তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরা
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ
তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।
# ৮
সে কোন পাগল ধায়
একটা পাগল পৃথিবীতে পাগলরাই হলো ভালো মানুষ। — আকিরা কুরোশাওয়া
ক্যাংলাসদের কৈশোরে এমনকি তরুণ বয়সেও সমাজে পাগলদের বিশেষ একটা মর্যাদা ছিল। পাগল ভাতা বা পাগল ভাণ্ডার খোলা হয়নি বটে, তবে তাদের বিশেষ স্নেহের চোখে দেখা হত। একটু এতোল বেতোল বকলেই বড়রা নইলে মাথায় হাত ভুলিয়ে কেন বলবেন
দূর পাগলি, কিংবা পাগল ছেলে!
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
‘পাগল শব্দটা আমাদের কাছে ঘৃণার শব্দ নহে। খ্যাপা নিমাইকে আমরা খ্যাপা বলিয়া ভক্তি করি; আমাদের খ্যাপা দেবতা মহেশ্বর। প্রতিভা খ্যাপামির এক প্রকার বিকাশ কি না এ কথা লইয়া য়ুরোপে বাদানুবাদ চলিতেছে–কিন্তু আমরা এ কথা স্বীকার করিতে কুণ্ঠিত হইনা। প্রতিভা খ্যাপামি বৈকি, তাহা নিয়মের ব্যতিক্রম, তাহা উলট পালট করিতেই আসে–তাহা আজিকার এই খাপছাড়া সৃষ্টিছাড়া দিনের মতো হঠাৎ আসিয়া যত কাজের লোকের কাজ নষ্ট করিয়া দিয়া যায়–কেহ বা তাহাকে গালি পাড়িতে থাকে, কেহ বা তাহাকে লইয়া নাচিয়া-কুঁদিয়া অস্থির হইয়া উঠে।‘
তা তো বলবেনই। তিনি যে নিজের জীবনে নানা পাগলের উৎপাত সহ্য করে এসেছেন। তাঁর নিজের দুই দাদা বীরেন্দ্রনাথ ও সোমেন্দ্রনাথ ছিলেন বদ্ধ উন্মাদ। সোমেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথকে দেখিয়ে সবাইকে বলতেন ‘ দেখ দেখ, আমাদের বাড়ির কেরানীকে দেখ , বসে বসে কেবল কলম পিষছে। ‘ আবার নাতিদের ফিসফিস করে বলতেন -জানিস তো গীতাঞ্জলির সব কটা কবিতাই আমার লেখা।
এখানে একটা মহা সমিস্যে এসে উপস্থিত হয়। আসল রবীন্দ্রনাথ কে? আমাদের পরিচিত রবীন্দ্রনাথ না তাঁর ভাই উন্মাদ সোমেন্দ্রনাথ? লীলা মজুমদারের খেরোর খাতার পোটো দিদির মাঝে মাঝে সন্দেহ হত তিনিই কি পোটো না কি তিনি তাঁর যমজ বোন? সন্দেহর নিরসন করতে তিনি ভয়ানক কঠিন একটা আঁক কষতে বসতেন। সেটা করে ফেলতে পারলেই তিনি নিশ্চিন্ত হতেন তিনিই আসলে পোটো, কারণ এই আঁক কষার সাধ্য তাঁর যমজ বোনের নেই। আমরাও সেই অ্যাসিড টেস্ট দিয়েই বুঝতে পারি উন্মাদ সোমেন্দ্রনাথ আর প্রতিভাধর রবীন্দ্রনাথের ফারাক। এক সুতোর হলেও ফারাক থাকে। তাই আমরা বলতেই পারি সব প্রতিভাধরই পাগল কিন্তু সব পাগলই প্রতিভাধর নন। সাধারণ নিয়মে যাকে আঁটে না তাকেই তো আমরা পাগল বলি, সেই হিসেবে কবির পাগলামি তো ছিলই, কিন্তু সেই পাগলামিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও ছিল, সেই রাসায়নিকের মতো, মাত্রার তারতম্যে যা কখনও হয় সুধা, কখনও মারাত্মক বিষ।মার্কিন লেখক অস্কার লেভ্যান্ট বলেছিলেন ‘প্রতিভা ও পাগলামির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সরলরেখা আছে। আমি সেটা মুছে ফেলেছি’। মাত্রাজ্ঞান, যাকে বলে মেথড ইন ম্যাডনেস। বাংলা প্রবাদে হয়তো একেই বলেছে- সেয়ানা পাগল বুঁচকি আগল। এই মেথডই রবি আর সোমের মধ্যে তফাত করে দেয়।
এখানে আরও একটা কথা মনে রাখতে হবে। একটা সময় পর্যন্ত পাগলামিকে সমাজ ও রাষ্ট্র স্নেহ ও ক্ষমার চোখেই দেখেছে। আমাদের লোকগানে, বাউল ফকিরের গানে পাগলের ছড়াছড়ি। ঈশ্বরপ্রেমে পাগল, মানে দিব্যোন্মাদ যাঁরা, তাঁরা ছিলেন সমাজের শ্রদ্ধার পাত্র, সে দক্ষিণেশ্বরের পাগলা ঠাকুর রামকৃষ্ণ হোন কিংবা পাগলা কানাই কিংবা লালন ফকির।
”তিন পাগলে হলো মেলা নদে’ এসে
তোরা কেউ যাস নে ও পাগলের কাছে ।।”
গানটিতে একটি ব্যাঙ্গাত্মক সুর আছে। আপাত মনে হচ্ছে, লালন নদিয়ার ঐ তিন পাগলের কাছে যেতে নিষেধ করছেন। কিন্তু তিনি আসলে ওঁদের কাছে যেতে উৎসাহ দিচ্ছেন।
‘লেখাপড়া শিখব বলে পড়তে গেলাম মক্তবে
পাগলা ছ্যাড়ার হবে না কিছু
ঠাট্টা করে কয় সবে।
ছ্যাড়া বলে কিরে তাড়ুম তুড়ুম
মারে সবাই গাড়ুম গুড়ুম
বাপ এক গরিব চাষা
ছাওয়াল তার সর্বনাশা।
সে আবার পড়তে আসে কেতাব কোরান ফেকা
পাগলা কানাই কয় ভাইরে পড়া হল না শেখা।‘
(পাগলা কানাইর গান)
রবীন্দ্রনাথের কাছে চিঠিপ্ত্র প্রচুর আসত, তার মধ্যে অধিকাংশ চিঠি পড়লে তাদের মাথার স্ক্রু যে বেশ ঢিলে আছে, তা বোঝা যেত। কেউ কেউ ছিল সেয়ানা পাগল। লিখত ‘আপনার স্ত্রী আমার আর জন্মের মা ছিলেন, ওঁর পা ধোয়া জল খেলে আমার অসুখ সেরে যাবে।‘
তাই তো তাঁর নাটকে এত পাগল। বিশু পাগল তো কাল্ট। স্বয়ং নন্দিনী যাকে পাগল ভাই বলেছেন।
ছবি ও গানের পাগল কবিতায় তিনি বলেছেন
‘তোরাই শুধু শুনলি নে রে, কোথায় বসে রইলি যে রে,
দ্বারের কাছে গেল গেয়ে গেয়ে,
কেউ তাহারে দেখলি নে তো চেয়ে।
গাইতে গাইতে চলে গেল, কত দূর সে চলে গেল,
গানগুলি তার হারিয়ে গেল বনে,
দুয়ার দেওয়া তোদের পাষাণ-মনে।‘
অর্থাৎ তথাকথিত নরমাল লোকদের পাষাণ দেওয়া মন, তাই তো তারা পাগলদের গান শুনতে পায় না। এই পাগলরাই শ্রী চৈতন্য সেজে প্রেম বিলিয়েছে, আইনস্টাইন হয়ে হোটেলের ঠিকানা ভুলে গেছে, সুভাষের মত দেশপ্রেমে পাগল হয়ে আর ঘরে ফিরতে পারেনি। এই পাগলরাই বড়বড় আবিস্কার, দেশের দশের কাজ করে গেছে আপনাতে আপনি মেতে, তবে এরা সব সিরিয়াস, বড় বড় পাগল। এদের কথা সবাই জানে। কিন্তু প্রতিটি বাড়িতে, প্রতিটি মহল্লায় যে পাগলরা একসময় আলো করে থাকত, তারা আজ কোথায়?
পাগল নিয়ে আমরা ঘর করেছি দিনের পর দিন, সে ঘরে উঁকি মারতে আসেনি রাষ্ট্রের নজরদারি ক্যামেরা।সংসারে দু চারটে , গ্রামে দু চারটে পাগলা থাকত। তারা আপন মনে থাকত। সাধারণত কারো কোন ক্ষতি করত না। গরমে তাদের পাগলামি বেড়ে যেত। যেমন ছিল আমার মামারবাড়ির গ্রামের চুলে লাল ফিতে বাঁধা শুচি পাগলি। একবার আমার ছোটবেলার খেলার বন্ধু পাগল হয়ে গেল। সে একদিন আমাদের বাড়ির দরজা ঠেলে সোজা ওপরে এসে বলেছিল, ‘তৃষ্ণা তুই আমার সঙ্গে কথা বলিস।‘
পাগল দুরকম। একদল শুধু নামে পাগল, অন্যদল সত্যিকারের দৌরাত্ম্য করে। একটা সময় সিনেমায় পাগলা গারদ থেকে পাগল পালাত ঘন ঘন। সেই যে হারানো সুর সিনেমায় স্মৃতিভ্রংশের শিকার উত্তমকুমারকে ইলেক্ট্রিক শক দেওয়া হচ্ছিল। আর পাগলাঘন্টি বেজে উঠত। এখন গোটা দেশটায় পাগলাঘন্টি বাজছে। কমোডের সিস্তার্নে কোটি কোটি টাকা, ওদিকে রামরাজ্যে পোষা কুকুর মাছের কাঁটা খেলে যাগযজ্ঞ করে তার প্রায়শ্চিত্ত করে ব্রাহ্মণ করা হচ্ছে। শ্মশানে বাবা বা মায়ের মৃতদেহর সঙ্গে সেলফি তুলে পোস্ট করে লাইক মাঙ্গছেন কেউ, কেউ রাস্তায় পড়ে থাকা মুমূর্ষু মানুষের পাশ দিয়ে হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছেন, উন্মাদ এ শহরে মেহের আলি চিৎকার করে বলছেন সব ঝুট হ্যায়, আর শাখপ্রশাখার একমাত্র ‘সুস্থ’ মেজ ভাই দু নম্বরি ভায়েদের মধ্যে ঋজু হয়ে বসে একমনে গানের সুরে তাল দিয়ে যাচ্ছেন। তখন মনে পড়ে পাওল কোয়েলহো কে, যিনি বলেছিলেন জীবন একেবারে উন্মাদ, হ্যাঁ, কিন্তু বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আপনার পাগলামি বেছে নেওয়ার মধ্যেই মহান প্রজ্ঞা নিহিত।
দুজন বিশিষ্ট পাগল আমার এলাকায় থাকে। একজন পুরুষ, প্রতিবেশী, তাঁর কাজ অতি মহৎ। তিনি ভোর থেকে মাঝরাত একটি ঢাউস সাউন্ড সিস্টেম আর মানানসই কতগুলি সাউন্ড বক্স নিয়ে অহরহ আবাসনের এ মাথা থেকে ওমাথা সবাইকে গান শোনাতে শোনাতে যান। এঁর জন্যেই আমাদের মহল্লা এখনো শুকিয়ে যায়নি। ইনি আগে যেমনটি ছিলেন, বোতাম আঁটা জামায় শান্তিতে শয়ান বাঙালি যুবক, সে ভোল আমূল বদলে হাতকাটা গেঞ্জি, ফেসিয়াল করা ত্বক, দামি রোদ চশমা। দুনিয়ার সবচে ট্রেন্ডি পাগল বলা যায় তাঁকে। এমনিতে শান্ত, কিন্তু কেউ উত্যক্ত করলে ইংরেজিতে এবং বাংলায় উদুম সব খিস্তি করেন। আরেকজন মহিলা, গৃহহীন এবং অতিমাত্রায় ফ্যাশন সচেতন। তাকে কোনদিন আমি এক পোশাকে দেখিনি। কোনদিন জিন্স টপ, কোনদিন ঘাগরা চোলি, কোনদিন থ্রি পিস- মোটামুটি ভদ্র ও পরিষ্কার পোশাকে তাকে দেখা যায়, মনে হয় স্থানীয় কোন বস্ত্র বিপণি তাকে তাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার করেছে। আর তার মুখের ভাষা, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যতটা কাছ থেকে শোনা যায়, শুনে আজ অব্দি কোন ভাষা বুঝতে পারিনি। তবে বিহার কিংবা উত্তর প্রদেশের কোন উপভাষার ছোঁয়া আছে, কারণ তাকে উত্যক্ত করতে গেলে সে যে গালি দ্যায়, তার ঝাঁঝ বলে দ্যায় সেটি বিহার বা উত্তরপ্রদেশের কোন বোলি।
রাস্তার ভবঘুরে পাগলরা সাধারণত অনেক পুঁটলি, প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে চলে, এবং তাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হচ্ছে ট্রাফিক পোস্ট। আমাদের এলাকার পাগলিটিও তার ব্যতিক্রম নয়। খেয়াল করে দেখলে কলকাতার বেশিরভাগ গুরুতবপূর্ণ রাস্তার ট্রাফিক পোস্টে একটি করে পাগল দেখতে পাবেন। এবং তারা আধুনিক সিগনালিং সিস্টেমকে মোটেই পাত্তা দ্যায় না। তারা হাত ডাইনে বাঁয়ে চালিয়ে যান নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের কলকাতা শহরের যান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যে এইসব নিঃসবার্থ পাগলরা স্বেচ্ছায় নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে (সিভিক ভ্লান্টিয়ারের ভাতা না পেয়েই) তা আমাদের যানব্যবস্থা দেখলেই বোঝা যায়।