মুক্তগদ্য: অদিতি রায়
মুক্ত গদ্য #২ঃ অদিতি রায়
বাড়ি বারুইপুর। লেখালিখির চর্চা পাঁচ বছর বয়স থেকে। পড়াশোনা বাংলা সাহিত্য নিয়ে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে গবেষণার কাজে যুক্ত।
কবিতার কবি
.
কবিতা কেমন হওয়া উচিত এ নিয়ে আর যাকেই লিখতে বলো না কেন, কবিকে অন্তত লিখতে বলা উচিত নয়। কবি লেখে আনন্দে। আত্মার আনন্দে। লিখেই তার সুখ। যশ পেলে তা স্বর্গলাভ। অর্থলাভ উপরি পাওনা৷ কিন্তু কবি লেখে মূলত তার নিজের জন্য।
এখন যদি কাব্যের আত্মা কী?- এ কথা তবুও কেউ জোরজার করে জিজ্ঞেস করে, তাহলে শরণাপন্ন হই ভারতীয় অলংকারশাস্ত্রের। এখানে ‘অলংকার’ মানে কিন্তু সৌন্দর্য। ফলে সেই সৌন্দর্যশাস্ত্রের দারস্থ হলে দেখি- কেউ বলেছেন, রস থাকলেই সুন্দর। কেউ বলছেন অলঙ্কারই (এখানে ‘অলঙ্কার’ মানে ভূষণ। অর্থাৎ অনুপ্রাস, বক্রোক্তি, রূপক ইত্যাদি) আসল। কারা বলেছেন রীতি বা গুণ ঠুসে দাও খানিকটা, তো কে এনেছেন বক্রোক্তি আবার কেউ বা ধ্বনি! অর্থাৎ কাব্যশরীর কীসে সুন্দর হয় এর উত্তরে কাব্যের নারীদেহ সাজাতে কেউ যেমন চন্দনের কথা আনলেন, কেউ ফুলের সাজ, কেউ রজত তো কেউ নিরাভরণ লাবণ্যকে গুরুত্ব দিলেন। তবে একজনকেই এই বিষয়ে আমি সমর্থন করতে চাই- তিনি আচার্য ভরতও নন, আচার্য দন্ডী বা আচার্য বামন, ধ্বনিকারিকাকার, আচার্য কুন্তক, আচার্য ভামহ, উদ্ভট, রুদ্রট কেউই নন – তিনি হলেন আচার্য ক্ষেমেন্দ্র৷ ঔচিত্যবাদের প্রবক্তা তিনি। তিনি বলেন, যেখানে যা দেওয়া উচিত, পরিমাণ মতো তাই দিয়ে রান্না করো। আমিও তাই বলি। তবে রান্না করার আগে কেবল শিখে নাও- কোনটি জিরে, কোনটি পাঁচফোড়ন, কোনটি হলুদ, কোনটি নুন, বিটনুন আর কোনটি মেথি-মৌরি।
জনান্তিকে বলে রাখি, উদাহরণটা সার্থকই হলো দেওয়া সম্ভবত। কারণ এই কোনো মশলাই আমি চিনি না বলে এখনো অবধি রান্নাটা আমি একেবারেই করতে পারি না। কবিতাও তাই। সচেতনে হোক, অবচেতনে হোক, প্রথাগত ভাবে হোক, অবহেলায় হোক – মাল মশলাগুলো চিনে নিয়ে, তার যথাযথ প্রয়োগ বড় প্রয়োজন।
আর এখন কবিতা কেমন? এর উত্তরে আমি বলব, কবিতা কবিতার মতোন। এটা হচ্ছে, ওটা হচ্ছে না, সেটা দরকার, অন্যটা করছে- এগুলো খুব আলটপকা মন্তব্য। আজ কবিতা কেমন লেখা হচ্ছে, কারা কীভাবে লিখছে- এসব বিচার করবে আগামী। আমি কি পুরুলিয়ার প্রান্তরে বসে যে কবিতা লেখা হচ্ছে, তার সব হাতে পাচ্ছি? জলঢাকার কাছে বসে কোন ফেসবুকবিহীন বয়স্ক মানুষ ডায়েরিতে কী কবিতা লিখছেন, আমি জানতে পারছি? তাই আমার বিশ্বাস আমি যে ধরনের কবিতা পড়তে চাইছি বা যে ধরনের কবিতা এখন লেখা হচ্ছে না অথচ হওয়া উচিত বলে আমি ভাবছি- তাও আসলে লেখা হচ্ছে, কোথাও না কোথাও, কোনো না কোনো ভাবে। আর কেউ না লিখলেও ভারি বয়ে গেল। পৃথিবী রসাতলে যাক। তখন আমি প্রেমিকের স্বপ্নে মশগুল হয়ে, একটি প্রেমের কবিতা লিখতেই পারি! তবে হ্যাঁ, ইচ্ছাকৃত চোখে ঠুলি পড়ে থাকলে তা আলাদা ব্যাপার।
কবিতা তো ক্লার্কশিপ পরীক্ষা নয় যে নম্বর দিয়ে ঝিন্টি তাকে মাপবে। কবিতা খুব স্বেচ্ছাচারী। কবিতা নিজেই ডাডাইজম স্বয়ং! কবিতায় যে যা ইচ্ছে তাই করুক! কবিতা কবির এবং পাঠক উভয়ের যুগপৎ একচ্ছত্র সাম্রাজ্য!
কবিই আসলে ঘোড়া আর কবিতা তো ঘোড়সওয়ার! কবি কী লিখবেন! কবিতা নিজেই একজন কবিকে লেখেন!
পাঠক ভাবছেন, আজেবাজে বকে মাথাই গুলিয়ে দিল। দোষ তো সম্পাদক মহাশয়দেরই বটে! কবিতা বিষয়ে গদ্য লিখতে বললে, একজন কবি এর থেকে বেশিকিছু লিখতে জানে না বাপু!
1 Comment
কোব্তে্ বড় আপন…কবিতা শাড়ী পড়া নারীর মতন…কখন বাদী হয় কখন বিবাদী…বোঝা বড় দায়…তাও সেটা যখন-তখন…