Email: info@kokshopoth.com
February 1, 2026
Kokshopoth

গল্পঃ রানা সরকার

Jan 2, 2026

গল্পঃ রানা সরকার

স্বশিক্ষিত এবং স্বনিযুক্ত। একসময় গৃহ শিক্ষকতা করেছেন। স্কুলে কম্পিউটার শিখিয়েছেন। নভেম্বর ২০০৩ সালে আনন্দমেলায় গল্প দিয়ে আত্মপ্রকাশ। ২০০৫-২০১৪ পর্যন্ত প্রায় নিয়মিত অনুষ্টুপে লিখেছেন। লেখা প্রকাশিত হয়েছে অমৃতলোক, ভাষাবন্ধন, উবুদশে। অনুবাদ করেছেন। লিখেছেন ছোটদের জন্য কম্পিউটার বই। সখ বহুবিধ। গীটার বাজান ও গান লেখেন। ২০২২ সালে কেতাব-ই থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাসঃ   পথের নতুন কাঁটা। ২০২৩ সালে প্রকাশিত মজার উপন্যাসঃ মাল্টিস্টোরিড ক্রিমেটোরিয়াম।

পাত্রপক্ষ

সেজেগুজে বসে আছে শ্যামলী। পাত্রপক্ষ আসবে। অনেকদিন ধরে দেখাদেখি চললেও এখনো বিয়ে হয়নি শ্যামলীর। যদিও এইভাবে বারবার পাত্রপক্ষের সামনে বসতে তার একটু দ্বিধা লাগে; কুণ্ঠা বোধহয়। কিন্তু কী করবে? বাড়ির লোকজন রক্ষণশীল আর প্রেম করাও হয়ে উঠল না তার। সে জানে যে মেয়েদের রূপ না থাকলে বা আকর্ষনীয়া না হলে আজকাল আর কেউ ঠিক পাত্তা দেয় না তেমন। তবে পড়াশোনা শ্যামলী অনেকটাই করেছে। গতবছর এম.এ. পাশ করল, রবীন্দ্রভারতী থেকে ইতিহাস নিয়ে। সঙ্গে তৈরিও হচ্ছে যাতে এবারে সমস্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসতে পারে। সঙ্গে চলছে কম্পিউটার ক্লাস। আর চার-পাঁচটা মেয়ের মতো অবশ্য অতটা স্মার্ট নয় সে। গড়নের দিক থেকেও নয় তেমন আকর্ষনীয়।

তবে এবারে পাত্রপক্ষ উৎসাহ দেখিয়েছে। বলেছে যে তারা পাত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতাকেই বিশেষভাবে নজরে রেখেছে। এর আগেও এই একই পাত্রপক্ষ একবার আসবে বলেছিল। সেদিনটার কথা এখনো বেশ মনে আছে শ্যামলীর। সকাল থেকেই কেমন যেন একটা সাজ সাজ রব পড়ে গেছিল সেদিন বাড়িতে। ঘরের জিনিসপত্র গোছানো থেকে শুরু করে ঝুল, ধুলো ইত্যাদি পরিষ্কার করা, পর্দা পাল্টানো, তারপর কে কোথায় বসবে, কে কীসব প্রশ্ন করবে বা করা হবে যাতে পাত্রপক্ষের আঁতে ঘা না লাগে অথচ সব খবর ঠিকঠাক জানা যায়, কে কী শাড়ি পরবে, কে পাত্রের কী লক্ষ্য করবে ইত্যাদি নিয়ে চলছিল নানান আলোচনা আর পরিকল্পনা।

সেদিন বিকেলবেলা থেকেই সবাই পরিপাটি হয়ে সেজেগুজে বসে ছিল। কিন্তু পাত্রপক্ষের আর দেখা মেলেনি।

সন্ধ্যে রাতে একটা ফোন করে জানিয়ে ছিল যে তারা দুঃখিত। একটা বিশেষ কারণে তারা আসতে পারলেন না। কিন্তু বিশেষ কারণটা যে কী সেটা তারা আর জানান নি। এই নিয়ে শ্যামলীর বাড়িতে বেশ খানিকটা তর্কাতর্কি হয়েছিল। শ্যামলীর মায়ের ছোটভাই, মানে ছোটমামা এই সম্বন্ধটা এনেছিল বলে তাকে শুনতে হয়েছিল একগাদা কথা। ছোটমামাও কম যান না। তিনি বলেছিলেন যে এতে তার ভুল বা দোষ কোথায়? রেগে গিয়ে আরও বলেছিলেন যে তিনি ভাগ্নীর জন্য আর কোথাও চেষ্টাই করবেন না। কারণ বিয়ের ক্ষেত্রে ভাগ্নির কী কী সমস্যা আছে, পাত্রপক্ষ দুঃখিত বলবার সময় সে সবও দিয়েছিল জানিয়ে। তাহলে তাকে নিয়ে এতো কথা উঠছে কেন? পাত্রপক্ষ তো আর অভদ্র নয়। শ্যামলীর কাকা এই ঝগড়ার মধ্যস্থতা করেছিলেন। সেদিন পাত্রপক্ষের প্রতি একরাশ বিরক্তি, ঘেন্না, হতাশা নিয়ে জামা পাল্টাতে গিয়েছিল শ্যামলী।

কিন্তু আজ তারা আসছেনই। আগেরবার না আসতে পারার জন্য বারেবারে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন। ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিলেন নিজেদের সেদিন না আসতে পাড়ার লজ্জার কথা। সঙ্গে এও জানিয়ে দিয়েছিলেন কোনো আয়োজন না করতে। তারা খালি পাত্রীকে দেখবেন আর বলেছিলেন যে একান্তই যদি লোক লৌকিকতা করতে হয় তবে শুধু চা-বিস্কুট খাওয়ালেই চলবে।

তবে সঙ্গে আরও একটা আবদার তারা জানিয়েছেন। জানিয়েছেন যে তারা অতদূরে যেতে পারবেন না। তাই আগামীকালই তারা টালিগঞ্জের স্টুডিরও কাছে শ্যামলীর মাসির বাড়িতে পাত্রী দেখতে আসবেন। শ্যামলীদের বাড়ি আবার পাইকপাড়ায়। ওখানে পৌঁছতে দেরী হয়ে যাবে। তাছাড়া রাস্তায় জ্যামজট হরদম লেগেই আছে। হাজার হোক মেট্রো করে তো আর পাত্রপক্ষ আসতে পারেন না। তাই তারা টালিগঞ্জের বাড়িতে আসবার অনুরোধ করেছেন।

যদিও আবদারটা একটু আশ্চর্‍্যের, তবুও শ্যামলী ভাবল যে তার মাসির টালিগঞ্জের বাড়ির কথা বোধহয় ছোটমামাই পাত্রপক্ষের কাছে ফাঁস করেছে। কারণ ওরা আবার আসছেন গড়িয়া থেকে। আর সেখান থেকে টালিগঞ্জ আসতে সুবিধাই হবে।

প্রাথমিক গাইগুই করা সত্ত্বেও শ্যামলীর বাবা রাজী হলেন। তবুও মাসির বাড়ি এবং কালকেই – এই কথা বলে রাগে গজগজ করছিলেন তিনি। বলছিলেন এতো কম সময়ের মধ্যে কি সব কিছু বন্দোবস্ত করা যায় নাকি? কাকা শ্যামলীর বাবাকে বোঝালেন যে এখন জেট যুগ চলছে। সবকিছু হচ্ছে ঝটপট; রেডিমেড। আজকাল মানুষের এতো সময়ইবা কোথায়? তাছাড়া এতো কিছু বন্দোবস্তেরও দরকার নেই কারণ ওরা বলেছেন যে শ্যামলীকে ঘরোয়া সাজেই ওরা দেখতে চান। আর রইল পড়ে মাসীর বাড়ি, সে মেসো মাসি দুজনেই দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছে। বোনঝির জন্য, দিদি জামাইবাবুর জন্য এইটুকু তারা করবে না? ফোন করে শ্যামলীর মাসি ওদের কোনো চিন্তা করতে বারণ করে দিয়েছে। বলেছে যে তারা সব কিছু ম্যানেজ করে নেবে। শুধু শ্যামলীরা যেন সকাল সকাল চলে আসে।

শ্যামলীর মাসির বাড়ি টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায়। মেসো ব্যবসায়ী মানুষ। বাড়িটা একদম বড় রাস্তার ওপরে। এটা মেসোদের পৈতৃক বাড়ি। মেসোর বাবা বানিয়েছিলেন। কতবার যে শ্যামলী এই বাড়িতে বাংলা সিনেমার নায়ক বা নায়িকাদের দেখতে এসেছে  তার ইয়ত্তা নেই। তবে এবারে পাত্রপক্ষের ব্যাপারটা অবশ্য অন্যরকম। তাই মেসো মাসিও শ্যামলীর মতো সেজেগুজে বসে আছে। শ্যামলীকে মাসি পরিয়েছে তার তাঁত বোমকাইটা। বাকি সবাইও ফিটফাট। ছোটমামা ঘড়ি দেখছিলেন। ফোন এলো অবশ্য শ্যামলীর মাসীর ল্যান্ডলাইনে। জানালেন যে ওরা বেরিয়ে পড়েছেন।

সময় যেন আর কাটতেই চাইছে না। তার মধ্যেই চলছে হাসি ঠাট্টা আর মশকরা। কার কার বিয়েতে বা পাত্রী দেখতে আসবার সময় কী কী হয়েছিল সেইসব নিয়েই চলছে স্মৃতিমেদুর আলোচনা। যদিও দুপুরে আজ ভালোই খাওয়াদাওয়া হয়েছে। আর এই ধারণাটাই সবার মনে খেলা করছিল যে দ্বিতীয়বার যখন ওরা নিজে থেকে আসছেন, তখন মনে হচ্ছে শ্যামলীর একটা হিল্লে হয়েই গেল।

এদিকে এক রাউন্ড চায়ের পর দ্বিতীয় রাউন্ড হয়ে গেল। ছোটমামা বাইরে থেকে ঘরে ঢুকে রূমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে জানিয়ে দিলেন যে পাত্রপক্ষ এসে গেছে। সবাই একেবারে তটস্ত হয়ে গেল। জানালা দিয়ে মাসী দেখল যে ওরা গাড়িটাকে পার্ক করলেন।

তারপর নেতাদের মতো হাতজোড় করে মুখে একগাল হাসি নিয়ে সদর ঘরে ঢুকে পড়লেন পাত্রপক্ষ। ওরা চার-পাঁচ জন মতো এসেছেন। একথা সেকথা শুরু হল। কিন্তু ক্রমেই দেখা গেল পাত্রী মানে শ্যামলী না, ওদের মন  পড়ে আছে বড় রাস্তার দিকে। কথার ফাঁকে ফাঁকেই পাত্রপক্ষের লোকজন অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে তাকাচ্ছিলেন রাস্তার দিকে। চোখে মুখে তাদের একটা উৎকণ্ঠা, একটা উত্তেজনা। অশোভন দেখালেও থাকতে না পেরে শ্যামলীর বাবা জিজ্ঞাসা করল, “কেউ কি আর আসবার আছেন? বাইরে বা মোড়ে কি কাউকে পাঠাবো?”।

পাত্রপক্ষ হেসে জবাব দিলো, “ও না না। ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়”।

কিন্তু পরের দিকে কথাবার্তা মানে বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা এমনভাবে কমে গেল যে শ্যামলীর মা, মাসী থেকে শুরু করে বাকীরা পর্যন্ত পাত্রপক্ষের এ হেন অদ্ভুত আচরণে অবাক হতে শুরু করলেন এবং নিজেরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে আলোচনা করতে থাকলেন। খবর গেল ভিতরে মাসতুতো ভাইয়ের সঙ্গে থাকা শ্যামলীর কাছেও। কথা ছিল সামান্য কিছু কথাবার্তার পর পরই শ্যামলীকে তারা ডেকে নেবেন। কিন্তু পাত্রপক্ষকে দেখা গেল পাত্রীর থেকে রাস্তার দিকেই আগ্রহ বেশি।

শেষে কন্যাপক্ষের বিস্ময় ও ভ্রু কোঁচকানকে খানিকটা মান্যতা দিয়েই পাত্রপক্ষের একজন বয়স্ক ব্যাক্তি শ্যামলীর মেসোকে বললেন, “আচ্ছা, আজ এই রাস্তা দিয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষের মরদেহ যাবার কথা আছে না?” কথাটা শুনে পাত্রীপক্ষ তো অবাক! ওই ভদ্রলোক বলে চললেন, “আরে, আমি বিখ্যাত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের কথা বলছি”।  

“হ্যাঁ, হ্যাঁ”, বলে উঠলেন শ্যামলীর মেসো।

-আমরা না সবাই ওর দারুণ ফ্যান বলতে পারেন। আমাদের খুব আলাপ করবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু দুম করে যে তিনি এভাবে মারা যাবেন বুঝতে পারিনি। আহা! কতই বা বয়স হয়েছিল! তাই শেষ দেখাটা যদি দেখা যায়।

-নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আমরাও ওর ছবির ফ্যান। মেসো ওদের সঙ্গে সহমত হলেন।

কথায় কথায় ঋতুপর্ণ ঘোষ এবং তার সিনেমা ও জীবনের নানা গালগল্প নিয়ে চলতে থাকল ঘনঘোর আলোচনা। চা পান একরাউন্ড পাত্রপক্ষের হয়ে গেছে। এর মধ্যেই একরকম জোর করে শ্যামলীকে ঘরে নিয়ে এলো ওর মাসী। যদিও শ্যামলীকে আনবার কথা বা দেখবার কথা একবারের জন্যও পাত্রপক্ষ তাদেরকে বলেন নি। এতেও তারা সবাই অবাক হয়ে যাচ্ছিল। শ্যামলী আসবার পর ভালো করে দুটো কথা হয়েছে কী হয় নি, রাস্তার মাইকে ঘোষণা শোনা গেল যে আসছে, ঋতুপর্ণ ঘোষের মরদেহ নিয়ে মিছিল শ্যামলীদের মাসীদের বড় রাস্তায় ঢুকে পড়েছে।

দুদ্দার করে পাত্রপক্ষের সবাই শ্যামলীদের সবাইকে অপ্রস্তুত করে বারান্দায় চলে গেলেন। আর পিপাসার্ত চোখে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকলেন। সঙ্গে নিজেদের মধ্যে এমনভাবে বলতে থাকলেন কথা যে তাদের যেন মনেই নেই যে তারা আসলে পাত্রী দেখতে এখানে এসেছেন। ওই মিছিলে থাকা নানান অভিনেতা অভিনেত্রীদের দেখিয়ে দেখিয়ে পাত্রপক্ষের চার-পাঁচ জন আলোচনা করছিলেন যে কাদের কাদের কে তারা চেনেন আর কাদের ক’টা সিনেমা কে কে কোথায় কোথায় দেখেছেন।

প্রায় কুড়ি মিনিট পর মিছিল চলে গেলে ওরা হঠাৎ ততোধিক ব্যাস্ততায় শিঙ্গারা মিষ্টি না খেয়েই শুধু জল পান করেই রওনা হয়ে গেলেন। বলে গেলেন যে তারা ফোনে পছন্দ অপছন্দের কথাটা জানিয়ে দেবেন।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *