গুচ্ছ কবিতাঃ সুমন জানা
গুচ্ছ কবিতাঃ সুমন জানা
পূর্ব মেদিনীপুরের এক গ্রামে জন্ম ১৯৭১ সালে। পশ্চিম বঙ্গ সরকারের বাণিজ্যকর দপ্তরের আধিকারিক। কর্মসূত্রে অস্থায়ী বসবাস উত্তর থেকে দক্ষিণ বঙ্গের বিভিন্ন জেলায়। কবিতাই মূল ভালোবাসার জায়গা হলেও কিছু গল্পও প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম কবিতা প্রকাশ ১৯৯২। প্রথম কবিতার বই ২০০১ এ ‘সামান্য কথার কথা’। এর পরে বেশ কিছু বছর লেখালিখিতে বিরতি। পরবর্তী পর্যায়ে আরও দুটি কবিতার বই হয়েছে ‘মোতিহারী তামাকের ঘ্রাণ’(২০১৮), ‘মিথ্যা হরিণের কিস্সা’ (২০২৩)। দেশ, কবিসম্মেলন, শিলাদিত্য, কৃত্তিবাস, মথ, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম, কেতাব-ই ইত্যাদি বিভিন্ন প্রিন্ট এবং অনলাইন পত্রিকায় কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম দিনটি থেকে আজ পর্যন্ত লেখালিখি মূলতঃ নিজের আনন্দে নিজে ডুবে থাকার ইচ্ছায়।
#১
অবিনশ্বর
প্রতিটি কবিতা যেন গরম আগুন,
পাতাগুলি ছেঁড়া, দোমড়ানো,
কবি একে রাখতে পারেনি,
হে পাঠক, ছ্যাঁকা দেবে, আস্তে ধরুন!
সুখী গৃহকোণ থেকে এ কবিতা পরিত্রাণ চায়,
একে তুমি নিয়ে যাও ভাঙা মন্দিরে
সেইখানে সাপের ফনায়
ভরে দাও কবিতার বিষ
একে তুমি আদর কোরো না
চুলের বকুল ছিঁড়ে ফেলে রেখে যাও।
দেবতার শূন্য আসনে
পড়ে থাক কবিতার ধ্বস্ত শরীর
হাজার বছর পরে যারা
এর কোনও সন্ধান পাবে
তোমার কবির মতো দৈনন্দিন
পুড়ে যাবে তাদেরও জীবন
#২
অসম্পূর্ণ
সমস্ত ঘরময় কবিতা উড়ছে। কবির হাতে ডায়েরি। কবি একটার পর একটা পাতা ছিঁড়ছে, দুমড়ে দিচ্ছে স্বপ্নে পাওয়া অক্ষরগুলি। উষ্ণ দুপুর। মাথার ওপরে ফুল স্পিডে ঘোরে; খৈতান পাখা। কবির ছেলে কাঁদছে, কবির মেয়ে কাঁদছে। আর দৌড়ে ধরার চেষ্টা করছে টুকরো পাতাগুলি। হাওয়ার প্রবল তোড়ে উড়ে যাচ্ছে তাদের প্রাণপণ অথচ ছোট ছোট চেষ্টাগুলি। … কবির বউ হতভম্ব, স্তব্ধ স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে দেখছে একটি কবিতা মিশে যাচ্ছে অন্য একটি কবিতার সঙ্গে আর সারা ঘরময় হতাশা, গরম আর আর্তনাদের ভেতর উড়ছে অনেক কবিতা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে। একটি অভুক্ত, বেদনা দীর্ণ রাত্রি। ক্লান্ত কবির গায়ে পা তুলে ঘুমোচ্ছে কবির ছেলে। দুমড়ে শুয়ে আছে কবির মেয়ে। তার গালে তখনও অশ্রু মোচনের শুকনো দাগ। মশারি গোঁজা নেই। চরাচর নিঝুম। তখনও সেই অন্ধকারে টর্চের আলোয় কবির বউ ডায়েরির ছেঁড়া পাতাগুলি পাশাপাশি রেখে খুঁজে পেতে চাইছে অন্ততঃ একটিও সম্পূর্ণ কবিতা…
#৩
প্রলয়কালীন
বকুল বিছানো পথে মেঘ নেমে এল
গবাদি পশুর খুরে পিষ্ট হল যাবতীয় কৃষ্ণচূড়া ফুল
প্রলয়ের আগেকার এক অন্ধকারে
চরাচরে বিষাদ ঘনাল…
গবাদি পশুর এই দৌড় লক্ষ করো
প্রলয়ের চিহ্নগুলি চেনো-
এতক্ষণ পাশাপাশি হেঁটেছিল যারা
তারা সব অন্য কোনও পথে চলে গেছে,
তুমি একা যে পথে চলেছ
সে পথে কোথাও কোনও নিষ্ক্রমণ নেই
সে পথে মেঘের সঙ্গে মাটির শত্রুতা…
#৪
পথিকের অভিমান
কোনও তীব্র দুপুরই একা
বোঝে পথিকের অভিমান
সব ছায়া লুকিয়েছে দ্রুত
নেই পানীয়েরও সন্ধান
নাকি পানীয় তৈরি ছিল
ছায়া ছিল তার কোল পেতে
শুধু পথিকের মনে ভ্রম
তাকে ঘুরিয়েছে ভুল পথে
তাতে দুপুরেরই বা কী দোষ
তার রৌদ্রের খরতাকে
যদি লোকে ভয় পায় আর
সব দরজা বন্ধ রাখে
সব ছায়াকেই ছুঁয়ে দেখা
সব দুপুরের রোদও চেনা
তাকে আড়ালে করেছি প্রেম
যাকে প্রকাশ্যে করি ঘৃণা
#৫
শ্রাবণ বাতাস
চুলের গন্ধে ভারি হয়ে ছিল শ্রাবণ বাতাস
আদরের মতো কয়েক পশলা বৃষ্টিও হল
আয়ত্তহীন শ্বাস-প্রশ্বাসে দুলে ওঠে মাটি
মেঘের দু’চোখে জ্বলেছিল ক্রুর হিংসার আলো
রাত্রির সব গোপন নকশা বদলেও যায়
বৃষ্টির ফোঁটা আদর না করে কশাঘাত হানে
দুলে ওঠা মাটি আবার কখন শান্ত হয়েছে
শ্রাবণ বাতাস তখন আমাকে কতটুকু চেনে
দিন বদলের সংকেতগুলি আমিও কি চিনি
গোলাপি ওড়না উড়ে গিয়েছিল ধরতে পারিনি