তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরা
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ
তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।
তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।
# চতুর্দশ পর্ব
জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে শুধু একটি লিপস্টিক!
ছোট থেকেই ডাক্তার আর আমি যেন সিয়ামিজ টুইন, একজন আর একজনকে না দেখে থাকতে পারে না। আমাদের শৈশব অব্দি ডাক ও তার বিভাগ খুব সক্রিয় ছিল, এ তো সবাই জানেন। তেমনি ডাক্তাররা। ডাকলেই তাঁদের পাওয়া যেত। সেটাকে বলা হত কলে যাওয়া। বিপিন ডাক্তারের চেম্বারে বসে থাকতে থাকতে অনেকসময় শুনতাম, ডাক্তারবাবুর আসতে দেরি হবে, উনি কলে গিয়েছেন। আমি ভাবতাম কলতলা তো বাড়ির উঠোনেই নিশ্চয়, তাহলে দেরি হবে কেন? তাহলে কি ডাক্তারবাবু কলতলায় পিছলে পড়ে গেছেন? যদু মাস্টার যেমন শ্বশুরবাড়ি যাবার তাড়ায় ট্রেন ধরতে গিয়ে পড়ে গেছিলেন? এক একটা ডাক্তারের চেম্বারে এত ক্ষণ বসে থাকতে হত, যে বসে থাকতে থাকতেই অনেক দীর্ঘমেয়াদী রোগ সেরে যেত। তাতে আবার সবাই ডাক্তারবাবুকেই ধন্য ধন্য করত। কপালে হাত ঠেকিয়ে বলত উনি স্বয়ং ধন্বন্তরি, ওঁর চেম্বারে বসে থাকলেই রোগ সেরে যায়, ছোঁয়ার দরকার হয় না। সে সময় আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াত এমন সব ভগবান স্বরূপ ডাক্তারদের গল্পকথা। আমার বাবার পরের ভাই, আমার না দেখা কাকু, মাত্র ছ বছর বয়সে মারা যায় কী এক কঠিন অসুখে। দাদু সেই সময় সম্ভবত মার্টিন বার্ন কোম্পানির চিফ অ্যাকাউন্টেন্ট ছিলেন। কলকাতায় বাসা ভাড়া করে থাকতেন। শনিবার শনিবার দেশে যেতেন। তো দাদু বিধান রায়কে দেখাবার সব ঠিক করে ফেললেন। এরপর যা ঘটল, তা আমাদের পারিবারিক ইতিহাসে এক কিংবদন্তি হয়ে আছে। দুই প্রজন্ম বাহিত হতে হতে যে গল্পটি আমার কাছে এসেছে, তা কত অংশে সত্যি, আর কতটা ডক্টর বিধান রায়ের অসামান্য চিকিৎসা ক্ষমতার দৈবী সম্প্রসারণ, তা বলতে পারব না, তবে ছোট থেকে সে গল্প শুনতে শুনতে যে ছবি আমি তৈরি করতে পেরেছি, তা হল, দীর্ঘ এক ঘর , যার এক প্রান্তে বিধান রায় আর অন্য দূরতম প্রান্তে আমার সেই না দেখা ছোট কাকু কে নিয়ে আমার না দেখা ঠাকুরদা। ওখান থেকেই, নাড়ি না দেখে বিধান রায় বলে দিলেন ছেলেকে নিয়ে ফিরে যান, শেষের কদিন যা খেতে চায় দিন। এ আর বড় জোর মাস খানেক।
এই কথা যে অক্ষরে অক্ষরে ফলেছিল, তা বাবা আমাকে বলতে ভোলেনি। আমার প্রথমবার শুনে ব্যাপারটা রোমাঞ্চকর লেগেছিল ঠিকই, ডক্টর বিধান রায়ের দৈবী ক্ষমতার প্রতি বেশ একটা সমীহও জন্মেছিল, কিন্তু তারপর যতবার শুনেছি, কেমন যেন হৃদয়হীন মনে হয়েছে , রোগীর থেকে অত দূরে, তাকে ভাল করে না দেখেই রোগ নির্ণয় এবং নিদেন হাঁকা- নাহ এতে আমার শ্রদ্ধা ভক্তি আদৌ উথলে উঠছে না তো! আমি তবে কি সেই অবিশ্বাসী, যাকে ধমকে বলা যায় – ‘চুপ করো অবিশ্বাসী, কথা কোয়ো না’।
কিন্তু আমি যে মাহোলে বড় হয়েছি, তাতে বিশ্বাস থাকাটি দস্তুর ছিল। বাবা ছিল হোমিওপ্যাথিক ওষুধের অন্ধ ভক্ত। এতটাই যে সেই ভক্তি মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে তার জীবনটাই কেড়ে নিল।
কলকাতায় এসে বাবা জেঠু ও দাদুর সঙ্গে থাকত, এবং যে বাড়িতে থাকত, সেটি নিজেই একটি চরিত্র। শুনেছি জবাকুসুম হাউসের একটি বাড়ি ছিল সেটা। সে বাড়ির ছেলে সম্ভবত বাবার সঙ্গে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পড়ত। দুজনে একবার পাতিয়ালায় অডিট করতে গিয়ে বাবা একদিন দেখে ঘুমের মধ্যে সে সোজা দরজা খুলে রাস্তায় বেরিয়ে গেল। সেদিন বাবা ছুটে গিয়ে না আটকালে সেই রাতেই ট্রাকের ধাক্কায় তার মৃত্যু অবধারিত ছিল। ঘরে ফিরে একটু ধাতস্থ হয়ে সেই ছেলেটি একটি অদ্ভুত কথা বলেছিল। তার অকাল মৃত পিসি নাকি তাকে ডাকে। সেই ডাক শুনে সে ঘুমের মধ্যেই রাস্তায় বেরিয়ে যায়। তারপর সে কথায় কথায় বলে যে বাড়িটিতে বাবারা থাকত, সেখানেই পিসি মারা গেছিল। স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, আত্মহত্যা। সে নাকি আজো ঘুরে বেড়ায় সে বাড়িতে। তখন বাবা বুঝতে পারে, শনিবার দাদু আর জেঠু দেশে চলে গেলে দুদিন বাড়িতে কার উপস্থিতি সে টের পায়। তবে নাহ, হচ্ছে জীবনের কথা, ভূতের গল্প আর এক দিন হবে।
তবে বাবা জেঠু দাদু একজায়গায় হলে ভূতের গল্প হতই, তার চেয়েও বেশি হত হোমিওপ্যাথির গল্প। এই ‘হুমোপাথি’ নিয়েই তিন জনে প্রায় মারপিট বেধে যেত। হ্যানিম্যান নামক এক টাকমাথা জার্মান ভদ্রলোকের ওপর বাবা আর দাদুর ছিল অগাধ আস্থা। বলত এক চৌবাচ্চা জলে এক ফোঁটা হুমোপাথি ওষুধ ফেলে সেই জল খাওয়ালেই রুগী বিছানা থেকে উঠে বসে।
তবে সারা জীবন বিবিধ ডাক্তারের চেম্বারে আয়ুর অর্ধেক কাটিয়ে দেওয়ার পর হুমোপাথি অ্যালাপাথি, কবিরাজি, হেকিমি- কিছুর ওপরেই আমার সেই অচল ভক্তি নেই। এ শুনে আমার ডাক্তার বন্ধুরা রাগ করলে আমি নাচার। আসলে ফার্স্ট ইম্প্রেশন হচ্ছে লাস্ট ইম্প্রেশন। জীবনের শুরুতেই এক ডাক্তারের সাজগোজের ঠেলায় আমার যাই যাই হয়েছিল। কলকাতা থেকে হাত পা ছড়িয়ে শান্ত সবুজে থাকবে বলে আমাদের পরিবারটি মফস্বলে চলে এল। এল এল, একেবারে প্রবল ডিসেম্বর মাসে। সে বেলেমাটির জায়গায় হাড় কাঁপানো ঠান্ডা পড়ত। তায় আমার বয়স চার মাস। জন্মের পরেই ২৫ মিনিট নাকি আমাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল। তারপর আমি কেঁদেছিলাম। জন্মাবধি এই কথাটা শুনে শুনে আমার মনে পেত্যয় জন্মেছিল আমি সাক্ষাৎ ফেরেস্তা জাতীয় কিছু। আমার মধ্যে দৈবী লক্ষণ সবই ফুটে উঠতে দেখা গিয়েছিল সেই শৈশবেই। আর সব কিছুই সেই ২৫ মিনিট টানা অক্সিজেনের জন্যে। সেই ইস্তক যে শুধু আমার নিজের প্রতি শ্রদ্ধা জন্মে যায় তাই নয়, ২৫ সংখ্যাটার প্রতিও বেশ একটা সমীহ জাগে। কোথাও ২৫ লেখা দেখলেই আমার মনে ভেসে ওঠে একটি ফুটফুটে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ছবি, জন্মের পরেই যার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল। আহা ফ্রেন্ড ইন নিড এরেই কয়। তো মফস্বলে চার মাস বয়সে এসে ডিসেম্বরের শীতের এক রাতে আমার তো যায় যায় অবস্থা। অত রাতে সবাই ছুটেছে ডাক্তার ডাকতে। ভাবছেন নিশ্চয়, তিনি অত রাতে আসতে অস্বীকার করেছেন। মোটেই তা নয়। অত হৃদয়হীন ডাক্তার ক্যাংলাসের শহরে ছিলই না। ডাক্তার জানলা একটুকু ফাঁক করে বললেন ‘ একটু দাঁড়ান, তৈরি হয়ে আসছি’ সেই কনকনে শীতের রাতে কাকু দাঁড়িয়ে আছেন আর ভাবছেন এত দেরি হচ্ছে কেন? তখনকার যা দস্তুর, একটা রিক্সাওলার ঘুম ভাঙ্গিয়ে নিয়ে গেছেন। যদিও আমাদের বাড়ি থেকে ডাক্তারবাবুর বাড়ি হাঁটাপথ, আর দোলমঞ্চের দিক থেকে আনন্দময়ী তলা দিয়ে এলে আরও তাড়াতাড়ি আসা যায়, তবু ডাক্তারকে কল দিলে রিকশা পাঠিয়ে দিতে হত, কিংবা ডাক্তারবাবু রুগী দেখে যাওয়ার সময় বাড়ির লোকদের ডেকে বলতেন ‘আমার রিক্সাভাড়াটা আলাদা দেবেন’। এই আলাদা করে রিকশা ভাড়া নেওয়াটা বেশির ভাগ লোকেই ভাল চোখে দেখত না বলাই বাহুল্য। এমনিতেই বাড়ি এলে ভিজিট হত দ্বিগুণ থেকে চতুর্গুণ, তার ওপর রিক্সাভাড়া চাইলে সে ডাক্তারকে আড়ালে লোকে নিন্দেই করত। বুদ্ধিমান ডাক্তাররা তাই ভিজিটের মধ্যেই কায়দা করে রিক্সাভাড়াটা ঢুকিয়ে দিতেন, সেলের সময় জামাকাপড়ের দাম বাড়িয়ে যে কায়দায় দোকানীরা উদার হাতে ছাড় দেন। ডাক্তারদের এই বিপণন কৌশল বেশ কাজের। তো কাকু সেই শীতে কাঁপতে কাঁপতে এইসব নিয়ে ভাবছিলেন না বলাই বাহুল্য। দরকার হলে তিনি ডাক্তারকে পিঠে চাপিয়েও নিয়ে যেতে পারতেন। তিনি ভাবছিলেন একটা ডাক্তারের তৈরি হতে কী কী লাগে। সেই সিনেমায় যেমন দেখায়- একটা ঢাউস ব্যাগ, সেটা যে রুগীর বাড়ির লোককেই বয়ে নিয়ে যেতে হয়, এটাও সিনেমায় দেখায়। আর বাইরের পোশাক পরে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝোলালেই তো রেডি।
কিন্তু মামলা অত সহজ ছিল না। এই ডাক্তারবাবুটি ছিলেন প্রসাধন আসক্ত । এবং তা চুল আঁচড়ানো বা পাউডার লাগানোয় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি নাকি রীতিমতো লিপস্টিক লাগাতেন। সেই রাতে একটি চার মাসের শিশু যায় যায় শুনেও তিনি তাঁর সাজ-রুটিনে কোন ব্যত্যয় ঘটতে দেননি। হয়তো রাত গড়িয়ে ভোরই হয়ে যেত আর কাকু যতক্ষণে ডাক্তার নিয়ে আসতেন ততক্ষণে আমিও আমার না দেখা বিধান রায় খ্যাত কাকুর পদাংক অনুসরণ করে ফেলতাম। কিন্তু একটা মিরাকেল ঘটেই গেল। হয়েছে কি, ডাক্তার আলো জ্বেলে আয়নার সামনে প্রসাধন করছিলেন, তাতে ডাক্তার জায়ার ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে থাকবে। বাইরে কাকুর ডাকাডাকি আর এদিকে ডাক্তারবাবুর অবিচলিত লিপস্টিক লাগিয়ে যাওয়া- এই দুয়ে দুয়ে চার করতে তাঁর বেশি সময় লাগেনি। তাঁরই তর্জন গর্জনে, (হয়তো দু-চার ঘা কষিয়ে দিয়েও থাকতে পারেন), ডাক্তারবাবু শৃঙ্গার অসমাপ্ত রেখে বাইরে এসে রিকশায় উঠলেন, আর সে যাত্রা আমারও মরা হল না। তবে এ জিনা কোয়ি জিনা হ্যায় লাল্লু!