ঋদ্ধি সাহা-র গল্পঃ সিগন্যাল লাল হলে
ঋদ্ধি সাহা-র গল্পঃ সিগন্যাল লাল হলে
জন্ম ২০০২, নৈহাটি শহরে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা ও চর্চা। স্নাতক রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির, বেলুড় থেকে। স্নাতকোত্তর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ, ভালোবাসা। মিশন স্কুলে থাকাকালীন বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা, পরে কলেজে সাহিত্য নিয়ে পঠনপাঠন ও পাশাপাশি লেখালেখির শুরু। বেশ কিছু পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত। ভালোলাগা – ফুটবল, লেখালেখি, সিনেমা।
–
মেট্রোর রেল গেট নামছে মাত্র। ভিড় টা যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল—মোবাইলের আলো আর মানুষের গায়ের উষ্ণতা ছাড়া চারদিক জুড়ে এক ধরনের ঝিম ধরা রাত। বালিগঞ্জ স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে শমিত ভাবল, এই শহর যেমন আকস্মিকভাবে থেমে যায়, তেমনই আবার দৌড়ও শুরু করে। ঠিক যেমন তার নিজের জীবনটা গত তিন মাস ধরে চলছে—হঠাৎ থেমে যাওয়া, আবার দৌড় শুরু, আবার থেমে যাওয়া।
তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল তৃষা। কাঁধে বড় ব্যাগ, চোখে বিস্কুট রঙের ফ্রেম। দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে, অথচ কেউই জানে না যে পরের তিন মিনিটে তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক যোগাযোগ জন্মাবে।
ট্রেন আসতে আর মিনিট দুয়েক বাকি। তৃষা হঠাৎ বলে উঠল,
—আপনি কি একটু সরে দাঁড়াবেন? ব্যাগটা বার করতে পারছি না।
শমিত সরে দাঁড়াল। তারপর অবাক হয়ে দেখল, তার ব্যাগের পকেট থেকে বেরোচ্ছে একটা পুরনো, ভাঁজ ধরা বই—হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে।
—আপনিও হুমায়ূন পড়েন? —শমিতের গলায় আশ্চর্যের সুর।
তৃষা হাসল, —পড়ি। তবে আমি যা পড়ি, তার থেকেও বেশি ভুলে যাই।
এই এক লাইনেই যেন কোথায় যেন কালো কালি দিয়ে লেখা একটা দরজা খুলে গেল। শমিত হেসে ফেলল।
—ভুলে যাওয়াই ভালো। মনে রাখলে অনেক কিছুই বয়ে বেড়াতে হয়।
সিগন্যাল তখনো লাল। তৃষা ব্যাগটা কাঁধে তুলে বলল—
—আপনি কি সত্যিই কিছু বয়ে বেড়াচ্ছেন?
শমিত নরম গলায় বলল, —হ্যাঁ। তিন মাস আগে সম্পর্ক ভেঙেছে। সেই ভারই।
—ওহ। দুঃখিত।
—না না, দুঃখিত বলার কিছু নেই।
তাদের কথোপকথনটা এমন ভাবে এগোচ্ছিল যেন দু’জন বহুদিনের চেনা। অথচ অপরিচিত মুখ, নতুন গন্ধ, নতুন শব্দ—সবকিছুই ছিল নিখাদ প্রথমবারের মতো।
মেট্রোর গেট খুলল। ভিড়ের সঙ্গে তারা দু’জনও উঠল। দু’জন দু’জনের থেকে হাত খানেক দূরে, মাঝখানে মানুষের কাঁধ, মোবাইল, ভেজা কাগজের গন্ধ।
ট্রেন চলা শুরু করতেই তৃষা বলল—
—মানে, সম্পর্ক ভাঙলে মানুষ কি খুব একা হয়ে যায়?
শমিত জানালার দিকে তাকিয়ে বলল—
—একা তো হয়ই। কিন্তু তার থেকেও বেশি হয় থেমে যাওয়া। মনে হয়, আর এগোনো যাবে না।
তৃষা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলল—
—মজার কথা জানেন? আমি ঠিক উল্টো। আমার সম্পর্ক ভেঙেছিল দু’ বছর আগে। প্রথম দু’মাস কাঁদলাম, তারপর হঠাৎ একদিন নিজেকে বললাম—‘আমার একটা জীবন আছে। ওটাকে নষ্ট করব না।’ তারপর এগোই এগোই… থামতেই পারিনি।
শমিত তাকাল।
—আপনি তাহলে অনেক শক্তিশালী।
—শক্তিশালী? না রে ভাই। আমি চুপ করে থাকলে ভেঙে পড়তাম। তাই দৌড়েছি।
ট্রেনের দুলুনিতে তৃষার চুল খানিকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। অদ্ভুত ব্যাপার—তার চেহারায় কোন আঁধার নেই, নেই যে-কথাটি মানুষ বুকের ভিতর চেপে রাখে সেই ভাঙচুরের ছাপ। বরং একটা অদ্ভুত দীপ্তি।
শমিত হঠাৎ বুঝল—থেমে থাকার মধ্যে যতটা যন্ত্রণা আছে, দৌড়ানোর মধ্যে ততটাই মুক্তি।
দক্ষিণেশ্বরের দিক থেকে বাতাস এসে মেট্রোর কামরার ফাঁক দিয়ে গায়ে লাগছিল। দু’জনই এমন ভাবে কথা বলছিল যেন এতদিন ধরে না বলা, না বলা কথাগুলো জমে ছিল।
—আপনি কোথায় নামবেন? —তৃষা জিজ্ঞেস করল।
—শহিদ মিনার। আপনি?
—পার্ক স্ট্রিট।
ট্রেন কমলাপুর পার হতেই তৃষা হঠাৎ বলল—
—শমিত, আমি একটা কথা বলব?
—বলুন।
—আপনার চোখে একটা অস্থিরতা আছে। মনে হচ্ছে আপনি খুব চেষ্টা করছেন মুক্ত হতে।
—আপনি এত সহজে বুঝলেন কিভাবে?
তৃষা হালকা হাসল—
—আমি নিজে অস্থির ছিলাম। তাই চিনতে পারি।
মুহূর্তটা খুবই পরিষ্কার, কিন্তু সংজ্ঞাহীন। যেন তাঁরা দু’জন নয়—একটা গল্পের দুই চরিত্র, যারা ঠিক ঠিক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
হঠাৎ ট্রেন ঝাঁকি মারল। তৃষা হেলে পড়েছিল। শমিত হাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়েও থেমে গেল। অকারণে স্পর্শ করতে চায়নি। কিন্তু তৃষাই সামলে নিয়ে বলল—
—বাহ, ধরলেন না তো!
—মানে… ভাবলাম আপনার অস্বস্তি হবে।
—না, অস্বস্তি হত না।
এই একটা ক্ষুদ্র বাক্য শমিতের বুকের কোথাও গিয়ে আলতো টোকা দিল।
—আপনার তো খুব কথা আছে ভেতরে ভেতরে, —তৃষা বলল। —তবে বলেন না।
—কখনো বলা হয় না।
—আজ বলুন?
—আজ?
—হ্যাঁ, আজ। কারণ আজকের মতো দিন আর হবে না। আজ আমরা দু’জন অপরিচিত। কাল থেকে আর থাকব না।
শমিত অবাক।
—মানে?
—মানে কাল যদি আবার দেখা হয়, তখন আপনি আমাকে চেনা মানুষ বলে ভাববেন। কিন্তু আজ আমরা সম্পূর্ণ নতুন। আর নতুন মানুষের সামনে মানুষ সৎ হয়। তাই আজ বলুন।
ট্রেন মধ্যস্থলে পৌঁছেছে। চারদিকে ভিড় কমে এসেছে। শমিত গভীর শ্বাস নিল।
—আমি আসলে ভীষণ ভয় পাই, —সে বলল। —ভয় পাই কাউকে নতুন করে বিশ্বাস করতে। আবার ভেঙে যেতে হবে এই ভয়।
তৃষা মন দিয়ে শুনছিল।
—ভয় পাওয়া খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ভয়কে মানলে মানুষ থেমে যায়। আপনি থামবেন না, শমিত।
খানিকটা থেমে তৃষা বলল—
—একটা কথা বলতে পারি?
—হ্যাঁ।
—আপনি আবার প্রেমে পড়বেন।
শমিত চমকে উঠল।
—কি করে এত নিশ্চিতভাবে বললেন?
তৃষার চোখে অদ্ভুত এক নিশ্চিন্ততা—
—কারণ আপনি প্রেমে পিছলে যাওয়ার মতো মানুষ। কেউ যদি আপনার জীবনে এসে দাঁড়ায়, আপনি তাকে ঠেলে সরাতে পারবেন না। আপনি ভিতরে ভিতরে খুব নরম।
শমিত হেসে ফেলল।
—আপনি আমার সম্পর্কে এত কিছু জানলেন কখন?
—মেট্রোর পাঁচটা স্টপেজেই।
ট্রেন পার্ক স্ট্রিটে ঢুকছে। তৃষা ব্যাগটা ঠিক করল।
—আমি নামছি।
—হ্যাঁ…
—একটা কথা মনে রাখবেন। প্রেম মানে কখনোই শুধু জোড়া লাগা নয়। প্রেম মানে কখনো কখনো নিজের ভিতরের ভাঙা জায়গাটা চিনে ফেলা। আর সেটা চিনলেই নতুন জীবন শুরু হয়।
তৃষা নেমে যাচ্ছিল। শমিত ডাকল—
—তৃষা!
তৃষা ঘুরে দাঁড়াল।
—হ্যাঁ?
—যদি আবার কোথাও দেখা হয়ে যায়?
তৃষা মুচকি হাসল—
—দেখা হলে তখন নতুন করে শুরু হবে। নাম রাখবেন—“সিগন্যাল সবুজ হলে।”
গেট বন্ধ হয়ে গেল। শমিত একা দাঁড়িয়ে রইল।
সিগন্যাল সবুজ হল। ট্রেন এগোতে লাগল। আর শমিতের ভিতরটাও।
আজ বুঝল সে—প্রেম ভাঙলেও জীবন ভাঙে না; প্রেম হারালেও মানুষ নতুনের দিকে হেঁটে যেতে পারে। কারণ শহর যেমন একবার থেমে আবার দৌড় শুরু করে, মানুষের মনও ঠিক তেমনই।