Email: info@kokshopoth.com
February 1, 2026
Kokshopoth

কবিতা সিরিজঃ অসহ এপিটাফ

Oct 31, 2025

তিস্তা-র কলমে
কবিতা সিরিজঃ অসহ এপিটাফ

তিস্তা-র নিজের কথায়

আমার বিশেষ কোনো পরিচয় নেই। পরিচিতিও নেই। এই পর্যন্ত নয়টি কাব্যগ্রন্থ। ব্যাস। এইটুকুই।

#১

রক্তসিঁড়ি

 

ধাপে ধাপে রক্ত, ধাপে ধাপে জেগে উঠছে নগ্ন এক দুঃখশ্রেণী। 

বুকফাটা শাঁখ বাজছে দূরে—পূজা নয়, শবযাত্রার বাঁশি। খোলা 

জানালা দিয়ে ঢুকে পড়েছে দশ বছরের শিশুর কণ্ঠস্বর। সে তো 

কবেই ডুবে মরে গেছে পুকুরের জলে! তবু আজ এত রাতেও সে 

কেন ডাকছে তোমাকে? কারা যেন কোরাস গাইছে! ঘরদোর ভেসে 

যাচ্ছে তেরছা-আলোয়! তুমি কি শুনতে পাচ্ছ গলা কাটা মুরগির 

আর্তনাদ? হাড়ভাঙা উৎসব? পেটমোচড়ান খিদে তো চলছেই 

চলবে— তবু শেষমেশ তুমি দেখবে তোমারই চোখ আসলে দগ্ধ 

ভস্মের খনি; যেখান থেকে আর জল নয়, রক্ত গড়িয়ে পড়বে 

অনিবার্য। শিরার ভেতরে গমগম করে জেগে উঠবে লাল নদী। 

 

#২

অদৃশ্য গ্রীবা

 

কর্কশ কণ্ঠে ভোর নামে, গ্রীবার হাড়ে হঠাৎ জেগে ওঠে 

শুকনো ফুলের ছাই। যে শিশুটি গতকাল খেলছিল কাচের 

গুলি, আজ সে দাঁত বের করে হাসছে কাটা গলার উপর বসে।

প্রতিটি মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে মৃত পায়রার পালক, ভিজে 

স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ! তুমি যদি এসময় তাকাও জানালার দিকে— 

দেখবে কাচের ওপারে দাঁড়িয়ে আছে তোমার বহু আগের ছায়া, 

হাতে তার ভাঙা ঢোল। তুমি শুনতে পাবে ছিন্ন সুরের আরতি— 

যা বেজে চলেছে শুধুমাত্র তোমার ভেতর-হাড়ে। শুনতে পাবে 

নিজেরই গ্রীবা থেকে উঠে আসছে একটা দীর্ঘ হাঁসফাঁস ধ্বনি!

 

#৩

জ্বলন্ত বাগান

 

অবসন্ন দুপুরের ভেতর হঠাৎ দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে 

একটা বাগান। মাটির নিচে মশাল পুঁতে রাখা ছিল, আজ 

তা গিলে ফেলছে সমস্ত শিকড়। তুমি দৌড়ে আসো কুয়োর 

ধারে, কিন্তু কুয়ো ভর্তি শুধু বালি, জল নেই একটা ফোঁটাও। 

শাপলাগুলো কালো হয়ে গেছে, পাখিরা চিৎকার না ক’রে 

শুধু ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এই লেলিহান বাতাসের ভিতর শ্বাস 

নিতে নিতে তুমি একদিন আবিষ্কার করো— এই বাগান 

আসলে তোমার বুকের ভিতরেই! আর আগুনের প্রতিটি 

ফুল তোমার নিজের শিরা থেকেই ফুটে উঠেছে অকাতর!

 

#৪

কর্কশ ভোর

ঘড়ির কাঁটা আজ 

অকস্মাৎ দাঁড়িয়ে গেল গলার মধ্যে।

শ্বাস নিতে গিয়ে শুনলাম

কেবল ঘর্ষণের শব্দ—

যেন লোহা লোহার সঙ্গে ঘষা খাচ্ছে!

 

রোদ্দুর নয়,

আজ ভোর ফুঁড়ে উঠল

একটি গুলির শব্দে।

 

গাছের ডালে বসা কাকগুলো

হঠাৎ উল্টোদিকে উড়ে গেল,

তাদের ডানা থেকে ঝরে পড়ল

কালচে রক্ত— যা মাটিকে করে তুলল 

লবণের মতো নোনা।

 

প্রতিটি ভোরই আসলে

মৃতদেহ ঠেলে ঠেলে 

ওপরে উঠে আসার সিঁড়ি।

 

#৫

মৃত উৎসব

 

অগ্নি আজ

নিজের চুল্লি নিজেই ভেঙে ফেলেছে,

শালিকেরা উড়ে গিয়ে বসছে

মৃত মানুষের গায়ের ওপর।

 

শ্মশানের ভেতর থেকে উঠে আসছে

বিপুল করতালি, যার আঙুল নেই, 

নেই আঙুলের ছাপ, শুধু হাহাকার।

 

শঙ্খের শব্দে নয়,

ডুগডুগির শব্দেই শুরু হলো উৎসব।

গলিপথ ভরে উঠল কেবল ভেল্কির খেলায়

তুমি দিকভ্রান্ত হেঁটে যাচ্ছো ভিড়ের ভেতর,

দেখছো প্রত্যেকের হাতেই 

একটি করে ভাঙা কাস্তে; অথচ

তাদের চোখের মণি গলে পড়ছে বুক বেয়ে!

আশ্চর্য এই সময়ে

এক তরুণ কবি গাইছে তারস্বরে—

“ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না”!

 

 তুমি হেসে ফেল, শিরদাঁড়া বিক্রি করে

ফিরে আসো আপন ডেরায়।

 

রঙে রঙে ভরে যায় বাজার…

 

#৬

রাত্রির আয়না

 

অন্ধকারে ভিজে যাচ্ছে পিঁপড়েদের সাঁতার। 

 

মশারির ভিতর নৈশ্বর্য ঢুকে প’ড়ে 

হঠাৎই মেলে ধরল তার ক্ষুদ্র দাঁত! 

যেখানে সে কামড় বসায়— সেখানেই 

জন্ম নেয় অগণন চন্দ্রগ্রহণ। নিশ্চিহ্ন 

কাগজে আঁকা শত্রুর মুখ শিরদাঁড়া 

বেয়ে উঠে আসে মস্তিষ্কে,

আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে 

জমে ওঠে শুকনো রক্তের দলা!

 

প্লাবিত শয্যার পাশে

রাত দাঁড়িয়ে থাকে আয়নার পোশাকে…

 

#৭

অব্যাখ্যাত 

 

হাতির দাঁত উপড়ে বানানো বীণা। বাজছে। 

বেজে যাচ্ছে! করুণ তার সুরে ভেঙে যাচ্ছে

মাথার খুলি ভরা অতীত। যদি সাহস থাকে, 

ঝুঁকে পড়ো সেই সিঁড়ির উপর— 

দেখবে তোমারই নিজের মুখ অপেক্ষা করছে 

শবযানের পাশে। মাংসের করতালের ভিতর, 

ভাঙা জয়ধ্বনির ভিতর তবু কে যে বাজায় 

সেই অদৃশ্য ঘণ্টা! কে যে প্রতিটা শব্দের ভেতর 

বসায় আবারো এক নতুন মৃত্যুমুখ!

 

প্রার্থনার ঘন্টাধ্বনি থেমে গেছে,

 

চাঁদ ভেসে যাচ্ছে একা—

একটি ক্ষুধার্ত শিশুর মতো!

3 Comments

  • […] কবিতা সিরিজঃ অসহ এপিটাফ […]

  • প্রত্যেকটি কবিতাই উল্লেখযোগ্য। প্রথম পাঠের এইটুকু প্রতিক্রিয়া।
    এসব কবিতা একাধিক পাঠ দাবি করে।

  • ইন্দ্রিয়জ সিদ্ধান্ত / উচ্চারণে মোক্ষম

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *