একেকটা ছবি আমাকে বিপন্ন করে তোলে। একটা দেওয়ালের উপরে লাগানো একটা ছবি। হঠাৎ মনে হয় দেওয়ালটা কি তৈরিই হয়েছিল ছবিটির জন্য নাকি ছবিটি আঁকা হয়েছে শুধুমাত্র ওই দেওয়ালটাতে জায়গা করে নেবে বলে! এভাবে ভাবতে ভাবতে আমি কখন যেন ছবিটির ভেতরে নেমে যাই। নামতে নামতে পথ, পথের উপর পাথর, পাথরের তৈরি পথ। আমি সেই ছবিটার স্রষ্টার কথা ভাবতে থাকি। যে শিল্পী সেইতো স্রষ্টা। নাকি অন্য কেউ, যে ওই দেওয়ালটির জন্য ছবিটির নির্মাণ করিয়েছেন। নাকি ছবিটি আঁকা হবে বলেই একটি দেওয়াল নির্মিত হল। একটি বাড়ি, তার ভেতর অনেকগুলো ঘর, একেকটা ঘরে চার চারটে দেওয়াল, তারই কোনো একটি দেওয়ালে একটি নিয়তি নির্ধারিত ছবি! ভাবা যায়! আমি জানি না এইসব বিপন্নতার কথা আমি কাকে বলব! আমি জানি না আমার এইসব পাগলামি শুনে কেউ হেসে উঠবে নাকি। তবু যুদ্ধের ধারাপাতে আমার এই বিষণ্ণতা হয়তো খুবই স্বাভাবিক ভেবে নিয়েই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে নিজের কাজে। চারিদিকে যখন যুদ্ধ যুদ্ধ রব, হাহাকার আত্মীয় পরিজনের। তেলের জন্য চিন্তা, গ্যাসের লাইনে ভিড়, আমি তখন এইসব ভাবছি? এইসব? আমার কি যুদ্ধের কথা ভাবা উচিত নয়! এখন কি মানুষের অসহায়তার কথা ভাবার সময় নয়! হয়তো তাই। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা। এই যে দেওয়ালে এই মুহূর্তে যে ছবিটা টাঙানো আছে কয়েক বছর পরেও কি এরকমটাই থাকবে? নাকি বদলে যাবে দেওয়ালের রং, বদলে যাবে ছবি! ছবি কি আদৌ বদলায়! নাকি বদলে যায় মানুষের দর্শন, দেখার ভঙ্গিমা। হয়তো আজ যে বাড়িটির দেওয়ালে একটা ছবি টাঙানো আছে কয়েক বছর পর সেই বাড়িটাই আর থাকবে না বরং সেখানে থাকবে আস্ত একটা শ্মশান। বা সারি সারি কবর। গণকবর! বা হা হা শূন্যতা। ঘর নেই বাড়ি নেই দেওয়াল নেই ছবি নেই কেবল খাঁ খাঁ শূন্যতা। হয়তো সেই শূন্যতার নিচেই কোথাও চাপা পড়ে আছে সেইসব ছবি, সেইসব দেওয়াল, সেইসব মানুষের ঘরবাড়ি। নাকি সেগুলো ছাই হয়ে গেছে যুদ্ধের আগুনে পুড়ে! যেমন ভাবে পুড়ে যায় লাশ। তারপর ছবি হয়ে সেজে ওঠে দেওয়ালে। তাহলে এই যে সব বাড়িঘর পুড়ে গেল, ছাই হল, এদের ছবি আমরা কোথায় টাঙাব! আমরা মানে কারা! যারা এই বাড়িঘরের সঙ্গেই পুড়ে খাক হয়ে গেছি! আহ মানুষ বিপন্ন অসহায় মানুষ। এইসব না ভেবে এসো বরং যুদ্ধ যুদ্ধ খেলি। শিশুর মুন্ডু নিয়ে খেলি। মানুষের হাড়গোড় নিয়ে খেলি। ধোঁয়ায় ভরা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিই সেইসব হাড়গোড় মুন্ডমালা। দেখি কে লুফে নেয়। দেখি কে চিবিয়ে নেয় আমাদের আক্রোশ। দেখি কে আশ্বস্ত করে, বলে ঘরে যাও, আর দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকো আর ভাবো একটা ছবি আগে আঁকা হয়েছিল নাকি একটা দেওয়াল আগেই তৈরি হয়েছিল, ওই ছবিটির জন্য!