ফুল
সূর্যের এমন পরিক্রমণে রা কাড়ে না ছোট্ট শিশুটি।
ক্লোরিন বোমায় ধ্বংস উঁচু নীচু পাথরের স্তূপ— তার থেকে নরম হাত পা তুলে কঁকিয়ে বেরোচ্ছে পৃথিবীর জল ও বাতাসে। রাসায়নিক আর লাশের পচা গন্ধ চারিদিকে, তার মধ্যে বীজোত্থিত দেহটি তার নিস্প্রাণ দুমড়ানো সবুজ।
ওর ইচ্ছে ও ফুল হয়, ঝাঁকড়া ফুলগাছ৷ ওর বাবা মা’র ইচ্ছে ছিল বৃক্ষ হবে, সোপর্দ রাখবে প্রকৃতির নানাবিধ কাগজদলিল। পাখি আসবে, পোকামাকড়, অনেক লতানে গাছ ওর প্রেমে জড়াবে যৌবনে। যেমন স্বাভাবিক ইচ্ছে, বাঁচবার নিয়ম কানুনে— সুমিষ্ট ফল হবে, অন্তত ছায়ার জোগাড়।
ওর ইচ্ছে বৃক্ষজ কিছু নয়, ও একটু নিশ্বাস নেবে, একটু মুখ তুলে দেখবে আশেপাশে বন্ধু কেউই নেই— ও তখন ফুল হবে, অন্তত একটিমাত্র ফুল।
ফুলটি হবেনা লাল, তাও শিশু ভেবেছে মনে মনে, যত রাত পেরিয়েছে, বয়স বেড়েছে ক্রমে ক্রমে। রক্ত ও ধূসর রং পাশাপাশি দেখতে দেখতে ছোট চোখ গাড়ির গরম বনেটের গন্ধ পেয়েছে, বোমার পেটের মধ্যে নাড়িভুঁড়ি কীভাবে ফাটছে তার দৃশ্যও কল্পনায় দেখে, শিশুটি অন্য কোনো রং চায়, অন্য কোনো শেডে।
সূর্যের এমন পরিক্রমণে শিশুটি তবু কল্পনাপ্রবণ হল— ফুল, প্রেম, ইতিহাস, সেই তার জরায়ুকল্যের স্মৃতি – চক্রব্যূহে কীভাবে ঘিরেছিল তার জন্মস্থান, সেই সব মনে পড়ে এবং সে সব ছেড়ে ভালবাসে ভোরের নিদান। কেন না তখন সব শান্ত হয়ে আসে। ধোঁয়া উঠে উঠে ঠান্ডা হয়ে আসা, অধুনা অনুজ্জ্বল অনুর্বর পঙ্গু মাটিতে মাথা ঘষে ঘষে আর কোনো হিংস্র স্পৃহাই জাগেনি। অথচ এমন হওয়াটি তার অভিব্যক্তির অনুশাসনগ্রাহ্য নয়!
তবুও অপুষ্ট সবুজকে সে সেই লজ্জাহীন সূর্যেরই ক্লোরোফিলে নিল ভেপে। তার সামনে সংগোপনে নত হল উর্দিধারী বোমারু বাতাস। ঝড় পেরোনো অদ্ভুত রাতটির মৃত যোনি থেকে, যে শিশুটি তাকিয়ে দেখল এই কালো পোড়া সভ্যতার দিকে- চোখে তার দীর্ঘ মাজার, বৃন্দা রাগের মতো ভালোবাসা, ক্ষমা।