Email: info@kokshopoth.com
February 19, 2026
Kokshopoth

এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা

Feb 18, 2026

প্রবন্ধ/ নিবন্ধ

তৃষ্ণা বসাক

এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা

 

‘পাকিস্তানি ডাকাতরা যাকে বেআবরু করতে পারেনি, বাঙালি ঘাতকের হাতে তার ব্লাউজ দোফালা, শাড়ি ছিন্ন ভিন্ন- (ভোর কখন, মুক্তিযুদ্ধের গল্পসমগ্র, রাবেয়া খাতুন, প্রথম প্রকাশ,ফেব্রুয়ারি ২০০২)

 

ফ্ল্যাশব্যাক ২০০৭-নীল সবুজ মাতৃভূমি

 

পুজোর কলকাতা ছেড়ে যাওয়া কি যে কষ্টের। কিন্তু এ তো বাংলা ছেড়ে অধিক বাংলায় যাওয়া। আমার সোনার বাংলায়। সল্টলেক থেকে সৌহার্দ্য বাসে চেপে বসা নবমীর ভোরে। আবার নবমীর রাতেই পৌঁছে যাওয়া আর এক বাংলা মায়ের কোলে। মাঝে চ্যাংড়াবান্ধায় এক খিটকেল কাস্টমস অফিসার ব্যাগ খুলে হাটকে একাক্কার অবস্থা। যে শাড়িগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল আত্মীয়াদের জন্যে, সেগুলো পুরো ভাঁজ খুলে কচলিয়ে কি করুণ দশা করে দিল তাদের। যেন কতবার পরা পুরনো শাড়ি। সৌহার্দ্য বাসের ফিরোজ ভাই এগিয়ে না এলে সেগুলো ফেরত পাওয়াই যেত না। শাড়ির মতোই তছনছ মন নিয়ে, ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন ঢাকার নবাবপুর রোডে এসে পৌঁছলাম, তখন রাত নটা বেজে গেছে। সরু গলির মধ্যে হঠাৎই আলদিনের দৈত্য যেন বিশাল প্রাসাদ বসিয়ে গেছে। এ বাড়ির বাসিন্দারা বহুবার পালিয়েছে প্রাণ হাতে করে, আবার ফিরে এসেছে। সেই পালানো আর ফিরে আসার ইতিহাস এর প্রতিটি বাঁকে। বাড়ির সদর দরজা থেকে মূল বাড়িতে পৌঁছতে তাই অগণিত গলির ভুল্ভুলাইয়া। পরে বুঝেছি, এর কারণ হানাদারকে বিভ্রান্ত করে কিছুক্ষণের জন্যে ঠেকিয়ে রাখা, সেই অবসরে বাড়ির সবাই যাতে পালিয়ে যেতে পারে। সে বড় সুখের সময় নয়। স্বাধীনতা আর দেশভাগ হাত ধরাধরি করে এসেছিল। এই উপমহাদেশ ভেঙে দুটো দেশ ভারত আর পাকিস্তান। সে পাকিস্তানের আবার দুটো অংশ, পশ্চিম আর পুব। পুব যে দুয়োরানি তা তো বোঝা যাচ্ছিল পদে পদে। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল রাওয়ালপিণ্ডি আর লাহোরের কতিপয় পরিবারের হাতে। পুবের শিল্প অর্থনীতির মাজা ভেঙে দেওয়া হচ্ছিল সুপরিকল্পিত ভাবে। সবচেয়ে আঘাত আসছিল ভাষা সংস্কৃতির ওপর। এরই জেরে ১৯৫২ র ভাষা আন্দোলন, আর তারপর দু দশক ধরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। আবার এক নতুন দেশের জন্ম হল। বাংলাদেশ। যাদের জাতীয় সঙ্গীত যখন বাজে তখন গলার কাছে কী যেন দলা পাকায়, চোখে জল আসে, বুকে গর্ব হয়। সারা পৃথিবীতে যে ছড়িয়ে যাচ্ছেন রবি ঠাকুর, ছড়িয়ে পড়ছে বাংলা ভাষা।

তাই পাসপোর্টে ছাপ পড়তে একটু অদ্ভুতই লাগছিল, বিদেশ নাকি? নবাবপুর রোডে আসতে আসতে চারপাশের দোকানপাট দেখেও চোখের কি আরাম। সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে বাংলাভাষা। কানের আরাম। খাস কলকাতায় একটা বিশুদ্ধ বাংলা বাক্য শোনা প্রায় যায়ই না।

আধো অন্ধকারে গলির ভুল্ভুলাইয়া পেরোতে গিয়ে দেখি ছোট ছোট ঘরে মানুষজনের ঘরকন্না। দেখেই বোঝা যায় তাঁরা সমাজের পিলসুজের একেবারে নিচের অংশ, যেখানটায় আলো পড়ে না। পরে শুনেছি, ওরা কেউ শাঁখারিটোলার সোনার দোকানে সোনার গুঁড়ো কুড়িয়ে বেড়ায়, কেউ ফেরিওলা, কেউ রিকশা টানে। এদের ডেকে এনে বাড়ির মধ্যে জায়গা দেওয়া অকারণে নয়। দাবায় যেমন রাজাকে বাঁচাতে সামনে বোড়েদের এগিয়ে দেওয়া হয়, এরা ঠিক তেমনি। হানাদারের আক্রমণের প্রথম চোটটা ওদের ওপর দিয়ে যাবে। তখন অনেক সময় পাওয়া যাবে মালিকদের নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার। পালিয়ে যাওয়ার সময় বরাবর এঁরা লক্ষ্মী জনার্দন নিয়ে গেছেন বুকে করে। ফিরেও এসেছেন তাদের বুকে নিয়ে। সেই লক্ষ্মী জনার্দনের মন্দির আছে বাড়ির চত্বরেই। কিন্তু গলির চক্করে চট করে খুঁজে পাওয়াই দায়। বলা বাহুল্য, এটা ছিল আত্মগোপনের জায়গা। বাড়ি থেকে না পালিয়ে বাড়ির মধ্যেই লুকিয়ে থাকা।

আমি কেন আসতে চেয়েছি এখানে? ভাবতে ভাবতে  মন চলে যায় ঋত্বিক ঘটকের কোমলগান্ধার ছবির সেই দৃশ্যে, যেখানে রেললাইনটা শেষ হয়ে গেছিল। ওপারে একটা অন্য দেশ। সেই কাটা রেললাইনটা, নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে, কেয়াপাতার নৌকো এইসব পড়তে পড়তে আমার মনে একটা শেকড় তৈরি হয়েছে কখন অজান্তে। শুধু বাংলা নয়, কোথাও দেশভাগ মেনে নিতে চায় না আমার মন। পরে তো পূর্ব পাঞ্জাব, পশ্চিম পাঞ্জাবের যন্ত্রণার কথাও জানলাম। কিসান চন্দরের পেশোয়ার এক্সপ্রেস, মান্টোর অসাধারণ গল্পগুলো, পরবর্তীকালে পাঞ্জাবি লেখকদের রচনা- অজিত কৌর, মোহন ভাণ্ডারী – আমাকে অস্থির করে তোলে ভীষণ। দেশভাগ, গৃহযুদ্ধ, আর তার ফলে এক বিপুল সংখ্যক মানুষের মাইগ্রেশন – এ যে কি ভয়ানক!  দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে ছোট ছোট ঘুপচি ঘরে নগণ্য মানুষের ঘরকন্না দেখছিলাম। দৃষ্টি অন্ধকারেও দূরে চলে যাচ্ছিল। আন্দাজে বুঝলাম খুব কাছেই জিন্দাবাহার লেন। পরিতোষ সেনের অসামান্য স্মৃতিকথা পড়ে পড়ে যাকে আমি চিনি। ওই তো ওই বাড়ির ছাদ থেকেই  হয়তো রংবেরঙ্গের ঘুড়ি উড়ত, লক্কা পায়রারা আকাশে উড়ত চক্রাকারে। এখন কোথায় তারা? কোথায় বুদ্ধদেব বসুর পুরানা পল্টন?  কোন বাড়িতে রাণু সোমকে গান শেখাতে আসতেন নজরুল?যাবত প্রিয় বইয়ের পাতা খুলে যাচ্ছিল ফরফর করে। আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম সেই সময়ে, কখনো আবার ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাইয়ের ঢাকায়। হঠাৎ  শিউলি ফুলের গন্ধ এল নাকে। শিউলির গন্ধ আর এবাড়ির পুরনো  গল্প শুনতে শুনতে   কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম কে জানে।

পরের দিন এখান থেকে বিদায় নিয়ে আবার সেই ভুলভুলাইয়া গলিপথ দিয়ে বাইরে আসি। কণবমুনির আশ্রমের হরিণছানার মতো শিউলি ফুলের গন্ধ পিছু টেনে ধরে। এখান থেকে কমলাপুর স্টেশন।অটোতে। এখানে যাকে বলে সি এন জি, আবার কখনো বেবি ট্যাক্সি।ময়ূরপঙ্খী নৌকার মতো বাহারি রিকশায় চড়াটা তোলা থাকল আপাতত।

 

‘আমাদের ব্যাগে কয়েক প্যাকেট জিরের গুঁড়ো, সাবুর পাঁপড়,

আলতা আর অশ্রু-

ওখানে কি এসব পাওয়া যায় না?

প্রথমে বাসের নাম লিখি-

সৌহার্দ্য, শ্যামলী, সোহাগ

তারপর সীমান্তের নাম লিখি-

বেনাপোল, পেট্রাপোল, চ্যাংড়াবান্ধা,

এরপর লিখি স্টেশনের নাম-

কমলাপুর, তেজগাঁও, টঙ্গী, জয়দেবপুর…

ময়মনসিংহ পৌঁছে আর কিচ্ছু লিখি না,

আমাদের ব্যাগে কয়েক প্যাকেট জিরের গুঁড়ো, সাবুর পাঁপড়,

আলতা আর অশ্রু-

এখানে কি এসব পাওয়া যায় না?

আজ দশমী,

ছোট মামীর আলতা,

নয়ামাসির সাবুর পাঁপড়,

ফুলমাসির জিরের গুঁড়ো

আর অনেক অশ্রু নিয়ে

১০৮ দুর্গানাম ব্রহ্মপুত্রে ভেসে চলে যায়…’

 

কবিতা সবসময় সত্যি কথা বলে।যেমন এই কবিতার মধ্যে আমার ২০০৭ সালের বাংলাদেশ সফরের কয়েকটি তথ্য নিখুঁত ভরা   আছে। যাকে বলা যায় সেই সময়কালের ডকুমেন্টেশন।

সত্যিই শ্যামলী পরিবহনের সৌহার্দ্য বাসে যাওয়া হয়েছিল।

চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডার পেরিয়ে। সোয়াবিন, জিরের গুঁড়ো, সাবুর পাঁপড় – এইসব নেওয়া হয়েছিল আত্মীয়দের জন্য। শাশুড়ি বলেছিলেন ওখানে এইসব নাকি পাওয়া যায় না। নিরামিষ খাবার দিন খুব অসুবিধে হয়। চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডারে সেই বদরাগী কাস্টমস অফিসার সব শাড়ি উলঢাল পালঢাল করলেও এইসবে হাত দেয়নি।

এইসব স্টেশনের নাম আমি সত্যি লিখছিলাম একটা ছোট্ট নোটবুকে। খানিক পরে হাল ছেড়ে দিই অবশ্য।  কারণ এইসব লিখতে গেলে ট্রেনের দুধারের দৃশ্য দেখা হচ্ছে না, আদিগন্ত সবুজ আর অফুরান জলরাশি, যেন সবুজ জমিতে রুপালি কারুকাজের একটি জামদানি, যা দেখে রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়বেই।

‘আজি, বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি

তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী

ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে’

বাংলাদেশের ট্রেনের চেহারা-ছবি বিশেষ সুবিধের নয়, বাবুলোকেরা কেউ বড় একটা চড়েও না।মাইক্রোবাস আর বেবি ট্যাক্সি জনপ্রিয়। এগুলো বিদেশ থেকে আমদানি, দেখনদারিত্বে এবং আরামে বেশ ভালো, বিশেষ করে দূরপাল্লার বাসগুলো।  তবে ট্রেনে চড়ার একটা মস্ত সুবিধে হচ্ছে দেশের আসল মানুষদের দেখার সুযোগ পাওয়া যায়। তিনঘণ্টার জার্নিতে একেবারেই কেঠো বেঞ্চে বসে পিঠ, কোমর আরাম পেল না ঠিকই, কিন্তু চোখ যতটা পারল চেটেপুটে নিল। বরষা শেষের শরতের বাংলার রূপ যে কী মনোমুগ্ধকর। আর শুধুই তো প্রকৃতি নয়, গ্রামবাংলার মানুষ যে সারাদিন কত কাজ করে, তাদের সেই কর্মমুখর দিনের একটা ছুটন্ত ছবিও পাওয়া যায় ট্রেন থেকে।

‘শৈবালের ওপর অনেকগুলি ছোট ছোট কচ্ছপ আকাশের দিকে সমস্ত গলা বাড়িয়ে দিয়ে রোদ পোয়াচ্ছে। অনেক দূরে দূরে একটা একটা ছোট ছোট গ্রাম আসছে।গুটিকতক খড়ো ঘর, কতকগুলি চাল, শূন্য মাটির দেওয়াল, দুটো একটা খড়ের স্তূপ, কুলগাছ, বটগাছ, আমগাছ এবং বাঁশের ঝাড়, গোটা তিনেক ছাগল চরছে, গোটাকতক উলঙ্গ ছেলে মেয়ে হয়তো খেলছে’ রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রের উনিশ শতকের এই বাংলাদেশ আমি একুশ শতকেও দেখতে পেলাম ট্রেনের জানলা থেকে।

 

 

ময়মনসিংহ স্টেশনের মধ্যে বিশেষত্ব  কিছু নেই। এপার বাংলার যেকোন রেলস্টেশনের মতোই। নোংরা, ধুলো পড়া চেহারা, তবে বেশ বড়।  অচেনা আকাশের একটা টান থাকেই, বাকিটা শরৎ ঋতুর হাতযশ। তার ওপর যখন ভীষণ চেনা আর প্রিয় মুখ দেখা দিল অচেনা প্লাটফর্মে, তখন এই কাগজেকলমে বিদেশ, স্বদেশ হয়ে উঠল। বাঙ্গালির দুর্গাপুজো তো আসলে ঘরে ফেরার উৎসব। সেই ঘর আপাতত নাটক ঘর লেন। স্টেশন থেকে খুব সামান্যই পথ। হাতে হাতে লাগেজ নিয়ে পৌঁছে যাওয়া গেল। আর যেতে যেতে এক নজর চোখ বুলিয়ে নেওয়া গেল পথের দুপাশে। বড় রাস্তা থেকে ঢুকে পড়ে একটি ছোট রাস্তা, নাটক ঘর লেন। যদিও লেন, তবু একে গলি বলা যাবে না। সেই রাস্তায় ঢুকে ডানহাতের বাড়িটার সামনে দরজার দুপাশে মঙ্গল ঘট বলে দিচ্ছিল এ বাড়িতে কোন আনন্দ উৎসব আছে। অবশ্য উৎসবের একেবারে শেষ দিনে আমরা এসে হাজির হলাম। আজ বিজয়া দশমী। আমরা আসার আগেই এ বছরের মতো  পুজো শেষ হয়ে গেছে। ছোট উঠোনে ছোট প্যান্ডেলে ততোধিক ছোট একচালার প্রতিমা।প্রতিমার নির্মাণে এক আশচর্য সারল্য চোখে পড়ে, মনে হয় এর মধ্যে এক আকাঁড়া বাঙ্গালিয়ানা আছে, নগর সভ্যতা যার খোঁজ রাখে না। প্রতিমার সামনে বসে পুরোহিত বিকেলের দেবী বরণের জন্য গোছগাছ করছেন, দু একজন বয়স্কা মহিলা আর দু চারটি নাছোড় শিশু মণ্ডপের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

নাটক ঘর লেনের মণ্ডপের দিকে তাকিয়ে নিজের ছোটবেলাটা এক লহমায় দেখতে পেলাম।যদিও প্রতিমা এখনো মণ্ডপে দাঁড়িয়ে, তবু ছোটদের মুখে বিষাদ জমতে শুরু করছে। আচ্ছা, আমাদের মতো ওরাও কি দেবীর চোখে জল দেখতে পাচ্ছে?

আগে পূজার সব রসদ আসত তারাইল গ্রাম থেকে। সেটা ছিল এই নাটক ঘর লেনের দেশের বাড়ি। দেশভাগের পর দেশের মানেই বদলে গেল। কোপ পড়ল অর্থনীতিতে। যে জমি থেকে, বাগান থেকে চাল, ডাল, নারকেল আসত, সেসব অনেকটাই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। যা রইল, তাতে আর জাঁকের পুজো হয় না। তাই শহর বাজার থেকেই কেনাকাটা চলে, তবে পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রাখতে এখনো পুরোহিত আসেন তারাইল থেকে। সেই আদি পুরোহিত বংশের বর্তমান প্রতিভূ। এবারও পুরোহিত এসেছেন তারাইল থেকে, সঙ্গে এনেছেন ছোট মেয়েটিকে। গ্রামে পড়ে না থেকে শহরের পুজোয় একটু আনন্দ করুক, একটু ভালো মন্দ খেতে পাক।  আর এসেছেন  এ বাড়ির এক বৃদ্ধা পিসিমা। তিনিই বলতে গেলে পুজোর সব নিয়মনিষ্ঠা ধরে রেখেছেন।

বরণ পর্ব শেষ হলে পাড়ার ছেলেরা জড়ো হল। গঙ্গা নয়, বিসর্জন হবে ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে।গঙ্গাহীন এ দেশ। এ নিয়ে বিবেকানন্দের এক মজার গল্প আছে। এপার বাংলা থেকে জামাই গিয়েছে পুব বাংলায় শ্বশুরবাড়ি, তাকে ষোড়শ ব্যঞ্জনে আপ্যায়ন করছেন শাহুড়ি। শেষ পাতে সর পরা এক বাটি ঘন দুধ। জামাই দেখল শাশুড়ি তাতে সাদা গুঁড়ো মতো কী যেন  মেশালেন।সে দুধ পান করার পর সমবেত মহিলারা শংখ  ধবনি করলেন , জোকার দিলেন। জামাই ভাবল এ বুঝি এ দেশের জামাই আদরের স্ত্রী আচার।এদিকে  শাশুড়ি চোখ মুছে বললেন ‘ বাবা, তোমার পেটে তো মা গঙ্গা আছেন। এতদিনে তোমার শ্বশুরের গংগাপ্রাপ্তি হল।দুধে তোমার শ্বশুরের অস্থিচূর্ণ মেশানো আছে। ।’

গঙ্গা ফিক্সেশনের এই প্রেক্ষিতে, অনেক বয়স্ক মহিলাদের আক্ষেপ করতে দেখলাম প্রতি বছর মাকে ব্রহ্মপুত্রে বিসর্জন করতে হয় বলে। যাই হোক,  দেখি সব তরুণের গায়ে নতুন সাদা টি সার্ট, যার সামনে দুর্গামুখ, আর পেছনে লেখা শুভ বিজয়া, নাটকঘর লেন, ময়মনসিংহ। পাড়ার ক্লাব ছেপেছে পুজো উপলক্ষে।   সেই টি শার্ট একটি, উপহার পাওয়া,  আজো আমার কাছে রয়ে গেছে। আজ ১৯ বছর  পরে যখন দেখি, কেমন অলীক মনে হয়।

 

ব্যাক টু ২০২৬-এরা অব মার্ডার

 

‘পুরো দেশ যেন এক বিশাল মানসিক হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। নাগরিকেরা ক্রমাগত ট্রমার মধ্যে বাস করছে—কী বললে গ্রেপ্তার হতে হবে, কী লিখলে হামলার শিকার হতে হবে, কী বিশ্বাস করলে ‘অপরাধী’ সাব্যস্ত হতে হবে—এই অনিশ্চয়তা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ভয় যখন নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে, তখন সমাজ সৃজনশীলতা হারায়, মানবিকতা হারায়, ভবিষ্যৎ হারায়।‘

(আদিত্য ইকবাল, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫)

 

‘আমরা এরা অব মার্ডারে প্রবেশ করেছি, মত প্রকাশ তো অনেক দূরে’- মাহফুজ আনাম, সম্পাদক, ডেইলী স্টার

 

 

মুক্তিযুদ্ধ, এপার বাংলাতেও একটা পবিত্র শব্দ, যা জন্ম দ্যায় অনেক যন্ত্রণার, যন্ত্রণা মুক্তির, একটা জাতির প্রতিবাদের, প্রতিরোধের। সেই প্রতিবাদে ভারতবর্ষ, আমার দেশ সাধ্যমত হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, এই নিয়ে ভারতীয় হিসেবে আমরা গর্ববোধ করি। আবেগ এতটাই ঘন যে অমৃতসরে পার্টিশন মিউজিয়ামের একটি ঘরে ঢুকতে গিয়ে  তখনি ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ বেজে উঠলে চোখে জল চলে আসে। সে গান এদেশের লোক গাইতে পারবে না এমন ফতোয়া জারি হয়েছে শুনছি। ওপারেও  রবীন্দ্রনাথের গান কেন জাতীয় সঙ্গীত হবে তা নিয়ে জল ঘুলিয়ে উঠছে।  গত আগস্ট থেকে ‘বিপ্লব’ হল অনেক, যার ফলে আদতে ইসালমিক মৌলবাদের হাত বেশি শক্ত হল।

কবি নজরুলের ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাটির একটি লাইন মনে পড়ে যায়-

‘আমরা তো জানি স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!’

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নায়কদের মূর্তি ভেঙ্গে তার ওপর প্রস্রাব করা হচ্ছে, ইতিহাস নতুন করে লেখা হচ্ছে, মনে পড়ে যাচ্ছে নিষিদ্ধ লোবানকে, মনে হয় এই লেখক সত্যিই সত্যদ্রষ্টা, যিনি ইঙ্গিত দিয়ে গেছিলেন সতর্ক  থাকার, আমরা থাকতে পারিনি।

 

‘আমি তোমায় সন্তান দিতে পারব। উত্তম বীজ উত্তম ফসল। তোমার সন্তান খাঁটি মুসলমান হবে, খোদার ওপর ঈমান রাখবে, আন্তরিক পাকিস্তানী হবে, চাও না সেই সন্তান? আমরা সেই সন্তান তোমাদের দেব, তোমাকে দেব, তোমার বোনকে দেব, তোমার মাকে দেব, যারা হিন্দু নয়, বিশ্বাসঘাতক নয়, অবাধ্য নয়, আন্দোলন করে না, শ্লোগান দেয় না, কমিউনিস্ট হয় না। জাতির এই খেদমত আমরা করতে এসেছি। তোমাদের রক্ত শুদ্ধ করে দিয়ে যাব, তোমাদের গর্ভে খাঁটি পাকিস্তানি রেখে যাব, ইসলামের নিশানা উড়িয়ে যাব। তোমরা কৃতজ্ঞ থাকবে, তোমরা আমাদের পথের দিকে তাকিয়ে থাকবে, তোমরা আমাদের সুললিত গান শোনাবে।’ (নিষিদ্ধ লোবান, সৈয়দ শামসুল হক)

১৯৮১ সালে বসে  এই উপন্যাসটি লেখা একেবারেই সহজ ছিল না। আর এখন তো একেবারেই অসম্ভব। এখন একটা ভয়ের মহলে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ।

সেই পাকি স্বপ্নের বীজ নিয়ে বড় হয়ে ওঠা সন্তানরাই এই দেশটাকে তাদের পিতৃভূমির মতো বানাতে চায়? করতে চায় পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মতো দেউলিয়া রাষ্ট্র? এরা ভুলে গেছে (এবং আমাদের দেশের মৌলবাদী রাজনীতিক রাও) যে ধর্ম হচ্ছে হিং -র মতো, তার মাত্রা বেশি হলে সে ব্যঞ্জন আর খাওয়া যায় না। ধর্মকে ব্যক্তিগত উপাসনার বাইরে আনা রাষ্ট্রের পক্ষে অতীব বিপজ্জনক।

 

‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাসের শেষে মেজর তার যাবতীয় একনায়কোচিত আস্ফালন সহ উড়ে যায়, উড়ে যায় তার অনুগত সেনা, সেনা ছাউনি, তার বীজ বপনের ইচ্ছাটি শুধু রয়ে যায়। ধর্ষিতা নারীর গর্ভে তারা সফল ভাবে রেখে যেতে পেরেছিল  যুদ্ধশিশুর ভ্রূণ, তারাই কি আজকের বাংলাদেশের নিয়ন্তা হয়ে ওঠেনি? যারা মুক্তিযোদ্ধাদের  ঘাম রক্তে কেনা দেশটাকে আবার বানাতে চায় তাদের পিতৃভূমিপ্রতিম মৌলবাদী এক দেশ?

যে মৌলবাদ কেড়ে নিচ্ছে নারীর অধিকার, রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করছে, বারবার হামলা হচ্ছে ছায়ানটের ওপর, এখন বাংলাদেশের মুসলমান পরিবার থেকে গান শিখতে আসা ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা হাতে গোনা প্রায়।

 

‘আমি এই প্রতিষ্ঠানেরই ছাত্র ছিলাম, তখন ছাত্রদের বেশিরভাগই ছিল মুসলিম। আর আজ বাংলা গান শিখতে আসা মুসলমান পরিবারের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্র হিন্দু। মনে হয় পারিবারিক ভাবে গান শেখা বা গান গাওয়া নিয়ে গোঁড়ামি বাড়ছে মুসলিমদের। অথচ কোরান  বা হাদিস শরিফে কোথায় গানে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে? আসলে বাঙালি জাতিসত্তাকে ভয় দেখাবার জন্যেই  এই আক্রমণ’

(মোমিনুল হক দুলু)

 

যদিও রাস্তাঘাট একই রকম। অফিস কাছারি, ইস্কুলের ভিড়, বাহারি রিকশা, রাস্তার জ্যাম, নতুন বলতে মাথার ওপর মেট্রো লাইন। কিন্তু দেশটা আর সেই দেশ নেই। গত সতেরো আঠের মাস ধরে যে অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলছে বাংলাদেশ, সেখানে প্রতিবেশি হিসেবে আমাদের কাছে অত্যন্ত উদ্বেগের শুধু নয়, স্বপ্নভঙ্গেরও। যারা অনেক কষ্টে, দেশ ছেড়ে এসেছিলেন, তাঁদের মনে যে ছবি ছিল, তা নষ্ট হয়ে গেছে।

 

একটি সূত্রের খবর, পূর্ববর্তী সরকারের প্রতি আস্থা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। বিরোধীশূন্য করে দেবার অপচেষ্টা, ক্ষমতা কুক্ষিগত কয়েকটি পরিবারে, সর্বোপরি পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি- সব মিলিয়ে আওয়ামি লিগের ফেরার আশা সামান্য। বি এন পি র খালেদা পুত্রের সাম্প্রতিক পরিণত ব্যবহার অনেককে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

কিন্তু ওদেশের স্থায়ী বাসিন্দা এবং গভীরভাবে রাজনীতি সচেতন কয়েকজনের কথায় উঠে এল, শেখ হাসিনার যথেষ্ট জনসমর্থন আছে, নির্বাচনে  আওয়ামি লীগ লড়ার সুযোগ পেলে ফল শেখ হাসিনার পক্ষেই যেত। তবে তাঁরাও স্বীকার করে নিচ্ছেন শেখ হাসিনার অনেক ভুল ছিল, যার প্রধান দুটি হল    দুর্নীতি এবং অজস্র মাদ্রাসা তৈরির ছাড়প্ত্র। তাঁর পোষা মৌলবাদ তাঁরই শত্রু হয়ে উঠবে তিনি কল্পনাও করেননি। আসলে মৌলবাদ জিনিসটাই এমন, তার উৎসকেও সে ছাড়ে না।

 

 

তবে যা ভয়ের, তা হচ্ছে যদি কোন মৌলবাদী দল ক্ষমতায় আসে, তবে কার্পেটের তলায় লুকনো রাক্ষস বাইরে বেরিয়ে আসবে। ২০০৭ এই আশংকা অনুভব করেছি, অনেক আত্মীয়ের কথায়। এখন একটা সুবিধে হল,  যা প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় চেপে দেওয়া হয়, তা চাপা থাকে না সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে। একটা এরা অব টেররে অনেকদিন ঢুকে গেছে বাংলাদেশ, যে দেশ গড়তে ভারতীয়দেরও রক্ত ঝরেছে। কবে থেকে ভারত তাদের শ্ত্রু দেশ হয়ে গেল! এটা টের পেয়েছিলাম ২০০৭ এই।

 

মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই কিছু কি ভুল থেকে গেছিল? তার তলে তলে সক্রিয় ছিল এক পাক সমর্থক বুদ্ধিজীবী স্লিপার সেল, যারা নতুন প্রজন্মের অনেককেই সফল ভাবে মগজ ধোলাই করতে পেরেছে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে। সেইরকম এক তরুণ হারুন বলে ‘আমরা তো শুনছি পরের ফুসলানোতে যুদ্ধ। যার ফলাফলে মানে আপনাদের ভুলের ফলে এখন ভুগছি আমরা।

ইমরান, যিনি মুক্তিযুদ্ধে অনেককিছু হারিয়ে এখন পরবাসী,  অবাক হয়ে যান ‘ত্রিশ লক্ষ মানুষের আত্মদান হাজার হাজার বধু-মাতা কন্যার ইজ্জত আব্রুর বিসর্জনে যে স্বাধীনতা প্রাপ্তি তার এমন ভুল ব্যাখ্যা? কাদের কাছে হারুনরা নিচ্ছে ভ্রান্ত বিশ্বাসের আরোপিত মন্ত্র?

হারুন হেসে বলেন ‘স্যার আপনি তো বাইরে থাকেন, ভেতরের ছবি খুব ঘোলাটে’

(মধ্যরাতের সাত মাইল, মুক্তিযুদ্ধের গল্পসমগ্র, রাবেয়া খাতুন)

প্রতি বছর বৈশাখের রঙ্গিন শোভাযাত্রায় বা একুশে ফেব্রুয়ারির আবেগ গদগদ গানে সেই ঘোলাটে ছবিটা ঢাকার চেষ্টা হয়েছে, সমস্যার মূলে যাওয়ার চেষ্টা করেনি কেউ। তাই আজ সোনার বাংলায় সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা, মানবাধিকার কিছুই নেই, আর সংখ্যালঘুর মধ্যে শুধু হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান, বা পাহাড়ি আদিবাসীরা নয়, নারী এবং মুক্তমনা মানুষরাও আছেন।

তবে এত অন্ধকারের মধ্যেও সবাই বেঁধে বেঁধে গান গাইছেন এখনো, দগ্ধ ছায়ানট সাজিয়ে তুলছেন- এটা খানিক স্বস্তি দিচ্ছে।

 

‘সরকারের শীর্ষ স্তর থেকে সন্ধ্যা নাগাদ জানিয়ে দেওয়া হয় হামলা হওয়ার আশংকা রয়েছে। আমরা কয়েকজন সেই রাতেই গিয়ে এখান থেকে জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছি। বেরিয়েছি সোয়া একটা নাগাদ আর কয়েকশ উন্মত্ত হামলাকারী ঢুকেছে তার মিনিট কুড়ি পরেই। ফলে আর্কাইভ ওরা নষ্ট করতে পারেনি, বাঁচাতে পেরেছি. …. আর একটু সময় বেশি থাকলেই ওদের মুখোমুখি পড়তাম। তার পর কী হত, আজ বলা যায় না। তবে ভয় করলে তো চলবে না, প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে তো হবে। কোনও ধর্মের সঙ্গে আমার কোন বিরোধ নেই’

’ (সনজীদা খাতুনের পুত্র পার্থ  তনভির নভেদ)

 

বাংলাদেশ অন্দরমহল, ধ্বংসতোরণ পেরিয়ে আলোর ছায়ানট, অগ্নি রায়, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, আনন্দবাজার পত্রিকা)

এই বৃন্দগান গেয়ে যেতেই হবে, গান থামালেই  যে মৃত্যু!

1 Comment

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *