তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরা – দ্বিতীয় ভাগ
তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরা – দ্বিতীয় ভাগ
তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।
# ৪
শিখবে না, সে শিখবে না
ক্যাংলাস পার্টিদের একটা বৈশিষ্ট্য হল এরা সফিসটিকেশন জিনিসটা কোনদিন বোঝেনা, শেখালেও শিখবে না বা ভুল শিখবে। সেদিন একটা সভায় ঠাকুর পরিবারের ঢাকাই ও মুক্তামালা শোভিতা
এক অপরূপা নারী আমার পাশে বসে তাঁদের পরিবারের শিশুদের কীভাবে শিক্ষাদীক্ষা দেওয়া হত, তা নিয়ে বলতে গিয়ে জানালেন তাঁদের পরিবারে কোন অনুষ্ঠানে বা সভায় বসে ছোটরা পা নাচালে পায়ে মারা হত । শুনেই আমার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত খেলে গেল। আমি এতক্ষণ ওঁর পাশে বসে অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হয়েও সমানে
অবিচলিত ভাবে পা নাচিয়ে গেছি। উনি যে তার পরেও আমাকে মারেননি, সেটাও নিশ্চয়ই পরিবারের শিষ্টতা শিক্ষা!
আমার নিজের এই তো শিক্ষার হাল, তাও আমি আমার পরিবারের ও সন্নিহিত এলাকার শিশুদের শিক্ষা দেবার সুযোগ পেলে ছাড়ি না। একবার
একটি তেঁদড় শিশু বড়দের সমানে তুই সম্বোধন করে যাচ্ছিল, তার বাবাকে এই নিয়ে অভিযোগ করাতে তিনি নির্বিকার ভাবে বললেন ছোটরা ঐরকমই হয়, বড় হয়ে আর করবে না। তখন নিজের হাতে আইন তুলে নিতেই হয়। তা যথাসম্ভব নরম গলাতে বললাম, ‘শোনো, বড়দের তুই বলতে নেই, তুমি বলতে হয়।‘
অমনি বেটাচ্ছেলে আমাকে বলে কি ‘তোকেও তুমি বলতে হবে?’ ভাবুন, এটা অপমান হল কিনা?
তবে আমি আবার তার থেকেও কিছু শিক্ষা নিই নি। সেই বিপর্যয়ের পরেও বাচ্চা দেখলেই কিছু শেখাতে ইচ্ছে হয়েছে। চ্যারিটি বিগিনস এট হোম।
তাই যখন নিজের এক পিস হল তাকে নিয়ে পড়লাম। এর মধ্যে একটাই ভাল ব্যাপার। শিক্ষক হিসেবে আমার লেগে থাকার ক্ষমতা প্রায় শূন্য। আমি একবার, বড়জোর দুবার বলি, তারপর কোথা থেকে শুরু করেছিলাম, স্রেফ ভুলে যাই, মাস ছয়েক পরে যখন মনে পড়ে, তখন সেই ‘হতে পারত’ শিক্ষার্থী সব বিষয়েই আমার নাগালের বাইরে চলে যায়। কিন্তু একটি শিশুর সঙ্গে তার মায়ের তো সবসময়ই দেখা হচ্ছে, , একে দেখে আমার ক্ষণে ক্ষণে বেদনা জাগে, পারলে ছাতার বাঁট দিয়ে টেনে এনে কিছু শেখাবার চেষ্টা করি। সেই যে মহাশ্বেতা দেবীর একটি গল্পে পড়েছিলাম। কোন এক গ্রামের স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের আবশ্যিক যোগ্যতা ছিল দুটি-
একঃ শিক্ষকদের দৌড়বীর হতে হবে, যাতে স্কুল পালানো ছাত্রদের ছুটে গিয়ে ধরে আনতে পারেন।
দুইঃ তাঁর অতি অবশ্যই একটি লম্বা বাঁটের বাঁকা হাতলযুক্ত ছাতা থাকতে হবে, যাতে তিনি পেছন থেকে ছাতা দিয়ে পলাতক ছাত্রের গলা ধরে হিড়হিড় করে টেনে স্কুলে ফেরত নিয়ে যেতে পারেন।
এর থেকেই বোঝা যায়, প্রকৃত শিক্ষককে কতটা নাছোড়বান্দা হতে হয়, অবিকল রামকৃষ্ণ কথিত উত্তম বৈদ্যের মতো, যিনি রোগীকে চিত করে ফেলে, তার বুকে চেপে বসে ওষুধ খাইয়ে দেন। না আমি দৌড়তে পারি, না আমার অমন ছাতা আছে। তার ওপর এতদিনে বাচ্চারা আবার জেন জি। তবুও ধন্য আশা কুহকিনী। ঠিক করলাম, এবার মুখে বেশি কিছু বলব না, ছবি দেখাব। কারণ সিইং ইজ বিলিভিং। আর এরা তো অডিও ভিস্যুয়ালেই স্বচ্ছন্দ বেশি।
তাকে একদিন আমার কোন একটা অনুষ্ঠানের ছবি মোবাইলে দেখিয়ে বললাম ‘ এই দেখ আমি কীরকম বক্তৃতা দিচ্ছি। সবাই কেমন মন দিয়ে শুনছে।‘ শুধু নিজের বাহাদুরি দেখানোর উদ্দেশ্য না, ভেবেছিলাম এতে বাংলা সাহিত্যের বীজ ওর মধ্যে বপন করা যাবে। ছবিটি খুব ভাল করে দেখে সেই বছর পাঁচেকের মানববোমাটি বলল ‘এখানে যারা এসেছে সবাই দেখছি তোমার থেকেও বেশি বুড়ো!’
এর পরেও তাকে কিছু তো শেখাতেই হয়েছে, নিজে না পারি, শেখানোর অন্য অন্য এজেন্সি যা সমাজে অনুমোদিত, নাচের স্কুল, গানের স্কুল, আঁকার স্কুল, এসবে নিয়োজিত করা গেল। নাচ থেকে সে শিখেছিল ‘তাকাদিমি তাকাঝুনু,’ আর গানের ক্লাস থেকে ‘খ্যাড়োবায়ু বয় বিগি।‘ (শ্রী শ্রীমৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত খরবায়ু বয় বেগে-র একটি জেন জি ভার্সন )। সবচেয়ে বিপর্যয় যা ঘটেছিল, তা হচ্ছে পাবলিক স্পিকিং-এর ক্লাসে ভর্তি করে। হাই স্কুলে গিয়ে ক্লাস সিক্স বা সেভেনে একটা এক্সট্রা কারিকুলার নিতে হয়। চেস, নাটক, আঁকা, মান্দারিন, এরকম বহুবিধ কর্মকুশলতার সুযোগ সেখানে ছিল। কিন্তু আমার মাথায় পুরনো পোকা নড়ে উঠল।
মেয়েটাকে মানুষ করতে হবে। আমি লক্ষ্য করেছি, ও কেবল নিজের বয়সী বা ছোটদের সঙ্গে মিশতেই স্বচ্ছন্দ। বড়দের সঙ্গে মোটেই কথা বলতে পারে না। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে ভাইভা গুলোতে। জানা প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারে না ভয়ে। এর আশু সমাধান দরকার। আমি ধাঁ করে ওকে পাবলিক স্পিকিং-এ ভর্তি করে দিলাম। চোখের সামনে দেখলাম সে চকাচক ভরা সভায় লেকচার দিচ্ছে ‘সিসটার্স অ্যান্ড ব্রাদারস অব যাই হোক গে!’
কিন্তু যা ঘটল, তা ভয়াবহ। আজো তার জের আমি টেনে চলেছি। পাবলিক স্পিকিং -এ সপ্তায় সপ্তায় ক্লাস করা সেই বালিকা এখন তরুণী। আজো তার পরিবার ও বন্ধুবৃত্ত ছাড়া স্পিকিং এ প্রবল ভীতি, মানে প্রাক পাবলিক স্পিকিং এ যা অবস্থা ছিল, পোস্ট পাবলিক স্পিকিং অবস্থা আরও খারাপ।
অথচ যখন কচি চারা, কথা ফোটে নাই, তখন কী না বলত! ওঁর সঙ্গে দোস্তি পাতিয়ে বাড়িতে সমস্ত পাড়ার ও বেপাড়ার বেড়ালের আনাগোনা। তাদের ক্লাব, প্রসূতিঘর, দুয়ারে ডিম্ভাত, ক্রেশ, নৈশ বিশ্রাম, দুপুরের ডিম্ভাতঘুম সব এখানে, এমনকি লজ্জার মাথা খেয়ে তুমুল প্রেমের কুঞ্জ আমার বাগান। একদিন এক অতিথি এলেন বাড়িতে, যাবার সময় উঠোনে একটা বেড়ালীকে দেখে আমাকে নিচু গলায় বললেন ‘ বেড়ালটার বাচ্চা হবে মনে হচ্ছে’ আমার সম্বিত ফেরে, ‘তাই তো তাই তো’ করি লাজুক মুখে। সে ঘটনা ওখানেই চুকে বুকে গেছে ভেবেছিলাম। কিন্তু তারপর থেকে দেখি শিশুটির পাতে মাছের কাঁটা বেছে, একটু অন্য কাজে উঠে গেছি, সে মাছ উধাও। এত দ্রুত খেয়ে নিল! এরকম দু চারদিন চলার পর চেপে ধরি ‘মাছ কোথায় গেল? ‘ তখন সেই সত্যবাদী শিশুটি অম্লানবদনে বললেন ‘ বেড়ালটাকে খেতে দিয়েছি’
‘কেন?’
‘ওর দরকার মাছ খাওয়া’
‘কেন শুনি?’
‘শুনলে না ওর বাচ্চা হবে? আমার তো আর এখুনি বাচ্চা হচ্ছে না। আমার কদিন মাছ না খেলেও চলবে’
ঠাঁঠিয়ে চড় দিতে ইচ্ছে করলেও সে চড় মারা হয় না আধুনিক উদ্ভট শিশুশিক্ষার প্যাঁচে পড়ে। আগে যেখানে স্রেফ একটা থাপ্পড়ে কাজ হত, এখন হাজার কথা বলে মুখে ফেনা তুললেও কোন লাভ হয় না। চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি। কারণ কেউ কেউ কিছুই শেখে না। ম্যানুফাকচারিং ডিফেক্ট। আমিই বা কী শিখেছি? আর শিক্ষক হিসেবে তো আরও খারাপ পারফরমেন্স!
চিঠি বা পার্সেল দিতে এসে ছেলেগুলো যখন বারবার জিজ্ঞেস করে ‘আপনিই কি? আপনিই কি?’ তখন তাদের কিছুতেই শেখাতে পারিনি-
হ্যাঁ রে বাবা আমিই। একটাই পাঁচতলা মল, আমার কোন শাখা নেই। তবু তাদের কেন যে বিশ্বাস হয় না? ইনিই তৃষ্ণা বসাক? যাঁকে প্রতিদিন রাশিরাশি বই আর পত্রিকা ডেলিভারি দিতে দিতে দিতে এদের হাড় সেঁকে যাচ্ছে! কারা
পাঠায় এত? কেনই বা? দেখলে তো পেত্যয় হয় না ইনি এত পড়েন!
একবার শাশুড়ির নামে একটা খাম রিসিভ করছি, ছেলেটা হাড়হিম করা চোখে তাকিয়ে বলল ‘ইনি আপনার কে হন?’
-শাশুড়ি।
বিরক্ত হয়ে সংশোধন করে দেয় ছেলেটি ‘মাদার ইন ল বলুন!’
জন্মদিনে দামি ফুলের তোড়া পাঠিয়েছেন শ্রদ্ধেয় লেখক, ছেলেটি বারবার জিগ্যেস করছে, আপনিই তো? জন্মদিনে একটু মুষড়ে পড়ি, তারপর সে যখন ফুলের তোড়া নিয়ে একটা ছবি তুলতে গেল, বকের মতো গলা বাড়াই, সে অমনি কায়দা করে সরে যায়। স্পষ্ট বুঝি আমার কোন চিহ্নই সে রাখতে চায় না, একেও শেখাতে পারিনি ‘আমিই সেই হেঁ হেঁ মানে তৃষ্ণা বসাক’!
মানুষ তো বটেই, যন্ত্রগুলো পর্যন্ত আমাকে চিনতে পারে না।
সেবার সেকেন্ড ডোজ নিতে গেছি, ঠিক আমার নামে এসে যন্ত্র থেমে গেল, তার ভুরু দুটো জিজ্ঞাসাচিহ্ন হয়ে উঠেছে, দেখতে পেলাম মানসচক্ষে।তারপর হেড আপিসে বার কয়েক ফোন করে যন্ত্রের মগজ প্রক্ষালন করার পর তবে আমার ছাড় মিলল।
ডোজ নিয়ে মুকুন্দ ভবনের তিনতলায় বসে আছি। বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। উল্টোদিকে একটা অশ্বত্থ গাছ। একদম আমার মুখোমুখি। নবীন পাতা দুলিয়ে দুলিয়ে বলছে
‘তুমি কে?
যেন পাগলপারা হে
বহুদিনের চিনা বলে মনে হতিছে!’
যাক, একজনকে শেখাতে পারলাম তাহলে!
6 Comments
[…] তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল… […]
রম্যরসে ভরপুর গভীর প্রেক্ষণ
ভাল লাগল।
দারুণ। রম্যরসে ভরপুর
উপভোগ করলাম।
Unique style.