Email: info@kokshopoth.com
February 1, 2026
Kokshopoth

বই নিয়ে আলোচনাঃ দীপশেখর চক্রবর্তী

Nov 7, 2025

বই নিয়ে আলোচনাঃ দীপশেখর চক্রবর্তী

দীপশেখর চক্রবর্তীর জন্ম ভারতে, বারাসাত নামের একটি ছোট শহরে। কলকাতায় পড়াশুনো করেছেন দীপশেখর, যদিও বড় শহর তাকে কখনো টানেনি। পত্রিকায় ফ্রি ল্যান্স চাকরি করেছেন কিছু বছর। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেছেন জাদুবাস্তবতা এবং বাংলা উপন্যাস নিয়ে। কবিতা লেখা দিয়ে শুরু করলেও দীপ শেখরের প্রথম গল্পের বই প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে। প্রথম বই থেকেই তাঁর গল্পে দেখা যায় অন্য এক স্বর। প্রায় গল্পহীন এক গল্প বলতে চেয়েছেন দীপশেখর। দেখা যায় পরাবাস্তবতা এবং জাদুবাস্তবতার দক্ষ প্রয়োগ। তাঁর গল্প সংকেতময়। যদিও দীপশেখর একে ‘নতুন বাস্তব’ বলতে চেয়েছেন (Neo reality)। গল্প লেখা ছাড়াও দীপশেখরের একা ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে। ভালো লাগে, দেশ-বিদেশের সিনেমা ও ছবি দেখতে। অঁরি মাতিসের ছবির অন্ধ ভক্ত তিনি। প্রিয় রঙ তাঁর, গাঢ় নীল। প্রিয় লেখক, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। 

বিষয়কেন্দ্রিক কবিতার সুখ ও দুঃখ : তৃষ্ণা বসাকের ‘জ্যোতির্ময় হে’

কবিতা কোথায় হয় অথবা হয় না, এই নিয়ে পাঠক অথবা সমালোচকের সংশয়ের শেষ নেই। এই সংশয় মানেই কবিতার সীমারেখা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান। ব্রহ্মাণ্ড প্রসারিত হয়ে চলেছে, সেই সঙ্গে প্রত্যেকটি সীমার প্রসারণ ঘটে। এই হল, জীবনের ধর্ম। শিল্প অথবা লেখা যা জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে তার স্বভাবই প্রসার। কিন্তু এই প্রসারের ভেতরেও কিছু কিছু লেখা একেবারেই রসোত্তীর্ণ নয়। কিছু লেখা যে পথে যেতে চেয়েছিল, তাতে পথভ্রষ্ট হয়েছে। ফলে আমাদের ভাবনার বিষয়টি এই নয় যে কতদূর কবিতা। ভাবতে হবে, যে কবিতাটি হল, সে’টি কোন গুণে ‘হল’ অথবা কেন ‘হল’? এই নিয়েও সংশয় অথবা তর্কের শেষ নেই। কোনও নির্দিষ্ট মাপকাঠি না থাকার সুবিধা হল প্রত্যেক শিল্পী অথবা সমালোচক নিজের মতো করে একটি ব্যখ্যা দিতে পারেন। তৃষ্ণা বসাকের কবিতার বই ‘জ্যোতির্ময় হে’ প্রথমেই যে পৃষ্ঠার সামনে দাঁড়ালাম, তার শিরোনাম- ‘ভূমিকা’। ‘উৎসর্গ’ এবং ‘সূচির’ মধ্যে একটি পৃষ্ঠায় কবি কিছু কথা আমাদের জানিয়েছেন। তার কথা থেকে দুয়েকটি বিষয় তুলে দেখতে পারি। কবি জানিয়েছেন, যে কোনও উপলক্ষ্যেই তার কবিতা লেখার ডাক পড়ত। কখন পড়ত? কবি প্রথম লাইনে জানান-‘সে ছিল অন্য এক সময়, অন্য এক পৃথিবী।’ পাঠক বুঝতে পারবেন, কবি এই অন্য শব্দ দিয়ে কিন্তু কেবলই তার অতীতকালের কথা বোঝাচ্ছেন না। বরং এমন একটি সময়ের কথা বলছেন, যা অন্য অথবা অপর। কবিতা লেখার সময় কি চিরকালই এই অন্য অথবা অপর নয়? বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা পার করে কবি জানান কবিতার ফাইল খুলে দেখলেন, অনেক কবিতা জমা হয়ে আছে যা জ্যোতির্ময় পুরুষ ও নারীকে নিয়ে লেখা। এই নিয়ে চমৎকার বই হতে পারে। ফলে কবিতার বইয়ের নাম কেন ‘জ্যোতির্ময় হে’, এই নিয়ে আমরা স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম। শেষে একটি কথা লেখেন কবি। ‘পাঠক পড়েই দেখুন’। এখানেই সেই প্রশ্নটি বারবার ফিরে ফিরে আসে, যা একান্তই ব্যক্তিগত। কোন পাঠক? কেমন পাঠক? একজন কবি কোন পাঠকের প্রত্যাশা করেন? সেই পাঠকও কি তার অন্য অথবা অপর পৃথিবীর বাসিন্দা? যাই হোক, কবিতার ভেতরে প্রবেশ করা যাক। আমার মতে এই সংকলনের সবথেকে গাঢ় এবং রসোত্তীর্ণ কবিতাটি হয়ত, ‘দ্বিতীয় বোধি’। কেবলই তার ভাষা প্রয়োগের দক্ষতার জন্য নয়। কবিতায় সংকেত এবং মূল বক্তব্যকে আড়াল করার দক্ষতা কবিতাকে সুন্দর করে তোলে, এখানে আছে। তা ‘সেরিব্রাল’ নয়, আন্তরিক। বুদ্ধি অথবা মেধা যখন অন্তরের প্রবাহকে আছন্ন করে, বাধা দেয়, সেই কবিতা ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ হয় না। যে কোনও ভালো কবিতায় তাই বুদ্ধি ও মেধা অন্তরের গভীরতম উপলব্ধির প্রবাহে নৌকাটি স্থির রাখে। এই যে প্রথম লাইন- 

‘আমার জন্য আমলকী খণ্ড সঞ্চয় করেছ কেন আনন্দ?’ 

কবি টেনে নিয়ে গেলেন সেই অন্য অথবা অপরের দেশে। আরও কিছু পাঠক পড়ে দেখুন-

‘পৃথিবীতে যেন আর কোন রঙ নেই,/থাকলেও অগম্য সম্পর্কের মতো আছে।’

অথবা

দেখো, আমার কান্না/ এই বৃক্ষতলে লুটিয়ে পড়েছে,/শরণ পাচ্ছে না।

এ হল একজন মগ্ন কবির কবিতা। যাকে কোনও দায়ে পড়ে কবিতা লিখতে হচ্ছে না। কোনও বিশেষ সংখ্যার জন্য অথবা সম্পাদকের অনুরোধে যা সৃষ্টির জন্য বেরিয়ে আসছে না। এই কবিতা সেই অন্য অথবা অপর পৃথিবীর। যা পাঠককেও অনায়াসে টেনে নিয়ে যায়। আবার দেখুন একটি কবিতার নাম ‘নজরমিনার’। কবিতাটির নির্দিষ্ট একটি বিষয় আছে, সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। শুধু শেষ লাইনটি পাঠক লক্ষ্য করুন-

‘ কল্যাণেশ্বরী দাঁড়িয়ে আছেন চিত্রার্পিতের মতো,/ আর শালবনের মাথা দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একসারি ধবল বক…’

এই যে দৃশ্য, গোটা কবিতাটির সম্পদ। একটি বিষয়কেন্দ্রিক কবিতাকে, কবিতার রসে জারিত করতে পারে কয়েকটি লাইন। কবি আগেই বলেছেন, বিষয়কেন্দ্রিক কবিতা তাকে লিখতে হয়েছে। বিষয় ও ভাবের মধ্যে এই যে সেতুনির্মাণ, এখানেই একজন দক্ষ লেখক তার ছাপ রেখে যান। আরও একাধিক কবিতায় এমন উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ‘সুতো’ কবিতার শেষ তিন লাইন তুলে দিলাম-

‘চরকার ঘর ঘর শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না ঠিকই,/ কিন্তু গান্ধী আর কস্তুরবার হাতে বোনা সুতো/ প্রতি মুহূর্তেই আর একটি দীর্ঘ, আর একটু শক্ত হচ্ছে।’

অনেক কবিতার লাইন তুলে ধরার সহজ পথের দিকে পা না বাড়িয়ে কবিতার বইয়ের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করে ফেলা যাক। একথা বলা যেতেই পারে, ‘জ্যোতির্ময় হে’ কবিতার বইটি অত্যন্ত ঘটনাবহুল। অথবা বলা যেতে পারে এত বিষয়, ঘটনা, স্থান, কালের রাজনীতি এই বইয়ের ভেতর ঢুকে পড়েছে যা বিস্মিত করে। যদিও ভারতবর্ষের কবিতা, বিদেশী কবিতা পড়ার ক্ষেত্রে এমন অভিজ্ঞতা আমার আছে। গণমাধ্যম, ইতিহাস এমনকী খেলার মাঠের বিভিন্ন দিক স্পর্শ করেছে এই বইটি। পড়তে পড়তে মনে হয়, এত বিষয় নিয়েও কবিতা লেখা যায়! যে কোনও ঘটনাবহুল কবিতার বইয়ের সবথেকে বড় ভয়ের জায়গাটি হল তার জাগতিক এবং মহাজাগতিক উপলব্ধির ভারসাম্য যদি নষ্ট হয়ে যায়। এমন বহু কবিতার কাছেই গেছি যা জাগতিক ঘটনায় এত ঠাসা, যে পাঠক কবিতার আত্মাকে উপলব্ধি করতেই পারেন না। দক্ষ শিল্পী অথবা কিছু ক্ষেত্রে কারিগরও এই বিপদটি অতিক্রম করেন। তাদের কবিতা তাই ঘটনা থেকে বোধের দিকে যায়। যে কবিতা রসোত্তীর্ণ নয়, তা ঘটনাতেই আটকে যায়। ফলে, বিষয় এবং ঘটনার দিক থেকে এক বিপুল পৃথিবীর অংশ হয়েও ‘জ্যোতির্ময় হে’- এই কবিতার বইটিকে তাকিয়ে থাকতে হবেই বোধ এবং উপলব্ধির দিকে। লক্ষ্য করা যায়, কবি, কীভাবে ঘটনা থেকে বোধের দিকে নিয়ে গেছেন কবিতাকে। এই যে প্রতিটি বাঁক, তা কখনও ভাষাকে আশ্রয় করে, কখনও একটি ঘটনার ভেতর থেকে উঠে আসা দর্শনকে কেন্দ্র করে নিজেকে স্পষ্ট করে। এমন নয়, এই বইয়ের সমস্ত কবিতাই এ’টি পেরেছে। তবে, যে কবিতা পারেনি, তার ভেতর থেকেও এমন একটি লাইন সহজেই পাওয়া যায় যা গাঢ়তম জীবনদর্শন থেকে উঠে আসে। ফলে বিষয়কেন্দ্রিক হয়েও অনেক ক্ষেত্রেই কবিতাগুলো বিষয়ের গণ্ডিকে অতিক্রম করতে পেরেছে। তবে একটি প্রশ্ন কবির কাছে থেকেই যায়। তিনি যে কবিতাগুলো দীর্ঘদিন লিখেছেন, রেখেছেন জমিয়ে, সেগুলো প্রকাশের সময় তার কি মনে হয়েছিল কিছু কবিতা এই সংকলনে না রাখলেই বেশ হত। অন্তত যে কবিতাগুলো কিছুটা হলেও বইয়ের গুরুত্বের পক্ষে উপযুক্ত হয়নি। অথবা এমনও হতে পারে কবিতার দুয়েকটি লাইন। সামান্য পাঠক হিসেবে মনে হয়, সেগুলো না থাকলে বইটি আরও বেশি ‘পূর্ণ’ হয়ে উঠত। ‘এবং অধ্যায়’ ভালো বই করে। তাদের বইয়ের নির্মাণ নিয়ে নতুন বলার কিছু নেই। সুপ্রসন্ন কুণ্ডু চমৎকার প্রচ্ছদ করেন। তবে, বইটির প্রচ্ছদ ও নামাংকন অন্যরকম হলে ভালো হত- এমন আমার মত। তৃষ্ণা বসাক আরও কবিতা লিখুন। স্মৃতির ভেতর থেকে তুলে নিয়ে আসুন কবিতা। লিখুন, নিজের জন্যই। সে লেখা বিশেষ সংখ্যা অথবা সম্পাদকের জোরের বৃত্ত থেকে মুক্তি পাক, এই আশা করব। কারণ কবির মন ঘর ছাড়া, স্বাধীন, মুক্ত। সেখানে তো কোনও জোর খাটে না। প্রথমেই যে অন্য অথবা অপর পৃথিবীর কথা বলেছিলাম, তৃষ্ণা বসাক তার খোঁজ জানেন বলেই এই বইতে ব্যক্তিগত দুঃখ, বেদনা, আনন্দের গণ্ডি ছাড়িয়েছেন। তিনি অপরের আলোর কথা লিখেছেন। অথচ, তার কবিতা অপরকে অতিক্রম করে ফিরে ফিরে আসে নিজের কাছেই। এই পথটি সুন্দর, আলোকিত।       

        

‘জ্যো তি র্ম য় হে’                             

প্রকাশকঃ এবং অধ্যায়

প্রচ্ছদঃ সুপ্রসন্ন কুণ্ডু

মুদ্রিত মূল্যঃ ১৫০ টাকা

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *