কবিতা বিষয়ক গদ্য: জয়া বসাক
মুক্ত গদ্য #১ঃ জয়া বসাক
জন্ম : ১৯৯৫, দক্ষিণ দিনাজপুর ।
নৃবিদ্যায় স্নাতক নিয়ে পড়াশোনা ও রেডিওথেরাপিউটিক্স টেকনোলজি তে ডিপ্লোমা ।
পেশা : রেডিয়েশন থেরাপিস্ট
শখ : ছবি আঁকা, নিজের সাথে একা সময় কাটানো, পাহাড়ে যাওয়া, নদীর নির্জনতা শোনা ।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : প্রথম কাব্যগ্রন্থ গোয়াল ফ্লানি সেতু, ২০২৩, দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ মার্টিন লুথারের গয়না ঘর, ২০২৪ ।
কবিসম্মেলন, মধ্যবর্তী, কবিতা পাক্ষিক, কবিতা আশ্রম, নন্দন আরও অসংখ্য পত্র পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা লিখে চলেছেন ।
কবির জগৎ
কবিতা কেন লেখে ? এই প্রশ্ন যেমন বহুকালের, তেমনি এর উত্তরও দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বহুজনে। বৈষয়িক মানুষের কাছে কবিতা একটি অপ্রয়োজনীয় বিষয়, কারণ তা দিয়ে কোনো বৈষয়িক লাভ হয় না। তারা আসলে ভেবে দেখে না, বিষয় (অর্থ)আসলে কোনো না কোনো কাল্পনিক আরাম বা স্বস্তির জগৎ নির্মাণের উপাদান মাত্র। কবিতাও কবিকে এই বিশৃঙ্খল, অসামঞ্জস্যপূর্ণ পৃথিবীতে তাঁর নিজের মতো একটি শৃঙ্খলিত, সামঞ্জস্যপূর্ণ জগৎ গড়ে নিতে পারার স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বস্তি দেয়।
মানুষ টাকা রোজগার করে। কারণ এই টাকা হলো সেই ক্ষমতা যা দিয়ে মানুষ তার নিজের ইচ্ছামতো একটি জগৎ চায়। কবির শব্দ হলো সেই শক্তি যা দিয়ে তিনিও নিজের ইচ্ছামতো একটি বিশ্ব নির্মাণ করেন। কিন্তু টাকার জগৎ ও কবি নির্মিত শব্দের জগতের মধ্যে একটি ব্যবধান আছে। প্রথমটি সীমাবদ্ধ, দ্বিতীয়টি অসীম। বস্তুজগত সবসময় একটি দ্বান্দ্বিক, জটিল টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে চলে। টাকার ক্ষমতা এই দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে একটি ফলাফলের দিকে এগিয়ে চলে। শব্দের জগতেও এই দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েন আছে, তবে কবি তাঁর বিপুল প্রতিভা এবং কল্পনার অসীম শক্তি দিয়ে এখানে নিজের জগৎ গড়ে তোলেন এবং কল্পনার জগৎ বলেই তার স্বাধীনতা ও মুক্তির আকাশ অনেক বড়ো। বুঝতে হবে, টাকার ক্ষমতা চলে বাস্তব থেকে কল্পনার দিকে, শব্দের ক্ষমতা কল্পনা থেকে বাস্তবের দিকে এগোয়। কবি যখন একটি জগতের কথা ভাবেন তখন সেটি একটি কল্পনা, তারপর তিনি যখন শব্দ দিয়ে জগৎটি নির্মাণ করে ফেলেন সেটি বাস্তবের অনুভূতি দেয়। আবার টাকা হলো সেই বাস্তব যা একটি কাল্পনিক জগৎ নির্মাণের ক্ষমতা হিসেবে কাজ করে। উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারে। ধরা যাক, একটি যুবক একটি সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। অর্থাৎ, যুবকটির কল্পনায় সুন্দরী মেয়েটিকে স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার একটি কাল্পনিক বাস্তবতার আকাঙ্ক্ষা বর্তমান। যুবকটি যদি অনেক টাকার মালিক হয়, সে ওই টাকার ক্ষমতা দিয়ে মেয়েটিকে বিয়ে করার কথা ভাববে। যুবকটি যদি কবি হয়, সে তার কবিতার জগতের ভিতরে মেয়েটিকে পেতে চাইবে। টাকার বাস্তবতা এখানে মেয়েটিকে পাওয়ার কাল্পনিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। কাল্পনিক বাস্তবতা বলেই মেয়েটিকে পাওয়ার পর মেয়েটি সম্পর্কে তার পূর্বের ধারণা ও স্বপ্ন মিলবে না, কিংবা বহু ফারাক ধরা পড়বে। উল্টোদিকে কবির শব্দের কল্পনা যখন কবিতার ভিতরে মেয়েটিকে ধরে রাখবে তখন সেখানে তিনি যেমন ভাবে তাকে সৃজন করবেন তা চির অপরিবর্তনীয় হয়ে ধরা থাকবে। ফলত, এই কবিতার বাস্তবতা কখনো বদলে যাবে না। এইজন্য বৈষয়িক মানুষের জগতের চেয়ে কবির জগৎ এতো বড়ো, অসীম।
যেকোনো মানুষ তার নিজের জগৎ গড়ার কাজে সচেষ্ট। কবিও তার ব্যতিক্রম নন। শব্দ, কল্পনা, চিন্তার সারবত্তা দিয়ে কবি তাই নির্মাণ করেন। প্রকৃতপক্ষে যারা কবিতা লেখে না, পড়ে না বা পছন্দ করে না, তারাও কবির মতোই একটি মনো মতো জগৎ চান, কিন্তু তারা চেষ্টা করে নিজেদের কাছে যে টুলস আছে তাই দিয়ে সেই জগৎ গড়তে, কবি চেষ্টা করেন তার নিজের ইনস্ট্রুমেন্টস (কবিত্ব) দিয়ে সেই জগৎ নির্মাণ করতে। সে ইনস্ট্রুমেন্টস এতো শক্তিশালী যে তা দিয়ে যা নির্মাণ করা হয়, তা পার্মানেন্ট হয়ে যায়। এমনকি সাধারণ মানুষের আবেগ, অনুভূতি, সুখ, দুঃখ, চাওয়া পাওয়ার সূত্রগুলো সেখানে এক অন্য সমীকরণে নতুন করে ভাঙা গড়ার মধ্য দিয়ে চলে। হয়তো দুঃখ সেখানে সুখের চেয়ে অধিক আনন্দদায়ক, বিরহ মিলনের চেয়ে ঢের বেশি মধুর।