মোহনা মজুমদার-এর নিবন্ধ
মোহনা মজুমদার-এর নিবন্ধ
জন্ম কলকাতায় । অংকে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা চার । প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘পারাবার বেঁধে রাখি’ , ‘উৎসারিত ও সলিলোকুই’ , ‘বিহান আলোর লিপি’ , ‘যতটা অপ্রকাশিত’ । আজকাল, সংবাদ প্রতিদিন, ভারতীয় হাইকমিশন ঢাকা থেকে প্রকাশিত ভারতবিচিত্রা, কবি সম্মেলন, বাংলা লাইভ,দৈনিক স্টেটসম্যান,যুগসঙ্খ, নাটমন্দির, উজানস্রোত, অপার বাংলা, আবহমান, বান্ধবনগর, কারুকৃতি, গুহালিপি , বৃষ্টিদিন, শুধু বিঘে দুই , প্রভাস, সাতটি তারার তিমির ইত্যাদি বিভিন্ন প্রথম সারির পত্র পত্রিকায় লিখে চলেছেন । অবসরে ভালোবাসেন গান শোনা ও রংতুলি দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটা।
ধর্ম কি নারীসত্তার রূপরেখা?
ধর্ম হল সত্তা। প্রতিটি ধর্মের প্রতিটি মানুষের অন্তর্নিহিত সাধারণ বৈশিষ্ট্যটিই সত্তা এবং এটাই ধর্ম। চুম্বকের সত্তা যেমন লোহাকে আকর্ষণ করা, বৃক্ষের সত্তা যেমন ফল-ফুলের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ, তেমনই মানুষের ধর্ম বা সত্তা হল মনুষ্যত্ব। জাপানি বৃদ্ধ ভিক্ষু ওশো বলেছিলেন, “Mind with beliefs, ideas, concept, systems, philosophies is a paralysed mind no longer free to move too feathered too much in bondage, slave” অথচ এই বিশ্বাস, ধারণা, ভ্রম এগুলোই তো একটি ধর্মের তথা ধর্মগ্রন্থের বুনিয়াদ। কিন্তু ধর্ম যদি এই বিশ্বাসকে ইনভিজিবল অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করে? আদিকাল থেকে স্বার্থান্বেষী ব্রাক্ষণরা মানুষের অন্ধত্বের সুযোগ নিয়ে নিজেদের পক্ষে ধর্মকে টানার জন্য ঐশী গ্রন্থে বা ঐশী শিক্ষামূলক গ্রন্থে নিজেদের মনগড়া কথাকে ঈশ্বরের বাণী বলে ঢুকিয়ে দেয়। যার দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ আমরা মনুসংহিতায় পাই। কথিত আছে, মনুসংহিতা একটি নারীবিরোধী ধর্মগ্রন্থ। যেখানে নারীকে কুকুর বা শূদ্রের থেকেও অধম হিসেবে দেখানো হয়েছে। নারীদের অবস্থান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, নারীদের জীবনের কতগুলো ধাপ যথা বাল্য অবস্থান, যৌবন অবস্থান, বৃদ্ধ বা বৃধবা অবস্থান সম্পর্কে মনু যেসব বক্তব্য রেখেছেন, তা মনে হতে পারে নারীবিদ্বেষী। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থায় পুরুষের আস্ফালন এবং নারীকে নানাবিধ বিধানের মাধ্যমে গৃহবন্দী করে রাখার নিদান মনু লিখে রেখে গেছেন এই গ্রন্থে। শোনা যায়, বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠার অনেক পরে অশোকের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও বৌদ্ধধর্মকে রাজধর্ম করার ফলে ব্রাহ্মণ্যধর্মের হীনাবস্থায় বহুকাল গত হলে ব্রাহ্মণদের চক্রান্তে পুষ্যমিত্র কর্তৃক সম্রাটকে হত্যা করে ব্রাহ্মণ্যশাসন প্রতিষ্ঠার পরে এই গ্রন্থ রচিত হয়। প্রধানত বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধে এবং পুরোনো ধর্মশাস্ত্রকে বরবাদ করে দিয়ে বর্ণব্যবস্থাকে জন্মগত করে ব্রাহ্মণকে সবার ঊর্ধ্বে রেখে হাজারো জাতপাতের সৃষ্টি করে একেবারেই নতুন করে ব্রাহ্মণ্যধর্মী এই গ্রন্থ রচিত হয়। এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল রাজহত্যাকারী ব্রাহ্মণ সেনাপতি স্বয়ং পুষ্যমিত্র যে তখন সিংহাসনে আসীন। অথচ এই গ্রন্থ স্বয়ম্ভূ মনু কর্তৃক রচিত বলে ধর্মকে সামনে রেখে ভণিতা করে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া হয়।
ধর্মের ধারণা তো শুরু হয় ঘর থেকে, বাসস্থান থেকে। গৃহই মানবসত্তার ভেতর ধর্মের প্রাথমিক মৌলবাদী বীজ রোপণ করে। সমাজ একটা পিতৃতান্ত্রিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, যেখানে ‘নারী’ নামক বস্তুটিকে শুধুই চাহিদা সরবরাহের মাধ্যম হিসেবে ‘নির্মাণ’ করে চলেছে সে। সময়ের সাথে সাথে তার বিবর্তন ঘটেছে, রূপ, রং বদলেছে কিন্তু এই নির্মাণ বা নির্মাণের ধারণা, তার টপোলজি কিন্তু বদলাইনি। স্বতঃপ্রণোদিত ভাবেই এই ‘নির্মাণ’ শব্দটিই ব্যাবহার করা হল, কারণ কালের পর কাল সমাজ তাকে এক অদ্ভুত জড় পদার্থের ন্যায় এক কল্পনার পুতুল হিসেবে গড়ে পিঠে রাখতে চেয়েছে, যার কোনো নিজস্ব বাক স্বাধীনতা থাকবে না, নিজের জীবন নিজের মতো করে গড়ার স্বাধীনতা থাকবে না সর্বপরি ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির কোনো অস্তিত্ব থাকবে না তার জীবনে। ছোট থেকে শুনে এসেছি আমাদের বাড়িতে মেয়েদের জন্মদিন নাকি উদযাপন করতে নেই, কিন্তু তার পেছনে কোনো কারণ বা ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বড়রা। শিশুমনে প্রশ্ন উঠলে বলে দেওয়া হত মেয়েদের জন্মদিন করলে বাড়ির অকল্যাণ হয়। কন্যাসন্তানকে উপেক্ষিত করে রাখার জন্য এসব স্টিরিওটাইপ যুক্তি দিয়ে সমাজ থাবা বসিয়ে এসেছে যুগের পর যুগ। একজন পুরুষের ‘চাওয়া’ সমাজ যত সহজে অ্যাকসেপ্ট করে, একটি নারীর ‘চাওয়া’ কি অত সহজে গ্রাহ্য করা হয়? একজন নারী তার ‘চাওয়া’ নিয়ে সমাজের কাছে দুহাত পেতে দাঁড়ায়। বিচারসভা বসে। সেখানে আলোচনাপূর্বক অনুমোদন করা হয় কতখানি ‘চাহিদা’ পূরণ করা হবে। এভাবে হাত পাততে পাততে নারী একসময় ভুলে যায় তারও কোনোকালে ‘চাওয়া’ ছিল। ‘চাওয়া’ শব্দটির প্রতি অধিকারবোধ ছিল। আজ সে শুধু রিক্ত নয়নে চেয়ে থাকে ‘চাওয়া’ ও ‘না পাওয়া’র মধ্যবর্তী শূন্যতার দিকে। যেখানে আর কোনোদিন ফিরে যাওয়া হবে না। ছোটবেলায় মা’কে দেখেছি খেতে দেওয়ার সময় সবার আগে ভাইয়ের থালায় খাবার দিয়ে এসেছেন আজীবন। জিগ্যেস করলে সগর্বে বলতেন ‘ঠাকুমা নাকি বলে গেছেন বাড়ির ছেলের পাতে আগে খাবার বাড়তে’। পিতৃতান্ত্রিকতাকে আরও বলিষ্ঠ করে তোলার উদ্দেশ্যে আমরা নারীরাই আজীবন সযত্নে দায়িত্ব পালন করে চলেছি নির্দ্বিধায়। যুগের পর যুগ মানুষ সেকাল-একাল এর জীবনধারার ফারাক বুকে আগলে বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে, দেখে যাওয়া ছাড়া আর কিচ্ছু করার নেই মানুষের। ছোটবেলায় ঠাকুমা বলতেন আমরা ভাই-বোন কেউ বাবার মত পড়াশোনায় হইনি, বা বাবার মত গায়ের রং পাইনি। এই না হওয়া, বা না পাওয়ার ভেতরে তিনি কি পরোক্ষভাবে কোথাও মা’কে দোষী বা ব্যর্থ প্রমাণ করতে চাইতেন? কখনও ভেবে দেখিনি। তবু ওই মানুষটাই একসময় হয়ে উঠেছিলেন আমার সর্বসময়ের সঙ্গী। মা-জ্যেঠিকে দেখতাম সকলকে খেতে দিয়ে সবার শেষে যখন নিজেরা খেতে বসতেন একখানি মাছ হাফ হাফ করে খেতেন। কেউ কখনও এসে জিগ্যেস করেনি তাদেরও কিছু প্রয়োজন ছিল কিনা। অথচ তাদের সংসারঅন্ত জীবনে কী মন দিয়েই না সংসারখানা করেছেন তারা হাসিমুখে অভিযোগহীন ভাবে। আসলে পিতৃতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মতো দুটি নিপীড়নমূলক ভাবধারার মাঝে নারীদের গৃহ ও যত্নের অবৈতনিক শ্রমে বেঁধে রাখাই চিরকালীন রীতি। দিদা-ঠাকুমাকে দেখেছি তারা যতকাল বেঁচেছেন নিরামিষ খাবার খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন তাদের মৃত স্বামীরা আর ফিরবে না জেনেও। তাদের মনের কোণে কখনও কোনোদিন কি ইচ্ছে হয়নি আমিষ দ্রব্য চেখে দেখতে? রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে আমরা প্রত্যেকে যে যার ইচ্ছে মতো খাবার খাই, গাড়িতে উঠলে নিজেদের পছন্দের সিটে উঠে বসি। কিন্তু মা কখনও মুখ ফুটে বলেন না ‘আমি আজ এই সিটটায় বসতে চাই’ কিংবা ‘আমার আজকে অমুক খাবারটি খেতে ইচ্ছে করছে’। যুগের পর যুগ নারী শুধুমাত্র নিজের ‘চাহিদা’ গুলো মুছে গেছে নির্দ্বিধায় পিতৃতন্ত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে। ভালবাসার মানুষকে আঁকড়েই তার যাবতীয় সুখ। রণজিৎ দাশ লিখছেন “নারী শুধু চায় মন-/ পুরুষের মন!/ প্রতিটি দুঃখের বাঁকে শেফালি শাখার মত হাত পেতে থাকে/ বলে, দাও, মন দাও, দোহাই তোমার-/ মনের বেদনা জলে আমাকে বাঁচাও।”
‘সিনিসিজ্ম’, ‘বিদ্বেষ’, ‘আধিপত্য’, ‘আত্মশ্লাঘা’ এই শব্দগুলো খুব প্রকটভাবে পুরুষের ভেতর রোপন করেছে ধর্ম। ঘরের থেকে যখন বাইরের দিকে চোখ রাখি , দেখি নারী আজও পুরুষের চোখে একই রকম অবজ্ঞা, অসম্মানের পদে অবস্থান করছেন। এই কয়েকদিন আগে এক কবি(পুরুষ) তার পছন্দের সেরা দশজন কবির তালিকা প্রকাশ করলেন। সেই তালিকায় একজনও মহিলা কবির নাম তিনি রাখলেন না। এটা কি নিতান্তই ব্যাক্তিগত চয়েস হিসেবে গন্য করা যায় নাকি সন্তর্পনে তিনি একখণ্ড পুরুষতন্ত্রের ছাপ রেখে গেলেন এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও? গন্য করতে না চাইবার এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রবণতা শুধুই অসম্মানজনক নয়, হতাশারও। আর কতকাল, আর কতকাল নারীকে নিজেদের প্রমাণ করার জন্য পুরুষের ভ্যালিডেশন নিয়ে বাঁচতে হবে?
এখন আমি আমার সাত বছরের মেয়ের কোলে মাথা রাখি, সে হাত বুলিয়ে দেয় আমার মাথায়, আমি নিশ্চিন্তে চোখ বুজে তাকে জড়িয়ে থাকি। স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে নিঃশ্বাসে। নারীরা বোধহয় এমনই, চিরকালীন ‘মা’ হয়েই জন্মায়। তার ভেতর আমি যেন সারদা মা’র ছায়া দেখতে পাই। যেন পা বিছিয়ে স্নেহসুলভ ভঙ্গিতে বলছেন “আমি সত্যিকারের মা, গুরুপত্নী নয়, পাতানো মা নয়, কথার কথা মা নয়- সত্য জননী।” সারদা মাও তো ধর্মের কথাই বলে গেছেন এবং তিনি একজন নারীই ছিলেন। তবে মনুর ধর্ম আর সারদা মার ধর্ম কি কোথাও কোনো কনফ্লিক্ট তৈরী করে? দুটি ভিন্ন পথের সন্ধান দেয়?
শোনো গো সাধের নারীমন, বসো, একটু জিরোও। সারাজীবন তো অনেক ছুটলে, আঘাত পেলে, এবার একটু নিজের দিকে তাকাও। চারপাশে তাকিয়ে দ্যাখো, তোমাকে ভাল রাখার জন্য তুমি ছাড়া আর কেউ নেই তোমার পাশে। তুমিই হলে তোমার ইডিওসিনক্র্যাটিক উর্জা।
2 Comments
দারুণ লেখা। এমন নিবন্ধ পড়লে জ্ঞান ও অনুভূতি দুটিই পুষ্ট হয়।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মুখে বেত্রাঘাত এই নিবন্ধটি। তবে একটি কথা না বলে পারছি না , তা হলো ওই পুরুষ কবির বিপরীতে কোনো মহিলা কবিকে তার পছন্দের দশটি কবির নাম প্রকাশ করতে কেউ কি বাধা দেয়। মনুবাদি সমাজ নিশ্চিতভাবেই অনেক পরিশীলিত হয়েছে তবে বর্তমান রাজনৈতিক ভাবধারা আবার সমাজকে পিছুটান টানছে তাই সেখানে দাঁড়িয়ে এমন বলিষ্ঠ লেখা আরোও প্রয়োজন।