শুভদীপ গাঙ্গুলির কবিতাগুচ্ছ
শুভদীপ গাঙ্গুলির কবিতাগুচ্ছ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। জীবনের কৃপাঋণ অপটু দক্ষতায় শোধ করতে গিয়ে, তার দু তিন বছর ঘরের বাইরে কেটেছে, আবার ঘরে ফিরে আসাও হয়েছে সেই ঋণ মেটানোর দায়েই।
সে জীবনকে জীবনের মত বাঁচতে ভালবাসলেও, জীবনের কাছে আরো অনেকের মত, সে পরাজিত, লাঞ্ছিত; জীবনের হরিৎ আভা তাকে সবসময় স্পর্শ করতে পারেনা। সে শব্দের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেতে সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করে, আর ভালবাসে গান শুনতে, সিনেমা দেখতে, ব্যাডমিন্টন, চেস ইত্যাদি খেলা খেলতে।
#১
একেক রাতে
একেক রাতে বিষাদ নামে
স্রোতের মতো, ঢেউয়ের মতো, হিমের মতো
দুঃখ নামে, অনাগত।
একেক রাতে কষ্ট নামে, ওষ্ঠ জুড়ে
কন্ঠ জুড়ে, দুঃখ কাতর স্মৃতি আসে
অবিরত অবিরত।
একেক রাতে গভীর শ্বাসে, দুঃখ নামে
ইতস্তত, দুঃখ চাপার ভঙ্গি নামে
নিজের কাছে, মনের মতো।
একেক রাতে নদীর নামে, নিরাগ আসে
অকারণে, নদীর পাশে, নদীর গায়ে
কান্না আসে, নিশির মতো।
একেক রাতে জোৎস্না আসে, জানলা দিয়ে,
নয়ন দিয়ে, জোৎস্না আসে, জোনাক আসে
অবিরত, অবিরত
#২
বিষাদ কাহন
তিন আঙ্গুলের ফাঁকে কপাল জড়িয়ে ধরি
দুই আঙ্গুলে অন্ধকার
এক আঙুলে কাজল লাগাই রাত্রির
শূন্য হাতে দিই চন্দন।
(চাঁদের চুমুতে দিই চন্দন)
এক বাহু জড়িয়ে ধরে তাকি বলি, “কাঁদছি”,
আরেক বহু জড়িয়ে বলি, “এলাম এবারের মত”।
রাত্রি থেকে কাজল ঝরে পড়ে অবিরত;
তাকে সাবধানে থাকতে বলি।
চোখ থেকে জল নামে, তাকে
স্বাগত জানিয়ে বলি, “জ্যোৎস্না”।
সেই ছোঁয়ানো নোনতা জল মাটিতে পড়ে,
আমি সেই গন্ধে তার চুলে খুঁজে পেয়ে বলি,
“আরো কাঁদছিলি?”।
দুই বাহুতে আঁকড়ে থাকা,
বুকের মাঝে আর্তনাদ
কাঁধে মাথায় হাত বোলানো
থেমে যাওয়া হিম পরত দীর্ঘশ্বাস।
রাত্রি থেকে সেই অন্ধকার কাজল পরিয়ে,
তাকে জিজ্ঞেস করি, সে কেন হঠাৎ ঝুমকো পরতে চেয়েছিল?
তাকে আরো জিজ্ঞেস করি, সে কেন শোনেনি ফিরতি গান?
কেন অবহেলায় গা ভাসিয়ে আমাকে আরো করেনি কিছু অপমান?
যে সব উত্তর ভেসে আসে, স্বপ্নে, দুপুরে, দিনে, ঝাপসা চোখে
সেই সব আমাকে পাগল করে তোলে
মাথায় হাত বুলিয়ে দিই ফোঁপানো কান্না
জড়িয়ে ধরে বলি, এলাম।
#৩
ঝিঁঝিঁর শব্দ
ঝিঁঝিঁর শব্দের মত বৃষ্টি অনর্গল;
আজ এই গহন রাতে, তোমার মাটির
শরীরের কথা মনে পড়ে।
অথচ তুমি এমন কোনো দূরে যাওনি, আমার
থেকে হয়তো একশো, দুশো বা কয়েক হাজার ক্রোশ দূরে তুমি ?
ওই দেখ, গড়িয়াহাট মোড় থেকে ফুলের গন্ধ
ভেসে ভেসে আসে,
জন্মের উন্মেষে বসে থাকতে থাকতে, মৃত্যু অপেক্ষায়, কিংবা গভীর ঘুমে
অগভীর রাত্রির মত, অবলীলাক্রমে, কত ঘুম, শব্দ, স্বপ্ন ভিড় করে আসে।
মনে পড়ে, এমনই এক রাতে হলুদ বৃষ্টি
তোমার লম্বা চুলের পরে বিনুনি হয়ে পড়েছিল।
জ্যোৎস্নার কাফনে যে বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল,
তার অন্তিম দিন ঘনিয়ে গেছে বহুদিন।
এক এক অপরাহ্ন হেলায় কেটেছে কত, তারপর।
আজও যখন বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধাই,
তোমার হাতের কথা মনে পড়ে, জলপট্টি, ভেজা ঘাম, ওম।
সেই হাত, যা আমাকে বৃষ্টিতে ভিজতে শিখিয়েছিল।
কথা কাটাকাটির পরে এখনও তোমার দেখা পেতে চাই আমি।
কিন্তু, ক্রমশ আঁধার নেমে আসে;
শব্দের ঝিঁঝিঁর মত অনর্গল বৃষ্টি
আর আমি বুঝতে পারি, তোমার পায়ের ছাপ
ভিজে মাটি থেকে ক্রমশ আকাশের ঊর্ধ্বে উঠে যাচ্ছে।