চন্দ্রাণী গোস্বামী-র গল্প
চন্দ্রাণী গোস্বামী-র গল্প
চন্দ্রাণী গোস্বামীর জন্ম সত্তর দশকের শেষদিকে। স্কুলজীবন, বড়ো হয়ে ওঠা সবই কলকাতায়। পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান। কলকাতার একটি কলেজে হিসাব রক্ষণ বিভাগে কর্মরতা।
ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি তীব্র আসক্তি। নতুন দশকের শেষ থেকে নিয়মিত লেখালেখি। কবিতা আশ্রম, কৃত্তিবাস, গাঙ্গেয়, অপদার্থের আদ্যক্ষর, এই সহস্রধারা, বম্বে ডাক, তমোহা, সাজি পত্রিকা, বিকল্প বার্তা সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত।
‘ নিমফুলের মেয়ে ‘ প্রথম এবং ‘ব্যথা ঋতুর পালকেরা’ কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ।
স্থির জন্ম
আজকাল প্রায়শই নিজের ওপর বিরক্ত লেগে যায় দীপার। বয়স তো কম হলো না, কিন্তু শারীরিক ভাবে বার্ধক্য যতটা না গ্রাস করেছে তাকে, মনের বয়সটা ইদানিংকালে সেই অনুপাতে অনেক বেশিই বেড়ে গেছে সেটা নিজেই বেশ বুঝতে পারে দীপা। সত্যি কথা বলতে কি মনের আর কি দোষ ! এই বাহান্ন বছরে কম তো কিছু ঝড় বয়ে গেল না মনের ওপরে ! তার খবর ওপর থেকে কে বা রাখে! ভাবতে গিয়েও নিজের মনেই হেসে ফেলল দীপা। খবর রাখার মতো নিজের লোক এই তিন ভুবনে তার কে বা আছে! নিজের বলতে তো কোলে পিঠে করে মানুষ করা ভাইপো অর্চি, অর্চিষ্মান। সে যদিও পিমা মানে পিসিমা বলতে অজ্ঞান ছিলো এতকাল , কিন্তু বিয়ে সাদী করে, নিজের কাজ কম্ম নিয়ে আজকাল আর সময় বিশেষ পায় না । এটা বেশ ভালোই বোঝে দীপা। তাই সে নিয়ে অর্চির প্রতি খুব একটা অভিযোগও তার নেই। এইতো কদিন আগেই অফিস থেকে ফিরে যদি দেখতো তার পিমা খাটে বসে টিভি দেখছে ওমনি বাইরের কাপড় চোপড় না ছেড়েই সটান শুয়ে পড়তো পিমার কোলে। দীপা যতো বলতো, করিস কি? যা হাত পা ধুয়ে আয়। কিন্তু সেকথা ছেলে শুনলে তো! কেবল একই কথা , ও পিমা, একটু মাথাটা টিপে দাও না, আঙ্গুলগুলো টেনে দাও না, খুউউব ব্যাথা। মুখে যতই রাগ করুক দীপা মনে মনে কিন্তু এই সময়টার জন্য রোজ অপেক্ষা করে থাকতো। মনে হতো , আহারে! বাছার আমার কী কষ্ট। নিজের সমস্ত অপত্য স্নেহ দিয়ে যেন আহ্লাদে ভরিয়ে দিতো সে অর্চিকে। আঠাশ বছরের ছেলে যেন আঠাশ দিনের বাচ্চা হয়ে আদর খেতো তার পিমার গরম কোলের ভেতর মাথা গুঁজে। দুই কাঙাল তাদের পারস্পরিক অপূর্ণতা পুষিয়ে নিতো একে অন্যের সাহচর্যে। হায় রে! চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।
বেশ ছিলো মায়ে-পোয়ে, মানে পিসি-ভাইপোতে। অর্চির বাবা, অসীমের স্ত্রী তাদের ছেড়ে চলে যায় যখন ,তখন অর্চির বয়স চার বছর। সেই থেকে মা বলতে সে দীপাকেই চেনে। সেই থেকে সংসারের জোয়াল দীপার হাতেই। ধীরে ধীরে অর্চিকে বড়ো করা, সবদিক খেয়াল রাখা — দেখতে দেখতে দাদাও একদিন চলে গেলেন। সেই থেকে তো পুরোটাই একা দীপাই শক্ত হাতে সামলেছে। অর্চি দাঁড়ালো, চাকরি পেলো এরপর মহা আনন্দে অর্চির বিয়ে হলো তুলির সাথে। দীপার সে কি আনন্দ, উত্তেজনা ! তার অর্চির বিয়ে বলে কথা। মনে মনে নিজেকে শ্বাশুড়ির জায়গায় বসিয়ে পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তের এক অদ্ভুত পরিতৃপ্তির আস্বাদ পেতো দীপা।
তুলি, অর্চির শিক্ষিত বউ বাড়িতে এসে কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝিয়ে দিলো দীপাকে যে, দীপা শ্বাশুড়ি নয়, পিসি শাশুড়ি। নিচু স্বরে ভদ্র কিন্তু দৃঢ় ভাবে দীপার সীমারেখা বুঝিয়ে দিতে শুরু করলো তুলি। এতদিনের নিজের হাতে পরিপাটি করে সাজানো সংসার যখন চোখ তুলে দীপাকে শেখাতে থাকলো যে কোনকিছুই দীপার নিজের নয়, বরং সে আশ্রিত ভাইপোর সংসারে — তখন কি জীবনের প্রতি বিশ্বাস টা চলে যায় না? নীরব অনেক আচরণই অধিকারের গন্ডী এমন নিঃশব্দে টেনে দেয় যা শুধুমাত্র অনুভব করতে পারা যায়, অথচ এসব কথা কাউকেই বলা যায় না। সত্যিই তো সে নিঃসন্তান , চার চার বার শরীরে ভ্রূণের সঞ্চার হয়েছে বটে , কিন্তু তারা কেউ ই চোখ মেলে পৃথিবীর আলো, মায়ের কোলের ওম… সবটাই যেন তাদের আর দীপার, উভয়ের’ই অধরা। তার ওপরে সেই কবেই স্বামী রমেন চলে যাবার পর নিত্য গঞ্জনায় জীবন তো প্রায় অসহনীয় হয়ে উঠেছিল তার। তখনই দাদা আর বৌদি গিয়েই তাকে আদর করে নিয়ে এসেছিল বাপের বাড়িতে। মা বাবা কেউই নেই, বৌদি কোনদিনও সেই কথা তাকে বুঝতে দেয়নি, বরং তার আঁচলে বেঁধে দিয়েছিল চাবিগাছা সংসারের আর আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিয়েছিল এই যাঁতাকলে। ধীরে ধীরে বৌদি চলে যাবার পর দীপাই হয়ে উঠেছিল সর্বময়ী কর্ত্রী এই বাঁধনকে নিজের অজান্তেই দীপা কখন যে একান্ত নিজের ভেবে নিয়েছিল বোধকরি নিজেও জানে না। অর্চি তাকে কখনো ভাববার ফুরসৎই দেয়নি ফেলে আসা অতীতের দিকে তাকানোর কিংবা আপন পরের অনুভব।
এই আস্তে আস্তে অপাংক্তেয় হয়ে ওঠার যন্ত্রণা টা সেদিন ভুলে গেল যেদিন সকালে অর্চি জানালো তুলি মা হতে চলেছে। সে কি আনন্দ দীপার। সে ঠাকুমা আর পুঁচকে অর্চি হবে বাবা! ভাবতেই এতো সুখ, হাতে পেলে না জানি সে কোন অমৃত-সুখ হবে, ভেবেই যেন হাসি থামতে চায় না দীপার। সেদিন থেকেই সব ভুলে তুলির ভালো মন্দ, শরীরের খেয়াল রাখাই যেন দীপার মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে উঠলো।
এই ছাদের চিলেকোঠাটা সেই ছোট্টবেলা থেকেই বড়ো প্রিয় দীপার। কত মেয়েবেলার দুপুর, কত লুকিয়ে পড়ার ফাঁকে গল্পের বই পড়ার মুহূর্ত, কত কিশোরীবেলার বুক দুরু দুরু গোপন অনুভূতি, কত বুক ভেঙে যাওয়া কান্নার আশ্রয় এই চিলেকোঠা। আজ আবারও সেই চিলেকোঠাই এই প্রৌঢ় বয়সে তাকে নির্জনতার আড়ালটুকু খুঁজে দিলো। কাল রাতে দীপা দেখেছিলো অধিক রাতে তুলি অর্চির আনা বিরিয়ানী আর চাপ খাচ্ছে। তাই আজ সকালে অর্চির অফিস যাবার সময় সে তুলিকে বলেছিল এইসময় এইসব বাইরের খাবার খেলে তুলির ও শরীর খারাপ হবে আর ভেতরে থাকা সোনাটারও কষ্ট হবে। সেকথা শুনে তুলি তীব্র ভাবে প্রতিবাদ করে উঠলো। দীপা লক্ষ্য করছিলো কদিন ধরেই যে দীপার এই অভিভাবকত্ব তুলি ভালো ভাবে মেনে নিতে পারছে না। আবার ভদ্রতা বোধে বিশেষ কিছু বলতেও পারছে না। কিন্তু আজ বোধহয় সেই বাঁধাটাও অতিক্রম করে ফেললো তুলি। নিচু অথচ দৃঢ় স্বরে জানিয়ে দিলো, যার শরীরে কোনোদিন কোনও ফুল ফোঁটেনি সেই গাছ আজ শুধুমাত্র বনসাই। তার অন্য কোনো গাছের মালী হবার যোগ্যতা নেই।
আজ বহুদিন পর লাল নীল হলুদ সবুজ কে আকুল হাতে ছুঁতে চাইছিলো দীপা। ফিসফিস করে নির্জন দুপুরে খাটো গলায় তাদের ডেকে উঠলো সে। তাদের তো কেউ কোনোদিন নামই দেয়নি, আর দেবেই বা কেন? দীপা ছাড়া কেউ কি অনুভব করছে তাদের? কত একাকী রাতে রমেন যখন গভীর ঘুমে কাদা, দীপা তখন তলপেটে হাত রেখে তাদের অনুভব করতো আর নাম ধরে ডাক দিয়ে গল্প করতো। তাদের তো কেউ জানেই না, চেনেই না। এমনকি রমেনেরও তারা অধরা। কিন্তু শত হলেও দীপা তো তাদের মা, সে কি করে অবহেলা করে! বহুদিন পর আজ আবার তাদের ডাকতে বড়ো সাধ যায় তার। ধরা গলায় নিজের তলপেটে আবার হাত বোলাতে বোলাতে সে আপন মনেই ডেকে চলে আয় তো আমার লাল, আয় তো নীল, কোথায় রে সবুজ, ওরে আমার হলুদ… কোথায় আমার বাছারা! মা যে তোদের ডাকছে, আয় না রে, আয় আমার সোনারা…আয়, আয়… ওরে আয়——।
1 Comment
[…] চন্দ্রাণী গোস্বামী-র গল্প […]