একটি উদ্যত ভল্লঃ সুধীর দত্ত
একটি উদ্যত ভল্লঃ সুধীর দত্ত
পাঠকের কাছে কবি সুধীর দত্তের পরিচয় দান অনাবশ্যক। তন্নিষ্ঠ কবিতা পাঠকের কাছে সুধীর এক অত্যুজ্জ্বল নাম। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য কবি। তাঁর কবিসত্তা, কাব্যশরীর, কবিতাদর্শন সবই একটি স্বতন্ত্র ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। তাঁর স্থির সত্যের ধারণাও। সব ছাপিয়ে তাঁর কবিতার ক্লাসিক আবহ তাঁকে এক মর্যাদাময় অবস্থান দিয়েছে।
তাঁর প্রকাশিতব্য মহাকাব্যের অংশ কক্ষপথকে প্রকাশ করতে দিয়ে তিনি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন।
পাঁচটি প্রবাহ দুটি ভাগে প্রকাশিত হবে। আজ তিনটি। ৫৮, ৫৯, ও ৬০। পরের সংখ্যায় ৬১, ও ৬২।
একটি উদ্যত ভল্ল ‘ দশ পিটকে বিভক্ত প্রায় দশ সহস্র পাঙক্তির একশত প্রবাহযুক্ত একটি মহাকাব্য। কাব্যটির নায়ক কোনও পৌরাণিক চরিত্র নয়, বাস্তব জগতের মানুষ, যিনি তাঁর কিশোরবেলা থেকে জানতেন, তাঁর জীবনের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য আছে, যে-উদ্দেশ্যের কথা তিনি তাঁর বন্ধুকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, মাত্র সতেরো বছর বয়সে। সেই উদ্দেশ্য হল, to become an embodiment of the past, product of the present & prophet of the future , ঐতিহ্যের প্রতিমূর্তি, সময়ের জাতক এবং ভবিষ্যতের বার্তাবহ। এই চরিত্রকে কেন্দ্র করে মহাকাব্যটিতে গ্রথিত হয়েছে জ্ঞানবিজ্ঞানে প্রোজ্জ্বল যে-বর্য, যাকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে, পুনরুত্থিত হবে স্বমহিমায়।
প্রবাহ : ৬১
পৃথিবীর শেষ গ্রীনভার্জ
–
ভূমিষ্ঠের জন্মকোষে যদিও জেনেছি আয়ু পুঁতে রেখে গেছে মৃত্যুবীজ,
তবু এই প্রেত জানে বর্তমান পৃথিবীতে একমাত্র বলশেভিক বিশাল ভালুক
সাবলটার্ন চাঁদের দিকে বাড়িয়ে ধরেছে তার হাত।
আর সেই গুঁড়ো গুঁড়ো আলো
যখন পড়েছে ঝরে ঔপনিবেশিক ঘোর রাতে
কেঁপে ওঠে সমুদ্রের জল, অচিরেই
ধাক্কা খাবে এবং বিপুল শক্তি ধূমায়িত, টেকটোনিক জোড় ও ফাটলপথে মেঘবাষ্প–ভূ-রাজনীতি
দানা বাঁধবে,উচ্ছ্বসিত জলের কল্লোল
ভেঙে দেবে স্থিতাবস্থা, চর ও অচর।
এসব জানা ছিল অনেক আগে থেকে
যখন চারদিকে ঘাসের জঙ্গল
কাঁপছে দশদিক, উদীয়মান সেই সূর্যদেশ
সরিয়ে নিয়েছিল অস্ত্রসম্ভার। এবং সেনারা
যেখানে নো-ম্যানস ল্যন্ড ও পামীরের
রুক্ষ পাদদেশ, ধূসর অঞ্চল মাঝখানে।
জাপানি, মাওসেনা, ইন্দোচিন ও মালয়, বার্মীজ, ইন্দোনেশীয়রা
যেনবা একটি বোঁটায় ধরে আছে
হরেক পাপড়ির একটি ফুল
পিছনে ককেশাস, যেনবা হিমবান
লুকনো আগুনের আর এক ক্ষেত্র
২
এ এক আশ্চর্য স্থান।
ধুধু সাদা–সুবিস্তীর্ণ চারদিক । উরাল পর্বতমালা দেখা যায় না, পূর্বের প্রশান্ত সাগর —
আরটিক সাগর কতদূর?
উড়ে যায় দেশান্তরী পাখিদের দল
কক্সবাজার, সুতানুটি, সুন্দর ও গরানের বন।
এবং বসন্ত সমাগমে যখন দক্ষিণ হাওয়া, পর্যুদস্ত শীত
সেও কি স্বদেশ ফিরবে পাখিদের মতো?
প্রেতের কি স্বদেশ আছে কোনও ?
সে এখন চুনীকণ্ঠী পাখিদের, সারসদের আসা-যাওয়া দ্যাখে।
দ্যাখে কনিফার গাছ, বৈকাল হ্রদের কন্যা আঙ্গারার চোখ বেয়ে ক্রমাগত একটি অশ্রুনদী —
এখানে কি একদিন ইউনিকর্ন, দাঁতাল বাঘেরা দাপাত?
বাস করত ডেনিসোভান, প্রত্নমানব ?
এখানেই একদিন অন্তরিক্ষ থেকে
দানব তারার মতো একটি জ্বলন্ত উল্কা আচম্বিতে ছুটে এসেছিল ।
কেঁপে উঠেছিল জীব –সুপেয় জলের হ্রদ, বনভূমি, পৃথিবীর গোটা জীবকুল।
হে প্রকৃতি- সৌম্যসৌম্যতরা দেবী
গুলাগে রক্তের দাগ,পুঞ্জপুঞ্জ শ্রম-শিবির,প্রতিহিংসা, আর্কিপেলাগো।
এখানেই লুপ্ত সব ডাইনোসরদের
জেগে ওঠে বীভৎস দাঁত মানুষের হিংস্র মাড়িতে?
কে যে কাকে পরিশুদ্ধ করে ! তবু চিরকাল বিশ্বাস করেছি,
একদিন মানুষেরা নরকের ভিতর, অন্ধকারে
যখন দেখছে না সিঁড়ি
কোনও এক ভার্জিল এসে সামনে দাঁড়াবেন।
এবং নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করেছি,
উপনিবেশ স্থাপন তরে কোনোও বাসনা নেই
বহুরক্তক্ষয়জাত এই মহান দেশের।
এদের দর্শন আছে, স্বপ্ন আছে, মানুষের হিত
যদিও মানুষ ভুলে যায়, যখন ঘুমন্ত পশু তাদের হৃদয়ে জেগে ওঠে,
এবং একটি সিংহ নিঃসপত্ন রাজত্বের লোভে
হত্যা করে অক্লেশে প্রতিদ্বন্দ্বীদের।
এবং এ জান্তবতা ডি.এন.এর মধ্যে সংকলিত,
যতক্ষণ না রূপান্তরিত—তার
চৈতন্যে জেগে ওঠা,
যতক্ষণ না ফিরে পাওয়া যায় স্মৃতি—সমবেত একটি প্রাণের,
যতক্ষণ না সমগ্রের মধ্যে ব্যক্তি বিনাশ ও বিস্তার খুঁজে পায়।
এ উল্লাস উপশম,
এ উল্লাস সমুদ্রের, আপূর্যমানতা।
এই প্রাণ আলো হয় –উন্মীলিত, নির্জ্ঞানের অন্ধকার ছিঁড়ে
নিরন্তর ভয় আর চাপা ক্রোধ আঁধারের গর্ভ থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে ফুটে ওঠে,
যদিও গোপন নখ থাবায় গোটানো থাকে শুধু।
মহাত্মা কি ভয় পাননি? সেই ভয়, বিচলন অন্তরের স্বর হয়,
এবং ছলনা করে, শব্দের আড়াল খুঁজে নেয় ।
আর ধূর্ত স্তাবকের দল?
জানি, লম্বা কার হাত, কত !
জানি, কার তরবারি কতটা ধারালো !
ক্লিমেন্ট অ্যাটলিকে কারা কপালের ভাঁজ খুলে মধ্যরাতে লিখেছিল চিঠি?
ফিসারকে কী জানানো হয়েছিল?
কী বলেন আপনি খুরশিদ !
এই হৃদয় স্পাই-ওয়্যার।
এই হৃদয় একটি আর্কাইভ ।
বহুবার যার মৃত্যু শত্রুরা ঘোষণা করেছে, তার আয়ু বেড়ে যায়, এ-সত্য কি প্রমাণিত হয়নি বারবার?
শোনা যায় অশরীরী সেই প্রেত মাঞ্চুরিয়া থেকে তার সংলগ্ন দেশে
হাওয়ার ভিতর উড়ে, কেউ আবার সায়গন সমুদ্র থেকে
ডুবসাঁতরে যেতে দেখেছিল তাকে কোনও এক অনির্দেশ্য পথে।
লোকটাকে হাঙরও নাকি, শোনা যায়, গিলতে ভয় পায় !
হয়ত-বা কেউকেউ জানত গতিবিধি, হাওয়া কোনদিক থেকে এসে
ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়, সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে।
ওমস্ক শহরে নাকি তার একটি দূতাবাস ছিল?
হয়ত-বা ছিল, কিংবা আদৌ ছিল কি?
লোকে বলে, যেখানে সড়ক নেই, রেলপথও, শুধু আকাশ-যান,
সেখানেই সুরক্ষিত গোপন তাঁবুতে তাকে রাখা হয়েছিল।
গান্ধীজি কি উত্তুরে হাওয়ায় তার গন্ধ পেয়েছিলেন ?
এবং সতর্ক বার্তা যথাস্থানে—-
এখন কি মাস যেন? জল ছুঁড়লে মাঝপথে বরফের গুঁড়ো
মুক্তোর মতো ঝরে পড়ে।
পাখিদের সাড়াশব্দ নেই।
ওরা কি বেড়াতে চলে গেছে?
হাস্কিদেরও দেখছি না আশপাশ।
মাথার পিছনে জনশ্রুতি, প্রেতদের তৃতীয় একটি
চোখ
ঘুমের ভিতর জেগে থাকে !
জীবিতের যে-দৃষ্টি নেই, সেই চোখ অশরীরী মৃতদের থাকে?
এখানে বরফ-বৃষ্টি হয়।
শুনেছি ঋষিরা নাকি বহু দূর দেখতে পেতেন, যখন অবাধ হ’ত গলে গেলে মধ্যিখানে কাঁটাতার–বেড়া !
বস্তুত, সামান্য মানুষ এই ভূত। জানে ও জানে না, শেষতক
চিত্রল কি পরিত্যক্ত হল? নাকি অন্যভাবে একটি দাগ রেখে গিয়েছিল?
ঘুমোতে পারেন না রাতে সীমান্ত গান্ধীর মতো ইপির ফকির ।
ভিতরে ভিতরে ফুঁসছে পাখতুনরা, বালুচ-পাঠান।
এসব কি ঘটবার কথা ছিল আদৌ?
নির্বিশেষ সহস্র সহস্র বলি ; রক্ত মাড়িয়ে রাজা ষষ্ঠ জর্জের
সামনে হাঁটু মুড়ে কারা কারা রাজদণ্ড ভিক্ষা করেছিল ?
কোন স্বার্থ ? এই মৃত ভূত
চতুর্থ আয়াম থেকে অনায়াসে পড়তে পারত গোপন এজেন্ডাগুলি—হস্তান্তর নথি ও দলিল।
হা ঈশ্বর , কে লিখছিল প্রেমপত্র, বুকে বইছিল কার দখিনা বাতাস
যখন ডিনামাইট দেগে হত্যা করা হল স্তম্ভ, বুলেটবিদ্ধ এক এক শহিদ ?
কেন যে দু-ফাঁক হয়নি জাহান্নাম, গিলে খায়নি সিঙ্গাপুর সমুদ্রসৈকত ?
হে রোষ হে ফুঁসে ওঠো, বহ্নি হও,ভূ-স্বর্গের মাথার উপর
চাঁদ উঠুক, জান্নাতের সকল জানালা খুলে যাক।
কাউকে না কাউকে একদিন
শোধ করতে ঋণ, দিয়ে যেতে হবে তার খুন।
এখনও জানে না কেউ, কারা ওই উত্তর পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে গিলগিটের পথে
ঢুকে পড়া আফ্রিদি, মোমান ও বহু দুর্ধর্ষ উপজাতি ?
কী বলেন জেনারেল লকহার্ট !
তিনি কি জানতেন চন্দ্র বোস
উপজাতিদের জন্য ভগৎরামকে কী কী বার্তা দিয়ে গেছিলেন?
এবং সেই থেকে যে অখণ্ড প্রবাহ ভিতরে
তা কি আজ রূপান্তরিত আগুন?
সহসা পুড়িয়ে দিল মজফরাবাদ?
তৃতীয় বিকল্প শক্তি ? ফকিরের খাস সেপাই, হুর-
সেনা, সম্মিলিত গুপ্তচর,
ফিনিক্স পাখির মতো অগ্নিখাদকেরা ?
রীতিমতো প্রশিক্ষিত, ভারী অস্ত্র-নিপুণ, ওরা কি
মুছে ফেলতে চেয়েছিল দ্বি-জাতির কৃত্রিম সীমানা ?
অখণ্ড-ভারত স্বপ্ন দুর্ধর্ষ উপজাতিদের দেশে ও বাহির থেকে দেখিয়ে এসেছে,
যে কার্যত মৃত, চিরকাল।
ভারতবিজয় শেষে আক্রমণ করত পাক-দেশ, যেরকম ভেবেছিলেন নেহেরু ও মিত্র ভাইসরয়?
বাধা দিতে পারেননি ভয়ে পাবিত্র দেশের লিয়াকত, কেন না তোচি ও গোমল নদী
ক্ষেপে উঠলে জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে দেয়, ভাসায় দু-কূল।
খণ্ডিত সূর্যোদয় তোমাদের এই প্রেত মানতে পারে নি ;
যদিও সে মারা গিয়েছিল, তার পাঁজরের নীচে
যা জ্বলেনি গ্যাসোলিনে, এখনও দগদগে এক ঘা, যখন সে দেখছিল, মৃতপ্রায় একটি মাকড়সা তার নৈসর্গিক লালাগ্রন্থি, ক্রমশ গুটিয়ে আনছে
ঠান্ডা যুদ্ধের প্রাক্কালে।
সঙ্গে তার পারমাণবিক দেশ এবং সে কেঁদেছিল :
এ দেশ তো দেশ নয়, এই বর্ষ বোধিগাছ, পৃথিবীর শেষ গ্রীনভার্জ !
প্রবাহ :৬২
রেড ফোর্ট ট্রায়াল
১.
অতএব এই পথে যাওয়া-আসা, এই পথ উঁচু-নিচু, আকাশ ও মাটির মাঝখানে ;
ওরাই তো ভাই-বন্ধু অত্যাগসহন, কাঁধে-কাঁধ ;
মরা ডালে পাখির মিছিল।
এই দ্যাখো ঝিকরগাছা , হাতেপায়ে শিকলবাঁধা লাশভর্তি ট্রাক,
এই দ্যাখো নীলগঞ্জ-বারাসাত, রাতের আঁধার,
এই দ্যাখো নদীজলে ক-হাজার মৃত বন্দী, নামহীন
শব,
এবং আড়ালে মৃত্যু, হত্যা নয়, এনকাউন্টার।
এখানে সরল রেখা নেই।
ভেঙে ভেঙে টুকরো টুকরো, তবু ওরা ঋজুরৈখিক।
চূড়ার দিকেই ক্রমাগত
ধাপে ধাপে ঘুরে ঘুরে উঠে যাচ্ছে সিঁড়ি, যেরকম বহু পূর্বে এই মৃত ভূত
তারাদের সংযোগ দেখেছিল।
আত্মহত্যা কে আর করতে চায়, বিশেষত যখন
উত্তাল
জনপদ , রেড ফোর্ট, গুমরে গুমরে গন্ধক ও ধোঁয়া।
সত্যাগ্রহ, বিয়াল্লিশ, বহু ব্যবহার-জীর্ণ, ক্লিশে এক মৃত শব্দব্যূহ।
শুধু ওই একটা লোক,
শুধু ওই একটা লোক, আধমরা সাপ,
অটুট বিষাক্ত দাঁত, অমসৃণ চলা,
সারা রাত স্বপ্ন হয়ে কারো কারো ঘুমে মিশে গেছে।
তাকে ঘিরে উত্তেজনা, বাঁধভাঙা ক্ষোভের আগুন পুড়িয়ে খেয়েছে জরা, স্থবিরতা, দীর্ঘ শীতঘুম।
যেনবা বসন্ত তার প্রতিশ্রুতি রেখে যাচ্ছে শাখায় শাখায়,
যেন তার পুনরাগমন, ভোর সূচনা করছে এই গাঢ়তম ঘন অন্ধকার।
কার বিচার? ওরা বীর, জাতীয় বীরের দল, স্তব্ধ গোটা দেশ।
জাতির আকাঙ্খা এরা ধারণ করেছে।
কোনোও উপমা নয়, পঙক্তি নয়, মহাপ্রাণ ভিতর-আকাশ
ফুঁসে উঠছে কাঁধে কাঁধ যুগপৎ তিনটি সম্প্রদায়।
কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ? খুলিতলা পাহাড়-চূড়ায় ?
বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছে অধোমুখ ভারতীয় সেনা—কী সদর্পে অকুতোভয় হেঁটে যাচ্ছে ওরা !
ধাক্কাধাক্কি ? কী সাহস !
রুখে দাঁড়ালেন বীর শাহনওয়াজ, সবক শেখাতে হবে,
‘ হাউ ডেয়ার ‘ এগিয়ে আসছেন ধীলন।
—হেল্প, হেল্প ! রক্ত ঝরছে, ভাঙা নাক, চোখে অন্ধকার।
কে কাকে সাহায্য করবে , ভিতরে আগুন চড়ছে পারদের মতো।
এই বুঝি বাজ পড়বে, আলোর চিড়িক, বজ্রসুঁই !
২.
আলোড়িত গাছপালা, নদীজল, পাখিদের ঠোঁট !
স্যসপ্যানের মধ্যে যেন ব্যারাকগুলি, গোটা ক্যান্টনমেন্ট।
হেরেও লোকটা জিতে গেল ?
তোমাদের এই প্রেত যেরকম ভেবেছিল, ঠিক সেরকমই —
দৈত্যের বাগানে শীত ক্রমশই আরও জড়োসড়ো।
অকিনলেক, ওয়াভেলদের রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে দ্রুত।
হয়ত-বা বেরিয়ে যাবে গোটা মহাদেশ ।
ম্যাক আর্থার হেঁটেছেন ঘুমের ভিতর।
চারদিকে সম্মোহক অদৃশ্য একটা তরবারি ঘুরছে ফিরছে,
যেন কারও সমাধিফলক
ফিসফিসিয়ে কথা বলছে,মৃত আত্মা শ্বাস ফেলছে ঘাড়ের ওপর।
ভুলাভাই কী ভাবছেন ? তাঁর আজ শোচনা হয়,মায়ার অঞ্জন
এতকাল ঢেকে রেখেছিল তাঁর চোখ।
ওরাই তো একদিন তেনজিং-এর মতো মণিপুর-মৈরাং-এর বুকে
পুতেছিল ভারত-আত্মার ধ্বজা। আর এদিকে গোয়েবলসের মতো হিস মাস্টার’স ভয়েস
নিরন্তর বেজে গেছে, রুদ্ধ করে সব অবিশ্বাস ।
আজ কত তারিখ? শুরু হবে আর একটু পরেই
ট্রায়াল?
মৃতরাও বাঁচতে শিখেছে।
এই প্রথম মনে হল আমরা বেঁচে আছি।
৩.
দশ দিকে আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস।
কলকাতা-এলাহাবাদ-বম্বে থেকে দ্রুত আগুন করাচি ও রাওয়ালপিন্ডিতে
ছড়িয়ে পড়েছে, খাক আর্মাড় কার,
আহত ও মৃত শতশত।
বড়োই দুর্বোধ্য ঠেকছে অনুগত-চোখ। শুধু শরীরের ভাষা
অস্থির, যেন কিছু গুমরাচ্ছে ভিতরে। আশপাশ ঢুকে যেতে পারে জ্বালামুখে।
সতর্কতর গোপন নির্দেশ : মুক্তি দিতে হবে তিনজনের। কী জানি কী রসায়নে লোকটা এ মহাঅস্ত্র, বানাল ত্রিশূল ?
এই শীতে কারও গায়ে দেখছো না চাদর নেই, খালি গা-লোকগুলো
আগুন পোহাচ্ছে রাতে ভিতরের তাতে।
হায়, এই একটা লোক, স্বীকার করতেই হবে, এই
একটা লোক
আমাদের সাড়ে সর্বনাশ করে গেছে । বিভেদ ও শাসন তছনছ,
সর্বত্র পালিত হচ্ছে “রসিদ আলি একতা দিবস”,
যেন তাদের হৃদয় একটি , সাকিন ও মোকাম এক— সমানি ভবন।
এদিকে আবার শুরু বাড়ব-আগুন, যা ক্রমশ অন্তরিক্ষে,স্থলে
হাওয়ায় হাওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ।খোঁড়া ইউনিয়ন জ্যাক
শুয়ে আছে চিৎপাত জাহাজের ডেকে।
থিকথিক অলিগলি, রাজপথ, ছটপটে অজস্র তরুণ
ভেঙে ফেলছে ব্যারিকেড,
ছুটে যাচ্ছে তাক-করা কামানের মুখে।
এ দৃশ্য অভূতপূর্ব —
নষ্টের গোড়া এই একটা মানুষ। অদৃশ্য, তবুও যেন উপস্থিত
অন্তর্যামীর মতো প্রতিটি হৃদয়ে।
এখন দেখার শুধু মাথার ভিতর কতখানি
কাজ করে খুড়োর কল, বার্ধক্য-পীড়িত মতিগতি।
1 Comment
চমৎকার লাগছে।