মুজাহিদ আহমদ
কবিতা/ কবিতাগুচ্ছ
মুজাহিদ আহমদ
# ১
যার আরেক নাম বুলন্দ্ দরওয়াজা
বুলন্দ্ দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে আমার বিনয় আরও অহংকারি হয়ে উঠল—দীর্ঘ সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে যেই দরওয়াজায় হাত রেখেছি—মনে হলো বজ্র শক্তি নিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে কবি অমিতাভ গুপ্ত—আমি সাহসী হয়ে উঠলাম। পাঠ করি তাঁর দীর্ঘ পৃষ্ঠার প্রার্থনা—শিলালিপির মতো কালের সাক্ষী হয়ে জ্বলজ্বল করছে।
আমার শিল্পকলার কথা; শিল্পরুচির দুর্ভিক্ষের কথা লিখলাম—ক্রমশঃ বোবা হয়ে যাওয়ার কথা, বই থেকে সাদা পায়রা উড়ে যাওয়ার কথা লিখলাম—আমিও যে ধীরে ধীরে বধির হয়ে যাচ্ছি—সে আফসোস লিখে রাখলাম।
কিছু পোস্টার, কিছু দেওয়াল লিখনের ছবি সেঁটে দিলাম বুলন্দ্ দরওয়াজায়—একটি সাম্রাজ্য পতন আরেক সাম্রাজ্যের উত্থানের সাক্ষী—চোখ দুটো বেঁধে রেখেছি উঁচু চৌকাঠে—ক্যালিগ্রাফি লুট হওয়ার আখ্যান লিখে রাখলাম।
আরও লিখে রাখলাম—কবিতাই—মানুষের ভিতরে প্রবেশের অন্যতম এক উঁচু প্রবেশদ্বার। যার আরেক নাম বুলন্দ্ দরওয়াজা।
#২
গান
সাগরের নুনতা জলে ভিজিয়ে রেখেছি মায়া—
তোমার নামে বাঁধা গানগুলো উড়ায়ে দিয়েছি
গুলিয়াখালির খোলা হাওয়ায়
যদি কেউ কোনোদিন সুর তুলে
তুলুক; নুন-বালু-জলে।
গগনে ভেসে গেছে চুলের ঘ্রাণ
সাগরের বুক যদি আগলে রাখে—রাখুক
দিকভোলা কোনো কবিতা
যদি ঘ্রাণের সূতো ফিরে এই উপকূলে
তাকে জানিয়ে দিও—
ঢেউয়ের মতো কবিও—ফেরত গেছে চলে
অথৈ সাগর জলে।
#৩
হাওয়াই চিঠি
আবার দেখা হবে মালতির সাথে—তার সাথে
কথা হবে পরিত্যক্ত হৃদয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
মরা ঘাসে জল ঢেলে শুশ্রূষার বিস্তারিত
নতুন করে পঠিত হবে— জেগে উঠবে ঢেউ আবার নতুন করে।
আমার একার কোনো বুঝাপড়া নেই।
তার হাওয়া হয়ে যাওয়া দিনের সকালটা
লিখে চলছি যুগ যুগ ধরে। নরম ইচ্ছেগুলো পড়ছি
হাসির সাথে ডুবে যাওয়া চোখ দুটো পুনরায় ভেসে উঠবে।
সুপ্ত আগ্রহ জ্বালাই সুগন্ধি বাতির মতো।
জলশ্রী হয়ে ভেসে বেড়িয়েছে- যেনো সহস্র
নটিক্যাল মাইল জলপথ
প্রাচীন বোতলের ভেতর ছেড়ে দিলাম তার সর্বশেষ হাওয়াই চিঠি।
জলশ্রীর মতো ভাসো, ভাসতে থাকো পৃথিবীতে জল আছে যতদিন।
একবার সখি বলে ডাকো
আমিও সেদ্ধজলের নীচে বসে রঙ ছড়াই—তোমার কাঁচের পাত্রে। সমস্ত শরীর থেকে ঠেলে বের করে দিই তোমার চাঙা হওয়ার রসদ। আমাকে নিয়ে কিছুই ভাবো না। অথচ, ঠোঁট রাখো আয়েশে আমোদে। আমিও আহ্লাদী হয়ে উঠি
আমাকে ভালোবাসো—আমিও বাসি। অথচ—হাতের ওপর পড়েনি হাত কোনোদিন। কতো নির্জনে একান্তে হেঁটে যাই আমরা ইথুপিয়াসের বনের দিকে।
আমি বেড়ে উঠি—হাড় মাজানো রসার স্রোত বেয়ে। আমার চোখে ভাসে কতো হাড় জিরজিরে চোখের স্বপ্ন।
একবার যদি সখি বলে ডাকো—পোড়া জনমে জন্মাবে সবুজ পাতা। ঝুরঝুরে প্রেমের দানা।
#৪
জলবেষ্টিত দ্বীপফুল
মাটিতে রাখলাম পা—এই মাটি জল ফেটে জেগে ওঠা কোনো এক নদীর বুক—উপেক্ষা করতে পারিনি শৈত্য প্রবাহের দিনে তার আহ্বান— দাঁড়িয়েছিলো হাতে নিয়ে পুরো জলবেষ্টিত দ্বীপফুল।
শুধুই আমি নাকি একজোড়া চোখও ছিলো সাথে আমার, যে চোখ খুলে পড়েছিলো গত রাতে মদিরার গ্লাসে। অঘুমা চোখ ছিলো গাঙচিলের ডানায় ঝুলানো। দৃষ্টিতে ছিলো নদীর নরম নেশা।