Email: info@kokshopoth.com
February 18, 2026
Kokshopoth

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরা

Feb 13, 2026

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ

তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।

 

পর্ব ১১

নচিকেতাদের দেখিলে কী করিতে হয়?

কিছু কিছু মানুষ আছে, তাদের সব কিছু জানার ইচ্ছে। মানে নচিকেতার মতো। গায়কের কথা বলছি না, বুঝতেই পারছেন।  নচিকেতা শব্দের অর্থ নাকি যে কিছু জানে না, কিন্তু যার জানার ইচ্ছে প্রবল। তা সে নাম তাকে ভালই মানিয়েছিল। বেটাচ্ছেলের জানার ইচ্ছে এমন যে যমের পেছন পেছন ধাওয়া করে সোজা যমের বাড়ি গিয়ে হাজির হয়েছিল। যে জায়গাটায় কিনা আমরা কেউ সহজে যেতে চাই না। সেখানে তার কৌতূহলপিপাসা চরিতার্থ করতে যমকে এত প্রশ্ন করেছিল যে সে তিতিবিরক্ত হয়ে তাকে ব্রহ্মজ্ঞান না কী একটা ফ্রিতে দিয়ে জ্যান্ত অবস্থায় ফেরত পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল। ‘আমার ভিক্ষের দরকার নেই, আপনার কুকুর সামলান‘ টাইপ নিরুপায়তায়।

ঠিক আমার মার মতো। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন। টয়ফেল, জি আর ই দেব বলে পাসপোর্ট করাতে হবে। দরখাস্ত করা হয়েছে। তার একটা ধাপ পুলিশ ভেরিভিকেশন। যেটা মানেই চাপ। কত টাকা চাইতে পারে   ভেরিফিকেশনে এসে,, টাকায় না পোষালে পাসপোর্ট আসবে না, পরীক্ষায় বসাও হবে না- বিরাট টেনশন। কত গল্প চারদিকে। কতজনের এমন ঘটেছে সে নিয়ে। সেইরকম এক সময়ে আমি ইউনিভার্সিটিতে, সন্ধেয় ফিরে শুনলাম আজ পুলিশ এসেছিল ভেরিফিকেশনে। বাড়িতে মা ছিল।  বেচারা পুলিশ!   ‘মেরে পাস মা হ্যায়’, সে তো জানত না। সে সরলভাবে জিগ্যেস করতে গেছে  ‘অমুক আপনার কে হয়?’ বা এইজাতীয় কিছু, ব্যস ওটাই কেলো করেছে। রুটিন প্রশ্ন। পুলিশ হয়তো মাকে ভালমানুষের মতো এইসব জিগ্যেস করতে গেছিল , বেচারা  বেচারা। মা তাকে উলটে পুলিশের জেরা করেছিল অন্তত পনেরো মিনিট টানা- ‘সে খবরে  আপনার কি দরকার?’ ‘কোত্থেকে আসছেন?’ ‘ভর দুপুরে গেরস্ত বাড়িতে এসে এইভাবে জ্বালাবার মানে কী?’ ‘আর এসে থেকে  টানা কড়া নাড়িয়েই চলেছেন, আমাকে এঁটো হাতে এসে দরজা খুলতে হল!’ তবে এত কিছু বললেও  ‘পুলিশে রিপোর্ট করব’- এইটুকু আর বলেনি বোধহয়। সেই যে একবার একজন লিখেছিল বাঙালি বিধবাদের মধ্যে ৯৯ ভাগই অসতী, তা পড়ে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন একজনকে আর বাদ দিলেন কেন? সেইরকম মাও ঐ একটা প্রশ্নটা ছেড়ে দিয়েছিল।  ভিভ রিচার্ডসের ঝোড়ো ব্যাটিং র মতো মার  জেরার মুখে   সেই সরল নিরীহ পুলিশটি বেশিক্ষণ ক্রিজ আঁকড়ে থাকতে পারেনি,  সে লেজ গুটিয়ে ফিরে  গেছিল আর এক সপ্তার মধ্যে চলে এসেছিল পাসপোর্ট, এক নয়া পয়সা উৎকোচ  না দিয়ে।

সে পুলিশ কী করে জানবে,  আটপৌরে ভাবে শাড়ি পরা, শাঁখাপলা শোভিত এই মহিলা সারা জীবন তার জ্ঞানতৃষ্ণা কীভাবে ডাক্তারদের ওপরে মিটিয়ে এসেছে। ডাক্তার সব কিছু প্রেস্ক্রিপশন বুঝিয়ে দেবার পর  (চার দশক আগের ডাক্তার ব্রো, এক আলাদাই স্পেসিজ ) সে বলেছে ‘সব তো বুঝলাম ডাক্তারবাবু , কিন্তু আপনি আমাকে বলুন এই অসুখ কোথা থেকে হল?’  অসুখটি আমার। আমি ওখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচি, কিন্তু মা সেই অসুখের উৎস না জেনে বেরোবে না। তখনো ডাক্তাররা ইউ ব্লিংক অ্যান্ড ইউ মিস ধরনের ন্যানো সেকেন্ডের রোল করতেন না চেম্বারে। তাঁরা অনেকক্ষণ ধরে রোগী দেখতেন, আর ,মোটামুটি তাঁদের ধৈর্যও ছিল অসীম। আমার মায়ের মতো পেশেন্ট পার্টিকে তাঁদের ঝেলতে হত। এই সময় হলে মায়ের এই প্রতিভার বিকাশ হত না নিঃসন্দেহে।

কোথাও থেকে ফিরে এলেও ,মা প্রথম প্রথম ওইরকম অদম্য  জ্ঞানতৃষ্ণায় জিগ্যেস করত ‘কী বলল? কী খাওয়াল? তোকে ভালবাসল তো ওরা?’ এই শেষ প্রশ্নটা পাঠকের একটু অদ্ভুত ঠেকবে। সেই ভদ্রমহিলার জীবন সম্পর্কে এমন অতি সরল ও অবাস্তব আশা ছিল যে সবাই তার মেয়েকে খুব ভালবাসবে। আজকাল সেসব মনে পড়লে মহিলার ওপর খুব মায়া হয়।

হায় রে! তবে ভালবাসা সম্বন্ধে তার যত দুর্বলতা থাক না কেন, বিয়েবাড়ির ডিটেলিং জানতে  তত মন ছিল না তার। মানে কনের গহনা, শাড়ি ইত্যাদি,।  সে কিছু কিছু পাবলিক আছে। বিয়েবাড়ি খেয়ে এসে শরীর আই ঢাই, শুতে পারলে বাঁচি, তাদের  তখনি সব কিছু জানার আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠবে । আপনারা ভাবতেই পারেন, এবং সে ভাবনা যথেষ্ট জায়েজ যে ইস্কুল পাঠশালা পড়ার সময় এত জানার ইচ্ছে কোথায় ছিল বাপ? তখন তো মাস্টার ক্লাসে পড়িয়ে মুখের ফেনা তুলে যখন জিজ্ঞেস করত ‘কারো কোন প্রশ্ন আছে?’ তখন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতিস! ‘আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কে?’ জিজ্ঞেস করলে বেমালুম বলে দিতিস ‘কোন সায়েবই হবে!’ আর আমার কন্যার মতো কেউ হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাম অবলীলায় লিখে আসত ‘পাগ্লু!’ কিংবা জওহরলাল নেহেরুকে বাচ্চারা ‘চিল্ড্রেন্স ডে’ বলে ডাকে! যখন দরকার ছিল,  কারো কিচ্ছু প্রশ্ন ছিল না, জানার কোন আগ্রহ ছিল না। আর আজ মেয়েটা খেয়েদেয়ে ক্লান্ত হয়ে একটু শুতে চাইছে, তার চোখের মাস্কারা শুকিয়ে খড়খড় করছে, চুলে লাগানো ফুল থেকে পোকা বেরিয়ে মাথায় কামড়াচ্ছে (না না উকুন নয়) , এতক্ষণ ধরে পরম ধৈর্যে  পরে থাকা ভারি জরির শাড়ি অঙ্গে বিশমনি বোঝার মতো লাগছে, আর তিনি বা তাঁরা জানতে চাইছেন ‘কনেকে দেখলি? হাতে কানে গলায় কী পড়েছে?  শাড়ি কি বেনারসি না অন্য কিছু? শাড়ির রঙ কী ? মেয়ের গায়ের রঙ কেমন দেখলি? ফর্সা? না উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ?  তোর সামনে দিয়েই কি মেয়ের বাড়ির তত্ত্ব এল? কটা ডালি দেখলি? ভালো দিয়েছে থুয়েছে?’

 না না এর মধ্যে আবার আপনারা পেট্রিয়ার্কির গল্প খুঁজবেন না। ছেলের গায়ের র্ং, ছেলের বাড়ির  থেকে আসা গায়ে হ্লুদের তত্ত্ব নিয়েও এরা একইরকম অনুসন্ধিৎসু।   এইসব বলে এরা চলে যায় আসল ব্যা[পারে। ‘কী খাওয়াল? করকম মাছ? খাসির মাংস করেনি? ছি ছি মুরগি তো আজকাল ভেজ বলে লোকে। মুরগি কেউ কাউকে নেমন্তন্ন করে খাওয়ায়? আবার রিটার্ন গিফট দিয়েছে!  ছোঃ! এই তো খেলো প্লাস্টিকের বাটি আর আয়না, এর চেয়ে খাসি করতে পারত।  কী কী মিষ্টি?’

 ‘ভাইরে, তোমারও  তো নেমন্তন্ন ছিল, গেলে না কেন?’

 এসব আবার বলা যাবে না।

‘অ্যাঁ এই বয়সে অত রিচ খাবার রাতে খেয়ে মরি আর কি? এই তো খই দুধ কলা খেয়ে নিলাম’

‘ যাব্বাবা! তাহলে তুমি খাসির মাংস নিয়ে এত উৎসাহ দেখাচ্ছিলে কেন?’  এ প্রশ্ন  করি না অবশ্য, করতে নেই। কারণ করলেই এর পিঠে আরও নতুন এক সেট প্রশ্ন আসবে। সবই আনসিন। তার থেকে বড্ড ঘুম পেয়েছে বলে শুয়ে পড়া ভাল।

শুধু বিয়েশাদি নয়, মৃত্যু নিয়েও যে এদের অনন্ত কৌতূহল তা তো কিছু আগের পর্বেই বলেছি। এঁরা অসুস্থকে দেখতে গিয়েও অনর্গল প্রশ্ন করেন। শ্রাদ্ধ বাসরে শ্রাদ্ধরত অনাথকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন পাতা কোথায় ফেলব কিংবা রসগোল্লা একবারের বেশি দিল না কেন?

 আর একদল আছেন তাঁরা ভ্রমণের যাবতীয় তথ্য  সংগ্রহ করেন। এঁরা দেখবেন ভ্রমণ মেলায়  প্রতিটি স্টলে গিয়ে মালয়েশিয়া থেকে মধ্যমগ্রাম, হাসনাবাদ  থেকে হনুলুলু -সব জায়গার  ব্রোশিওর কালেক্ট করেন। একটা হোটেলে উঠে অন্য হোটেলের রুমে নক না করে ঢুকে গিয়ে (হনিমুন সুইটে অব্দি) প্রশ্ন করেন ‘ইন্ডিয়ান না ওয়েস্টার্ন? ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি?’ মশা আছে?’

এঁদের দেখলেই মোবাইল  ঘাঁটতে শুরু করবেন, কিংবা বলবেন ‘অনলাইন মিটিং –এ আছি’, কারণ  এদের প্রথম সরল প্রশ্নটা  একটা ভয়ানক ফাঁদ, তাতে পা দিয়েছেন কি মরেছেন!

1 Comment

  • প্রনাবি দেখুন,আপনি আর কি এমন সরস গল্প লিখেছেন!এখনকার সরস উপন‍্যাসের দিকে একটু তাকান।আপনি না হয় গুরুদেবের ছোঁয়া পেয়েছিলেন।বাংলা পাশ দিয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে একগাদা পুরস্কারও পেয়েছেন।আর এই মহিলাটি বিজ্ঞান পাশ দিয়ে এতো বাংলা লেখার জোশ পায় কোথা থেকে?একটু আশীষ দেবেন প্লিজ।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *