না বলে অর্জন বলাই ভাল। প্রতি বছর মামাবাড়ির পুজোর জলসায় একটা আবৃত্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন হত। সেখানে ফার্স্ট প্রাইজ   বাঁধা ছিল। এর পেছনে  মেজমাসির কিছু ঘোটালা ছিল, এই ফিসফাস শোনা যেত কান পাতলে। একবার আরও একটি মেয়ে কলকাতা থেকে গেছে। সে ভালই বলল, সেখানে আমি রবীন্দ্রনাথের ‘রবিবার’ বলতে গিয়ে হঠাৎ কোন কারণ ছাড়াই বলা থামিয়ে পাক্কা সাড়ে ১১ সেকেন্ড দর্শকের দিকে তাকিয়ে হেসেছিলাম। তারপরেও আমি ফার্সট। ভাবা যায়!  প্রাইজ পেলাম একটা বাঁধানো লাইন টানা বঙ্গলিপি খাতা আর একটা লাল আর কালো স্ট্রাইপ দেওয়া পেনসিল। প্রতি বছর ফার্স্ট প্রাইজ ছিল এটাই।  সেটা বাম আমল কিনা তাই এরকম রঙ।

 

পেনসিলের যে রকমফের আছে তা জানতে আরও অনেক বছর লেগেছে। বন্ধুরা যখন টুবি, এইচ বি, এসব বলত, হাঁ করে চেয়ে থাকতাম। ভাবতাম বাসের কথা বলছে বুঝি!  তার কারণ আছে। পড়াশোনার একটা অপরিহার্য অঙ্গ যে ছবি আঁকা,  সেটা আমি বরাবর বাদ দিয়েই চলতে চেয়েছি। স্কেল ছাড়া একটা সোজা লাইন টানতে যে পারেনা, সে ছবি কী করেই বা আঁকবে? কিন্তু ছবি না আঁকলে নম্বর উঠবে না, এরকম একটা হাড় হিম করা খবর ভেসে এল বাতাসে। বন্ধুদের প্র্যাক্টিকাল খাতার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতাম। যাবতীয় শিল্প ঢেলে তারা এক একখানি খাতা তৈরি করেছে। আর আমি তখন একটা বকযন্তর আঁকতেও  ছরকুট হই, ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র আঁকতে হবে ভাবলে টেনশনে নিজের পৌষ্টিক তন্ত্র ফেল মেরে যায়। বন্ধুদের পরামর্শে বিচিত্র শেডের পেনসিল কিনি,  কিন্তু তাতে আদৌ কোন উন্নতি হয় না।  বরং শেড দেবার জন্যে ঘসতে গিয়ে কাগজ ছিঁড়ে যায়। আর তখন, তখন আমার সেই পুরনো ‘উট’ পেনসিলের কথা মনে পড়ে, যার মতো ছাত্রবন্ধু জীবনে আর দুটি দেখিনি।

1 Comment

  • উট পেন্সিল থেকে উডে চলে আসার আগে রবার কখন ইরেজার হয়ে উঠল, মনে দ্বিধা রেখে কখন যে বাইরে দূরে হারিয়ে গেল, তা বুঝতেই সোনার তরী ডুবে গিয়েও ব্ইছে।। এ এক মনের জীবনীশক্তি। 🙏🙏

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *