সাম্য রাইয়ান-এর জার্নালঃ পৃথিবী ও তার ক্লান্ত নাবিকেরা
সাম্য রাইয়ান-এর জার্নালঃ পৃথিবী ও তার ক্লান্ত নাবিকেরা
সাম্য রাইয়ানের জন্ম বাঙলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায়। ২০০৬ থেকে সম্পাদনা করছেন শিল্প-সাহিত্যের অন্যতর লিটল ম্যাগাজিন ‘বিন্দু। কবিতা, প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি লিখেছেন নতুন ধরনের আখ্যানধর্মী গদ্য৷
সাম্য রাইয়ানকে নিয়ে ভারতের সাহিত্য পত্রিকা ‘তারারা’ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ‘মনমানচিত্র’, ভারতের ‘এবং পত্রিকা’ তাকে নিয়ে বিশেষ একক সংখ্যা ও বাংলাদেশের প্রখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন ‘নিসর্গ’ বিশেষ মূল্যায়ন (ক্রোড়পত্র) প্রকাশ করেছে৷ ভারতের নব্বই দশকের কবি সুবীর সরকার সাম্য রাইয়ান প্রসঙ্গে ‘সাম্যপুরাণ’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন।
প্রকাশিত গ্রন্থ: সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট [গদ্য, ২০১৪]; বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা [কবিতা, ২০১৫]; মার্কস যদি জানতেন [কবিতা, ২০১৮]; হলুদ পাহাড় [কবিতা, ২০১৯]; চোখের ভেতরে হামিং বার্ড [কবিতা, ২০২০]; লোকাল ট্রেনের জার্নাল [গদ্য, ২০২১]; লিখিত রাত্রি [কবিতা, ২০২২] ও হালকা রোদের দুপুর [কবিতা, ২০২৩]; জলের অপেরা [কবিতা, ২০২৪]; সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের [উপন্যাস, ২০২৫]৷ সম্পাদিত গ্রন্থ: উৎপলকুমার বসু [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২২]; জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ [পর্যালোচনামূলক প্রবন্ধ সংকলন, ২০২৩]; শম্ভু রক্ষিত: পাঠ ও বিবেচনা [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২৫]।
সভ্যতার নতুন বামনতত্ত্ব
মানুষের সমাজেও ‘ইকোলজিক্যাল সিলেকশন’ নামে এক ধরনের ব্যাপার ঘটে; যদিও জীববিজ্ঞানের বইয়ে এ প্রসঙ্গের অবতারণা এখনো হয়নি। কিন্তু চারপাশে তাকালে বোঝা যায়, সমাজও নিজের মতো করে মানুষ নির্বাচন করে। কোনো সমাজ কেমন মানুষকে টিকিয়ে রাখবে, কাকে সম্মানিত করবে, কাকে পিষে মারবে তা নির্ভর করে সেই সমাজের মানসিক গড়নের ওপর।
মরুভূমিতে যেমন মাছ টিকে থাকে না, তেমনি মূর্খতার অতিরিক্ত ঘনত্বে প্রতিভাবান মানুষও দীর্ঘকাল বাঁচতে পারে না। বাঁচলেও, নিজের স্বরূপে বাঁচতে পারে না। তাকে বদলাতে হয়। নিজের উচ্চতা কমাতে হয়। চিন্তার ডানা কেটে ফেলতে হয়। কারণ চারপাশে উড়তে না-পারা মানুষ বেশি হলে, আপনার উড়াল সন্দেহজনক হয়ে উঠতে বাধ্য।
প্রকৃতিতে এমন কিছু মাছ আছে, যেগুলো দূষিত পানিতে বহু প্রজন্ম বসবাস করতে করতে নিজের শরীরের গঠন বদলে ফেলে। তাদের লিভার বড় হয়, চোখ ছোট হয়, স্নায়ু ভোঁতা হয়। কারণ বিশুদ্ধ নদীর জন্য নির্মিত শরীর, নর্দমায় টিকে থাকতে পারে না। ফলে টিকে থাকার জন্য শরীরকে আপস করতে হয়।
সমাজেও একই ব্যাপার ঘটে। দীর্ঘদিন অসুস্থ সংস্কৃতির মধ্যে বাস করতে করতে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গগুলো বিকল হতে শুরু করে। কৌতূহল কমে যায়। বিশ্লেষণক্ষমতা মরে যায়। চিন্তার জায়গা দখল করে এআই। আর যুক্তির বদলে প্রাধান্য পায় ট্রেণ্ড, হাইপ ব্লা ব্লা ব্লা। বইয়ের বদলে মানুষ খোঁজে শর্টকাট ভিডিও। ধীরে ধীরে, জটিল বিষয় বোঝার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে গোটা জাতি।
সভ্যতার ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, কোনো জাতি প্রথমে শিল্প, দর্শন বা বিজ্ঞান থেকে বিচ্যুত হয় না; তার প্রথম বিচ্যুতি ঘটে গভীর মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা থেকে। মানুষ যখন আর দীর্ঘ লেখা পড়তে পারে না, দীর্ঘ চিন্তা সহ্য করতে পারে না, তখন বুঝতে হবে সভ্যতার মগজে অক্সিজেন কমে গেছে।
একসময় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বিপজ্জনক জায়গা। সেখানে নতুন চিন্তা জন্ম নিতো। রাষ্ট্র দুর্নীতি ও নিপীড়নের আগেই ভয় পেতো। প্রচলিত চিন্তা, প্রথা, প্রতিষ্ঠান অস্বস্তিতে ভুগতো। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রশ্ন উৎপাদন কারখানা। এখন বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে চাকরির কোচিং সেন্টারে।
এই ধরনের বিবর্তনের ফলে সমাজে এক অদ্ভুত মিউটেশন ঘটে। জ্ঞানী মানুষ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়, চতুর হয়ে ওঠে অপরিহার্য। কবি পরিণত হয় অনুষ্ঠান উপস্থাপকে। দার্শনিক পরিণত হয় টকশো অতিথিতে। বিজ্ঞানীকে কথা বলতে হয় মোটিভেশনাল বক্তার ভাষায়। কারণ সমাজ আর গভীরতা গ্রহণ করতে পারে না; সে চায় বিনোদনের মোড়কে পরিবেশিত ইনফরমেশন।
এমন সমাজে ‘ভাষা’ অসুস্থ হতে বাধ্য। ক্রমশই এখানে শব্দের অর্থ বদলে যায়। ‘সাহসী’ বলতে বোঝায় উচ্চস্বরে চিৎকার করতে পারা মানুষ, ‘বুদ্ধিজীবী’ বলতে বোঝায় ভিডিওতে মুখ দেখানো ব্যক্তি; উৎসবে সর্বোচ্চ সংখ্যক সেলফি তুলতে পারা ব্যক্তিকে মনে করা হয় ‘সাংস্কৃতিক কর্মী’। অর্থাৎ ভাষা নিজেই নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
একসময় যে-সমাজ আইনস্টাইনের কদর করতো, সে-সমাজ এখন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ইশারায় নাচে। যে অ্যাক্টিভিস্ট সত্যের দিকে তাকিয়ে থাকতো; তার নজর এখন অ্যালগরিদমে।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই অবক্ষয় কখনো নিজেকে অবক্ষয় বলে মনে করে না। বরং নিজেকেই সভ্যতার সর্বোচ্চ রূপ বলে ঘোষণা করে। মনে করে দেখুন, রোমান সাম্রাজ্য পতনের আগে নিজেদের খুব আধুনিক ভাবতো। মোগল সাম্রাজ্য ধ্বংসের আগে সবচেয়ে বেশি আচার অনুষ্ঠান করতো। কিন্তু সত্য এটাই যে, মানুষ যখন পতনের দিকে যায়, তখন সে সাধারণত আরো জোরালো শব্দদূষণ করে, যেন সেই শব্দের চাপে ধ্বংসের আওয়াজ ঢেকে যায়।
বাঙলাদেশেও এখন এমন এক সময় চলছে, যেখানে গভীরতা সন্দেহের বিষয়। বেশি পড়াশোনা করা আনস্মার্ট মানুষের কাজ। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফালতু ভিডিও দেখে যাওয়া স্বাভাবিক আচরণ।
ফলে জাতীয় মেধার ওপর এক ধরনের ‘কালচারাল ন্যাচারাল সিলেকশন’ কাজ করছে। যে বেশি চিন্তা করে, সে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। যে কম চিন্তা করে, সে দ্রুত সফল হচ্ছে। যে মানুষ বই পড়ে, সে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। যে মানুষ ভড়ং ধরে, সে জনপ্রিয় হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন চলতে থাকলে একসময় পুরো সমাজের গড় মানসিক উচ্চতাই নিচে নেমে আসে। তখন বড় মানুষ জন্মালেও, তাকে ছোট হয়ে বাঁচতে হয়। নিজের ভাষা তরল না করলে লোকে পড়ে না। নিজের চিন্তা বিকৃত না করলে সোসাইটি গ্রহণ করে না।
নতুন এই পদ্ধতিতে সভ্যতা আর সরাসরি প্রতিভাকে হত্যা করে না; বরং তাকে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে বামন বানিয়ে ফেলে।
1 Comment
লেখাটির বক্তব্য সঠিক এবং সমসাময়িক বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু উত্তরণের উপায় কী? আরেকটা বিষয়- কিছু পজিটিভ দিকও আছে। যেমন : লেখাতেই বলা আছে রোমান ও মোগল সাম্রাজ্যের পতন। পতন মানেই বিকশিত নতুন ধারার।