Email: info@kokshopoth.com
February 1, 2026
Kokshopoth

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ

Jan 23, 2026

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ

তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।

 

১০ম পর্ব

বাসের বাঁশি


‘আসেন-আসেন ঢাকা মেইল
ভাড়া নাটোর বাইপাস।
একটু পরেই বুঝে গেলাম
আজ চড়েছি লোকাল বাস।
 
ভীষণ জোরে ছুটেলো গাড়ী
চললো অটোর ঠিক পিছে।
সময়মত পৌঁছে যাবো
এমন আশা আজ মিছে।
 
যেথায়-সেথায় থামে গাড়ি
স্টেশন-ফেশন লাগে না।
যাত্রীগণে ভীষণ বকে
চালক তাতে রাগে না।
 
সিট ফুরিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে,
বাদুড় ঝোলা কেউ ঝোলে।
তবু যেনো সাধ মিটেনা,
সব স্টেশনেই লোক তোলে।
 
সিটের ফাঁকে মাঝে-মাঝেই
ঊঁকি মারে ছারপোকা।
লোকাল বাসে উঠে আমি
আজ সেজেছি খুব বোকা।‘

 

(লোকাল বাস, এস. এম. ফরিদুল ইসলাম)

 

জীবনে যে বাসে প্রথম চড়ি তার নম্বর ছিল ৮৯। সেই বাস দিয়ে আমার বাস-তব জীবন দেখার শুরু। সেই মায়ের চেঁচিয়ে ওঠে ‘নদী দেখ, নদী!’, তারপর পুরনো কেল্লা, বরফ কল, বরফ কলের কাছে  ৭৬ বাস স্ট্যান্ড, মাছের আড়ত পরপর।  ক্রমে  ধানক্ষেত। গ্রাম বাংলার  অকৃপণ প্রকৃতি। মার বলে রাখা ‘ডাক্তারখানা স্টপেজে নামিও কিন্তু মেয়ে আছে সঙ্গে’, কন্ডাক্টর এক গাল হেসে, ‘কী যে বলেন বড়দি, আপনাকে বলতে হবে? আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি নেপাল’ এবং অবধারিত সে পয়সা নেবে না। ‘কী যে বলেন আপনার কাছে ভাড়া নেব?’  দুই বিনা ভাড়ার যাত্রীকে নামিয়ে দ্যায় পরম যত্নে।

 

২০৬ বাস দিয়েছিল টেনিস এলবো। ১বি দিয়েছে কোমরের ব্যথা।  মাল নিজ দায়িত্বে রাখতে শিখিয়েছে বাস। শিখিয়েছে   হিলা হিলায়ে লেডিস ,রোক্কে লেডিস।

বাস আমার প্রথম হারিয়ে যাওয়ার ভয় দিয়েছিল। ভিড়ের মধ্যে বাবার হাত ছেড়ে গেছিল, কান্নাকাটি করে একঘর।

‘বাশে করে এসেছি’  বলতে  ক্লাস নাইনে ইংরেজির গায়ত্রী ম্যামের বকুনি। ‘বলো বাশে নয় বাসে করে এসেছি’।

সরস্বতী প্রেসে যাবার সেই বিখ্যাত ২৩০, ২৩৪। বি টি রোডের কিংবদন্তীপ্রতিম জ্যাম।  এল নাইন দোতলা বাস।  দোতলা বাস থেকে দেখা অন্যরকম  সেই রোমান্টিক নস্টালজিক কলকাতা। বাস স্টপের সেই মায়া।  আমাদের  মফস্বলের ২১৮। আর একটা গুমঘরের মতো দেখতে মিনিবাসে লেখা ‘ঢোলার হাট যাইবে’, ছাদে ছাগল মুরগি।

কখনো বাসের ড্রাইভারের পাশের হট সিটে মানে ইঞ্জিনের ওপর  বসে দেশ দুনিয়ার অনেক জানকারি। এক ড্রাইভার বলেছিল, ‘বুঝলেন দিদি, ঐ আপনাদের লেখাপড়ার লাইন ছাড়া পৃথিবীর সমস্ত লাইন আমার জানা হয়ে গেছে।‘ এর পরের বাক্যটা সে বলেনি, কিন্তু আমি ঠিকই বুঝেছিলাম । ‘চ্যালেঞ্জ নিবি না শালা, পাঙ্গা নিবি না শালা।‘ ভাই রে! ড্রাইভারের সঙ্গে কেই বা পাঙ্গা নিতে যায়?

একটা কথাই তো আছে, গাড়ির ড্রাইভারকে কখনো চটাতে নেই, সে মোটর গাড়ি অথবা বাস। আমার ক্যাংলাসজীবনে টেম্পোতে ড্রাইভার এবং নারকেল দড়ি দিয়ে বন্ধ দরজার মাঝে বসে জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিতে যাবার অভিজ্ঞতা আছে।

 

তবে বাসের সেরা অভিজ্ঞতা এসেছিল এক মিনিতে। তখন সাহিত্য অকাদেমিতে চাকরি করি, মেট্রো তখনো বাড়ির দরজা অব্দি আসেনি, সরকারি বাস সি ফাইভ ভরসা, যাবার সময় একটা নির্দিষ্ট সময় বেরোলে সেটা পাওয়া যায়, টার্মিনাস থেকে উঠি বলে সিটও পাওয়া যায় , যদি না শেষ মুহূর্তে আসি, কিন্তু ফেরার সময় সে বাসের কোন ঠিক ঠিকানা থাকে না। রবীন্দ্র সদনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, ওটাই ন্যায়ত এবং ধর্মত বাস স্টপ। কিন্তু বেটাচ্ছেলে সেখানে দাঁড়াবে কেন? সে কেবল আড়াল দিয়ে আমাকে এড়িয়ে যায়। ঐ জায়গাটায় সবাই জানেন কেমন ট্রাফিক থাকে, অত বাস এবং গাড়ির ভিড়ে আমি ততদিনে সি ফাইভ কে শনাক্ত করার দক্ষতা অর্জন করে ফেলেছি। তাকে দেখলেই আমি যেরকম আহ্লাদিত হয়ে উঠি, চাকরির চিঠি বা প্রেমিকের মুখ দেখলেও জনগণ অত আহ্লাদ করে না। আমি  শিকারীর মতো তাক করে তার দিকে ধাবিত হই, কারণ সে বাসের ফুটপাথ ঘেঁষে আসার বা  থামার কোন সু অভ্যেস গড়ে ওঠেনি। সত্যি বলতে কি, একই রুট , এবং ফেরার পথে কখনো সকালের  একই ড্রাইভার কন্ডাক্টর  থাকলেও আসার পথে আর ফেরার পথে বাসের চরিত্র বেমালুম বদলে গেছে। আসার সময় বাস অত্যন্ত সহৃদয়, ক্রুণার অবতার। ‘অফিসে লেট খাব’, ‘বায়োমেট্রি কোন রেয়াত করবে না’, সমস্বরে চেঁচালেও, সে যতক্ষণ না বাইপাসে পড়ছে, ততক্ষণ প্রতিটি পাড়ার প্রতিটি গলিতে দাঁড়িয়ে পরম ধৈর্য এবং সহানুভূতির সঙ্গে অপেক্ষা করবে পৃথবীর সেরা বিলম্বিত লয়কারীদের জন্যে, আর আমরা দেখতে পারব অবিস্মরণীয় সব দৃশ্য। এক পায়ে মোজা পরে, আরেকটা হাতে নিয়ে দৌড়ে আসছে এক ফ্যাশবেবল তরুণী, স্কুল পড়ুয়া দৌড়চ্ছে, তার পেছনে  স্কুল ব্যাগ, ওয়াটার বটল, টিফিন বক্স কাঁধে, হাতে নিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে দৌড়চ্ছে মা, কোন কোন মা আবার ড্রাইভারকে বলছে ‘একটু দাঁড়ান না দাদা, শিবুর দোকান খুললেই কেকটা কিনে উঠব, আমার বুবাই আবার ঐ কেক ছাড়া কিচ্ছু খায় না!’  প্যান্টের বোতাম আঁটতে আঁটতে ভুঁড়িদার মাঝবয়সী হাঁটা আর ছোটার মাঝামামঝি কিছু একটা করছেন- আর এসবের মাঝে নির্বিকল্প  সমাধিতে বসে আছে ড্রাইভার, কন্ডাকটর এক মনে বিজলির থাম্বায় সাঁটা গুপ্ত রোগের হলুদ পোস্টার দেখছে! কিন্তু ফেরার পথে এদেরই আলাদা মেজাজ । কে হাত দেখাল, এরা পরোয়াই করে না, সকালে এরা প্রাইভেট বাসের মতো যথেচ্ছ স্টপের বাইরেই বেশি, প্যসেঞ্জার তুলতে তুলতে এসেছে, ফেরার পথে এরা রূপনারায়ণের তীরে জেগে ওঠার মতো আবিস্কার  করে এরা সরকারি বাস, এদের একটা আভিজাত্য আছে। এরা কেন স্টপেজে দাঁড়াবে?  সোজা  টার্মিনাসে গিয়ে দাঁড়াবে। ইদিকে আমি হাত দেখাই, যত সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ জানা আছে, সব প্রয়োগ করি, চেঁচাই, তবু সে আমার ব্ধূয়া আন বাড়ি যায় আমারই আঙ্গিনা দিয়া! পরের দিন অপেক্ষাকৃত ফাঁকা এক্সাইড স্টপে গিয়ে দেখলাম, একই ব্যাপার, সে চোখের ওপর দিয়ে, প্রাণের পরে চলে গেল বসন্ত বাতাসের মতো, সে যে চলে গেল বলে গেল না, ককিয়ে উঠেই ক্ষান্ত দিই না, দৌড়তে থাকি। বাস পাত্তাই দ্যায় না, সে উস্মেন বোল্টের মতো গতিতে যেভাবে চলে যায় যে সে রাসবিহারীর আগে কোথাও দাঁড়াবে বলে প্রেত্যয় হয় না। তবে এইভাবে  সি ফাইভের পেছনে প্রতি সন্ধেয় দৌড়তে দৌড়তে আমার আর জিমে যাবার দরকার পড়ে না, সেইসময় ছবি তোলা ফোন ছিল না বলে আপনাদের প্রমাণ দিতে পারছি না। তবে অচিরেই আমি সি ফাইভের মায়া মোহ ত্যাগ করে অন্য কিছুর সন্ধান করি, আর তখনি গড়িয়া মিনি চোখে পড়ে। বেঁটে মিনি আমার একটুও পছন্দ নয়, আর্গোনমিক্সের কথা ধরলে এর থেকে খারাপ বাস আর হয় না। তবু বাড়ি তো ফিরতে হবে।

তাই জয় মা বাসেশ্বরী বলে একদিন মিনিবাসে উঠে পড়ি। কী আশ্চর্য ! বাস বেশ ফাঁকা, দু চারটে সিট রয়েছে, একটি জানলার ধারে আবার। আহ্লাদ করে এগিয়ে যেতে  গিয়ে থমকাই, আমি যে সিটের দিকে তাক করে এগোচ্ছি, তার ঠিক পরের সিট আলো করে বসে আছেন ‘সংযুক্তা ভাদুড়ি’, যুবমানস দপ্তরে লেখার সূত্রে  তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের এই কর্মীর সঙ্গে দিব্যি একটা সখ্য  হয়েছে। দিদি অতুল্প্রসাদ রজনীকান্তের গান গান, টিভিতে প্রোগ্রাম থাকলে বলে দেন, তবে সে যে অন্তত সাত আট বছর আগের কথা, তার মধ্যে হয়তো দু একবার রাস্তাঘাটে দেখা হয়েছে, সে কথা মনে থাকে না আমার। আমি বহুদিনের আগের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে যেমন উচ্ছ্বসিত হওয়া উচিত, তার থেকেও বেশি উচ্ছ্বসিত।  আবার আমার টনটনে জ্ঞান আছে, সংযুক্তাদি  তো গোলপার্ক থাকে, এই বাস ওদিক মাড়ায় না। তবে?

তাই খুব অবাক  হয়ে বলি ‘তুমি এই দিকে? কোথায় যাচ্ছ?’ আমার সেই ‘সংযুক্তাদি’ আমার চেয়েও অবাক দেখা গেল। ‘হ্যাঁ এদিকেই তো যাব, এদিকেই তো যাই’ ‘সংযুক্তাদি’র হিমশীতল  স্বর আর অবাক প্রশ্নে আমার টনক নড়ে। মনে হয় কোথাও একটা গণ্ডগোল হচ্ছে। আমি সমস্ত উৎসাহ হারিয়ে ধপ করে সিটে বসে পড়ার আগে আমার ‘সংযুক্তাদি’ র দিকে  শেষবারের মতো তাকাই। আর অমনি আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমস্রোত খেলে যায়। ইনি কে? ইনি যে বিখ্যাত  বাচিক শিল্পী বিজয়লক্ষ্মী বর্মণ!  তাকে আমি বলেছি ‘তুমি এই দিকে? কোথায় যাচ্ছ?’!!! জানলা দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া আসে, আমার এই ছড়ানোগুলো উড়িয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে…

বাসের মধ্যে এই আবাস মেট্রো রুট কবি সুভাষ অব্দি সম্প্রসারণের পর উঠে গেল বললেই হয়। শেষ হল গেল  অ্যাডভেঞ্চারের রোমহর্ষক একটা পর্ব। শুরু হল মেট্রো অভিযান। সেখানেও মারকাটারি সব ক্যংলাসসুল্ভ ঘটনার ঘনঘটা। তা  অন্য গল্প, আরেকদিন হবে। তবু, ব্যথার স্নায়ুতে
মর্চের বাহার  যে লেগে আছে, তা বোঝা যায় যখন  এখনো যেতে আসতে  কোথাও ১ বি  দেখলেই উত্তেজিত হয়ে উঠি, বলতে চাই ‘ এই রোকো’!

1 Comment

  • চমৎকার লেখা। খুব মজা পেলাম।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *