নাহিদা আশরাফী-র গল্প
নাহিদা আশরাফী-র গল্প
কবি, কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক।
জন্ম ১৯৭৩, পটুয়াখালী, বাংলাদেশ।প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: মায়াবৃক্ষ [২০১৬), জাদুর ট্রাঙ্ক ও বিবর্ণ বিষাদেরা [২০২১], ঝুলবারান্দা তিনটি মাছ আর একটি বিন্দুবর্তী জলাশয় [২০২২]; কাব্যগ্রন্থ: শুক্লা দ্বাদশী [২০১৪], দীপাঞ্জলি [২০১৫], এপিটাফ [২০১৫], প্রেম নিয়ে পাখিরা যা ভাবে [২০১৮ ও ২০২৩ ), [Bilingual Book of Poetry,২০২০] ফিরতে চাই বৃক্ষজন্মের কাছে [২০২৩]। সম্পাদিত গ্রন্থ: মুক্তির গল্পে ওরা এগারোজন [মুক্তিযুদ্ধের গল্পসংকলন: ২০১৭], বিজয় পুরাণ [বিজয়ের গল্পসংকলন: ২০২০], রুদ্ধ দিনের গল্প [অতিমারীর গল্পসংকলন: ২০২১]। গবেষণাগ্রন্থ: বাংলার বেগম [২০২১]।
সাতাশ টাকা আট আনা
‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে’
বুড়ি টাকাগুলো তিন বার গুনলো । সাতাশ টাকা আট আনাই তো । না। কোন ভুল নেই । একদম ক্লিয়ার হিসাব। সাতাশ টাকা আট আনা । তাহলে সবাই ভুল গুনছে কেন? কেউ বলছে পঁচিশ টাকা, কেউ বলছে বিশ টাকা । বুড়ি এবার রেগে গেল । খুব রেগে গেল। হাতে লাঠিটা তুলে নিতেই ছেলেগুলো হা হা করে হাসতে হাসতে দৌড়ে পালিয়ে গেলো ।
এই খেলাটা পাড়ার উঠতি পোলাপানদের একটা বিনোদন । জনা তিনেক এক হলেই এই কাজ করবে । প্রথমে কাঁচুমাচু মুখ করে বুড়ির কাছে যাবে । তারপর বলবে ,’ ও বুড়ি, তোমার টাকা আছে না হারিয়ে গেছে?’ বুড়ির কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা যাবে । তারপর উদ্বিগ্ন হয়ে তেল চিটচিটে ছেড়াফাড়া কাঁথার নিচ থেকে কিংবা আঁচলের গিট্ থেকে কয়েকটা টাকা বের করে খুব নিবিষ্ট মনে গুনতে শুরু করবে । এই দৃশ্যটা থেকেই ছেলে ছোকরাদের কৌতুক শুরু হয় । কখনো দুই টাকা, পাঁচ টাকার ময়লা নোট, কখনও দশ টাকার আধা ছেঁড়া নোট । তা যে কয়টা টাকাই হোক না কেন বুড়ির হিসাবে তা সাতাশ টাকা আট আনা । এর বেশিও না কমও না । ব্যাস । এবার ছেলে ছোকরাদের আসল খেলা শুরু । তারা বুড়ির হাত থেকে টাকাগুলো নিয়ে গুনবার মিথ্যে ভান করে বুড়িকে বোঝাবে এখানে সাতাশ টাকা আট আনা নেই । কখনো বলবে কম আছে কখনো বলবে বেশি আছে । এতেই বুড়ি তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে । অবশ্য শুরুতেই যে ক্ষেপে যায় এমনটা নয় । প্রথম দিকে সেও ছেলেছোকরাদের বোঝাতে চেষ্টা করে ওদের হিসাবে ভুল হচ্ছে । ওরা তখন ইচ্ছে করেই না বোঝার ভান করে । একবার দুবার তিনবার । এরপরই ক্ষেপে যায় বুড়ি । আর একবার ক্ষেপে গেলে হাতের কাছে যা পায় তাই ছুড়ে মারতে শুরু করে । মাঝে মধ্যে হাতের লাঠিটা নিয়ে তেড়েও আসে। পাড়ার ছেলেপুলেরা তার এই তেড়ে আসাটা খুব উপভোগ করে ।
‘একদিন এ জীবন সত্য ছিলো শিশিরের মতো স্বচ্ছতায়’
কার্তিকের শেষ পূর্ণিমার রাতে বউয়ের ব্যথা উঠলে বশির মিয়া কী করবে ভেবে পায় না । দৌড়ে পাশের বাড়ির বড় মিয়ার বউকে ডেকে আনে । বড় মিয়ার বউ অবস্থা দেখে দেরি করার সাহস পায় না । বশির মিয়াকে দ্রুত পাঠায় দাই আনতে । দাই নিয়ে ফেরার ফুরসত দেয় না নবজাতক । দুনিয়ায় আসার তার অনেক তাড়া । দাই কোনমতে নাড়ি কেটে কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে এক টুকরা চাঁদ এনে দেয় বশির মিয়ার হাতে । বড় মিয়ার বউ বলে , ‘ ওরে বশির তুই আজান দে । চান্দের টুকরা আকাশ থাইকা তোর উডানে আইয়া পড়ছে । কী যে সোন্দর পোলা অইছে তোর ! মাশাআল্লাহ !’ বাইশ বছর বয়সে বাবা হওয়া বশির মিয়া একটা জীবন্ত পুতলার পুটলি হাতে নিয়ে হতবিহ্বল দাঁড়িয়ে থাকে । সে বুঝে উঠতে পারে না এই মধ্য রাতে তার কী করা উচিৎ । চিৎকার করে পাড়া জাগানো উচিত নাকি আজান দেয়া উচিত নাকি সন্তানের মায়ের কাছে গিয়ে বসা উচিত । সব কিছু বাদ দিয়ে সে সন্তানের সাথে কথা বলতে থাকে । পাড়া পড়শি তার কাণ্ড দেখে মুখ টিপে হাসে । মুন্সি বাড়ির ঠোঁটকাটা মেজো বউ তো বলেই বসলো, ‘ ও দেওরা! নতুন বাপ হওনের খবর কী আগে পোলারে জানাইতেছো?’ আরেক দফা হাসির রোল উঠলো । পরবর্তী সাতদিন বশির মিয়া কী যে এক ঘোরের মধ্যে ছিলো তা সে নিজেই জানে না । সদ্যোজাত পুত্রকে নিয়ে তার আবেগ কমে না । আর কেনই বা কমবে? ময়মুনার সাথে বিয়ের চার বছর হতে চলছিলো প্রায় । নিজেই খানিক চিন্তায় পড়ে যাচ্ছিলো । ময়মুনার কাছ থেকে একটা সুসংবাদের আশায় । ময়মুনার কপাল ভালো । সংসারে শ্বশুর, শাশুড়ি,দেবর, ননদ কিছুই নাই । তিন দিনের কলেরায় এক ঘোর বর্ষায় বশির মাত্র আট বছর বয়সে হারিয়েছে তার মা বাবা আর একমাত্র বোনকে । অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় সে ।শোক কেমন করে করতে হয় তা বুঝবার মতো ক্ষমতাও তার সেই বয়সে হয়ে ওঠেনি । সেই থেকে পাশের বাড়ির বড় মিয়ার বউয়ের কাছেই মানুষ সে । তার দয়াতেই দুবেলা দু মুঠো জুটেছে । লাজুক স্বভাবের বশির মিয়া খিদে পেলে ধানের গোলা থেকে ধান খুটে খেয়েছে তবু বড় মিয়ার বউকে বলেনি খিদের কথা । ধান খুটতে খুটতে বশির মিয়ার সামনের দুটো দাঁত অনেকটা ক্ষয়ে গেছে । এসব অবশ্য কখনোই কাউকে বলেনি সে কিন্তু মায়মুনাকে না বলে পারেনি । নতুন বউ ভালোবেসে জিজ্ঞেস করলে কোন পুরুষের সাধ্য তাঁকে সত্যিটা না বলে থাকবে? সেই থেকেই ময়মুনার অদ্ভুত এক মায়া কাজ করতো বশির মিয়ার জন্যে।
এগারো বছর বয়স থেকেই কাজে লেগে পড়েছিলো বশির মিয়া । পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা তাঁকে ওই বয়সেই বুঝিয়ে দিয়েছিলো খেতে হলে, বাঁচতে হলে তাঁকে যুদ্ধ করতে হবে । তার গ্রাম থেকে সৈয়দপুর রেল স্টেশন দুই ক্রোশ দূরে । হেঁটেই রোজ চলে যেত স্টেশনে । প্রথম দিকে কাজ পেতো না । একজন পরামর্শ দিয়েছিলো ভিক্ষা করতে । কিন্তু হাত পেতে কারো কাছে কিছু চাইবার গ্লানিটুকু সে ওই বয়সেই টের পেয়েছিলো । বেশ কিছুদিন পরে অবশ্য স্টেশান মাস্টারের দয়ায় কাজ জুটিয়ে নিয়েছিলো । কী না করেছে সে। এই রেল স্টেশনটা তার জীবনের এক আশীর্বাদ । তার উপার্জনের উৎস । পারলে সারাদিনই সে পড়ে থাকে এখানে । ইচ্ছে হলে রাতেও থেকে যেত । বাড়ি ফেরার তাড়া নেই, কেউ অপেক্ষা করে নেই । শুধু দু একদিন না ফিরলে বড় মিয়ার বৌএর বকুনি শুনতে হত । এই বকুনিটুকুর জন্যেই মূলত তার বাড়ি ফেরার একটা ক্ষুদ্র ইচ্ছে কাজ করতো । এই দৃশ্যপট পাল্টে গেল ময়মুনা তার ঘরে আসার পর । বড় মিয়ার বউ ই মোটামুটি ধরে বেঁধে তাঁকে বিয়ের পিড়িতে বসিয়ে দিয়েছিলো । ময়মুনা মামার বাড়িতে মানুষ, তারও বাবা মা নেই । বড় অসহায় । এই কথাটি শোনামাত্রই বশির মিয়া ময়মুনাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলো । তাদের সংসার বেশ সুখেরই ছিলো বলা যায় । একটাই চাপা বেদনা ছিলো কার্তিক আসার আগ অব্দি । সেটাও আর রইলো না । কার্তিক সত্যিই তাদের ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো হয়ে এলো ।
‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে ‘
আজ পাড়া বেশ সরগরম । নাবিল আর নাফিজের চাচা এসেছেন বিদেশ থেকে প্রায় পয়ত্রিশ বছর পরে । সবার আনন্দ আর উত্তেজনা স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটা বেশি । দুই ভাইয়ের আনন্দ সবচেয়ে বেশি । এই পাড়ায় ওদের বাবা চাচারা বড় হয়েছে । এখন ওরা বড় হচ্ছে । পুরান ঢাকার এই পাড়াটায় আধুনিকতার পরিপূর্ণ ছোয়া থাকলেও সম্পর্কের গাঁথুনিটা এখনও সবার আগের দিনগুলোর মতোই । মুক্তিযুদ্ধের বছর পনেরো পরেই দেশ ছেড়েছিলেন জাহিদ হায়দার । এক অজানা অভিমানে এই পয়ত্রিশ বছরে একবারও দেশে ফেরেননি তিনি । বিদেশেই বিয়ে সাদি করে থিতু হয়েছেন । বহুবার রফিক হায়দার মানে নাবিল নাফিজের বাবা বড় ভাইকে দেশে ফেরার অনুরোধ করেছেন । কিন্তু কোন অনুরোধেই তাঁকে টলানো যায়নি । ভাইয়ের ছেলেদের দেখেছেন ভিডিও কলেই । এই প্রথম তিনি ওদের সমনাসমনি দেখলেন। নাবিলের খুব ইচ্ছে সেই অজানা কারণটা জানার । কেন বড় চাচা তাদের সবাইকে ছেড়ে, বন্ধু স্বজন ছেড়ে দূর বিদেশে চলে গেলেন আর ফিরেই এলেন না । তার সাংবাদিক চাচার প্রতি মানুষের ভালোবাসা দেখে ওরা রীতিমতো বিস্মিত! গোপনে একটু গর্বও অনুভব হয় । কিন্তু চাচার কাছাকাছি যাবার মত সুযোগই পাচ্ছে না ওরা । সুযোগটা তৈরি করে দিলো পাগলী বুড়ি । রাত এগারোটার দিকে হইচই শুনে চাচা নিজেই নেমে এলেন দোতলা থেকে ।
-কী রে নাবিল? এতো চ্যাচামেচি কিসের?
নাবিল মুখ টিপে হেসে বলে, ‘ও কিছু নয় চাচা । পাগলী বুড়ি খেপেছে । এই পাড়ায় বুড়ি প্রায় দশ বছর ধরে আছে। কোথা থেকে এসেছে কেউ জানে না । জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলে না। সারাদিন কই কই ঘুরে বেড়ায় কিন্তু সন্ধ্যা হলে আমাদের বাড়ির পাশে তোমার অই পরিত্যাক্ত জায়গাটায় এসে পাটি পেড়ে ঘুমায়। এতদিন তুমি আসোনি তাই ওকেও আর কিছু বলিনি আমরা। এখন তুমি এসেছো । বাড়ি বা কমার্শিয়াল কিছু করলে তখন বুড়িকে বাধ্য হয়েই সরে যেতে হবে। চাচা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন । কোন কথা বললেন না। এই মোক্ষম সুযোগটা হাত ছাড়া করতে চাইলো না নাবিল । শান্ত স্বরে চাচাকে বললো, ‘চাচা একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করে । যদি বলো খুব ভালো হয়।’ নাবিল লক্ষ করে চাচার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে । তবু খুব শান্ত স্বরে বললেন , ‘ আমি জানি তুমি কী জানতে চাও । তোমরা বড় হয়েছো । আমি খুব খুশি হয়েছি তুমি জার্নালিজমে ভর্তি হয়েছো । আমি সাংবাদিক হিসেবে পেশার মর্যাদা রাখতে পারিনি । পালিয়ে গেছি । আশা করি তুমি পারবে ।’ নাবিলের কাঁধে হাত রাখলেন চাচা । নাবিল খুব প্রত্যয়ী চোখে তাকায় চাচার দিকে। নাবিল বুঝলো চাচা এড়িয়ে গেলেন বিষয়টি । কিন্তু নাবিল নাছোড়বান্দা । তাকে সত্যটা জানতেই হবে ।
‘মরুঝড়ের হাহাকারে মৃগতৃষার লাগি
প্রাণ যে তাহার রইল তবু জাগি ‘
ময়মুনা আর বশিরের জীবনে কার্তিক আসার পর বশির মিয়ার একটাই ভাবনা মাথায় কাজ করতো । যে কোন ভাবেই নিজের একটা মাথা গোজার ঠাঁই চাই । বড় মিয়ার বাড়িতে আর কত দিন? এই স্বপ্ন ময়মুনা আর কার্তিকের মধ্যেও ঢেউ তুলতো। আহা! কবে হবে নিজের একটা ঘর। গোপনে ময়মুনা কিছু টাকা জমাতে থাকে। একটু বড় হতেই কার্তিককে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিলো বশির। মাদ্রাসা ছুটি হলেই এক দৌড়ে সৈয়দপুর রেল স্টেশনে বাবার কাজে হাত লাগাতো কার্তিক । ময়মুনা স্টেশনমাস্টারের রান্নার কাজটা নিয়েছিলো । বলতে গেলে পুরো পরিবারটার দ্বিতীয় সংসার ছিলো সৈয়দপুর রেল স্টেশন । কদিন ধরে গ্রামে কানঘুষা চলছে । পাকিস্তানি হারামজাদারা নাকি অনেক মানুষ মারতেছে । যদিও তার ছোট্ট গ্রামটায় এখনও কোন দুর্বিপাক নেমে আসেনি কিন্তু বড় মিয়া গ্রামের ময়মুরুব্বি ডেকে কী যেন গোপন শলাপরামর্শ করছে গত দিন দুই আগে । কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারে না ময়মুনা । অবশ্য বুঝতে যে সে খুব আগ্রহী তাও তো না । তার জীবন বশির মিয়া আর কার্তিকে সীমাবদ্ধ । মাঝেমধ্যে কার্তিকের ফিরতে দেরি হলে সে নিজেই যায় সৈয়দপুর স্টেশনে স্টেশন মাস্টারের ভাত নিয়ে । কদিন ধরেই কী যেন মাইকিং করছে লোকজন । ময়মুনা বোঝে না ঠিক । কাদের যেন ট্রেনে করে বর্ডারে নিয়ে যাবে । সেদিন রাতে বশির মিয়া খেতে বসে ময়মুনাকে বললো সে যেন আর ভাত নিয়ে না যায় স্টেশনে । ময়মুনা জানতে চাইলে রেগে যায়। ‘এত জাইন্না কাম নাই । যা কইছি তাই করবি।’ ধমক খেয়ে চুপ হয়ে যায় সে । মানুষটারে কয়দিন ধরেই কেমন যেন আউলা লাগে তার । ঠিক মতো কিছু বলে না। কিন্তু কিছু যে একটা ঘটছে এটা নিশ্চিত । ঠিক তার দুদিন পরে এক মধ্য দুপুরে আচমকা আজাব নেমে এলো ময়মুনার সংসারে । ভাতের হাড়ি নামিয়ে গড় দিচ্ছিলো ময়মুনা । ভাতের ফেনার কুণ্ডলী পাকানো ধোয়ার ভেতর থেকেই সে কার্তিককে দৌড়ে আসতে দেখে । হাত নাড়িয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে ময়মুনাকে । ওদিকে দৃষ্টি দিতে গিয়ে বেশ খানিকটা মাড় অসাবধানতাবশত হাতের কনুইয়ের একটু নিচে এসে পড়ে । বুকের ভেতর ধাক্কা লাগে তার । হঠাৎই একটা কাক কা কা করে উড়ে গেল প্রায় তার মাথার উপর দিয়ে । ‘বালাই ষাট বালাই ষাট দূর হ দূর হ’ বলে ময়মুনা বিড়বিড় করে কাকটাকে গালি দেয় । চারিদিকে এমনিতেই এত মারামারি খুন খারাবি । ভয়ে রাতে ঘুম আসেনা ময়মুনার । তার মধ্যে ছেলেকে এমন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে কলিজা কেপে ওঠে ময়মুনার ।
-মা মা বাবারে মিলিটারিরা স্টেশনে আঁটকায় রাখছে । তারে নাকি আইতে দিবো না।
-ও আল্লাহ । কী কস বাজান! তোর বাপে কী করছে? আর তুই জানলি ক্যামনে?
-বাবায় কিছু করে নাই মা । কিন্তু মিলিটারিরা পুরা স্টেশন খালি কইরা রাখছে । কেবল বাবা আর ষ্টেশন মাস্টার কাকারে রাইখা দিছে । স্টেশন ঝাড়ু দেয় যে করিমন খালা হ্যারে বাবায় কইয়া পাঠাইছে তুমি বা আমি য্যান স্টেশনের আশে পাশেও না যাই । আর আমাগো সাবধানে থাকতে কইছে
-ও আল্লাহ গো । আমি অহন কই যামু? কী করমু?
ময়মুনা আর কার্তিক দৌড়ে বড় মিয়ার বউয়ের কাছে যায় । বড় মিয়ার বউ নিজেও কী বলবে ভেবে পায় না।এতো লোক থাকতে বশির মিয়ার মতো সোজা সরল মানুষটারে আটকাইলো ক্যান ?
-তুই চিন্তা করিস না ময়মুনা । বড় মিয়া বাইত্তে আহুক । দেহি কী করন যায় ।
পুরো গ্রাম জুড়ে তখন পালাই পালাই রব । এতো শঙ্কার মধ্যেও প্রতিবেশী সুকান্ত বাবু এসে বড় মিয়ার বৌকে প্রণাম করে। খুব খুশি খুশি মুখ নিয়ে বলে-
-বৌদি মণি আশীর্বাদ করো । তেনারা আমগো উপ্রে সদয় হইছেন । আমগো তারা বর্ডার পর্যন্ত পৌঁছায় দেবে । রাত থাকতেই স্টেশনে রওনা দেবো গো । তোমরা আমাগের বাড়ি ঘরদোড় দেইখ্যা রইখো । যুদ্ধ থামলেই ফিরা আসুম ।
বড় মিয়ার বউ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে । তবু মনে মনে ওদের মঙ্গল কামনা করে। জানামতে বেশ কিছু হিন্দু মারোয়ারি পরিবার দেশত্যাগ করছে । মন থেকে মেনে নিতে না পারলেও ওদের বাধা দেবার ক্ষমতাও তো নেই । কদিন ধরেই তুমুল মাইকিং হয়েছে । ওদের নিরাপদে বর্ডার অব্দি পৌঁছে দেবে। এমন সুযোগ ওরা কেন হাতছাড়া করবে? কিন্তু মনের মধ্যে কোথায় একটা কু ডাক ডাকছে যেন থেকে থেকে ।
ময়মুনা কিছুতেই বুঝতে পারে না হিন্দু পরিবারগুলোকে বর্ডার পার করে দেবে, দিক না । তাই বলে কার্তিকের বাবাকে কেন সেই ট্রেনে যেতে হবে? পাকিস্তানি মেজর নাকি কার্তিকের বাবাকে ডেকে বলেছে, ‘তুম আচ্ছে আদমী হো ।কাল সুবহা সওয়ারে উন কে সাথ ট্রেন মে যায়েগে । সারাদ পার কার কে ওয়াপাস আয়ো গে । ফির আপ কি ছুঁটটি হ্যায় । আপ যাহা চাও যা সাকতে হো ।’ মাথা কাজ করছে না ময়মুনার । একবার কি স্টেশনে যাবে সে ? গিয়ে পরিস্থিতি বুঝে আসবে? ছেলেকে পাঠাতে সাহস হয় না। কী বুঝতে কী করে । পরেরদিন পুরোটা সময় পুরো গ্রাম থমথমে। মিলিটারি আর রাজাকার খানিক পর পর টহল দিচ্ছে। ঘর থেকে উঠানে যেতেও সাহস করে না কেউ। বিশেষ করে যাদের ঘরে উঠতি ছেলে বা মেয়ে আছে তারা তো আরো বিপদে। দিন পার হয়ে রাতের আধার নামে। সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারে না ময়মুনা । থেকে থেকে আতঙ্কে কেপে ওঠে । কার্তিককে বুকে জড়িয়ে রাখে । মনে হয় ছেলেটাকে কোথাও লুকিয়ে রাখা যেত যদি । নিজেকে নিয়ে সে ভাবে না ।
-মা , মসজিদের হজুরে কইছে মেম্বার আজহার মুন্সির লাগে নাকি পাক বাহিনীর খুব খাতির । কিছু ট্যাকা পয়সা দিয়া তারে বুঝাইয়া কইলে বাবারে খবরডা আইনা দিতে পারে । যাইবা নাকি একবার আজহার কাকুর লগে কথা কইতে?
বুদ্ধিটা মনে ধরে ময়মুনার । যদিও বড় মিয়ার বউ মানা করছিলো এই লোকের কাছে না যাইতে কিন্তু ময়মুনার বিশ্বাস, এতো দিনের চেনাজানা আজহার মুন্সি । তার সাথে কী আর খারাপ করবে! পারলে কার্তিকের বাপরে ছাড়ায় দিবে, না পারলে নাই । কিন্তু ময়মুনার কাছে আছেই তো দশ-বারো টাকার মতো । এই টাকায় কী আজহার মুন্সী রাজি হবে? ময়মুনার এই গভীর চিন্তার মধ্যেই কার্তিক তার মাটির ঘটটা এগিয়ে দেয় । ঘটভেঙ্গে আরও কিছু পাওয়া গেল । এ নিয়েই ঘুটঘুটে অন্ধকারে দুটি ভয়ার্ত আর উৎকণ্ঠিত হৃদয় সকালের অপেক্ষা করে।
‘মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব থেকে যায়’
আজ নাবিল নাফিজের কিছু বন্ধু এসেছে চাচার সঙ্গে দেখা করতে । বিশেষ করে নাবিলের বন্ধুরা । জার্নালিজমের ছাত্র হয়ে এমন বিখ্যাত একজন জার্নালিস্টের সঙ্গ পেতে ওরা খুব আগ্রহী ছিলো ।চাচাও সময় নিয়ে ওদের সাথে কথা বললেন । এই জেনারেশনের অনুভব ও মেজাজ বোঝার চেষ্টা করলেন । ওরাও নানা প্রশ্নে জাহিদ হায়দারকে ব্যস্ত রাখলো । সেই সময়ের সাংবাদিকতা ও আজকের সাংবাদিকতার ব্যবধান, পেশাদারিত্বের ভাব অভাব , ইয়োলো জার্নালিজম-বিবিধ বিষয় নিয়ে গল্প হল । হঠাৎ ই নাবিলের এক বন্ধু জাহিদ হায়দারকে প্রশ্ন করে বসলো, ‘এতো তুখোড় একজন সাংবাদিক ছিলেন আপনি । হঠাৎ সব ছেড়ে চলে যেতে কষ্ট হয়নি আপনার?’ জাহিদ হায়দার চুপ করে গেলেন । পুরো পরিবেশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল মুহূর্তেই । মাথা নিচু করে বসে রইলেন তিনি । সত্যিই তো ! এত নীতি নৈতিকতার গল্প শোনালেন ছেলেদের অথচ তিনি নিজেই একদিন সব ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন । তার মুখে এসব নীতিকথা মানায় না ।যে সত্যকে সামনে আনতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, হেরে গেছেন এক অশুভ শক্তির কাছে, পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে তিনি বলতে গেলে পালিয়ে গেছেন সেই মানুষ কী করে পথ দেখাবে এই নতুন প্রজন্মকে? নাবিল গিয়ে চাচার হাত ধরে-
-চাচা, আমি জানি এটা খুব কষ্টের তোমার জন্যে । তবু আমরা শুনতে চাই
-বাবা রে! সফলতার গল্প শোনানো যায় । ব্যর্থতার গল্প থেকে কিছু শেখার নেই
‘আছে চাচা ।’ নাবিলের সেই বন্ধু বলে ওঠে । ‘ প্রতিটি হেরে যাবার গল্পে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবার প্রেরণা থাকে । আমাদের সেই প্রেরণাটুকু দিন অন্তত ।’
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে চুপ করে রইলেন । হঠাৎ নিজ থেকেই বলতে শুরু করেন-
আমি আমার পত্রিকা থেকে একটা দায়িত্ব পাই মুক্তিযুদ্ধের কিছু প্রতিবেদন তৈরির করার । কাজটা পেয়ে এতো খুশি হয়েছিলাম ! কয়েকরাত জেগে মোটামুটি ছক তৈরি করে ফেললাম । কোথা থেকে কাজ শুরু করবো ।কার কার সাক্ষাৎকার নেবো । পুরো প্ল্যান নিয়ে দেখা করলাম আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক তৈয়বুর রহমান এর সাথে । কিন্তু স্যারের সাথে কথা বলে আমার পুরো প্ল্যান বদলে গেলো । স্যার আমাকে সৈয়দপুর যেতে বললেন । কাজ করতে বললেন ‘অপারেশন খরচাখাতা’ নিয়ে । আমিও অল্প বিস্তর জানি বিষয়টা কিন্তু আমার সমস্ত জানা ধুলোয় মিশে গেল যখন আমি সৈয়দপুর গিয়ে এক অন্যরকম যোদ্ধার গল্প শুনলাম । এক নারীযোদ্ধার গল্প। আমি শিউরে উঠেছিলাম । কি ভয়াবহ অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছে সে । দিনটা ছিলো একাত্তরের তেরই জুন । প্রায় পাঁচশত হিন্দু মারোয়ারি পরিবার নিয়ে একটা ট্রেন সৈয়দপুর স্টেশন থেকে রওনা দেয় বর্ডারের দিকে । বলা হয়েছিল তাদের নিরাপদে ভারত সীমান্তে পৌঁছে দেবে ওরা। রাত থাকতেই অসংখ্য মারোয়ারি পরিবার এসে জমা হয় স্টেশনে । সবাই জীবন নিয়ে পালাতে মরিয়া তখন। কিন্তু বিষয়টা ছিলো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর এক ভয়াবহ ফাঁদ । ট্রেনটা এক স্টেশন পরেই থেমে যায় । ট্রেনের সব বগির দরজা জানলা লাগিয়ে ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় । তার আগে অবশ্য রাজাকার ও আলবদর বাহিনী নির্মমভাবে যাত্রীদের কুপিয়ে হত্যা করে । নারী শিশু কাউকে রেহাই দেয়নি জানোয়ারগুলো । এমনকি রেহাই পায়নি ড্রাইভার ও তার সঙ্গীরাও । সেই সঙ্গীদের একজন বশির মিয়া যাকে রীতিমতো জোর করে অই ট্রেনে ড্রাইভারের সংগে পাঠানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে বশির মিয়ার শরীরের এক অংশ ট্রেন থেকে ছিটকে পড়ে। আরেক অংশ ঝুলে ছিলো দুই বগির মাঝখানে। আর এখান থেকেই শুরু বশিরের স্ত্রী ময়মুনার গল্প-
এ অব্দি বলে জাহিদ হায়দার হাপাতে থাকেন । কপালে ঘাম চিকচিক করে তার । নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করেন । ছেলেগুলো যেন কথা বলতেও ভুলে গেছে । ওদের জিজ্ঞাসা যেন থেমে গেছে । জাহিদ হায়দার পাশে রাখা পানির গ্লাস থেকে পানি পান করেন ।
‘শোনা গেল লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে’
একটু বোধহয় ঝিম এসেছিলো ময়মুনার । হঠাৎই খুট করে একটা শব্দ কানে আসে । ভুল শুনেছে এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেয় । কিন্তু খানিক পরেই আবার শব্দটা টের পায় সে । কান খাড়া করে । তোষকের নিচে রাখা বটিটা শক্ত করে হাতের মুঠোয় তুলে নেয় । আস্তে করে টিনের ফুটোয় চোখ রেখে হতভম্ব হয়ে যায় সে।কার্তিকের বয়সী একটা ছেলে হামাগুড়ি দিয়ে তার চুলার পাশে রাখা পাতিলের ঢাকনা তুলে খাবার খুঁজছে । কিছু না পেয়ে মালসায় লেগে থাকা ভাতের মার চেটে চেটে খাবার চেষ্টা করছে । ময়মুনার চোখ ফেটে কান্না এলো । ময়মুনার বুঝতে দেরি হল না অভুক্ত এই ছেলেটা আর যাই হোক চোর না । ঘরে বাসি কয়টা ভাত আছে কিন্তু ছেলেটাকে দেবে কিভাবে? কিছু বলতে গেলেই যদি পালিয়ে যায় । অনেক ভেবে স্বর যথাসম্ভব মোলায়েম করে সে জিজ্ঞেস করে, ‘ তোমার কী খিদা লাগছে বাজান?’ ব্যাস এটুকু কথায় ছেলেটা আটকে গেল । চট করে পিছন ফিরে তাকিয়েই ময়মুনাকে দেখে সে খানিকটা নিরাপদে সরে যায় । ময়মুনা তাঁকে আস্বস্ত করে-‘ ভয় পাইয়ো না বাজান । ঘরে কয়ডা ভাত আছে , খাইবা ?’ ছেলেটা ময়মুনার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে বলে, ‘ মা আমি একলা না আমরা দশজন ।’ ময়মুনা হা করে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে থাকে । কী বলে! দশজন!!! বাকি সবাই কই? জিজ্ঞেস করতেই ছেলেটি বলে সবকয়জন বাড়ির পিছনের ডোবায় পানির মধ্যে শরীর ডুবিয়ে বসে আছে। মিলিটারি টের পেলে সবকয়জনকে গুলি করে নয়তো কুপিয়ে মেরে ফেলবে । ময়মুনার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। কোন কিছু না ভেবে সে চুলায় ভাত চাপায় । ছেলেটাকে বলে সবাইকে আস্তেআস্তে বাড়ির ভিতর নিয়ে আসতে । ছেলেটি কয়েক পলক তার দিকে তাকিয়ে সাথীদের নিয়ে আসতে যায় । ময়মুনা চিন্তায় পড়ে যায় । এতগুলো ছেলেরে সে কী দিয়ে ভাত খেতে দিবে । ঘরেও তো কিছু নাই । মাথা কাজ করছে না তার । কার্তিক ততক্ষণে উঠে পড়েছে । ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুটা থতমত খেয়ে যায় সে । কী হচ্ছে এসব । ময়মুনা ঠান্ডা মাথায় ছেলেকে সব বুঝিয়ে বলে । কার্তিকই মনে করিয়ে দেয় ঘরের পিছনে বেড়ে ওঠা বেশুমার কচুশাকের কথা । ময়মুনা দেরি করে না । কার্তিক ততক্ষণে ছেলেগুলোকে গামছা চাঁদর যা গেঞ্জি যা হাতের কাছে পায় দিতে থাকে । কিছুক্ষণ পরে কলাপাতা পেড়ে সবাইকে খেতে দেয় ময়মুনা।
-বাজানেরা তোমরা কারা? একটু কইবা? ভাবে তো মনে লয় তোমরা মুক্তিযোদ্ধা । ক্যামনে কী অইছে একটু জানতে মন চায় ।
ওরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকায় । ওদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখে কার্তিক বলে ওঠে,’ ভাই , আমার মা সহজসরল মানুষ । তাই এইভাবে জিজ্ঞাসা করছে । আপনেরা কিছু মনে নিয়েন না । আপনেরা ভাত খান । তারপর যতক্ষণ ইচ্ছা থাকেন । আপনাগো আর কিছু জিগাইবো না মা ।’
ওদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছেলেটি তখন কথা বলে-
-মা আমরা পনেরো জন সিদ্ধান্ত নিছিলাম ট্রেনে কইরা চিলাহাটি বন্দর থিকা বর্ডার পার হয়া কোনোরকম হলদিবাড়ি পৌঁছায়া ট্রেনিং সেন্টারে চইলা যামু । তাই ছদ্মবেশে সব মারোয়ারিগো লগে আমরাও ট্রেনে উঠি । কিন্তু এই শুয়োরের বাচ্চাগো মতলব যে আলাদা তা বুঝতে পারলাম গোলহাটি গিয়া । কেউ বাইচা নাই রে মা । সবাইকে কচুকাটা করছে । আমরা ট্রেন থিকা লাফায়া দৌড়ান শুরু করছি । কোন হুঁশ জ্ঞান ছাড়া দৌড়াইতে ছিলাম । গুলিতে ঝাঁজরা হয়া গেছে অনেকে । আমরা ক্যামনে বাইচা ফিরছি কইতে পারুম না মা । দিগ্বিদিক দৌঁড়ানোর পর নিজেগো আবিস্কার করলাম আপনাগো বাড়ির পিছে ডোবাডার কাছে । সেইখানে ঝাড় কলমির মইধ্যে ডুইবা ছিলাম দশজন । বাকী পাঁচজন কই আছে, বাইচা আছে না মইরা গেছে কইতে পারুম না । আমরা রাত নামার অপেক্ষায় ছিলাম । কিন্তু খিদার জ্বালা সহ্য করতে না পাইরা ও উইঠা আইসা আপনের পাকের ঘরে কিছু খাওন খুঁজতেছিলো । আপনার অনেক দয়া মা আমাগো খাওন দিলেন, আশ্রয় দিলেন ।
ময়মুনা স্থবির হয়ে শুনছিলো । তার কান দিয়ে কোন কথা ঢুকছিল কিনা কে জানে । কার্তিক কোন মতে ছেলেদের বুঝিয়েছিলো ওর বাবা ওই ট্রেনে ড্রাইভারের সাথে ছিলো। ময়মুনা যেন পাথরের মূর্তির মতো শক্ত হয়ে গেছে । কার্তিক মা মা বলে ডেকেই যাচ্ছে কিন্তু ময়মুনা যেন মৃত এক লাশের মতো। সবাই তখন বুঝেই উঠতে পারছিলো না ময়মুনাকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে । কোন ভাষাই খুজে পায় না ওরা। ওদিকে সময় গড়িয়ে যায়। ছেলেগুলোকে বেরিয়ে পড়তে হবে । এক অদ্ভুত নিস্তরঙ্গ সময় যেন সবাইকে ঘিরে ধরে। সেই নিস্তব্ধতা ভাঙে ময়মুনা।
-বাজান তোমরা আমারে নিয়া ভাইবো না। আল্লার নাম নিয়া বাইর হও। শুধু একটাই অনুরোধ আমার কার্তিকরে তোমরা সাথে লয়া যাও। আমার যা বোঝার আমি বুইঝা গেছি। হারামির বাচ্চারা সকাল অইতে দিবো না। তার আগেই আমার বাড়ি চইলা আসবে। ক্যান আমার স্বামীরে ট্রেনে তুইলা দিসে , ক্যান তারে মাইরা ফালাইছে আমি বুঝবার পারছি। আমার কার্তিকরেও অরা বাঁচতে দিবো না। তাছাড়া কার্তিক সাথে থাকলে তোমাগো পথ চিনতেও সুবিধা অইবো। এই গেরামের পথ ঘাট গলি ঘুপচি ওর খুব ভালো কইরা জানা আছে।
-কিন্তু মা, ও তো খুব ছোট । আর ও চইলা গেলে আপনে ক্যাম্নে থাকবেন?
-আমার লগে বাহাস কইরো না বাবা । রাজাকারের হাতে মরার চেয়ে ভালো দ্যাশের লাইগা যুদ্ধ কইরা মরা ।আর আমার কী করতে অইবো আমি জানি। তোমরা আজকে থিকা এগারোজন। বাঁচন মরণ আল্লার হাতে । যাও বাবারা রওনা দাও। অক্ষনি রওনা দাও। জানোয়ারগুলারে আমি ঠেকাইতেছি।
শেষবারের মতো ছেলেকে জড়িয়ে ধরে ময়মুনা। বুক ভরে ছেলের গন্ধ নেয়। চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে কপালে একটা চুমু দেয়। আতুর ঘরের কথা মনে আসে ময়মুনার। ছোট্ট কাপড়ের পুটলিতে আনা পুতলার কথা মনে হয়। সমস্ত চিৎকার গিলে ফেলে আস্তে করে ছেলের কানে কানে বলে, ‘ বাবার হত্যার বদলা নিও বাজান। মায়েরে ভুইলো না। যদি দ্যাশ স্বাধীন হয়, যদি আমরা বাইচ্চা থাকি ঠিক আমাগো দেখা হইবো। মায়পুতে মিল্লা তখন নতুন ঘর দিমু। নতুন কইরা বাচমু।‘
ময়মুনা দলের নেতাগোছের ছেলেটির হাতে তোষকের তলা থেকে বের করে কিছু টাকা গুঁজে দেয়। ছেলেগুলো হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে ময়মুনার দিকে।
-বাজান ট্যাকাগুলা জমাইছিলাম একখান ভিটা কেনার লোভে। ভিটা পরেও কিনা যাইবো। আগে দ্যাশের মাটি কিনি। দ্যাশ থাকলে কোথাও না কোথাও একটু ঠাই কী পামু না? নিশ্চয় পামু। যাও আর দেরি কইরো না।
কার্তিককে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে একরকম জোর করেই রান্নাঘর সংলগ্ন কচু ক্ষেতের ভিতর ওদের নামিয়ে দেয়। ছেলের হাত ছেড়ে দিতে দিতে মনে হল ময়মুনার ফের যেন নাড়ি কাটা হল। ফের যেন তার অস্তিত্ব থেকে তার বুকের মানিককে আলাদা করা হল। সন্তানের শোক স্বামীর শোক বুকের ভেতর ঘুম পাড়িয়ে ময়মুনা উঠে দাঁড়ায় । ছোট ছোট পা ফেলে আগায় আজাহার মুন্সির আস্তানায়…
‘চোখে তার যেন শতাব্দীর নীল অন্ধকার’
ময়মুনার গল্প আমি শুনেছিলাম ওখানকার স্থানীয় মুরুব্বীদের কাছে। আমার বিস্ময়ের সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিলো। আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার প্রজেক্টের কথা। সব ফেলে আমি ময়মুনার সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। অনেক কষ্টে আমি খুঁজে পাই ময়মুনার আশ্রয়দাতা বড় মিয়ার বউকে ।প্রথম দিন তো সে আমাকে রেগে বাড়ি থেকেই বের করে দিলো । আমি অবশ্য হাল ছাড়িনি । এমন অগ্নিকন্যার ইতিহাস আমাকে জানতেই হবে। আমি আবার যাই । তিনিচারবার ব্যর্থ হবার পর একদিন বড় মিয়ার বউয়ের মন গলে । অনেক দুঃখ নিয়ে বলে, ‘ কত সাংবাদিক আইলো গেলো । ময়মুনার কতা লিখ্যা নিলো । কিন্তু কেউ তো আর ছাপাইলো না।’ আপনেও তাই করবেন । লাভ কী শুইন্যা? আমি তাঁকে কথা দিলাম আমি যদি না ছাপি তাইলে আর কোনদিন সাংবাদিকতা করবো না। অনেক কষ্টে শেষে তিনি রাজি হলেন । বললেনও সব কথা । ঢাকায় ফিরে দ্রুত প্রতিবেদন তৈরি করলাম । তাতে আজহার মুন্সিআর নাম পরিচয় সব তুলে ধরলাম । আমার রক্ত তখন টগবগ করে ফুটছে । মাথায় আগুন জ্বলছে । পাতা নিজ হাতে গুছিয়ে অফিস থেকে বাড়ি এলাম । সেই রাতটা যেন আমার কাটছে না । সকাল হতেই দৌড়ে পাড়ার মোর থেকে পত্রিকা নিলাম । পাগলের মতো খুঁজলাম । নেই । আমার প্রতিবেদন কোথাও নেই । কোন এক অজানা রহস্যের ইঙ্গিতে সেই প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি । আমি লজ্জায় ক্ষোভে সম্পাদকের কাছে ছুটে গেলাম । সম্পাদক আমাকে ঠাণ্ডা মাথায় বোঝানোর চেষ্টা করলেন । জলে থেকে আমি নাকি কুমিরের সাথে লড়াই করতে পারবো না। আজহার মুন্সী তখন বিশাল এক মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী । আমার মতো চুনোপুটি সাংবাদিককে বসিয়ে দেয়া তার জন্যে বা হাতের খেল । টাকা ও ক্ষমতা দুটোই তিনি ছড়িয়েছেন বেশ দক্ষতার সাথে ।
আমি নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না । তার মনে বড় মিয়ার বউ যা বলেছে তাই সত্যি! এখন বুঝতে পারছি কেন কেউ লেখে না ময়মুনাকে নিয়ে । লজ্জায় ঘৃণায় আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বড় মিয়ার বউকে দেয়া কথা আমার রাখতে হবে । চাকরি ছেড়ে আমি এক বছরের মধ্যে দেশও ছেড়ে দিলাম । স্বাধীনতার পরেও যে দেশে বীরাঙ্গনা যোদ্ধাদের কথা চাপা পড়ে যায় ক্ষমতা আর টাকার লোভে সেখানে দমবন্ধ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে দূরে থাকাই শ্রেয় ।
এবার বড় মিয়ার বউ এর বয়ানেই তোমরা শোন ময়মুনার সেই ভয়ংকর জীবনের না বলা কথা-
ময়মুনা নিজের ইচ্ছাতেই আজহার মুন্সির আস্তানায় গেছিলো । ও চাইছিলো যে কোন ভাবেই হোক পাইক্কাগো ভুলায় ভালায় আস্তানার মধ্যেই রাখতে যাতে ওরা এগারোজন নির্বিঘ্নে গ্রাম পার হয়া যাইতে পারে। দাতে দাঁত চাইপা মাইয়াডা কুত্তাগুলার অকথ্য নির্যাতন সহ্য করছে । তবু একবারও জোরে চিৎকার পর্যন্ত করে নাই । আর শিকার একেবারে খাঁচার মইধ্যে পায়া জানোয়ারগো উল্লাস ছিলো দেখবার মতন ।ওদিকে দিনের বেলায় টেরেনের মইধ্যে এত্তগুলা মানুষ মাইরা তারা কিছুটা জিরান্তি ভাবেও আছিলো ।তার মধ্যে ময়মুনারে পায়া তাগো শয়তানি আনন্দ আরও বাইড়া গেলো । বাইরের দিকে তাগো নজর কইমা গেছিলো । ময়মুনা তো এইডাই চাইছিলো । ময়মুনা জানতো এই নরকে ঢোকার রাস্তা আছে বাইর হওনের রাস্তা নাই । আর এট্টুক গ্রাম । কথা চাউর হইতে সময় লাগে না । পরদিনেই আজহার মুন্সি বুইজ্জা গেছিলো নিজের পোলা সহ ওই দশজন মুক্তিরে নিরাপদে গ্রাম পার করার জন্যেই ময়মুনা এই নাটক করছে । তার বাদে নির্যাতনের সাথে সাথে তার উপরে চলে অসহনীয় অত্যাচার । এক একদিন ময়মুনার চিক্কুরে আল্লাহর আরশ ও মনে লয় কাইপ্পা উঠতো । আপনেরে কইতে বাঁধা নাই । ময়মুনার দিকে অনেক আগে থেকেই আজহার মুন্সির নজর আছিলো । এই কারণেই ষড়যন্ত্র কইরা বশিররে ওই টেরেনে উডাইছিলো সে । বশির না থাকলে পোলা আর বউডারে উডায়া নিতে কোন অসুবিধাই অইবো না । কিন্তু ময়মুনা যে রাইতের মইধ্যে পোলাডারে মুক্তিগো কাছে দিয়া দিবো তা স্বপ্নেও ভাবতে পারে নাই আজহার মুন্সি । এইবার সম্ভ্রম হারানোর লগে লগে গাদ্দারির শাস্তিও যোগ হইলো ময়মুনার কপালে । একে একে দশ আঙুলের নখ টাইনা তুইলা ফেলছিলো ওর। বেয়োনেট দিয়া খোঁচাইতে খোঁচাইতে শইলের অনেক জায়গা দিয়া মাংস পইচা গেছিল । তবু মাইয়াডার মুখ দিয়া একটা শব্দও উচ্চারণ করাইতে পারে নাই । তীব্র ক্ষোভ আর জেদে আরো অত্যাচার করছে । এক রাইতে পাকিস্তানি এক মেজরের গায়ে থু থু দিলে ক্রোধে সে হুকুম করে এমন শাস্তি দিতে যাতে কেউ আর এমন করার সাহস না পায় । আজহার মুন্সি ত্যাল গরম কইরা ওর যৌনাঙ্গে ঢালে । সেদিনের সেই চিক্কুর আল্লাহ কবুল করছিলো মনে লয় । সেই রাতেই মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে পাইক্কাগো ঘাঁটিতে । ঘাটি দখল কইরা সব বন্দি মাইয়াগো অস্থায়ী হাসপাতালের ক্যাম্পে পাঠায় মুক্তিবাহিনী । ময়মুনা মইরা গেছে ভাইবা তারা ফালায় যাইতেছিলো কিন্তু হঠাৎ ই এক পোলায় ওরে চিনতে পারে । সেই রাতে এই পোলাডাও ছিলো ওই দশজনের দলে । পোলাডা ওরে কান্ধে কইরা হাসপাতালে নিয়া যায় । পরে শুনছি ওর চিকিৎসা এইখানে অইবো না বইলা ঢাকায় লইয়া গেছে । যাবার আগে নার্স রে একটা টাকার পুটলি দিয়া পোলাডায় কইছিলো, ময়মুনা বাইচ্চা উডলে এই টাকাটা য্যান তারে দেয়া হয় । জিগাইলে কইতে কইছে, তার পোলায় তার জন্যে টাকাডা পাডাইছে । আর না বাঁচলে এইডা দিয়া য্যান দাফন কাফন করে । সিস্টার বারবার জিগাইছে কার্তিকের কতা । পোলাডা নাকি কোন কতা না কইয়া চোখ মুইছা চইলা গেছে । আমি এইসব পরে হাসপাতালের এক আয়ার কাছে শুনছি । ম্যালাদিন যমে মানুষে টানাটানি চলছে । একসময় শইলের ক্ষত শুকাইছে কিন্তু মনের ক্ষত শুকায় নাই ময়মুনার । হাসপাতাল থিকা ছাড়া পাওনের সময় সিস্টার টাকাগুলান ওর হাতে দিছিলো । এক সকালে হাসপাতাল থিকা একলা একলা বাইর হইয়া কই যে গেছে কেউ কইতে পারে না। খাবার পরনের কাপড় কিছুই নেয় নাই।নিছে শুধু পোলার পাঠানো টাকা কয়ডা । সিস্টার গুইন্না দেখছিলো একদিন । সেইখানে সাতাইশ টাকা আট আনা আছিলো ।
-কত টাকা!!!
প্রশ্ন করতে করতেই নাবিল নাফিজ নিজের অজান্তেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে যায় । ওদের এই অস্বাভাবিক আচরণের কোন কারণ খুঁজে পায়না ওর বন্ধুরা, এমনকি চাচাও ।
-সাতাশ টাকা আট আনা ।
চাচা দ্বিতীয় বার বলার সাথে সাথেই ওরা পাগলের মতো দৌড়ে নিচে নামে । পাড়ার দুষ্টু ছেলের দল তখন বুড়িকে ক্ষেপাতে ব্যস্ত । নাবিল নাফিজ চিৎকার করে ওদের সরিয়ে দিয়ে বুড়ি কে জড়িয়ে ধরে । অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে নাবিল নাফিজ । অস্ফুটে বলে এই তো আমাদের ময়মুনা মা । এবার তোমার প্রতিবেদন বের হবেই চাচা । কেউ আটকাতে পারবে না । এই প্রথমবার নাবিল নাফিজ বুড়ি মায়ের সাথে এক সুরে বলে,’ হ্যাঁ মা এখানে সাতাশ টাকা আট আনাই আছে ।‘
সারাজীবন উল্টো শুনে আসা অশীতিপর বৃদ্ধা মা এক অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে তাকায় নাবিল নাফিজের দিকে।
10 Comments
খুব ভালো লাগলো। 🙏
অনেক ধন্যবাদ 🙏
অসাধারণ।
এখনও ঘোরের মধ্যে আছি।
অনেক ধন্যবাদ দাদা 🙏
খুব ভালো লেগেছে।
অনেক ধন্যবাদ
অসাধারণ।
অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে নাবিল নাফিজ । অস্ফুটে বলে এই তো আমাদের ময়মুনা মা । এবার তোমার প্রতিবেদন বের হবেই চাচা । কেউ আটকাতে পারবে না । এই প্রথমবার নাবিল নাফিজ বুড়ি মায়ের সাথে এক সুরে বলে,’ হ্যাঁ মা এখানে সাতাশ টাকা আট আনাই আছে ।‘
সারাজীবন উল্টো শুনে আসা অশীতিপর বৃদ্ধা মা এক অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে তাকায় নাবিল নাফিজের দিকে।
অনেক ধন্যবাদ 🙏
[…] নাহিদা আশরাফী-র গল্প […]