Email: info@kokshopoth.com
April 28, 2026
Kokshopoth

নির্মল রায় 

Apr 24, 2026

 গদ্য

নির্মল রায়

শাস্ত্রীয় সংগীতের চিত্র প্রকৃতির যুদ্ধ বিরোধী ইতিহাস 

 

১৪০০ শতাব্দী থেকে শুরু করে ১৯০০ শতাব্দী পর্যন্ত শাস্ত্রীয় সংগীতের চিত্র প্রকৃতির যুদ্ধবিরোধী ইতিহাস দক্ষিণী, রাজস্থানী, মুঘল, পাহাড়ী প্রভৃতি ভৌগোলিক- সাংস্কৃতিক ঘরানাগুলির পরিসরে সমৃদ্ধ।প্রায় ৫০০ বছরের ব্যবধানে ভারতবর্ষের বুন্দি, বুন্দেলখন্ড, হায়দ্রাবাদ, কাংড়া, উনিয়ারা, মেবার, বিকানির, আহমেদনগর, গোয়ালিয়র, মালোয়া প্রভৃতি স্থানকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষমতা দখলের অশান্ত যুদ্ধ বিগ্রহের মধ্যেও গড়ে উঠেছে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের শান্ত চিত্র প্রকৃতির ইতিহাস।

 

চিত্রে যেমন ঊর্ধ্বরেখা, অধোরেখা, আলো-ছায়ার দ্বন্দ্বময় সঞ্চরণ, সংগীতেও তেমনই আরোহণ, অবরোহণ, পকড়ে রাগিণীর বিস্তার। গুণকলী রাগিনী- কেন্দ্রিক মধ্য অষ্টাদশ শতাব্দীর বুন্দেলখন্ড মিনিয়েচারে ঘোর বেগুনী আকাশ, নিচে শ্যাওলা-সবুজ জমি, বাগান। দুটি মেয়ে গাছ থেকে ফুল তোলে। এক মেয়ে ডালায় করে ফুল নিয়ে এসে নায়িকাকে দেয়, নায়িকা ফুলমালা গাঁথে। অভ্যন্তর কক্ষে অন্য একটি মেয়ে শয্যা প্রস্তুতরতা। এই ছবিতে ব্যবহৃত তীব্র বেগুনী, শ্যাওলা-সবুজ, খয়েরী, ছাইসাদা এবং নীল রং-এর ‘আশে’ ছবির প্রকৃতি ধূসর, বেদনার্ত এবং মলিন । 

 

তোড়ী রাগিণীর ওপর অঙ্কিত অষ্টাদশ শতাব্দীর একটি দক্ষিণী চিত্রে নায়িকার হাতে বীণা। তাকে ঘিরে পাহাড়ী মালভূমির সবুজ ঘন ঘাসের ওপর হরিণেরা চরে বেড়ায়। পাহাড়ের ওপর নগর। নিচে ঝিলে পদ্মফুল। 

 

তোড়ী রাগিণীকে কেন্দ্র করে ১৭২৫ খ্রিস্টাব্দে অঙ্কিত হায়দ্রাবাদের দক্ষিণীধারার একটি চিত্রকলায় বীণাবাদনরতা নায়িকাকে বনের মধ্যে একটি টিলার ওপর বসে থাকতে দেখা যায়। পেখম মেলে ময়ূরের দল তাকে ঘিরে থাকে।গাছের ওপরেও ময়ূরের দেখা মেলে।

 

রৌপ্য নীল, লেবু- হলুদ, হলুদ- সবুজ, শুদ্ধ নীল ও মেটে বর্ণের তাল ও ছন্দে এ চিত্রে মুক্ত, চির- শান্ত, সূক্ষ্ম ও আনন্দময় প্রকৃতির মীড় ও জোড় অনুরণিত। 

 

‘কাব্য প্রভাকরে’ রাগিণী সুষমার গমক— 

 

সুন্দর অংগ অনংগ ভরী ছবি শ্যামল বিন্দু বিয়াজিত থোড়ী। অম্বর শ্বেত উরোজ উটংগণি নাগিনিসী অলকাঁই উজুগ ছোড়ী।। ঘুমন্ত তানন বাঁধন সোঁকর চুমতে কাননকে মৃগ মোড়ী। তাঁহি নাচাবত বীন বজাবত প্রীতম কে গুণ গাবত টোড়ী।। 

 

ললিতা, ললিত বা ললত রাগিণীকে কেন্দ্র করে মধ্য অষ্টাদশ শতাব্দীর বুন্দেলখন্ড মিনিয়েচারে কক্ষমধ্যে শয়নরতা নায়িকা। বাইরে নায়ক মালা হাতে দাঁড়িয়ে। পরিচারিকাদের হাতে, থালার ওপর গোলাপ জলের ঝারি, ফুল। কারো হাতে বীণা, কারো হাতে মশাল। নিম্নকক্ষে পর্দার অর্ধ অন্তরালে এক রমণী। 

 

ঘন কালচে নীল, পত্রসবুজ,ঘোর- সবুজ, পীত -সাদা, লাল, হলুদ, খয়েরী, আকাশী নীল বর্ণসজ্জায় এ চিত্রের প্রকৃতি সোচ্চার, গতিময় অথচ পরিমিত আন্দোলনে ধ্বনিময়।

 

রাজ-রাজণ্যবর্গের তীব্র লড়াই আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আবহের মধ্যেও শিল্পীর তুলির এ নিঃশব্দ, অভিমানী চিত্রভাষা কবির কাব্যে ভাবের মাধুর্য, ভাষার শুদ্ধতা, গীতরীতির গাম্ভীর্য ও ছন্দের বৈচিত্রে সঞ্চারিত।

 

 আশাবরী রাগিণী সম্ভবত প্রাচীন সাপুড়েদের সুর থেকে সৃষ্টি। তাই এই রাগিণীকে ভিত্তি করে অঙ্কিত একটি ছবিতে এক আদিবাসী যুবতী রমণীকে তার স্বজাতি পোষাকে সজ্জিত হয়ে থাকতে দেখা যায়। তখনো তার প্রেমিক আসেনি। তাই সমস্ত চিত্রক্ষেত্র বেদনার সূরে আকীর্ণ। রমণীটি যুদ্ধকালীন দুঃখের সময়কালকে ভুলে থাকবার জন্যে সাপুড়েদের সঙ্গে সাপ নিয়ে খেলা করে। ছবিটির প্রকৃতি বেদনাদীর্ণ, সংযত এবং আত্মনিমগ্ন, প্রাণশক্তিতে দীপ্যমান।

 

বিলাবল রাগিণীর একটি চিত্রে নায়িকাকে ব্যস্তসমস্ত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। একটু পরেই তার প্রেমিক এসে পড়বে। তাই তার সাথে সাক্ষাতের প্রস্তুতি হিসেবে সে সযত্নে প্রসাধন শেষ করে পরিচারিকার হাতে ধরা আয়নায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে দেখে কোথাও কিছু ত্রুটি থাকল কিনা। যদিও মূলগতভাবে বিলাবল রাগিণী শান্ত প্রকৃতির, তথাপি এ চিত্রের প্রকৃতি উদ্বিগ্ন, চঞ্চল এবং অনিশ্চিত।

 

রাগিণী ককুভার শান্ত, সুন্দর, সুর- ছন্দময় এ চিত্ররূপ কবির কাব্য ভাষায় অন্তরিত।

 

বিঠুরী অলকৈঁ আঁখিয়া ললকৈ দুতি যোবনকী ঝলকৈঁ তনমৈঁ।

পট কেসরিয়া উভরী ছতিয়াঁ দরকী অঙ্গিয়া পরিরম্ভন-মৈঁ।।

 

১৫৯০ খ্রিস্টাব্দের মুঘল-মারাঠা যুদ্ধক্ষেত্র আহমেদনগর ও দক্ষিণী রীতির একটি চিত্রে হিন্দোল রাগের রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। এই চিত্রে নায়ক- নায়িকা পত্রপুষ্পে আচ্ছাদিত গাছের শাখা থেকে ঝুলিয়ে রাখা দোলনায় দোল খায়। এদেরকে ঘিরে থাকে নারীর দল। তাদের হাতে বীণা এবং রং-এর পিচকিরি। ঘন সবুজ, নীল খয়েরি বর্ণের শোভাযাত্রায় এ চিত্রের অন্তর্সত্তা উচ্ছ্বসিত, আনন্দময়, সজীব এবং প্রাণবন্ত। 

 

রাগ হিন্দোল এবং রাগিণী তেলেঙ্গিকে ভিত্তি করে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধবিধ্বস্ত গোয়ালিয়র ও দক্ষিণী রীতির একটি যৌথ চিত্রে দুটি তপস্যামূলক, প্রাণধর্মী চিত্রের সম্মিলন। ওপরে চতুর্মুখ দেবতার চতুর্হস্তে কমন্ডলু, রুদ্রাক্ষের মালা, পদ্মফুল এবং অস্ত্র। তাঁর পাশে দুজন জ্ঞানী পুরুষ। এঁদের সামনে রাজা উপবিষ্ট, তাঁর হাতে ধনুর্বাণ। নিচে গাছ থেকে ঝোলানো দোলনায় নায়িকা দোল খায়। পরিচারিকারা দোলনা দোলায়, চামর দিয়ে নায়িকাকে বাতাস করে।

 

ভারতীয় আদি ছয়টি রাগের ষষ্ঠ রাগ শৃংগাররসযুক্ত মেঘরাগভিত্তিক ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দের মালোয়া, মধ্যভারতের একটি চিত্রে ঘনকালো আকাশে বিদ্যুতের ঝালকানি। সাদা বকের দল উড়ে যায়। নিচে নায়ক- নায়িকা নৃত্যরত। সখীরা সেতার, শ্রীখোল ও করতাল নিয়ে গীতবাদ্যের মাধ্যমে নৃত্যে অংশগ্রহণ করে।

 

শিল্পী মাধোদাসকৃত গৌণ ও শীতল- সংবেদী শ্যাম বর্ণচরিত্রের এই মেঘরাগকেন্দ্রিক চিত্রকলায় ধাতব কালো, জোৎস্না- সাদা, লাল ও প্রতিপ্রভ হলুদ বর্ণ সমন্বয় রাগিণীর প্রাণময়, ছন্দবদ্ধ, আবেগী সত্তা পরিচয়কে প্রকট করে।

 

শুদ্ধ সা সমন্বিত দক্ষিণ ভারতীয় ঠাটের শেষতম ঠাট ‘রসিক প্রিয়া’। এই ঠাট অবলম্বনে মুঘল-রাজস্থানী ক্ষমতা টানাটানির রক্তেভেজা সময়কালে বিকানির-এর রাজস্থানী একটি চিত্রে নায়িকা গৃহসংলগ্ন ছাউনিতে উপবিষ্টা। তার মুখ আংশিক ওড়নায় ঢাকা। গাছের ডালে ময়ূর। মুক্ত প্রকৃতি।

 

‘রাগমালা’ চিত্র হিসেবে কথিত এই চিত্রকলাগুলি ভারতীয় চিন্তা চেতনা ও যুদ্ধবিরোধী সমচৈতন্যের গতিশীলতায় শাস্ত্রীয় সংগীত ও চিত্রকলার পারম্পর্য পরিবাহী মৌলিকভাবের অনুসৃত। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ভারত- ইতিহাসের খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগে থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রাক বৈদিক, বৈদিক ও পৌরাণিক এই তিনভাগে বিভক্ত প্রাচীন যুগ, ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমভাগ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত মধ্যযুগ এবং উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে আজ পর্যন্ত সময় রেখার আধুনিক যুগ— এই তিন কাল সীমার মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন সামরিক শাসনের সমরনীতির পরিবর্তনের সাথে সাথেও অগ্ৰগামী।

 

এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথে সুকুমার কলার সমস্ত বিভাগগুলিই পরস্পর পরস্পরকে সহমর্মে ও সহযোদ্ধাসুলভ মননে সাহায্য ও সমৃদ্ধ করেছে। শাস্ত্রীয় সংগীত ও চিত্রকলার পারম্পর্য এরকমই এক যৌথ সহযাত্রায় পারস্পরিক নির্ভরতায় অস্ত্রহীন শান্তি স্থাপনের আশয় নির্দেশ করে। 

 

চিত্রকলাগুলির আকারের আদিম তাৎপর্য, বর্ণপ্রতীক, উজ্জ্বল রং যেমন সক্রিয়তলে প্রক্ষেপিত, সংগীতেও সেরকম স্বর, শ্রুতি গ্রাম মুর্ছনায় রাগরাগিনীগুলির প্রাণশরীরে শান্তির অনুভব সন্তরিত। রাগরাগিনীগুলির দৃশ্য চিত্ররূপে মানব অন্তস্থ যুদ্ধের কোলাহলমুক্ত অনুভব, আবেগ, ভাব, বিভাব ও অনুভাবের স্থায়ী, আস্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ প্রভৃতি শান্ত আনন্দময় ‘তুকে’র অধিবাস। কুমারস্বামী একেই ‘profoundly imagined pictures of human passion’ বলে চিহ্নিত করেছেন। 

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ 

১.Birla Academy of Art&Culture,Calcutta 

২.Indian Museum, Calcutta 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জিঃ 

১.চিত্রকলায় পূর্ব-পশ্চিম- বিমল দেব 

২.Rajput Painting-A.K. Coomarswami 

৩.Rajput Painting-O.C.Gangoly 

৪.Indian Painting-C. Sivaramamurthi

৫.Indian Miniature Paintings- Asharani Mathur, Rupinder Khullar 

৬.Indian Museum Bulletin, Calcutta, July, 1967 

৭.সঙ্গীত ও সংস্কৃতি/ ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস- স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ 

 ৮. রাগ ও রূপ (প্রথম ভাগ)- ঐ 

 ৯.The Music of India- Shripada Bandopadhyaya

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *