প্রবন্ধঃ রুদ্র শায়ক
প্রবন্ধঃ রুদ্র শায়ক
কবি ও প্রাবন্ধিক— জন্ম, ১৯৮৩ লক্ষ্মীপুরে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে বিএ (সম্মান) ও এম.এ । ছোটোকাগজ ‘ওপেন টেক্সট’ সম্পাদনা করেন। মূলতঃ ছোট কাগজের লেখক। কাব্য গ্রন্থ: বাড়ীর দিকে ফিরা, প্রকাশিতব্য গ্রন্থ: মধ্যবিত্তের সংরাগ কিংবা গ্ৰামসির কবিতা গ্ৰাম, কারণ ছাড়াই কৌশল জানে মৌটুসী পাখি কিংবা সময় সময়োচিত মানুষকে ভুল বুঝে ।
উত্তর আধুনিক কালখণ্ডে বাঙ্গালীর উত্তর উপনিবেশিক দর্শন অন্বেষা (প্রবন্ধ)।
কালো গোলাপ চাষ প্রকল্পের মিথস্ক্রিয়া
মনে রেখ অন্ধকার আর ভীষণ ঠান্ডার এই উপত্যকাজুড়ে
শুধু দুঃখ-কষ্ট প্রতিধ্বিনিত
-ব্রেখ্ট, দ্য থ্রি পেনি অপেরা
সারাদিন ঘুরাঘুরি, নিজের সাথে নিজের দ্বন্দ্ব, ছুৎমার্গের কেরিক্যাচাল..
ভাষা ও মতের শৃঙ্খলে শব্দ ধাঁধার সাথে জটিল পোদ্দারী।
তত্ত্ব, তথ্য, ধারণা, মতবাদের দাসত্ব নয়, এই সব আমার জন্য
ভেলা, কাঁধে চেপে বহে বেড়াবার জন্য নয় বরং তাকে
চেপে নদী পার হবার জন্যই,
রাত জেগে জেগে হস্তীর বিষ্ঠাররমত আমার নিরন্তন পৃষ্টার পর পৃষ্টা পাঠ ও লিখা।
নতুন ভোরের স্বপ্নখামে উত্তর(post) অথবা নতুন(New)
কোন চিন্তার প্যারাডইম দিবে নয়া কোন বাঁক। সেই বাঁকে
অপরূপা কবিতাদেবীর স্নিগ্ধতা শান দিবে দেবীর চিবুক।
বর্তমানে মতবাদের সবচেয়ে কার্যকরী অস্ত্রের নাম মিডিয়া। এর হাত থেকে রেহাই পায়নি আমাদের মায়া-মমতা, আবেগ-ভালোবাসা, প্রেম-দ্রোহ, দহন, এমনকি হৃদয়ের সূতিকাগার কবিতা ও । মিডিয়া সহবাসের দাপাদাপিতে আমাদের কবিতা যেন বাল্য বিবাহে শিকার শ্বশুর বাড়ির অত্যাচারে অতিষ্ট কুড়িতে বুড়ি হওয়া মেয়েটি । অপেক্ষাকৃত স্বাধীন মত ও চিন্তা প্রকাশের একটি কার্যকর পাঠাতন সংকোচিত হয়ে যাচ্ছে , আমাদের সাহিত্য বিকাশের উদিত চত্বরে, গণতান্ত্রিক লেবাসে স্বাধীন মত প্রকাশের জিকির তুললেও সারা পৃথিবীতে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো বিজ্ঞাপন নামের কলকব্জার স্বার্থের কাছেই গভীর আন্তরিকতায় অনুগত, অপর দিকে আধা পুঁজিবাদী-আধা সামন্ত সংস্কৃতি প্রভাবিত প্রান্তিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর প্রধান গণমাধ্যমগুলো, সেটি সংবাদপত্র হোক আর রেডিও , টিভি হো্ক , এখনও প্রবলভাবে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত, এবং প্রত্যক্ষ ওপরোক্ষভাবে ক্ষমতার কাছে নজর বন্দি। এ রকম পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে প্রকাশিত ছোট কাগজ (লিটল ম্যাগাজিন)ই আমি ও আমাদের অন্যতম ক্রিয়াশীল হাতিয়ার। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত খুপড়ি ঘরের প্রথাগত হিরোইজমের ঘেরাটপে হারিয়ে যাবে পলিজমা এই ভাঁটি অঞ্চলের কৃষকের ঘাম ঝরানো মহত্ব গাঁথা। দৃশ্যত বিলুপ্ত প্রায় কবিগান, যাত্রাপালা, ঘাটুগান, ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া। আমাদের কাব্যমন্দির থেকে চলে যাচ্ছে লোকগাঁথা, পুরাণ, মিথ, লিজেন্ড, পেস্টোরাল সিম্ফানি, মাটিবর্তী মানুষের শাণিত কণ্ঠস্বর। স্থানিক স্বরন্যাস আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না কর্পোরেট দানব গ্রাসের কারণে , আমাদের দেউড়ীঘরে, প্রান্তিক সংস্কৃতি আজ বিমুখ উন্নসিক স্রোতের তোড়ে।
প্রান্তরের স্বপ্নে আজও জেগে আছি বাঙলার লাঠিয়াল সবুজ শ্যামল ছায়ায়। এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে আজও চতুরক বাণিজ্য বাতাস বইছে। নদী বিধৌত নগর অঞ্চলের কারণে কৌম সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। মহাকালের স্রোতে আর নয় সরল বা এক রৈখিকতা , স্রোতের প্রখরতা যেখানে বেশি , বাঁক বদলের তাগিদ সেখানেই তীব্র। সেখানেই বড় মাপের ভাবনার জোয়াল ভাঙে। প্যারাডাইম শিফট (Paradigm Shift) এখানেই ঘটে। অদ্বৈতবাদ এখানেই হয়ে যায় একাকার, মহাকালই হোক আর কালই হোক, যেভাবেই ডাকি না কেন সময়ের ধারাকে, এটি যে কাল হয়ে কখনো দাঁড়ায়নি মানুষের সামনে । প্যারাডাইম শিফটই তার প্রামাণ ।এই বাঁক বদলের ধাপে ধাপে সভ্যতা এগিয়ে যায়। এই কাজ মিডিয়া ম্যানিপুলেটর এর মাধ্যমে সম্ভব নয়, সংস্কৃতি অধ্যায়ন (cultural studies)ই শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। পাহাড় ডিঙানো বা সমুদ্র সেচাঁর মতো কঠিন মনে হতে পারে এই কাজ। But I think that, practices frequently easily you can desire the goal. ভূ-সংস্কৃতি অধ্যায়নের জন্য রেপ্রিজেন্টেশনের ধারনাকে আমরা অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারি, ফার্দিনান্দ ডি সস্যুর প্রভাবিত সেমিওটিক এ্যাপোচ এবং ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ডিসকার্সিভ এ্যপোচ কে এ্যাক্টিভেট করার মাধ্যমে। সমুজ্জ্বল অবাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছি কালের ভেলা… গভীরতম হৃদয় অনুভূতি নিয়ে যাবে এ ভেলা মহাকালের পথে, কথাটি কিছুটা বিতর্কিত। তবু কবিতা সময়ের চাহিদা মিটিয়ে চলে যাবে মহাকালের মঞ্চে। বিশেষ মুহুর্তের উন্মাদনার ভেতর থেকে কবি তার চমৎকার কবিতাটির ভাষা দেন। এই প্রকল্পের অনুকম্পে একটি শব্দের পর আর একটি শব্দের মাধুলী গাঁথার ঠিক এক সেকেন্ড পূর্বে কবিও জানেনা , তিনি পরের শব্দটি কি লিখবেন । এ যেন এক ঐশ্বরিক খেলা কবির মনন চিত্তজুড়ে, কিন্তু অল্পতেই আমাদের দম ফুরিয়ে যায় ,জ্বলে ওঠেই আমরা নিভে যায়ই। শাস্ত্রজ্ঞানের চাতালে ঔপনিবেশিক বেড়ী আমাদের মন মাজারে, শত বছরের চিন্তার দাসত্ব কাঁধে আমরা নুয়ে পড়ি ফেরারি ইতিহাসের ইশতেহার নিয়ে।
এখনই মোম সময়, শূন্যতার ভরাটতত্ত্বে এসে কবিতার ম্যাপ পূর্ণ করার। কাব্যবীজানুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় প্রথাসর্বস্বতা ও মতায়নের বিপরীতে মঙ্গলবোধের প্রদীপ হাতে যুথবদ্ধ প্রপঞ্চের মিথস্ক্রিয়া।
“উড়ে যেতে প্রস্তুত আমার ডানা,
আমি চাইব ঘুরে যেতে।
সময়হীন সময় যদি থাকে,
আমার থাকবে ক্ষীণ সম্ভাবনা”
-গেরার্ড শোলেম
উত্তর ঔপনিবেশিক সিম্ফনি ও কাব্যাখ্যান প্রকৃর্ষা
পৃথিবীর প্রাচীন পিঠের ওপর আমি এক নবাগত আগুন্তক
এখন কবির হাতের শিরা কেটে যখন রক্ত নিচ্ছেন চিকিৎসক
এখন আমার মনে পড়ছে আমি নিজের রক্ত বেচে মদ গিলে
লিখতে চেয়েছিলুম কবিতা আমি কি উচ্ছন্নে গেছি ?
-ফালগুণী রায়
প্রচল চিন্তার সীমা ভেঙে আজ আমাদের যাত্রা অব্যাহত অপ্রচল বৌদ্ধিক শৃঙ্খলের দিকে। বহুস্বর-বহুভাষিকতা-কৌমসংস্কৃতি-ইতিহাস ও ঐতিহ্য নবায়নের মাধ্যমে সমকালিন ডিসকোর্সের আলোকে বিন্যাসিত হচ্ছে আমাদের যূথবদ্ধ প্রপঞ্চগুলো, মিথস্ক্রিয়ার স্পাইরাল বাইন্ডিং আকারে যে প্রতিবেদন তা ওপেন এন্ডেড (Open ended) । ভাষা ও ক্ষমতার শৃঙ্খলে তথ্য ও তত্ত্বের ভিত্তিতে যে কেউ টেক্সট এর সাথে সম্পৃক্ত হতে পারেন অথবা রচনা করতে পারেন পাল্টা জ্ঞান ভাষ্য Counter discourse । কারণ আমাদের টেক্সট্ Closed ended নয়। প্রকাশিত টেক্সটের মধ্যে প্রকৃত লেখকের আর কিছু বলার থাকে না। বাস্তবত তা পাঠকের সম্পদ, এই পাঠক এক প্রকার পর্যবেক্ষক যে তার বোধের গভীরতায় আত্ম-আয়নায় Interpretation এর মাধ্যমে একটি নতুন টেক্সট্ তৈরী করতে পারেন। প্রতিটি টেক্সট্ রিডার অন্তর্পাঠের মাধ্যমে ভেঙে ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলেন। রোলা বার্থের সহী বয়ান অথরের মৃত্যুই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তালাল আসাদের শ্লোক হয়ে ওঠে ভবিতব্য সময়ের বিবেচ্য বিষয়-লিখা মানে পদ বানানো নয় নিজস্ব পদ রচনা। নিজের কথা নিজের মত করে বলা, বলতে পারা । আমরা অবক্ষয়ের সীমা ভিঙ্গিয়ে আপন নিয়মে নতুন আঙ্গিকের সন্ধানে ব্যস্ত। আমরা সাহিত্যে বাঙলার শ্যামল ছায়া ও শেকড়ের সাথে অন্বয় সাধন করে বৈশ্বিকতার পাঠকে ভূ-সংস্কৃতির আলোকে বিশ্বজনীন করে সম্বন্বয় সাধন করা। প্রয়োজন সময় পাঠ অনুভূতির আলোকে বিনির্মাণ ও প্রতিস্পর্ধার বীজতলা তৈরী করা। উপনিবেশ পেরিয়ে আমরা ভাটির তামাটে দামালরা সতত প্রস্তুত, নয়া উপনিবেশক সাম্রাজ্যবাদ, কর্পোরেট পুঁজি, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দাসানুদাস ভিত্তি যেন প্রবেশ না করে আমাদের সাহিত্যে, তার জন্য মূলত আমাদের সংগ্রাম । লোকালিজম ও গ্লোবালিজম’র সম্বনয়ে লোবালিজম ডিসকোর্সটি পাঠ অনুধাবন জরুরী হয়ে উঠে। প্রচলিত ফ্রেম ও ফর্ম যেহেতু আমাদের নয়, তাই প্রতিষ্ঠানের হিজড়া কাঠামোর সাথে চূড়ান্ত বিরোধ অনিবার্য, আর আমাদের মিডিয়াগুলো ক্ষমতাবানদের কার্যকরী অস্ত্র ও কালো টাকার পাহারাদার। তাই আমাদের শাণিত কণ্ঠস্বর প্রকাশের কার্যকরী পাটাতনটি সংকোচিত। অতএব বিকাশের উদিত চত্বরে ছোটকাগজই আমাদের আস্থাশীল হাতিয়ার গর্জে ওঠার নিমির্তে।
কৃষি নির্ভর কৌমসমাজ ভেঙে যাচ্ছে। কবর রচিত হলো এগ্রো-ইকোনমির। প্রান্তিক অর্থনীতির মূল হাতগুলো অপরিকল্পিত নগর রতির স্বাদ নিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। যার ফলে বির্স্তীন ফসলের মাঠে লোনা পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি ও লবন চাষ হচ্ছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মাটির উর্বরতা, প্রান্তিক সংস্কৃতি বিমুখ আমাদের উচিত, মোক্ষম সময়ে এসে আবার প্রান্তের স্বপ্নে জেগে উঠা। আমাদের উর্বর পলি মৃত্তিকা তার উর্বরতা হারাচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানী গুলো বির্স্তীন ফসলের মাঠে তামাক চাষ করছে। যার ফলে মাটির ক্ষতি হচ্ছে, ফলে আর ফলবে না সোনার ফসল একদিন সোনার বাংলায়। ফলে তাদের শিল্প বিকাশের জন্য তারা নানা কাজে ব্যবহার করবে আমাদের মত তৃতীয় দুনিয়ার ফসলের মাঠগুলো, নির্বাক বাস্তবতায় শকুনির থাবায় জ্ঞানশূন্য হয়ে যাচ্ছি। বিদ্রুপের উল্টো পিঠে তাই দেশ মাতৃকার স্বর স্তদ্ধতার কারণে আমারা বাঙলা মায়ের সন্তান বিরুদ্ধ সময়ে গর্জে উঠে হাত প্রসারিত করেছি পরস্পরের দিকে। সংশয়ে না থেকে। নির্ভয়ে ঘুমাও মা। আমরা জেগে আছি তোমার এই সবুজ গাঙ্গেয় বন্দ্বীপে।
Biology & Ecology পাশাপাশি চলিয়া আসিতেছে। এদের একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির কথা চিন্তা করা যায় না। Bio মানে Life প্রাণ।| Ecology Oiks মানে House অর্থাৎ আবাস। তাই Ecological Balance জরুরী। ইহা বজায় রাখতে হবে। না রাখিলে সমাজ জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তন দৃশ্যত আজ বিশ্বসভ্যতার বড় হুমকী। অথচ এর জন্য দায়ী প্রথম দুনিয়ার বাসিন্দারা। তাদের শিল্প-কারখানায় বর্জ্যই এই ভয়ানক পরিণতির অন্যতম কারণ। অথচ এর বলি শিকার হচ্ছে তৃতীয় দুনিয়ার মানবআত্মাগুলো।
বাঙলা সাহিত্যের শুরুকে আমরা চিহ্নিত করতে না পারলেও আবি®কৃত সত্যকে অস্বীকার করার কোন অনুযোগ নেই, স্বীকার্য সত্য যে চর্যাপদ হতে আমাদের যাত্রা শুরু এবং তা পাওয়া যায় গোয়াল ঘরে। এজন্য যে গোয়াল ঘর কে অস্বীকার করে জাতে উঠবো এমন কোন প্রয়াস-প্রচেষ্টা আমি ও আমাদের নেই। বাঙালীর যাপিত জীবন শৃঙ্খল-লোকসংস্কৃতি ও তার প্রত্নসংস্কৃতির সাথে গোবাচুর, গোয়ালঘর, গোয়ালিনী, রাখাল হতে শুরু করে তার নানা পর্বে গো-সম্পদ নানাভাবে সম্পৃক্ত হয়ে তৈরী হয়েছে, মিথ-পুরাণ-সাহিত্য-কবিতা ও লোকগান। কৃষিজীবী মানুষের গাম্ভীরা আমাদের অহংকার। কানু ও গোপী ঐতিহাসিক চরিত্র। কৃষ্ণ লীলা তার বাঁশী ও গো-প্রেম আমাদের যাপিত ধর্মের সাথেও সংলগ্ন হয়ে আছে। আমরা ভাটির মানুষ ধান ভানি আর মন বুনি সবুজ শ্যামল আলো-ছায়ায়। শিল্পের প্রতি ডেডিকেশন শেকড়ের ঘ্রানে, কারণ আমাদের আদি সাহিত্যের পর্ব থেকে যদি যাত্রা শুরু করি তাহলে মধ্যপথে এসে দেখি উপনিবেশকিতার দাসত্ব বৃত্তির মানসিকতা কিংবা স্বভাব জাত ফড়িয়া বৃত্তির কারণে আমরা ব্রেন-ড্রেন পদ্ধতিতে ইনপুট করা তকমা নামক তথা কথিত আধুনিকতার ভূষি মাল এর মিশ্রণে যে মালাই খেয়েছি তাতে সংক্রামিত হয়েছে আমাদের সাহিত্য। সাহিত্যে যে ভূ-সংস্কৃতির সহিত সম্ভাষণ রয়েছে তা নষ্ট হয়েছে। ধারাক্রমিক আমাদের সাহিত্য বিকাশের পথ পরিক্রমা বিচ্যুত হয়েছে। আমরা বাস্তবতাহীন ভাবে তছনছ করেছি সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামল এই সাহিত্য ভান্ডার। পোষাক বদলিয়ে আধুনিক হতে চেয়েছি কিংবা হয়েছি। নিজেকে কর্নভাট করে আদ্যপ্রান্ত আধুনিক হতে চেয়েছেন মধুবাবু। আধুনিকতার পাটাতনে আমরা সাধারণত শ্রী মধুবাবু’র মুখশী আঁকি। নানা প্রলোভনে লোভে নানা কায়দায় তার রূপান্তর হয় মাইকেল মধুসুদন হিসেবে। কিন্তু ভেতর সত্তার অন্তনিহিত সে সৌরভ তা নষ্ট করা সম্ভব নয় (Being in Itself) । অবশেষে তিনি ফিরে আসেন নিজের ভুল বুঝতে পেরে নতুবা বেশী সুবিধা করতে না পেরে। ইউরোপিয়ান হতে গিয়ে তিনি বলেন- ধান গাছে কি তক্তা হয়? অথচ তিনি জানতেও চেষ্টা করেননি যে গম গাছেও তক্তা হয় না। এই সবুজ গাঙ্গেয় বদ্বীপটি ধানগাছ দিয়ে সবুজ হয়নি। তক্তা হবার পোক্ত তক্ততা আমরা রপ্তানি করি এবং কেউ কেউ চুরি করেও পাচার করে। ইংরেজ হবার তার প্রাণান্ত প্রচেষ্টার পারদ Captive lady। একটি বিবেচ্য গ্রন্থ অথচ তাকে যথার্থ সম্মান দেওয়া হয়নি হবেই বা কেন? কারণ তিনি আগুন্তক, তাছাড়া শুধু বোধ পাল্টালেই হবে না, পোশাক বদলালেই হবে না, খাদ্য অভ্যাস ও আচারন পরিবর্তন করলে হবে না। চামড়া তুলে ফেলতে হবে কিন্তু তা কি সম্ভব? বঙ্গিম, রামমোহন… সহ নানা জনের হাতে নানা হিজেমনির প্রভাবে ভাঙ্গচুর হলো বোধ শাখা গুলো। গ্রহণ বর্জনের মধ্য দিয়ে তৈরী হল কনফ্লিক্ট। এই ঘেরাটপের মধ্যে দিয়ে কলোনিয়াল ভাষা ও সংস্কৃতি আধিপত্য বিস্তার করেছে আমাদের মূল্যবোধে। মিল্টনীয় সনেট শাখায় গড়ে ওঠে চতুদর্শপদী কবিতা। ডিভাইন অফ কমেডি’র ব্যপ্তি মেঘনাদবধ।
ইউরো-আমেরিকান আধুনিক জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে নিত্যবহন যোগ্য উপাদান কনডম। যা তারা পার্সের মধ্যে রাখে কখনো যদি পুরুষ সঙ্গির সঙ্গে না থাকে তাহলে ফি-মেইল সঙ্গির কাছে থাকে Lady কনডম। তাদের এদেশে আগমনের ফলে গড়ে ওঠে বন্দর সংস্কৃতি। চাহিদা জমে পতিতার। কলোনিয়াল বন্দর সংস্কৃতির প্রভাবে নদীমাতা বাংলার গঞ্জে ও বন্দরে তৈরী হয় পতিতালয়। তাদের ফেলে দেওয়া কনডম যেমন খুঁজে খেলা করে বেওয়ারিশ শিশু, ঠিক তেমনি হল মধুসুদনের অবস্থা। পাশ্চত্য ব্যবহার শেষে তাকে ছুঁড়ে ফেলার পর ঔপনিবেশিক মানসিকতা জাত তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে মহাকবি উপমা তিলকে। তার প্রত্যাবর্তনের পরের কবিতা যদিও টেনে হেঁচড়ে ভারতীয় কাপড়ে ঢাকা কিন্তু তার চোখ ও মনন ইউরোপীয়। এবং এই বীজের জারণে প্রবাহিত ছিল তার জীবন। তার বাবার সাথে দ্বন্ধ, বেহিসেবী জীবন, ব্যক্তিগত যাপন দাঁড় করিয়ে দেয় কাঠগোড়ায়। তার সামনে উপস্থিত ছিল সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনা অথচ করেন নীল দর্পন নিয়ে কাজ। এর দায়ভার মুক্তির অন্বষনের পেছনেও ছিল তার মনোজগতে বাসাবাঁধা ঔপনিবেশিক হিজেমনি। এভাবেই আধুনিকতার তকমা গিলে বাৎসায়নের অর্থশাস্ত্র হয়ে যায় কামশাস্ত্র বা কামসূত্র। ভারতবর্ষের ইতিহাস, পুরাণ, দোঁহা, লোকগান, গাজীরপট, গাম্ভীরাসহ জীবন হতে গড়ে ওঠা সাহিত্য হল বটতলার সাহিত্য। এই বোধ এবং ডিসকোর্স গুলোকে অচল, পুরাতন বলে ফেলে দিয়ে উলম্ফন সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে আমাদের চোখ ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছিল পান্ডবরা কোন দিকে? তাকি কি শুভঙ্করের ফাঁকি নয়? এই ফস্কা গেরোতে আটকা পড়ে আমরা লেপাপাদুরস্ত জন দৃষ্টিভঙ্গিকে করেছি সীমিত ও একরৈখিক।
ওই দেখ সাগরের পারে
শ্রমজীবী শত শত
কেমন সংগ্রামে রত
এই ব্রত-রবে না আধাঁরে
আয় তোরা দেখি যে সবারে
-শিবনাথ শাস্ত্রী
তথা কথিত ইয়াং বেঙ্গল নামে সে রেঁনেসার কথা বলা হয়েছে তা আসলে কোন মুভমেন্ট নয়। তারা মূলতই হঠকারীতার চর্চাই করেছে। যার ভেতর দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে বাঙ্গালীর যাপিত সংস্কৃতির মরমী ভজনা। আধ্যত্মিকতা সাধন যান্ত্রিক ধ্যান। ডিরোজিওর উস্কানিতে তারণ্য তার সর্বগ্রাসী ক্ষুধায় গিলেছে ইউরোপীয় ভাবনাচিন্তাকে, আত্মস্থ করেছে, যুক্তি বিসর্জন দিয়েছে তারা বিবেক তথা মানবিক মূল্যবোধ। তাহলে আজ কোথায় সেই স্পর্ধার উত্থান? যন্ত্রসভ্যতা কে ভিত্তি করে আমাদের সভ্যতা গড়ে ওঠেনি, তাই যুক্তি বাঙালীর সহজিয়া জীবন শৃঙ্খল নয়। কৃষি ব্যবস্থাকে ভিত্তি করে নদীমাতৃক এই অঞ্চলে সভ্যতা গড়ে ওঠেছে বলেই বিবেক তাদের কাছে প্রাধান্য পেয়েছে। অবিকৃত সত্যের মোহে যদি পিতৃপুরুষের বিশ্বাসকে ঢেকে ফেলা হয় তা হলে প্রতারণা করা হবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে। যার ফলে তৈরী হয় এবং হয়েছে শূন্যতা, যার পরিণাম হতাশা। তারই প্রামাণ্য ডায়াগ্রাম মুদ্রিত করেছেন ইয়াং বেঙ্গল গোষ্ঠী। ইংরেজী শিক্ষার প্রতি আগ্রহী ঐতিহ্য বিমুখীতার চর্চার ফলে আমরা হারিয়েছি একদল প্রতিভাবান তুর্কি। তার ঔপনিবেশ জাত শক্তি তৈরী করে একটি ফাঁকা ও ফাঁপা সময় যার ভেতর দিয়ে ইনপুট করে তাদের বোদ্ধিক ফমূলা। তার ঐ অযাচিত সময়ের মুখছবি- কৃষ্ণ মোহন বন্দোপাধ্যায়, তারা চাঁদ চক্রবর্তী, দক্ষিণানন্দ মুখোপাধ্যায়, রায়গোপাল ঘোষ, রসিক কৃষ্ণ মল্লিক, প্যরীচাঁদ, রাধানাথ শিকদার, এই সমস্যার ঘেরাটপে বন্দি দুষ্ট চক্রের আগ্রাসনে কবলিত। হিন্দু সম্প্রদায় সিরাজদ্দেীলার পতনের পর ইংরেজদের সাথে কম্পোমাইজ করে সাহিত্য দখল করে নিচ্ছে, তখন এই মোহে ভ্রষ্ট হয় আবদুল লতিফ কর্তৃক গঠিত মোহামেডান লিটারেটি সোসাইটি যাহা একই সমস্যায় আক্রান্ত ।
অবক্ষয়ের সীমা ডিঙ্গিয়ে প্রকৃতি আপন নিয়মে নতুন আঙ্গিকের সন্ধানে ব্যস্ত হয়। নতুন কবিতায় ভরে ওঠছে এই শ্যামল বাংলা। আমরা চাই অতীতের সাথে অন্বয় রক্ষা করে অগ্রসর হতে। অতীতের সমস্ত বর্জ্য কে ক্যাথারসিস করে বাদ দিয়ে নতুন সময়ের অনুপম স্বর দ্যোতনায় ভূ-সংস্কৃতির আলোকে কবিতাকে বিন্যাস করতে। অন্বয় রক্ষা মানে ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা। ছন্দের শাশ্বত স্কুলের দেয়ালে আঁকা কাঠামোতে আমাদের কবিতা নয়। হৃদয়পুরের দাবীতে আমাদের কবিতার গন্তব্য অব্যাহত নিশ্চিন্তপুর। আমাদের কবিতার কোমল শরীরে একদিন খোদিত হবে নতুন ব্যাকরণ ও ছন্দ যা আবিষ্কার করবে চতুর্থ শ্রেণীর লোচকরা, যারা ‘অ’ বর্গ ও ‘ড’ বর্গের ফ্রেমে বন্দি আজো সেমিনার রুমে । ভেদ রেখা সনাক্ত করে অভেদের সন্ধানে আমাদের যাত্রা অব্যাহত কাব্যিক রিদমে শব্দের লাচাড়ি ছন্দে।