Email: info@kokshopoth.com
February 19, 2026
Kokshopoth

মোখলেস মুকুল

Feb 18, 2026

গল্প/আখ্যান

মোখলেস মুকুল

 

রং বিনাশী রং

মাস ছয়েক আগে আমার স্ত্রী গত হলে আমাদের দীর্ঘ আড়াই যুগের বুড়ো ন্যাড়া গাছের থ্যাবড়ানো বাকলের মতো দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। স্ত্রী আমার চেয়ে বছর তিন—চারেকের ছোটো, আমার এখন ষাট ধরধর। এই বয়সেও তাকে নিয়ে প্রায়ই খ্যাপাটে এবং নান্দনিক উভয় ধারার স্বপ্ন দেখি। লম্বা দাম্পত্য জীবনাবসানের পর যে শূন্যতা আর নিঃসঙ্গতা বিরাজ করে, তাতে কম বেশি সব বিধবা বা বিপত্নীকই বোধ হয় একটু আধটু এমন বিড়ম্বনা বা আড়ম্বনায় পড়ে থাকতে পারেন। আমি একটু বেশি, এই যা।

অঙ্ক না কষে গড়পড়তায় এর কারণ হিসাবে ধরে নেওয়া যায় আমি তাকে একটু বেশি ভালোবাসি বা বাসতাম। তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসতাম তুলাদণ্ডে না মেপেও বুঝে নেওয়া যায়, যদি সে কারণগুলো মানুষ জানতে পারে। ব্যতিক্রম বাদ দিলে সব মানুষের কাছে মায়ের স্থান সবার ওপরে। অথচ স্ত্রীর প্রতি আমার প্রগাঢ় ভালোবাসা সব ভালোবাসাকেই হার মানায়। উদাহরণ আর ক—টাই—বা দেওয়া যায়, যখন প্রায় প্রতিদিনই স্ত্রীর ভালোবাসার কাছে সবকিছুই পারস্ত হয়। থাক, বারবার স্ত্রী প্রিয়তার কথা বলে বাহাদুরি আর আদিখ্যেতা দেখাতে চাই না। অন্য কোনও বিষয় নিয়ে গল্প করা যাক।

 

অন্য এক গল্প:

 

বছর তিনেক আগের কথা। তখনও মা বেঁচে। শুনতে পাই পাক—ভারত যুদ্ধ! অবশ্য ঢাকার মিরপুর স্টেডিয়ামে। এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারত ও পাকিস্তান। পাক—ভারত ক্রিকেট মানে আলাদা উত্তেজনা। ফাইনাল হলে তো কথাই নেই, যদি মাঠে উপস্থিত থেকে উপভোগ করা যায়, তাহলে তো পোয়া বারো। বহু লাইন ঘাট করে, পাঁচ শ টাকার টিকিট পাঁচ হাজার টাকায় সংগ্রহ করেছি। পাঁচ যাক, সাত যাক, খেলা ইজ খেলা। দেখতেই হবে। কিন্তু আমার বউ কিছুতেই যেতে দেবেন না। সুন্দরী, শিক্ষিতা, উচ্চবংশীয়, স্টাইলিস্ট বউ, সাজুগুজু করে ফিটফাট থাকতে যতটা পছন্দ করেন ঠিক ততটাই অপছন্দ করেন ক্রিকেট। এই খেলা আমি পছন্দ করি বলে কিনা জানি না, ফুটবলটা তার খুব পছন্দ। আমারও। সেটা তিনি জানেন না। যেদিন জানবেন সেদিন থেকে তিনি ফুটবলটাও অপছন্দের তালিকায় আনবেন। এমন হাজারখানেক অপছন্দ তার আছে, যা আমি পছন্দ করি। কি আর করা, তেল মালিশ, এক শ একটা বায়না পুরণের ওয়াদা, বিশেষ করে আগ্রার তাজমহল দেখতে যাওয়ার যাবতীয় খরচের অগ্রিম চেক সই করিয়ে নেওয়ার পর আমাকে খেলা দেখার অনুমতি দেন।

খেলা শেষ পর্যায়ে, ভারতের নয় উইকেট গন। ক্রিজে ডানহাতি তুখোড় ব্যাটসম্যান, সেস্না—মিডিয়াম পেচার, লেগ ব্রেক, অফ ব্রেক বোলার, লিটল মাস্টার ব্লাসটার, মাত্র পাঁচ ফিট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার, ক্রিকেট ওয়ান্ডারস সাচিন টেন্ডুলকার তখনও উকেটে, পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে।

অন্য দিকে বল হাতে বামহাতি ফাস্টর্ বোলার, গড়পড়তা বলের গতি ঘণ্টায় এক শ চল্লিশ কিলোর ওপর, সাত ফুট এক ইঞ্চির দৈত্য, সর্টপিচ দূর কী বাত গুডলেংথ এমন কী ইয়র্কারেও হরহামেসা বাউন্সার দিতে পারেন উচ্চতার বদৌলতে, সেই সর্বকালের সেরা ক্রিকেট জায়ান্ট মোহাম্মদ ইরফান টর্নেডো হয়ে মিরপুরের আকাশে ওড়েন।

লাস্ট বল…

ভারতের দরকার দুই রান। পাকিস্তানের এক উইকেট।

গ্যালারিতে কেমন উত্তেজনা বিরাজ করতে পারে! আমার কথা না হয় বাদই দিলাম। মাঝে মাঝে নিজের পালস নিজেই দেখি আর চিন্তা করি হার্ট এ্যাটাক হচ্ছে কী না!

এক প্রান্ত থেকে ইরফান দৌড় শুরু করেন, লম্বা রানআপ। তার বাম হাতের মুঠোয় কাঠের বল অনেকটা পৃথিবীর মতো লাগে। গতি ক্রমশ বাড়ে…

ক্রিজের ওপাশে সাচিন ব্যাট ক্রিজে ঠুকিয়ে ঠুকিয়ে পজিশোনিং করেন আর উইকেট আগলে রাখেন। তার হাতের কাঠের ব্যাটটাকে মনে হয় টুথপিক। তিনি ওটাকে উঁচিয়ে ধরেন…

গ্যালারি থেকে কেউ কেউ চিৎকার করে, “দেখো দেখো, ইরফান গোটা পৃথিবীটাকে হাতে নিয়ে ছুটছেন আর টেন্ডুলকারের হাতে ব্যাটের বদলে দাঁতখিলান! হা হা হা…”

ইরফান ঝড়ের গতিতে পৃথিবীটাকে ছুঁড়ে দেন… আর ওটাকে লক্ষ্য করে সাচিন টুথপিক সজোরে চালিয়ে দেন…

এক দিক স্ট্যাম্প ভেঙে বেল গড়িয়ে যায়, অন্য দিক পৃথিবীর চি‎হ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না!

উভয়পক্ষের সমর্থকদের মধ্যেই উত্তেজনার শেষ থাকে না। ভারতীয় সমর্থকরা ভাবে, পৃথিবী হাওয়া, অতএব ছক্কা। পাকিস্তানি সমর্থকরা ভাবে, উইকেট তো ভেঙেছেই।

থার্ড আম্পায়ার তন্নবিতন্ন করে কারণ খুঁজেও হতভম্ব। গ্যালারির পঞ্চাশ হাজার মানুষের এক লক্ষ চোখ ফাঁকি দিয়ে পৃথিবীটা কীভাবে, কোথায়, কোনদিকে হারিয়ে গেল! স্টাম্পের বেল পড়ে যওয়ার কারণও খুঁুজে পাওয়া যায় না। কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তও দিতে গরিমসি করেন।

দুই পক্ষের সমর্থকই ভাবে, তারাই জয়ী। এক পর্যায়ে উগ্রসমর্থকদের মধ্যে হই হুল্লোড়, পরে ধাওয়া পালটা ধাওয়া, মারামারি। কে কীভাবে পালাবে হুঁশ থাকে না। আমিও ধাক্কা খেতে খেতে বাইরে এসে ব্যালান্স করতে না পেরে পড়ে গিয়ে বাম হাতের কব্জিতে চোট পাই। পচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। ডাক্তার বন্ধু এক্স—রে করে বলেন, “কলিস ফ্র্যাকচার উইথ ডিনার ফর্ক ডিফরমিটি। ক্লোজ রিডাকশন মানে প্লাস্টার অব প্যারিস দিয়ে প্লাস্টার করেও রাখা যায়। ওপেন রিডাকশন মানে অপারেশন করে নেইল প্লেট দিয়েও ঠিক করা যায়।”

আমি এসবের এক অক্ষর বুঝি না। বলি, “বুড়ো বয়সে অপারেশনের ঝুঁকি কে নেয়। প্লাস্টার করে ছয় সপ্তাহ হোক আর আট সপ্তাহ হোক, থাকব।”

সিএনজি করে বাড়ি ফেরার পথে কিছু বিষয় মনে রেখাপাত করে। আমি কী দেখলাম! ইরফানের হাতে পুরো পৃথিবী! কী করে সম্ভব! এটা কি ওর কঠিন আক্রোশ, না অন্য কিছু! সাচিনের হাতে দাঁতখিলান! আশ্চর্য! এটা কি তার তাচ্ছিল্যের নমুনা!

সব যেন গোলকধাঁধা! আমরাই—বা কেমন! কোথায় পাকিস্তান, কোথায় ভারত! বিজাতীয় বিষয় নিয়ে খুনাখুনি! ইস্যু সৃষ্টির অভিনব কায়দা! এই ধরনের জেদ বা আত্ম—অহংকারজনিত সমস্যা অথবা পরম তাচ্ছিল্যভাব আমাদের পরিবারিক জীবনে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করে! আমি কি একাই মতিভ্রমে পড়ে ছিলাম! কিন্তু অনেকেই এর সাক্ষী। এসব কি আমাদের মনদৈহিক অপচিন্তার ফসল! না কি অন্য কিছু! প্রাণিজগতের এই ইতিহাস প্রাচীনতম। এর হাত থেকে বাঁচার কোনও কায়দা কি কেউ জানে!

জানের ভেতর ধুকুপুকু। বউয়ের অমতে খেলা দেখতে যাওয়া, না জানি কী রামধোলাই কপালে আছে। মনে সাহস সঞ্চয় করি, আমি যতই মেরুদণ্ডহীন প্রাণী হই না কেন, আমার ভেতর প্রচণ্ড ইচ্ছা এবং প্রতিবাদি শক্তি আছে, বউয়ের সামনে শুধু সেটা প্রকাশ করতে পারি না, এই যা। বিগত পঁচিশ বছরে যা হওয়ার হয়েছে, আর নয়। আমি সাচিন বা ইরফানের ইচ্ছাশক্তির কথা স্মরণ করি। এবার হ্যাস্তন্যাস্ত করেই ছাড়ব। আরে যাহ, কী সব আজগুবি চিন্তা! আমি না তাকে প্রচণ্ড ভালোবসি! আর সে—ও আমাকে…

হাত ভাঙা নিয়ে বাসায় এলে সব আত্মীয়স্বজন দলে দলে ভিড় জমাতে থাকে। শতকরা নিরানব্বই ভাগ শ্বশুর কুলের। আমার আছেই এক মা। থাকে অন্য ভাইয়ের বাসায়। মা আমার বাসায় থাকবেই—বা কেন! অশিক্ষিত, মূর্খ, চাষাভুষার জাত, কার্টেসি জানে নাকি! আমার বাসায় ফাইভস্টার হোটেলের পরিবেশ। ছেলে—মেয়েরা দল ধরে সব ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। এই পরিবেশে খাপ খাওয়ান কোনো হেজিপেজির কাজ না।

একমাত্র মা—ই কাঁদতে কাঁদতে এলেন। বউ ধমকে ওঠেন, “কাঁদবেন না তো, কাঁদবেন না। অবাধ্য লোক, শাস্তি হওয়া দরকার।”

রাতে মার থাকা হলো না। থাকবেনই—বা কোথায়, বিছানা আছে নাকি! ঘর ভর্তি লোক। সব ঘর ইতোমধ্যেই দখল। আমার মস্তিষ্ক পুরাই ভোতা, মনেও করতে পারি না, মাত্র দশ বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পর মা—ই আমাকে বড়ো করেছেন। মা চলে গেলেন। স্ত্রীর কাছে ভালোবাসার পরীক্ষা দিয়ে কোটি কোটি বছর ধরে সব পুরুষই অনবরত ফেল করে যাচ্ছেন। তিনি যত বড়ো পারুখাই হোন, এমনকি সাচিন বা ইরফানও। আমি আবার কোন ছার! গোটা মানবসমাজের মাথাই খেয়েছেন সাচিন আর ইরফান ইগো। থাক এসব। মূল প্রসঙ্গে আসি।

 

আসল গল্প:

 

মা অন্তিমশয্যায়। দেখতে গেলাম। একাই। আর সবার সময় কই! মানুষটা একেবারে এতটুকুন হয়ে গেছেন। মা আমার দিকে ঘোলা চোখে জুলজুল করে তাকান। আশেপাশে কেউ নেই। কুঁচকান আর ঢিলে চামড়ার শীর্ণ হাতে আমাকে ইশারায় কাছে বসতে বলেন। পেসাব পায়খানার গন্ধেভরা বিছানায় মার পাশে বসি। মা আঁচল খসিয়ে একটা চাবি হাতে দিয়ে বলেন, “ট্রাঙ্কের ভেতর একটা ব্যাগ আছে, আন তো বাবা।”

মার বিয়ের সময় বাবার দেওয়া বহু পুরনো টিনের ট্রাঙ্ক। সেটা খুলে ব্যাগটা তার হাতে দিই। আমার মতো অপদার্থকে কেন যে তিনি এত প্রশ্রয় দেন জানি না। মা বলেন, “ব্যাগটা রাখ, ভিতরে কিছু টাকা আছে। গ্রামের বাড়ির গোড়স্তানে তোর বাবার কবরের সাথে জায়গা কিনে আমার কবর দিবি।”

মা শেষ মুহূর্তে আমাকে ফিসফিস করে সব বলে গেলেন, সেসব কথা মনে পড়লে আজও অবাক হই। মা একদিন চলে গেলেন। তার কথা মতো তাকে আমাদের গ্রামের গোড়স্থানে বাবার পাশে কবর দেওয়া হয়েছে।

তারপর হার্ট এ্যাটাকে স্ত্রী গেলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনিও আমাকে একটা অনুরোধ করেছিলেন, “আমাকে দূরে কোথাও কবর দিও না। অন্তত প্রতি জুম্মাবার সুবেহ সাদেকের পর একটি করে হলেও কবরে ফুল দিও।”

কথা মতো তাকে নিকটস্থ শহরের অভিজাত গোরস্থানে কবর দেওয়া হয়েছে। আমি এখন একা। স্বাধীন। তো! আমি যতই ক্রিকেট পাগল হই আর খেলা নিয়ে স্বপ্ন দেখিÑ আমি তো আমিই… স্ত্রীর কথা মতো প্রতি জুম্মাবার সুবেহ সাদেকের পর তার কবরস্থানে যাই। আজ শুক্রবার। আজও গিয়েছি। আশ্চর্য! কবরের একপাশে সাচিন আর ইরফান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। ওদের হাতে ব্যাট ও বলের পরিবর্তে এক জোড়া করে তাজা গোলাপ।

ফজরের আযান শুনে ঘুম ভাঙতেই বুঝলাম, স্বপ্নটা মাত্রই দেখলাম। এ জাতীয় স্বপ্ন আমি প্রায়ই দেখি… কিন্তু ইরফানের কাঠের পৃথিবী এবং শাচিনের দাঁতখিলান আর ফুল রহস্য সর্বদায় আমাকে ভাবিয়ে তোলে…

 

1 Comment

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *