কৌশিক সেন-এর দুটি গদ্য-কাব্য বা আধুনিক চম্পূ
কৌশিক সেন-এর দুটি গদ্য-কাব্য বা আধুনিক চম্পূ
প্রায় একুশ বছর দিল্লিপ্রবাসী, জন্ম ও বেড়ে ওঠা বহরমপুর শহরে। কর্মসূত্রে কেন্দ্রীয় সরকারী আধিকারিক হলেও ধর্মসূত্রে ও মর্মসূত্রে পরিচয় কবি, একান্তভাবেই।
উত্তর চল্লিশের কবি তাই কবিতাকেই জীবনদর্শন হিসেবে বিশ্বাস করেন।
#১
এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি……
নেশা ধরে গেছে। মাচায় বসে থাকা কাকাতুয়াকে দেখেছি, কীভাবে ভেঙেচুরে যাচ্ছে, ঝনঝন ঝরে পড়ছে সিকি রেজগির মত। রঙিন পালকে এল্ভিস প্রিস্লের গান। ভিনদেশ থেকে নেমে আসা সবকটি সন্ধ্যাতারায় আজ বসন্তোৎসব। খণ্ড’ত-এর মত একফালি মরুভূমি শুকিয়ে যাচ্ছে ফণীমনসার নেশায়। গিরগিটির গায়ে কুঁ-ঝিকঝিক, কুঁ-ঝিকঝিক। সমস্ত কান্না সঙ্গে নিয়ে মঙ্গলগ্রহে উড়ে যাচ্ছে আদ্যিকালের বন্দে ভারত। রাতের রসিকতা ছেড়ে তারা গুনে চলেছে অন্ধ পেঁচানী। দশ গুনবার পর কালো ভ্রমর, একশোর পর মাকড়সার রস আর হাজার পেরোতে না পেরোতেই স্বয়ং ব্যোমকেশবাবু ঝাঁপ দেন অন্ধকার সমুদ্রে। অজিতবাবু এখন নুলিয়া, চাঁদের আলোয় খুঁজে বেড়ান নিষিদ্ধ গল্পসূত্র। চারআনায় বেচে আসবেন দূরগাঁয়ের বটতলায়। পাখির কলতানে উঠে আসবে সামনের ব্যালকনির রানুবৌদি, যার ফুলছাপ নাইটি মেলা থাকে চাঁদের তারকাঁটায়।
বালিশে সাইরেন বাজে রোজ। চোর পালিয়েছে। ভিতরে ওয়াচটাওয়ার। অর্বুদে অর্বুদে ভরে গেছে পাঁজরের সবকটি হাড়। মাংসের অন্দরমহলে ঝড় উঠবে এখনই। ত্রিসীমানা ছেড়ে উড়ে যায় কাক। তোষকের গভীরে মধ্যরাতের মহানগর। মাতালের সেরিনেড। মুখ হাঁ করে হাঁইতোলা শীতকাতুরে বেবুশ্যে। হাঁয়ের ভিতর খদ্দেরের জিভ, ফুলে ওঠা নাভি, ক্লায়েন্টের অন্ধকার পেনিসে কনকচাঁপার সুবাস, খিদেয় দাহ্য হয়ে আসা নৃশংস পাকস্থলী। তোষকের ভিতর সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস। তটে আঁছড়ে পড়ে অন্ধকার বিকিনি। নতুনত্ত্বের সীমানা ছাড়িয়ে অনন্তে ভেসে চলা শঙ্খচিলের ঘরবসত।
নেশা জমে গেছে। রোদ্দুরের পিপাসায় দুএকটি চাদর মেলেছিলাম ভোরবেলায়। এখন সেখানে মহাকাব্য লিখে গেছেন প্রাচীন ঋষিরা। চর্যাপদ লিখবার খসড়া তৈরি করছেন কেউ কেউ। কেউ বা মিথুন মুছে রাখছে বিশুদ্ধ প্যাপিরাসে। কষ্ট। বড় কষ্ট। দাঁড়াশ সাপের সামনে মেঠো ইঁদুরের প্রসবযন্ত্রণা যেন! ডিমে তা দিতে দিতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে লুডোবোর্ডের সাপেরাও। জরায়ুতে লিখে রাখে সুচারু রবীন্দ্রসঙ্গীত। ছক্কা ও পুটের মাঝখানে ফণা তোলে কালনাগিনী। আদরে কোলে তুলে নেয় বেহুলা, কাঁচুলি সরিয়ে দংশনচিহ্ন এঁকে নেয় গভীর ক্লিভেজে।
বহুরাত চাঁদ ওঠেনি। কেবল সপ্তর্ষি আর কালপুরুষ। চশমার ডাঁটে নিপুণ সংযোজন করেছি নিভন্ত শরখানি। মোবাইলের আলো ফেলে দেখেছি, কারা কারা বেঁচে আহচে অতলে। কারা কারা রজনীগন্ধা ফেরী করছে হাসপাতালের বারান্দায়। ঘুমিয়ে পড়েছ কেউ! ওঠো। লিখে রাখো, কোন কোন মাছেরা শাপভ্রষ্ট হয়ে মনুষ্যজন্ম লাভ করেছে। কোন কোন পাখিরা বীজ বুনে দেয় অন্ধকার খামারে। লিখে রাখো, আজ রাতেই। সম্ভব হলে ফেরিওয়ালার রূপ ধরে ঘুরে আসব স্বপ্নের অলিতে গলিতে। তল্লাশি নেব ঈশ্বরের বালিশ বিছানার। চিন্তা কোরোনা, দু’স্ট্রিপ সেডেটিভ ম্যানেজ করেছি পাড়ার কেমিস্ট শপ থেকে!!
#২
মিডনাইট ব্লুজ
ঝুপ করে আসে, আবার চলেও যায়। যেন অফিস ফাইলের সন্তর্পণে নষ্ট জোনাকির আনাগোনা। অসুস্থ নাইট বাল্বের গুঞ্জন। “ঘুম ঘুম চাঁদ, ঝিকিমিকি তারা…” কেউ কি গান গায়! বাঁশপাতায় নক্ষত্রের ঝিকিমিকি। বিষণ্ণ মনিটারে পুলস্ত্য, পুলহ। নির্জনতা ছুঁতে চায়, যেন মিশনারি স্কুলের তরুণী সন্ন্যাসিনী।
ঘুম থেকে উঠতেই অন্ধকারটা স্পষ্ট হয় আরও। কিছু কি গেল! ইলেক্ট্রিসিটি! যাক, যা গেছে তা যাক! বরং আঁজলা পাতা যাক নষ্ট কালপুরুষের সামনে। প্ল্যানেটরিয়ামের সিলিঙয়ে ছুঁয়ে দেওয়া যাক র্যাপিডফায়ার কোয়েস্চেনেয়ার। হৃৎপিণ্ডে পুষে রাখা যাক দুশ্চরিত্র ঝিঁঝিঁপোকাকে।
ও বুঝি অরুন্ধতী! দ্বৈপায়ন হ্রদ থেকে উঠে আসা মহাকাব্যের বিশালাক্ষী! ফোঁটা ফোঁটা সুখ ঝরে পড়ে মধ্যরাত্রের নোটসে। বিশিষ্ট জাদুস্পর্শে ভেঙে পড়ে কপিলাবস্তুর পরিমিতি। জ্যোৎস্না নয়, অন্য কোনও অসুখের সম্মুখে দাঁড়ায় পৃথিবী। শাপভ্রষ্টা অপ্সরা ভর করে মধ্যরাত্রের কীবোর্ডে।
“তারা ঝিলমিল, স্বপ্ন মিছিল……” থাক, থাক। ওসব তো সলমাজরির গল্প! ওতো বিলাসিতা! স্পর্শসুখ লেগে থাকা বাহারি ফোল্ডার সব! এক ক্লিকে পাপড়ি মেলে ঘুম। চোখের পলকে খুলে যায় স্বপ্নের মধুভাণ্ড বুঝি! ঘন হয়ে আসে বৃশ্চিকরাশির বিষণ্ণতা। এক ফুঁয়ে যজ্ঞাগ্নি নিভিয়ে দেয় বাকসিদ্ধ ঋষিটি। কেউ কেউ ঠোঁট ছুঁয়ে অনুভব করতে চায় স্বপ্নকে। অনুমতি দিই, অকারণেই।
ঘুম পায়, ফের। সযত্নে সরিয়ে রাখা গন্ধ ফিরে আসে। জোছনার। যাহ্, জোছনা হতে যাবে কেন! ওতো বেদেনী! বীণ বাজায়, রোজ, শিয়রে। কনকচাঁপার গন্ধে ম’ম করে বালিশ বিছানা। ঘন নীল হয়ে আসে স্বপ্নেরা। আঃ ঘুম, পাশবালিশ ভরিয়ে তোলো মিছিলে মিছিলে, স্লোগানে স্লোগানে, নীলাভ স্বপ্নের সোনাটায়।।