Email: info@kokshopoth.com
April 12, 2026
Kokshopoth

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ

Apr 10, 2026

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ

তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।

 

ভ্রমণে কী কী ভ্রম ঘটিতে পারে?

 

জীবনে কিছু কিছু বিষয় আছে, যেখানে কেউ সত্যি কথা বলেন না। কষ্টকর কিন্তু অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ প্রসঙ্গে জ্ঞানীরা উপমা দিয়েছেন তপ্ত ইক্ষু চর্বণের,  জিভ ছড়ে যায় গাল ছড়ে যায়, তবু ছাড়া যায় না। সেইরকম কিছু কিছু জিনিস আছে, কেবলই যাতনাময়, প্রেমের মতোই,  তবু ছাড়া যায় না, এদিকে বাইরের কারো কাছে সে যন্ত্রণা কবুল করার সাহসটুকুও নেই।  আধুনিক মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় যেমন আশপাশের অবাঞ্ছিত জিনিসপত্র মুছে ফেলে স্রেফ হাসিমুখটি রাখা হয়, তেমনি এখানেও শুধু আহ্লাদটুকুই দৃশ্যমান।

 

 

জগতে নাকি দুকিসিমের মানুষ আছে -একদল টুরিস্ট, তারাই সংখ্যা গরিষ্ঠ। তারা যেকোন টুর করে লোককে দেখাবার জন্যে। আর বেড়াতে গিয়ে তাই তারা ওঠে পাঁচ নিদেন পক্ষে তিন তারা হোটেলে, সুইমিং পুলের ধারে বসে কেত মেরে ছবি দ্যায়, যত রাজ্যের ওয়াটার স্পোর্ট করে, সে হাঁটুতে যতই জং ধরে থাক না কেন, হোটেলের জিমে গিয়ে মিছিমিছি পোজ দ্যায়।  আর সব জায়গায় গিয়ে বলে ‘দূর ফালতু জায়গা! কিছুই দেখার নেই’ এরা শুধু খুশি হয় হোটেল দেখে। বাড়ি গিয়ে সবাইকে জাঁক করে বলে ‘হ্যাঁ উঠেছিলাম বটে এবার একটা হোটেলে! ‘

পিঁপড়ে যেমন চিনির কৌটোর মধ্যে ঘুরে মরে, কী কী দেখলি? জিজ্ঞেস করলে বলে ‘চিনি কেবল চিনি’ এরা হচ্ছে সেই প্রজাতির।

আর একদল আছে ট্রাভেলার । এরা হচ্ছে ভ্রমণ পিপাসু,  এরা একেবারে ভ্রমণের ভেতরে ঢুকে যায়। কোথায় থাকছে, কী খাচ্ছে, এরা ডোন্ট পরোয়া। ঐ যে বিভূতিবাবু বলেছিলেন  ব্যাগে একটা টুথব্রাশ আর তোয়ালে নিয়ে এরা তাকলামাকানে চলে যেতে পারে- এরা হচ্ছে সেই মরিয়া টাইপ। খুব বড় বড় যোগীরাই যে ট্রাভেলার হয়ে জন্মায় তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই। রোদ্দুরে টাক ফেটে যাচ্ছে , খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে, এরা হাম্পির মন্দিরের সীমানা থেকে এক দৃষ্টে আঞ্জনেয় পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। বিশ্বাস করুন, গাইড বলেছে ওটা একটা পাহাড়, কিন্তু এখান থেকে একটা ধোঁয়াটে রেখা ছাড়া কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ভ্রমণ পিপাসু ওইদিকেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবে আর উত্তেজনায় পাশের লোকের হাত খামচে বলবে ‘ওহ কী দৃশ্য মাইরি!’। সে লোকটা মহা বিরক্ত হয়ে বলে, ‘দূর মশাই, ও তো আমাদের বাসটা,  ধোঁয়া ছাড়ছে।‘ তাতেও পিপাসুর ঘোর কাটবে না। সে বলবে ‘একটা পাখি ডাকছে শুনতে পাচ্ছেন?’

‘আরে আপনার ফোন বাজছে।‘

তা আপনি টুরিস্ট হোন কি ট্রাভেলার, ফি বছর  কম করে হলেও একটা বড় আর কয়েকটা ছোট ভ্রমণ নাকি  করতেই হয়। না করলে মান থাকে না। পিয়ার প্রেসার বলেও তো একটা কথা আছে। লোকে দার্জিলিং গেছে বলে ডালহৌসি নাকচ করতেই হয়।

 

‘গৃহিণী। হ্যাং ডালহাউসি। দার্জিলিং চল। আমার ত্রিশ ছড়া পাথরের মালা না কিনলেই নয়, আর চার ডজন ঝাঁটা। আর অত দাম দিয়ে গলায় দেবার শুঁয়োপোকা কেনা হ’ল—সেই যে বোআ না কি বলে—আর হীরে—বসানো চরকা—ব্রোচ—তা তো এ পর্যন্ত পরতেই পেলুম না। তোমার সেই ডালকুত্তো পাহাড়ে সেসব দেখবে কে? দার্জিলিং—এ বরঞ্চ কত চেনাশোনা লোকের সঙ্গে দেখা হবে। টুনি—দিদি, তার ননদ, এরা সব সেখানে আছে। সরোজিনীরা, সুকু—মাসী, এরাও গেছে। মংকি মিত্তিরের বউ তার তেরোটা এঁড়িগেঁড়ি ছানাপোনা নিয়ে গেছে।

যুক্তি অকাট্য, সুতরাং দার্জিলিং যাওয়াই স্থির হইল।‘

এইসব পাবলিক আদৌ কোথাও ঘুরতে যান না, বাড়িটাকেই আসলে বয়ে নিয়ে যান। মাচু পিচুতেও গিয়ে চাডডি মাছের ঝোল ভাতের খোঁজ করেন।

একবার নৈনিতালে গিয়ে এরকম এক দলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেছিল। সে ভ্রমণ শুরু হয়েছিল খুব অদ্ভুত ভাবে। একটা জরুরি কাজে দিল্লি, ছিলাম পাণ্ডবনগরের একজনের ফ্ল্যাটে, যিনি তখন পুজো উপলক্ষে কলকাতায়। সকালে একটা লম্বা ডিমের ঝোল করে বেরিয়ে পড়া, আর সারা দিল্লি চষে প্রায় মধ্য রাতে  ঘরে ফেরা। এতেও যথেষ্ট আমোদ না হওয়ায় একদিন বাস আড্ডায় গিয়ে হরিদ্বারের বাসে চেপে পড়া। সেখানেও দিন সাতেক এমনই টইটই  করে আবার একদিন বাসে চড়ে নৈনিতালের দিকে যাত্রা। সেখানে একদিন গেলাম সন্নিহিত কয়েকটা লেক দেখতে একটা দলের সঙ্গে। ভীমতালে মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতি। বাইরে গেলে দুপুরের খাবার একদম স্থির করা থাকত। রুটি বা ভাত সঙ্গে পনির কিংবা খাওয়া যাবে এমন কোন সবজি। ব্যাস।  বাসের আরেকটি গ্রুপ তখন গালে হাত দিয়ে বসে। তারা মাছ ভাত ছাড়া খাবেই না।  আমাদের খাওয়া শেষ  যখন,  তখন হোটেলের একটি ছেলে একটি আস্ত  লোভনীয় চেহারার রুই মাছ নিয়ে ঢুকল। লেকের সদ্য ধরা টাটকা মাছ। সেই মাছ কাটা, ভাজা ও ঝোল হবে, তবে তাঁদের মুখে অন্ন উঠবে! ততক্ষণ বাসকে তো অপেক্ষা করতেই হবে। নট আ বিগ ডিল!

 

অতখানি না হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে সফর মানেই তো গুচ্ছের জেলুসিল, ভলিনি, মাথার বাম, নি ক্যাপ, কোমরের বেল্ট, চায়ের সরঞ্জাম, চার্জার, ডেটা ব্যাংক, মেমরি কার্ড  এবং অবশ্যই মোবাইল, যা সবসময়  নোঙরটা ঘরেই ফেলে রাখে আর পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে উঠেও টাওয়ার আর ওয়াই ফাই র সঙ্কেত খুঁজে চলে।    ‘ওগো এত কিছু আনলে, ফ্রিজটা কেন ফেলে এলে?’ এক ভদ্রলোক শুধিয়েছিলেন তাঁর গিন্নিকে। গিন্নি তো খেপে বোম। পরে শুনলেন সেই ফ্রিজের ওপরেই টিকিট রেখে এসেছেন কত্তাটি!

 এঁদের চেয়ে মশাই নকুড়মামা ঢের ভাল, তিনি অন্তত সৎ।

 

নকুড়মামাকে মনে নেই? কচি সংসদের  সেই নকুড়মামা।

 

দার্জিলিং—এ গিয়ে মেঘে বৃষ্টিতে দশদিক আচ্ছন্ন, জনশূন্য ক্যালকাটা রোডে যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।সেই ডুমরাওনের মোক্তার নকুড় চৌধুরী, যিনি সম্পর্কনির্বিশেষে আত্মীয়—অনাত্মীয় সকলেরই সরকারী মামা।

নকুড়মামার  ‘মাথায় ছাতা, গলায় কম্ফর্টার, গায়ে ওভারকোট, চক্ষুতে ভ্রূকুটি, মুখে বিরক্তি। আমাকে দেখিয়া কহিলেন—’ব্রজেন নাকি?’

নকুড়—মামা কহিলেন—’সব বলছি। তুমি আগে একটা কথার জবাব দাও দিকি। এই দার্জিলিং—এ লোকে আসে কি করতে হ্যাঁ? ঠাণ্ডা চাই? কলকাতায় তো আজকাল টাকায় এক মন বরফ মেলে, তারই গোটাকতক টালির ওপর অয়েলক্লথ পেতে শুলেই চুকে যায়, সস্তায় শীতভোগ হয়। উঁচু চাই—তা না হ’লে শৌখিন বাবুদের বেড়ানো হয় না? কেন রে বাপু, দু—বেলা তালগাছে চড়লেই তো হয়। যত—সব হতভাগা—।’

এই পৃথিবীটা যখন কাঁচা ছিল তখন বিশ্বকর্মা তাহাকে লইয়া একবার আচ্ছা করিয়া ময়দা—ঠাসা করিয়াছিলেন। তাঁর দশ আঙুলের গাঁট্টার ছাপ এখনও রহিয়া গিয়া স্থানে স্থানে পর্বত উপত্যকা নদী জলধি সৃষ্টি করিয়াছে। বিশ্বকর্মার একটি বিরাট চিমটির ফল এই হিমালয় পর্বত। নাই দিলে কুকুর মাথায় ওঠে,—ভগবানের আশকারা পাইয়া মানুষ হিমালয়ের বুকে চড়িয়া দার্জিলিং—এ বাসা বাঁধিয়াছে। নকুড়—মামা ধর্মভীরু লোক, অতটা বাড়াবাড়ি পছন্দ করেন না।

আমি বলিলাম—’কি জানেন নকুড়—মামা, কষ্ট পাবার যে আনন্দ, তাই লোকে আজকাল পয়সা খরচ করে কেনে। অমৃত বোস লিখেছে—

ভাগ্যিস আছিল নদী জগৎ সংসারে

তাই লোকে যেতে পারে পয়সা দিয়ে ওপারে।

দার্জিলিং আছে তাই লোকের পয়সা খরচ ক’রে পাহাড় ডিঙোবার বদখেয়াল হয়েছে। তবে এইটুকু আশার কথা—’এখানে মাঝে মাঝে ধস নাবে।’

মামা ত্রস্ত হইয়া খাদের কিনারা হইতে সরিয়া রাস্তার অপেক্ষাকৃত নিরাপদ প্রান্তে আসিয়া বলিলেন—’উচ্ছন্ন যাবে। এটা কি ভদ্দর লোকের থাকবার দেশ? যখন—তখন বৃষ্টি, বাসা থেকে বেরুলে তো দশ তলার ধাক্কা, দু—পা হাঁটো আর দম নাও। তাও সিঁড়ি নেই, হোঁচট খেলে তো হাড়গোড় চূর্ণ। চললে হাঁপানি, থামলে কাঁপুনি—কেন রে বাপু?’

 

পাহাড়ে চড়তে গিয়ে যখন মাথায় চক্কর দ্যায়, যখন সমুদ্রতীরে হাঁটলেই পায়ে বালি কিচকিচ  করে, যখন ঘোড়া কেবলই খাদের ধার ঘেঁষে চলতে যায়, যখন জঙ্গুলে মশারা আমাকে ওদের হেলথ ড্রিংক ভেবে নেয়, তখন আমিও নকুড়মামার মতো কিছুতেই বুঝতে পারি না, এটা কি ভদ্দর লোকের থাকবার দেশ? কেন রে বাপু বাড়ি ছেড়ে আসার দরকার কী ছিল?

 

হায় আমার কথায় যদি দুনিয়ায় সব কিছু হত তবে আমি তো আমার লেখার টেবিলে বসে সবেদা পাতায় মৌটুসির নাচন আর দেয়ালে রোদের মান্ডালা আর্ট দেখে দেখেই কাটিয়ে দিতাম।

এ জিনা কোয়ি জিনা হ্যায় লাল্লু! 

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *