রশীদ হারুণ-এর কবিতাগুচ্ছ
রশীদ হারুণ-এর কবিতাগুচ্ছ
বসবাস খুলনা, বাংলাদেশ। লেখালেখির সূত্রপাত নব্বইয়ের শেষার্ধ থেকে। মাঝে লম্বা বিরতি। ২০১৯ থেকে আবার লিখছেন। মূলতঃ লিটলম্যাগে লেখেন। কবিতাই লেখেন। তবে সংখ্যায় কম। দীর্ঘ বিরতির পর নতুনভাবে কবিতা লেখা শুরু করেছেন। নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করেন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ – ‘কথানহর’।
#১
প্রস্তুতি
কাঁচের ভেতর প্রজাপতি খেলা করছে
তোমার চিরুনি, ক্লিপ, ব্যান্ড, ব্রাশ এইসব—
আস্তর রাখার জিহ্বাগুলো
লকলকিয়ে উঠছে। আর পারফিউমের সাপ
বিরতিহীন ছোবল দিচ্ছে…
ডানার তরল রোদ গলে যাচ্ছে কাঁচের ওপর—
দেখতে পাচ্ছি— অসংখ্য আলোর চিংড়ি হাঁটছে, নীলপায়ে
ঘড়ি, ঘামে ভেসে যাচ্ছে…
#২
প্রজ্ঞা
হাঁটতে-হাঁটতে ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়েছি।
মস্ত গাছ। ছায়ার ছাতার নীচে
পাখি ডাকছে সমস্বরে। একটা মায়ার মুদ্রা
চোখের কোস্টারে তটরেখা ধরে ঘুরছে।
সবুজ বোতল হাতে পাতাগুলো দুলছে
হাওয়ার মদিরা খেয়ে।
আমি চুপচাপ। চিকন রোদের লার্ভা
থিকথিক— বসে আছে ঘাসের ওপর।
রোদে, প্রজাপতি ওড়ছে। নাচছে জংলীফুল।
ও পাশে দাঁড়িয়ে উম্মাদ ছেলেটা বকে যাচ্ছে—
দ্যাখো, প্রজাপতিগুলো পৃথিবীতে আটকা পড়েছে।
#৩
কয়েকজন চিন্তার নির্জনতা
বারান্দা গলিয়ে মুখশ্রী দেখাচ্ছে চাঁদ।
শোনো— ঠাণ্ডা কিছু শব্দ দাঁড়িয়ে দেখছে,
এখানে বসেছি আমি— কয়েকজন চিন্তার নির্জনতা :
ভাবি। একা। একার ভেতরে, শাদা অন্ধকারে,
বিবিধ ভঙ্গিমা, আমাকে দেখছে আমি—
অসম্পূর্ণ। দৌড়গ্রস্ত। বিভ্রমের মধ্যে
লাফিয়ে উঠছে একঘড়ি : মাথা, স্থির, অস্থিরতা, ওহ্,
আর, সব অদেখা প্রকৃত দেখার বাহিরে!
আমি হাসি। একা। দুঃখবাদী হাসিগুলি
একা থাকে। আমি কি সেখানে নেই! কার কোন্ ইশারায়
একটা একাকী, বহু একাকীর মধ্যে খাবি খায়…
দুঃখ-বোধ! কি আশ্চর্য অন্তর্গত আতলেমি!
আবারও হাসছি। কেন! দলিত হাসির
একান্ত সিল-ছাপ্পর, চুপ, শাদা অন্ধকারে, ভালো থাকে!
ভাবি— ভাবনার অপূর্ণতা একা, গুচ্ছ-গুচ্ছ ট্যাবু
যে ভেতরে ফেরে বারবার, তাকেই দেখি না, কেন!
#৪
সেফটিপিন
একটি সেফটিপিন; অপ্রাকৃতিক ও আধুনিক—
গোলনাক তুলে দেখছে আমার নীলচোখের ঈর্ষা।
ভাবনা বসে আছে ধ্যান ও দেহের খাটে।
ফুলে উঠছে সেফটিপিনের বুক। আলোগুলো
খুব ধমকাচ্ছে এই সভ্যতাড়িত গিঁটের গণিতকে—
চোখের ক্লাসের বোধে ঢুকিয়ে পড়ুক দেহজ্ঞান!
চোখও সেফটিপিন! আড়ালে বেঁধেছে
সমস্ত রঙজঙ্গল; রৌদ্রপীড়িত পাতার ভাষা,
ঝুলন্ত ফলের শ্বাস! আর সে, সেফটিপিন,
গোপন চোখের মতো লেগে আছে তার সাথে।
ধূসর ভ্রমণ শেষে ঘুম পায় পূনর্দশনের লোভে!
চোখ বন্ধ হলে সেফটিপিন কে খোলে!
#৫
সন্ধ্যার গন্ধ
এই সন্ধ্যাবেলা, কত কিছিমের হয়। মন, ম্যাজম্যাজ করে।
গাছেরা ঘোমটা পরা। চোখের কিনার বেয়ে টোকা দিচ্ছে রাত্রি : সন্ধ্যাবেলা— দূর-অনুভব, অনেক জঙ্গলে ঘন হরফের রাত্রির বৈঠক তৈরি হয়। রাত্রিচরা প্রাণীদের মহাজাগতিক হাহাকারে ভরে ওঠে তৃষ্ণার্ত আকাশ। তুমি কি ফেরত চাও এই সন্ধ্যার পাপড়ি! গাছের সবুজ ডগার নিভৃত বেড়ে ওঠা! যে-কটা দারুণ সন্ধ্যা এসেছে, জীবনে, শিল্পের বোনের আঙুলে, সেই সব বোনেদের তুমি কি ফেরত চাও! সন্ধ্যায়, কয়েক পেগ বিমূর্ত বিমর্ষ তুমি কি করেছো পান! কিছুটা তৃষ্ণার ভেতর বপন করেছো একটু-একটু অন্ধকার! গত-সন্ধ্যার নক্ষত্রগুলি গতসন্ধ্যার এবং আমরাও ছিলাম কয়েকটি কবিতার গন্ধ খুলে, উন্মাদ সময়ে। কান পাতো— শোনো, পাতারা বাতাসে গোছাচ্ছে ফেরার ব্রিফকেস— জলে, সকলেই পা-ধুয়ে নিচ্ছে, এই নিরব আলোর সঙ্গে প্রত্যেকের দেখা হয়। তুমি, এক অভিমানী যাত্রী, কিছুটা নামছো চোখের মদের মধ্যে, কিছুটা ভাসছো নেশা-অনেশার দোলাচলে। সন্ধ্যার তাড়না আছে— ফেরা থেকে ফেরা, এই প্রকৌশলে কখন যে টুপ করে ঝরে পড়ছে একটি সন্ধ্যা।
শোনা, কোনো এক সন্ধ্যাবেলায় আমিও ঝরে যাব…