কবিতাঃ দুর্লভ ঠাকুর
কবিতাঃ দুর্লভ ঠাকুর
কবির নিজের জবানেঃ
জন্ম বীরভূমে হলেও বেড়ে ওঠা ইস্পাত-কারখানার শহর দুর্গাপুরে। সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করার সুবাদে জীবনকে বুঝতে শিখেছি অন্যার্থে। দেখতে শিখেছি জীবনের অন্তরে থাকা অন্য একটা জীবন-বোধকে। তাই নিয়েই লেখালেখির শুরু করি। পছন্দের কাজের তালিকায় রয়েছে ছবি তোলা, বই পড়া, নিরালায় বসে অনর্থক নানান কিছু চিন্তা করা, আড্ডা দেওয়া ইত্যাদি অনেক কিছুই। পড়াশোনার শুরু পাড়ার স্কুলে, তারপর সেখানেই মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি ছাড়িয়ে দুর্গাপুর সরকারি মহবিদ্যালয়ে বাংলায় স্নাতক, পরবর্তীকালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাশ করি বিগত বছরে। আপাতত নিজে পড়ি ও ছাত্রদের পড়ানোর চেষ্টা করি এবং উচ্চশিক্ষার দৌড়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছি।
কথা ১
জানালা দিয়ে বয়সের বাতাস বাড়িতে ঢুকছে। একটা বেড়াল ছানা তার ঘন উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছে আমার বিছানার দিকে। বিছানার ওপর বুক খুলে পড়ে আছে আমার কবিতার বই। খাটের পাশে টেবিলে নামানো রয়েছে পুরোনো রেডিও। তাতে চলছে সুমনের গান। কবির সুমন। যিনি মনের কথা গানে জুড়ে দেন। আমার একটা অনুরাগ জন্মেছে তোমার ওপর। কীসের থেকে, তা বলতে পারি না। আমি চাইছি, এখন শীত পেরিয়ে বসন্ত আসুক তোমার শরীরে। হঠাৎ ঘুমে ক্লান্ত হয়ে যাক সমস্ত শরীর। মনের ভেতর যে ছোট মনটা ক্রমশ নিজেকে বিদীর্ণ করে তুলছে, তার একটা শাস্তির প্রয়োজন।
কথা ২
কুয়োতলায় জ্যোৎস্নার বৃষ্টি পড়ে। দূরে কারখানায় হই-হট্টগোল। এখানে বাতাসে কার্বনের পরিমান অনেক বেশি। মন এখানে বিষণ্ণ। শরীর এখন ঝিমিয়ে আসছে। বারো ঘন্টার পর এখন একটু বিরতি। কলের জলে মুখ ধুয়ে নেব। তারপর বাটি সাবানে ঘষবো হাত। বৌ টিনের চালের আড়ালে ভাত চড়িয়েছে। আজ বিদ্যুষবার। নিরামিষ। ডালে ছাই পড়েছে। কলকারখানার চিমনি থেকে যা উড়ে বেড়ায় অনেকের ঘরে ঘরে, দোরে দোরে। আমার শরীর এখন কেবল বিশ্রাম নিতে চাই।
কথা ৩
তুলসী তলার সামনে একটা নীল বালতি। বালতির মধ্যে কী যেন একটা রয়েছে। উঁকি দিচ্ছে। বাম দিকের নারকেল গাছের কান্ডকে আঁকড়ে ধরে ওপরে উঠে গিয়েছে সরু লতার গাছ। তার গায়ের রং হলদে-সবুজে। আপনি চা খাবেন, প্রশ্ন উঠে আসে সাদা থানের এক বৃদ্ধার কাছে থেকে। চুলগুলো এখন তার পেকে গিয়েছে। হাতের বালাগুলিতে মরচে ধরেছে। আমি সদর্থক উত্তর জানাই। তিনি এগিয়ে আসেন আর ক্রমশ বিলীন হয়ে যায় আমার ভ্রম। স্বপ্ন। গাফিলতি।।
কথা ৪
আমার খুব ইচ্ছে ছিল প্রেসিতে পড়ার। কবিতা লেখার। রাস্তা দিয়ে মিছিলের আওয়াজ ঘরে ঢুকছে। একটা হলদে আলোয় ঝলমল করছে আমার জানালার কাঁচ। আমার ইচ্ছেগুলো কোনোকালেই বৃদ্ধি পাইনি। আমি অক্ষমতার অসুখে ভুগছি। বাড়ির ভেতরে বিছানার ওপর আমি কেবল পঙ্গু হয়ে উঠছি। আমার লেখার ক্ষমতাটুকু নেই। আমি যা কিছু লিখছি, সেসব লেখা হারিয়ে ফেলছি। আমার খাটের তলায় ইঁদুরের বাসা। আমার কবিতাগুলো তাদের পুষ্টি জোগায়। আমার বইয়ের তাকে উইপোকা আর শ্যাওলার বাস। আমার পেনদানিতে সিগারেটের ছাই। আমার হৃদয়ে ঝড় ওঠেনা, বৃষ্টি পড়ে না। গাভি চড়ে না। আমি কোনোদিন বাজার হাতে আনমনা হয়ে ভুটান চলে যেতে পারিনি। আমি রাঢ়ের গন্ধ পাইনি কোনোদিন। আমি খেজুর রস আস্বাদন করিনি। আমি কেবল স্বপ্ন দেখেছি। অনেক বড় হওয়ার, কিন্তু বড় হতে পারিনি।।