Email: info@kokshopoth.com
February 19, 2026
Kokshopoth

সতত সুবর্ণঃ বাংলাদেশ

Feb 18, 2026

প্রবন্ধ/ নিবন্ধ

এমরান হাসান

সতত সুবর্ণঃ বাংলাদেশ

 

 

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শব্দ দুটি যে কেবল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষা এমনটা নয়, এগুলো একটি জাতির আত্মার গভীরে প্রোথিত চেতনার নাম। এই চেতনা জন্ম নেয় রক্তে, বিস্মৃত হয় স্মৃতিতে, আর টিকে থাকে নিরবচ্ছিন্ন চর্চায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ শোষণ, অপমান ও নীরব আর্তনাদের সঞ্চিত বিস্ফোরণ। ১৯৭১ সালে যে রাষ্ট্রের জন্ম, তার ভিত্তিপ্রস্তর ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের অদম্য আকাঙ্ক্ষা নিজের ভাষায় কথা বলার, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার, নিজের ভবিষ্যৎ নিজের মতো করে গড়ার অধিকার। কিন্তু স্বাধীনতার সেই অগ্নিগর্ভ মুহূর্ত পেরিয়ে আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে কি মনে হয় সেই চেতনাকে ধারণ করছে এই সমাজ, নাকি কেবল তার স্মৃতির ভার বহন করছে?

স্বাধীনতা এক ধরনের নৈতিক অবস্থা, যেখানে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক ভয় নয়, বরং আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে নাগরিক প্রশ্ন করতে পারে, সন্দেহ করতে পারে, সমালোচনা করতে পারে এবং রাষ্ট্র সেই প্রশ্নকে রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়, বরং নিজের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্বাধীনতা অনেক সময় উৎসবের দিনগুলোয় সীমাবদ্ধ এক আনুষ্ঠানিক আবেগে পরিণত হয়। পতাকা উড়ে, গান বাজে, কুচকাওয়াজ হয় তারপর আবার নীরবতার চাদর নামিয়ে দেওয়া হয় দৈনন্দিন জীবনের ওপর। স্বাধীনতা তখন স্মৃতির ভেতর বন্দী থাকে, বাস্তবের মাটিতে নয়। কিন্তু বরাবরই রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে স্বাধীনতার মূল্যবোধই সবচেয়ে নির্মম পরীক্ষার মুখে পড়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক শিক্ষা ছিল ক্ষমতার জবাবদিহিতা। কিন্তু যখন ক্ষমতা দীর্ঘদিন একই কাঠামোর ভেতরে জমাট বাঁধে, তখন সেই ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে প্রশ্নের উর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেন।ঠিক এই কারণেই গণতন্ত্র তখন তার নিজস্ব প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে প্রহসনে পরিণত হতে শুরু করে। নির্বাচনের আস্থা সংকট, রাজনৈতিক ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, প্রশাসনের অতিরিক্ত কেন্দ্রিকরণ এসব মিলিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ধারণা এবং পরিবেশ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র থাকে স্বাধীন, কিন্তু নাগরিক অবচেতনভাবেই দাঁড়িয়ে যান অনিশ্চিত অন্ধকারে পতিত হবার মুখোমুখি। এমতবস্থায় সার্বভৌমত্ব আরও গভীর, আরও নিঃশব্দ অর্থ নিয়ে হাজির হয়। এই সার্বভৌমত্ব শুধু যে সীমান্তরক্ষার বিষয়, এমন নয় বরং এটি রক্ষার সিদ্ধান্তেই স্বাধীনতার প্রশ্ন সামনে চলে আসে। আধুনিক বিশ্বে পারস্পরিক নির্ভরতা অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু সেই নির্ভরতা যদি একসময় আত্মসমর্পণে রূপ নেয়, তবে সার্বভৌমত্ব ক্ষয়প্রাপ্ত হয় নীরবে,নিভৃতে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানের গল্পে বিদেশি ঋণ, উন্নয়ন সহযোগিতা, বৈশ্বিক বাজার সবকিছুরই ভূমিকা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উন্নয়ন কি এদেশের নীতিনির্ধারণকে স্বাধীন করেছে, নাকি সীমাবদ্ধ করেছে? যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মুহূর্তে অদৃশ্য চাপ, কূটনৈতিক হিসাব বা অর্থনৈতিক ভয় কাজ করে, তখন সার্বভৌমত্ব কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়— একথা নির্জলা সত্য। বাংলাদেশের ঐতিহ্য কেবল স্থাপত্য বা লোকাচারে সীমাবদ্ধ নয় এ কথা সর্বজন বিদিত। এটি মানুষের আচরণে, কথাবার্তায়, উৎসবে ও শোকাচরণে বহমান। পহেলা বৈশাখের রঙিন শোভাযাত্রা যেমন এই ঐতিহ্যের প্রকাশ, তেমনি গ্রামীণ হাটের সহজ কথোপকথনেও তার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েও যে মানুষ আবার নতুন করে ঘর বাঁধে, তার মধ্যেই নিহিত আছে বাংলার ঐতিহ্যের আসল শক্তি পুনরুত্থানের ক্ষমতার ইতিহাস।এই ইতিহাস ও ঐতিহ্য সরলরেখায় অগ্রসরমান কাহিনি নয়; এটি স্তরে স্তরে জমে ওঠা স্মৃতি, রক্ত, ভাষা, পরাজয় ও প্রত্যয়ের এক জটিল পালিম্পসেস্ট। এই ভূখণ্ডের মাটি যেমন পলিতে গঠিত, তেমনি এর ইতিহাসও পলির মতো—এক যুগের ওপর আরেক যুগের চাপ, ভাঙন, স্রোত আর পুনর্গঠনের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে। বাংলার ইতিহাস মানে কেবল রাজাদের উত্থান—পতনের নথি নয়, বরং কৃষকের কণ্ঠস্বর, নদীর দীর্ঘশ্বাস, কবির অগ্নিগর্ভ উচ্চারণ এবং সাধারণ মানুষের নীরব প্রতিরোধের সমষ্টিগত স্মারক।

প্রাচীন বাংলার জনপদে যখন গঙ্গা—ব্রহ্মপুত্র মেঘনার স্রোত সভ্যতার শিরা হয়ে প্রবাহিত, তখনই এই ভূখণ্ডে জন্ম নেয় এক অনন্য জীবনদর্শন। পাল ও সেন যুগের বৌদ্ধ—ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির সহাবস্থান বাংলার মননে বপন করেছিল সহিষ্ণুতার বীজ। সোমপুর মহাবিহারের ইটের স্তূপে আজও ধ্বনিত হয় সেই সময়ের জ্ঞানচর্চার গুঞ্জন, যেখানে ধর্ম ছিল কেবল আচার নয়, ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান। বাংলার ইতিহাসের এই প্রারম্ভিক অধ্যায় আমাদের শেখায় যে বহুত্বই ছিল এই ভূখণ্ডের মৌলিক চরিত্র।

মধ্যযুগে ইসলামের আগমন বাংলাকে নতুন ভাষা, নতুন কাব্যভঙ্গি ও নতুন সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত করে। সুফি দরবেশদের মানবতাবাদী আহ্বান বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে সৃষ্টি করে এক গভীর আত্মিক ঐতিহ্য। লালন, হাসন রাজা কিংবা শাহ আবদুল করিমের গান সেই ধারাবাহিকতারই পরিণত রূপ, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের ভেতরের মানুষটিই মুখ্য। এই সময়ের বাংলা সাহিত্যে আরবি—ফারসি শব্দের প্রবেশ ভাষাকে করে তোলে বহুধ্বনিময়, কিন্তু কখনো বিচ্ছিন্ন নয়—বরং আরও প্রসারিত।

ঔপনিবেশিক যুগে বাংলার ইতিহাসে নামে এক তীব্র দ্বন্দ্বের অধ্যায়। ইংরেজ শাসনের শৃঙ্খল বাংলার অর্থনীতি, সমাজ ও মননকে একযোগে ক্ষতবিক্ষত করে। পলাশীর পরাজয় কেবল একটি যুদ্ধের হার নয়; এটি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের অবসান এবং দীর্ঘ দাসত্বের সূচনা। কিন্তু এই পরাজয়ের গর্ভেই জন্ম নেয় নবজাগরণ। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ—এঁরা প্রত্যেকে নিজেদের মতো করে বাংলার আত্মাকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন। বাংলা ভাষা হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের প্রধান বাহন, আর সাহিত্য হয়ে ওঠে প্রতিরোধের নরম কিন্তু গভীর অস্ত্র।

ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য বাঁক। পৃথিবীর মানচিত্রে খুব কম জাতিই আছে যারা মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। ১৯৫২ সালের রক্তাক্ত ফেব্রুয়ারি বাংলার ইতিহাসকে চিরকালের জন্য রূপান্তরিত করে দেয়। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি হয়ে ওঠে অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তা পায় তার সুস্পষ্ট আত্মচেতনা, যা পরবর্তী সব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ভিত্তি রচনা করে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সেই দীর্ঘ সংগ্রামের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। এটি ছিল ইতিহাসের বিরুদ্ধে ইতিহাস লেখার যুদ্ধ। পাকিস্তানি শাসনের নিপীড়ন, সাংস্কৃতিক অবদমন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালি অস্ত্র তুলে নেয় শুধু ভূখণ্ডের জন্য নয়, একটি মূল্যবোধের জন্য। এই যুদ্ধের প্রতিটি শহীদ বাংলার ইতিহাসে এক একটি জীবন্ত অনুচ্ছেদ, যার রক্তে লেখা হয়েছে স্বাধীনতার অক্ষর। বাংলাদেশের জন্ম কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়; এটি ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে ওঠা ক্ষোভ ও স্বপ্নের যৌথ পরিণতি।

বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি বহুমাত্রিক, জটিল এবং গভীরভাবে রূপান্তরমান এক সামাজিক রাষ্ট্রিক বাস্তবতার প্রতিফলন। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় অতিক্রম করার পর বাংলাদেশ আজ এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে, যেখানে একদিকে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সংযুক্তির বাস্তব অর্জন দৃশ্যমান, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। বর্তমান সময়কে অনুধাবন করতে হলে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা পরিসংখ্যান নয়, বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর ভেতর বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশগত এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতাকে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাতে বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরেই একটি দ্বৈত বৈশিষ্ট্য বহন করে আসছে। সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী দেশটি একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হলেও বাস্তব রাজনৈতিক চর্চায় ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, দলীয়করণ এবং বিরোধী মতের সংকোচন একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়মিত থাকলেও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা, অংশগ্রহণমূলকতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সমাজে বিতর্ক বিদ্যমান। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল হওয়ায় নেতৃত্বের বিকাশ সীমিত এবং রাজনীতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, যা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতা অবকাঠামো উন্নয়ন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করেছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য। দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। তৈরি পোশাক শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে দেশের অর্থনীতিকে বহন করছে, পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল রেখেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি কাঠামোগতভাবে ভঙ্গুর। অর্থনীতির বৈচিত্র্য সীমিত, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ফলে প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ন্যায্যতা এবং টেকসই উন্নয়ন এখন বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নগরায়নের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্রোত বাড়ছে, যার ফলে শহরগুলোতে আবাসন সংকট, যানজট, পরিবেশ দূষণ এবং সামাজিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রামীণ সমাজে শিক্ষা ও প্রযুক্তির বিস্তার সামাজিক সচেতনতা বাড়ালেও কর্মসংস্থানের অভাব মানুষকে শহরমুখী করছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি সম্প্রসারিত হলেও তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ভঙ্গুর; সামান্য মূল্যস্ফীতি বা আয়ের ধাক্কায় এই শ্রেণি নিচের দিকে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। একই সঙ্গে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে, যা সামাজিক সংহতি ও ন্যায়ের ধারণাকে দুর্বল করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করছে।

শিক্ষাব্যবস্থা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বর্তমান অবস্থা গভীরভাবে চিন্তার দাবি রাখে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক। তবে শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন এবং গবেষণার সুযোগ সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও জ্ঞান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে। শিক্ষাকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাকরিমুখী দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে, ফলে সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা ও গবেষণাধর্মী মানসিকতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর পরিণতিতে শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা তরুণ সমাজের মধ্যে হতাশা ও অভিবাসনের প্রবণতা বাড়াচ্ছে।এদিকে কোনও রাজনৈতিক দল কখনোই দৃষ্টি দেননি।আবার স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ কিছু সূচকে অগ্রগতি অর্জন করলেও সার্বিক ব্যবস্থাটি এখনও বৈষম্যপূর্ণ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত হলেও বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি স্পষ্ট একথঅ বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের পার্থক্য সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসাকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। কোভিড ১৯ মহামারি দেখিয়েছে যে সংকটকালে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কোথায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি শক্তিশালী, সমতাভিত্তিক এবং টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বর্তমানে দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এখনও সমাজের গভীরে প্রোথিত, তবে ভোগবাদী সংস্কৃতি ও বৈশ্বিক গণমাধ্যমের প্রভাব মূল্যবোধের রূপান্তর ঘটাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি তথ্যপ্রবাহকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং সহিংস ভাষার বিস্তার সামাজিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তরুণ প্রজন্ম এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে, যেখানে পরিচয় নির্মাণ ও মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পাচ্ছে।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়,ভূমিকম্প,নদীভাঙন এবং লবণাক্ততা মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে। দ্রুত শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। টেকসই উন্নয়ন ধারণাকে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব প্রয়োগে কার্যকরভাবে সংযুক্ত না করতে পারলে উন্নয়নের অর্জন দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক শক্তি, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং ভূ—রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে সক্রিয়তা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হয়েছে। তবে বৈশ্বিক রাজনীতির চাপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলছে।সব দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের সার্বিক পরিস্থিতি একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে অগ্রগতি ও সংকট পাশাপাশি অবস্থান করছে। রাষ্ট্রের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এই জটিল বাস্তবতাকে স্বীকার করে দীর্ঘমেয়াদি, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্য উন্নয়নের পথে অগ্রসর হওয়া। প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ, নাগরিক সচেতনতা এবং নৈতিক নেতৃত্ব এই পথচলার মূল ভিত্তি হতে পারে। বর্তমান সময়ের অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রিক ও সামাজিক রূপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি বহুমাত্রিক, জটিল এবং গভীরভাবে রূপান্তরমান এক সামাজিক রাষ্ট্রিক বাস্তবতার প্রতিফলন। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় অতিক্রম করার পর বাংলাদেশ আজ এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে, যেখানে একদিকে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সংযুক্তির বাস্তব অর্জন দৃশ্যমান, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। বর্তমান সময়কে অনুধাবন করতে হলে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা পরিসংখ্যান নয়, বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর ভেতর বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশগত এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতাকে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাতে বর্তমান সময়ের অন্তর্নিহিত প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার রূপরেখা স্পষ্ট হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরেই একটি দ্বৈত বৈশিষ্ট্য বহন করে আসছে। সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী দেশটি একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হলেও বাস্তব রাজনৈতিক চর্চায় ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, দলীয়করণ এবং বিরোধী মতের সংকোচন একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়মিত থাকলেও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা, অংশগ্রহণমূলকতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সমাজে বিতর্ক বিদ্যমান। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল হওয়ায় নেতৃত্বের বিকাশ সীমিত এবং রাজনীতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, যা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতা অবকাঠামো উন্নয়ন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করেছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল ও বহুস্তরীয় করে তুলেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য। দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। তৈরি পোশাক শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে দেশের অর্থনীতিকে বহন করছে, পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল রেখেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি কাঠামোগতভাবে ভঙ্গুর। অর্থনীতির বৈচিত্র্য সীমিত, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ফলে প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ন্যায্যতা এবং টেকসই উন্নয়ন এখন বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নগরায়নের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্রোত বাড়ছে, যার ফলে শহরগুলোতে আবাসন সংকট, যানজট, পরিবেশ দূষণ এবং সামাজিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রামীণ সমাজে শিক্ষা ও প্রযুক্তির বিস্তার সামাজিক সচেতনতা বাড়ালেও কর্মসংস্থানের অভাব মানুষকে শহরমুখী করছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি সম্প্রসারিত হলেও তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ভঙ্গুর; সামান্য মূল্যস্ফীতি বা আয়ের ধাক্কায় এই শ্রেণি নিচের দিকে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। একই সঙ্গে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে, যা সামাজিক সংহতি ও ন্যায়ের ধারণাকে দুর্বল করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করছে।

শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বর্তমান অবস্থা গভীরভাবে চিন্তার দাবি রাখে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক। তবে শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন এবং গবেষণার সুযোগ সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও জ্ঞান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে। শিক্ষাকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাকরিমুখী দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে, ফলে সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা ও গবেষণাধর্মী মানসিকতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর পরিণতিতে শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা তরুণ সমাজের মধ্যে হতাশা ও অভিবাসনের প্রবণতা বাড়াচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ কিছু সূচকে অগ্রগতি অর্জন করলেও সার্বিক ব্যবস্থাটি এখনও বৈষম্যপূর্ণ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত হলেও বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি স্পষ্ট। সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের পার্থক্য সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসাকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। কোভিড ১৯ মহামারি দেখিয়েছে যে সংকটকালে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কোথায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি শক্তিশালী, সমতাভিত্তিক এবং টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একটি দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এখনও সমাজের গভীরে প্রোথিত, তবে ভোগবাদী সংস্কৃতি ও বৈশ্বিক গণমাধ্যমের প্রভাব মূল্যবোধের রূপান্তর ঘটাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি তথ্যপ্রবাহকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং সহিংস ভাষার বিস্তার সামাজিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তরুণ প্রজন্ম এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে, যেখানে পরিচয় নির্মাণ ও মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পাচ্ছে।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততা মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে। দ্রুত শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। টেকসই উন্নয়ন ধারণাকে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব প্রয়োগে কার্যকরভাবে সংযুক্ত না করতে পারলে উন্নয়নের অর্জন দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক শক্তি, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে সক্রিয়তা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হয়েছে। তবে বৈশ্বিক রাজনীতির চাপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলছে।

সব দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের সার্বিক পরিস্থিতি একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে অগ্রগতি ও সংকট পাশাপাশি অবস্থান করছে। রাষ্ট্রের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এই জটিল বাস্তবতাকে স্বীকার করে দীর্ঘমেয়াদি, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্য উন্নয়নের পথে অগ্রসর হওয়া। প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ, নাগরিক সচেতনতা এবং নৈতিক নেতৃত্ব এই পথচলার মূল ভিত্তি হতে পারে। বর্তমান সময়ের অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রিক ও সামাজিক রূপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অথচ,স্বাধীনতার সুর ছিলো এদেশের  মানুষের আত্মপরিচয়। শব্দ তখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, শব্দ ছিল অস্ত্র, শব্দ ছিল শিরদাঁড়া। সেই শব্দে ছিল দ্রোহ, ছিল অস্বীকার, ছিল মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্পর্ধা।এর মূলেরিয়েছে শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চা। কেননা,সংস্কৃতি হলো স্বাধীনতার সবচেয়ে সূক্ষ্ম, অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী বাহক। ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও শিল্প একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আয়না। বাংলাদেশের জন্মের পেছনে ভাষার ভূমিকা ছিল মৌলিক। অথচ আজ সেই ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা অনেক সময় অনুমোদিত সীমার ভেতরে আবদ্ধ। ইতিহাসের একাধিক পাঠ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু যখন রাষ্ট্র একটি মাত্র বয়ানকে চুড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন সংস্কৃতি জীবন্ত থাকে না, জমাট বাঁধে। স্বাধীনতার চেতনা সেখানে প্রশ্নহীন আনুগত্যে রূপ নেয়। সার্বভৌমত্ব তখন মানসিক স্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ চিন্তার স্বাধীনতা ছাড়া কোনো জাতিই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পারে না।

মানুষ একসময় জানত—ভাষা কেড়ে নিলে মানুষের স্ব—অবস্থান কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সময়ের দীর্ঘ, ক্লান্তিকর করিডোর পেরিয়ে আজ সেই শব্দগুলোও অবসন্ন। বহু ব্যবহারে, বহু বিকৃতিতে, বহু সুবিধাবাদে তারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। শব্দ এখন আর আগুন নয়, শব্দ এখন ধোঁয়া। বাংলাদেশ আজ আর কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি এক দীর্ঘ, ভারী নিশ্বাস—যেখানে সমাজ ও রাজনীতি পরস্পরের গায়ে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে অবক্ষয়ের গভীর খাদে।

এই অবক্ষয় কোনও হঠাৎ দুর্ঘটনা নয়। এটি পরিকল্পিতও নয়, আবার সম্পূর্ণ আকস্মিকও নয়। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক মানসিক ভূগোল, যেখানে মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে ফেলে তার প্রতিবাদের ভাষা। প্রথমে মানুষ চুপ থাকে ভয়ের কারণে, পরে থাকে অভ্যাসের কারণে, আর একসময় থাকে সুবিধার কারণে। এই তিন স্তরের নীরবতা মিলেই তৈরি হয় একটি সমাজ, যেখানে অন্যায় আর চমক জাগায় না, বরং স্বাভাবিক মনে হয়।

রাজনীতি এখানে এখন আর স্বপ্নের ভাষা নয়; এটি ক্ষমতার এক নির্লজ্জ ব্যাকরণ। এই ব্যাকরণে ক্রিয়া শুধু দখল করা, বিশেষণ শুধু শক্তিশালী, আর বিশেষ্য শুধু আমি। আদর্শ এখানে পোস্টারের রঙ, নির্বাচনী স্লোগানের ফাঁপা শব্দ। বাস্তবে তার কোনো শরীর নেই, কোনো রক্ত নেই। ক্ষমতার লড়াই আর নীতির পরীক্ষা নয়, এটি সহনশীলতার প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড। যে জেতে, সে ইতিহাস লেখে; যে হারে, সে পরিসংখ্যান হয়ে যায়। এই বাস্তবতা সমাজকে শিখিয়েছে—ন্যায় কোনো স্থায়ী সত্য নয়, শক্তিই শেষ যুক্তি।

ক্ষমতার এই একমুখী প্রবাহ সমাজের শিরায় শিরায় বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছে। মানুষ প্রতিদিন দেখে—অন্যায় করে যারা ওপরে ওঠে, তারাই সম্মান পায়, নিরাপত্তা পায়, মঞ্চ পায়। সততা এখানে ধীরে অপ্রয়োজনীয় বিলাসে পরিণত হয়েছে। নৈতিকতা এখন ব্যক্তিগত শখ, সামাজিক দায় নয়। ফলে সমাজ গড়ে উঠছে এমন এক প্রজন্ম নিয়ে, যারা প্রশ্ন করতে শেখেনি, বরং মানিয়ে নিতে শিখেছে। এই মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষা সবচেয়ে ভয়ংকর, কারণ এটি মানুষকে অপরাধের নীরব অংশীদার বানায়।

শিক্ষা, যে আলো হাতে মানুষ অন্ধকার চিরে সামনে এগোয়, সেই আলো আজ অনেক জায়গায় নিভু নিভু। বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানের আশ্রম নয়, ক্ষমতার উপশাখা। এখানে মেধার চেয়ে পরিচয় বেশি কার্যকর, যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি লাভজনক। প্রশ্ন এখানে বিপজ্জনক, চিন্তা এখানে সন্দেহজনক। ছাত্ররা স্বপ্ন নিয়ে আসে, কিন্তু বের হয় বাস্তবতার ভারে নুয়ে পড়া কাঁধ নিয়ে। তারা শিখে যায়—কখন চুপ থাকতে হয়, কখন মাথা নত করতে হয়, কখন হাততালি দিতে হয়। এই শিক্ষা মানুষ গড়ে তোলে না; এটি কেবল টিকে থাকার কৌশল শেখায়।

এই সমাজে সত্য আর নিরেট সত্য নয়। সত্য এখন সুবিধামতো বাঁকানো, সময়মতো ব্যবহারযোগ্য একটি বস্তু। গণমাধ্যম, যে আয়নায় সমাজ নিজের মুখ দেখার কথা, সেই আয়নায় ফাটল ধরেছে। কোথাও সত্য চাপা পড়ে যায় বিজ্ঞাপনের নিচে, কোথাও শব্দ হারিয়ে যায় রাজনৈতিক হিসাবের ভিড়ে। তথ্য এখানে আলো নয়, অস্ত্র। ফলে মানুষ আর নিশ্চিত হতে পারে না—যা দেখছে, তা বাস্তব নাকি সাজানো দৃশ্য। এই অনিশ্চয়তা সমাজকে ধীরে ধীরে বধির করে তোলে।

আইন এখানে কাগজে শক্ত, বাস্তবে দুর্বল। বিচার শব্দটি উচ্চারণে ভারী, প্রয়োগে হালকা। যে শক্তিশালী, তার জন্য আইন নমনীয়; যে দুর্বল, তার জন্য আইন নির্মম। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি সমাজকে শিখিয়েছে—অপরাধ করলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, যদি পেছনে সঠিক ছায়া থাকে। এই ছায়ার নিচে অপরাধ বেড়ে ওঠে, স্বাভাবিক হয়, এমনকি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

এই অবক্ষয় কেবল রাষ্ট্রের কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। পরিবারে সম্পর্কগুলো হিসাবি হয়ে উঠছে, ভালোবাসায় শর্ত জুড়ে যাচ্ছে। বন্ধুত্বেও ঢুকে পড়েছে সুবিধার অঙ্ক। মানুষ মানুষকে আর মানুষ হিসেবে দেখে না, দেখে সম্ভাব্য লাভ বা ক্ষতির সমীকরণ হিসেবে। এই মানসিকতা সমাজের মানবিক তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়, হৃদয়কে ঠান্ডা করে তোলে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই অবক্ষয়ের সবচেয়ে নিঃশব্দ অংশীদার।

তারা জানে কী ভুল, তবু নিরাপত্তার বিনিময়ে নীরব থাকে। তারা ক্ষুব্ধ হয় ঘরের ভেতর, সামাজিক মাধ্যমে, কিন্তু বাস্তবে নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে থাকে। এই নিরপেক্ষতা আসলে পক্ষ নেওয়ারই আরেক নাম—ক্ষমতার পক্ষে দাঁড়ানো। ধর্ম এখানে আর আত্মশুদ্ধির পথ নয়; এটি পরিচয়ের রাজনীতি। বিশ্বাস ব্যবহার হয় বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে। নৈতিকতার বদলে বাড়ে আনুষ্ঠানিকতা, মানবিকতার বদলে বাড়ে প্রদর্শন। ফলে সমাজে সহনশীলতা নয়, বাড়ে সন্দেহ আর বিদ্বেষ।

এই সমাজে নাগরিকত্ব এখন আর অধিকার নয়, এটি একধরনের ক্লান্ত চুক্তি। রাষ্ট্র নাগরিককে নিরাপত্তা দেয় না, নাগরিক রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে না। এই নীরব সমঝোতার ভেতর দিয়েই জন্ম নেয় অবক্ষয়ের স্থায়ী ব্যবস্থা। মানুষ বেঁচে থাকে, কিন্তু নাগরিক হয়ে ওঠে না।তরুণ সমাজ এই অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় শিকার। তাদের সামনে স্বপ্ন আছে, কিন্তু পথ নেই। যোগ্যতা আছে, কিন্তু সুযোগ নেই। ফলে তারা দেশ ছাড়ে, অথবা থেকে গিয়ে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। মেধার এই রক্তক্ষরণ সমাজকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়।

তবুও এই অন্ধকার সম্পূর্ণ নয়। এই দেশে এখনো কিছু মানুষ আছে, যারা অন্ধকারকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে চায় না। তারা সংখ্যায় কম, কণ্ঠে নিচু, কিন্তু নৈতিক ওজন অসীম। তারা জানে পরিবর্তন কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ, ক্লান্তিকর লড়াই। তাদের অস্তিত্বই প্রমাণ করে—এই সমাজ পুরোপুরি পরাজিত নয়।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই আলো কি যথেষ্ট? নাকি এই আলো কেবল আমাদের বিবেককে সাময়িক শান্ত রাখার এক অজুহাত? কারণ ইতিহাস বলে, অল্প আলো অন্ধকারকে হারায় না; অন্ধকারকে হারাতে হলে আগুন লাগে।

এই আগুন মানে সহিংসতা নয়। এই আগুন মানে প্রশ্ন। এই আগুন মানে অস্বস্তি। এই আগুন মানে নিজের দিকে তাকিয়ে বলা—আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমি কি কেবল ভুক্তভোগী, নাকি অংশীদারও? কারণ অবক্ষয় কখনো একা জন্মায় না। অবক্ষয়ের জন্য শুধু ক্ষমতাবানদের দোষ দিলে সত্য অপূর্ণ থাকে। অবক্ষয় টিকে থাকে সাধারণ মানুষের নীরব সমর্থনে। যে ভোট দেয় না, যে প্রশ্ন করে না, যে অন্যায় দেখেও চোখ ফিরিয়ে নেয় সেও।

এই দেশ আজ এক এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে যেখানে মানুষের অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তবুদ্ধিচর্চার পাশাপাশি একমাত্র সঠিক বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োগই পারে বাংলাদেশকে পুনরুজ্জীবিত করতে। সামনে দুটি পথ একটি আরও নীরবতা, আরও আপস, আরও অবক্ষয়ের; অন্যটি প্রশ্ন, আত্মসমালোচনা ও প্রতিরোধের। দ্বিতীয় পথ সহজ নয়, নিরাপদ নয়। সেখানে চাকরি হারানোর ভয় আছে, একা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কিন্তু ইতিহাস কখনো নিরাপদ পথ বেছে নেয় না। ইতিহাস এগোয় সেই দিকেই, যেখানে ঝুঁকি আছে, যেখানে প্রশ্ন আছে, যেখানেই প্রতিরোধ আছে।

একটি দেশ কোনও বিমূর্ত ধারণা নয়। একটি দেশ  সে দেশের মানুষের মুখ, মানুষের শ্রমে,ঘামে অর্জিত সফলতা।একটি দেশ সেই দেশের প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠ, মানুষের ব্যথা। এই ব্যথা যতদিন চাপা থাকবে, অবক্ষয় ততদিন বাড়বে। আর যেদিন এই ব্যথা ভাষা পাবে, সেদিনই জন্ম নেবে নতুন শব্দ, নতুন মানচিত্র, নতুন আবহের নতুন স্বদেশ। প্রশ্ন হলো—সেই শব্দ উচ্চারণের সাহস রাখে কে? নাকি নীরবতার আরামই এদেশের শেষ আশ্রয়? হয়তো না। কেননা,হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের হাতহাস কেবল রাজা—বাদশার তালিকা বা যুদ্ধ—সংঘর্ষের ধারাবিবরণী নয়; এটি একটি দীর্ঘ আত্মসংগ্রামের উপাখ্যান, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও প্রতিরোধ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই ভূখণ্ড বারবার শাসিত হয়েছে, শোষিত হয়েছে, ভাঙা হয়েছে, আবার নিজেকে নতুন করে নির্মাণ করেছে। ইতিহাসের প্রতিটি স্তরে এখানকার মানুষ শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা করেনি, তারা নিজেদের পরিচয় রক্ষা করার লড়াইও চালিয়েছে। এই লড়াইয়ের মধ্যেই জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্য,লোকজ—বিশ্বাস, গান, ভাষা, পোশাক, খাবার, উৎসব সবকিছু মিলিয়ে এক গভীর সাংস্কৃতিক স্রোত, যা আজকের সামাজিক বাস্তবতাকে বুঝতে গেলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে  দেখা যায় এ দেশ ছিলো এক উর্বর জনপদ, যেখানে নদী ছিল জীবনের কেন্দ্র, কৃষি ছিল অর্থনীতির মেরুদণ্ড, আর গ্রাম ছিল সামাজিক সংগঠনের মূল একক। পাল ও সেন যুগে বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির বিকাশ শুধু ধর্মীয় ছিল না, তা ছিল জ্ঞান ও শিল্পেরও বিস্তার। বিক্রমপুর, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর—এইসব স্থান শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, বরং সাক্ষ্য দেয় যে এই ভূখণ্ড একসময় চিন্তা, স্থাপত্য ও শিক্ষার কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ইতিহাসের চাকা ঘুরে যখন দিল্লি ও মুঘল শাসন এল, তখন বাংলার চরিত্র বদলাতে শুরু করল। ইসলামি শাসন বাংলার সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করল—ভাষায়, স্থাপত্যে, সামাজিক আচরণে। এই সংমিশ্রণই বাংলাকে একক কোনো পরিচয়ে আটকে দেয়নি; বরং বহুত্ববাদী করে তুলেছে।

ঔপনিবেশিক যুগ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। ব্রিটিশ শাসন শুধু রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নয়, এটি অর্থনৈতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক আত্মবিস্মরণের সূচনা করেছিল। বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি ধ্বংস হলো, তাঁতশিল্প বিলুপ্তির পথে গেল, কৃষক ঋণের জালে বন্দি হলো। কিন্তু এই সময়ই জন্ম দিল এক নতুন চেতনার—বাঙালি জাতীয়তাবাদ। ভাষা, সাহিত্য ও শিক্ষা হয়ে উঠল প্রতিরোধের অস্ত্র। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন —তাঁদের সৃষ্টিতে আমরা দেখি এক গভীর মানবতাবোধ, যা শাসকের বিভাজননীতির বিরুদ্ধে নীরব কিন্তু তীব্র প্রতিবাদ।

এই চেতনার পরিণতি ছিল ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি শুধু কয়েকজন ছাত্রের আত্মত্যাগ নয়; এটি ছিল ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় জমে ওঠা সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের বিস্ফোরণ। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি হয়ে উঠল অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি বুঝতে শুরু করল যে তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য অন্যের চাপিয়ে দেওয়া পরিচয়ের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে না। এই উপলব্ধিই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের বীজ বপন করে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। এটি শুধু রাষ্ট্র গঠনের যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল মানুষের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। গ্রাম থেকে শহর, কৃষক থেকে কবি—সবাই এই যুদ্ধে যুক্ত হয়েছিল নিজের মতো করে। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পেয়েছিল স্বাধীনতা, কিন্তু সেই স্বাধীনতার অর্থ কী—এই প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে চলেছে মানুষ। কারণ ইতিহাস দেখায়, স্বাধীনতা অর্জন আর স্বাধীনতার চর্চা এক বিষয় নয়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সমাজে যে পরিবর্তন এসেছে, তা জটিল ও বহুমাত্রিক। একদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামোগত অগ্রগতি, প্রযুক্তির বিস্তার—অন্যদিকে মূল্যবোধের ক্ষয়, সামাজিক বিভাজন, রাজনৈতিক মেরুকরণ। ঐতিহ্য যেখানে ছিল সহনশীলতা ও সমবায়বোধের প্রতীক, সেখানে আজ আমরা দেখি আত্মকেন্দ্রিকতা ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা। গ্রামবাংলার সেই সম্মিলিত জীবনধারা ভেঙে গিয়ে জায়গা নিচ্ছে একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তা।

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষিতে সবচেয়ে বড় সংকটটি হলো স্মৃতিভ্রংশ। ইতিহাসকে আমরা ব্যবহার করছি প্রয়োজনমতো, উপলব্ধি করছি না গভীরভাবে। মুক্তিযুদ্ধ কখনো রাজনৈতিক স্লোগান, কখনো বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠছে, কিন্তু তার মানবিক শিক্ষা—সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ, সাহস এসব ক্রমশ পেছনে পড়ে যাচ্ছে। ঐতিহ্যকে আমরা উৎসবের দিনে স্মরণ করি, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তার চর্চা করি না। ফলে সংস্কৃতি হয়ে উঠছে প্রদর্শনীর বস্তু, জীবনের অনুশীলন নয়।

আইনের শাসন ছাড়া স্বাধীনতা কেবল আবেগী উচ্চারণ। একটি রাষ্ট্র তখনই সার্বভৌম, যখন তার আইন ক্ষমতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। কিন্তু যখন আইন প্রয়োগে দ্বৈত মানদণ্ড দেখা যায়, যখন শক্তিশালী ও দুর্বল নাগরিকের জন্য ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হয়, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। বর্তমান বাংলাদেশের বিচার ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলো কেবল বিরোধী রাজনীতির অভিযোগ নয়; এগুলো নাগরিক আস্থার প্রতিফলন। আস্থা হারালে রাষ্ট্রের শক্তি ভেতর থেকেই ক্ষয় হতে থাকে। তবু এই অন্ধকারের মধ্যেও অল্প আলোর রেখা তৈরি হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ আবার ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। এ দেশের ভাষা, লোকসংগীত, গ্রামীণ শিল্প, আঞ্চলিক গল্পে নতুন আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তারা নিজেদের শিকড় খুঁজছে, যদিও সেই খোঁজ অনেক সময় অগভীর বা আবেগনির্ভর। এখানে চ্যালেঞ্জ হলো এই আগ্রহকে গভীর বোধে রূপান্তর করা, যাতে ইতিহাস শুধু গর্বের বিষয় না হয়ে দায়িত্বের বিষয়ও হয়নি। এসবের পাশাপাশি অর্থনীতি ও স্বাধীনতার সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে পরোক্ষ মনে হলেও বাস্তবে তা গভীরভাবে সংযুক্ত। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির বণ্টন প্রশ্নবিদ্ধ। যখন সম্পদ ও সুযোগ একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাধীনতা একটি দূরবর্তী ধারণায় পরিণত হয়। জীবিকার অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের সংকট, দ্রব্যমূল্যের চাপ মানুষকে নীরব হতে শেখায়। এই নীরবতা কোনো শান্তির লক্ষণ নয়; এটি স্বাধীনতার ক্ষয়ের নিঃশব্দ সাক্ষ্য।

বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আমাদের শেখায় যে এই ভূখণ্ড কখনো সরল ছিল না। এখানে সবসময় দ্বন্দ্ব ছিল ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা, গ্রাম ও শহর, শাসক ও শোষিতের মধ্যে। এই দ্বন্দ্বই আমাদের সমাজকে গড়ে তুলেছে। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষিতে এই দ্বন্দ্বকে অস্বীকার না করে বোঝার চেষ্টা করাই সবচেয়ে জরুরি। কারণ ইতিহাসের সঙ্গে সংলাপ ছাড়া ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে বুঝতে হলে তাকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখা উচিত। যে সত্তা স্মৃতি বহন করে, ভুল করে, আবার নিজেকে নিজেই সংশোধন করার চেষ্টা করে। ইতিহাস একটি দেশের,একটি সময়ের আয়না, ঐতিহ্য সেই দেশে বসবাসকারী জনগন এবং জনপদের শিকড়। এই দুটিকে অস্বীকার করে কখনোই কোন উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। বর্তমান সমাজ যদি তার সংকট কাটিয়ে উঠতে চায়, তবে তাকে ফিরে তাকাতে হবে তার ইতিহাসের দিকে, নতুন চোখে,নতুন প্রশ্ন নিয়ে। সেখানেই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে এমন এক বাংলাদেশ, যা শুধু অতীতের গৌরব নয়, ভবিষ্যতেরও দায়িত্ব নিতে সক্ষম।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বাধীনতার শ্বাসপ্রশ্বাস। গণমাধ্যম, লেখক, শিল্পী ও সাধারণ নাগরিক সবার কণ্ঠ মিলেই একটি সমাজের সত্য উচ্চারিত হয়। কিন্তু যখন ভয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির সংস্কৃতি বিস্তৃত হয়, তখন সেই কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত হওয়ার অনুভূতি ব্যাপক। এই সংকোচন রাষ্ট্রকে নিরাপদ করে না; বরং তাকে আত্মসমালোচনার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে। যে রাষ্ট্র নিজেকে প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত নয়। এই ভূখণ্ডের মানুষের ইতিহাস মূলত প্রতিরোধের ইতিহাস। নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, সাহিত্য ও চিন্তার জগৎ এখনো পুরোপুরি নীরব হয়নি। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূল্যবোধ নতুন করে জাগ্রত হতে পারে যদি রাষ্ট্র তার শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে নয়, আস্থায় রূপান্তর করে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং ভিন্নমতের প্রতি স্বাধীনতা একদিনের অর্জন নয়।এটি আজন্মের এক দায়। বাংলাদেশ আজ সেই দায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। যদি স্বাধীনতাকে কেবল অতীতের গৌরবগাথা হিসেবে দেখা হয়, তবে তা ধীরে ধীরে শ্লোগানে পরিণত হবে। আর যদি স্বাধীনতাকে বর্তমানের কঠিন প্রশ্ন ও ভবিষ্যতের নৈতিক দিশা হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে সার্বভৌমত্ব কেবল রাষ্ট্রের সীমানায় নয়, মানুষের মনন ও সাহসে স্থায়ী আসন পাবে। শেষ অবধি এটিই সত্য।

2 Comments

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *