Email: info@kokshopoth.com
February 1, 2026
Kokshopoth

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ

Nov 14, 2025

তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল ও ক্যাংলাস পার্টিরাঃ
দ্বিতীয় ভাগ

তৃষ্ণা বসাক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অতিপরিচিত প্রিয় নাম। জন্ম কলকাতা । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক.। সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে অভিধান প্রকল্পের দায়িত্ব – বিচিত্র ও বিস্তৃত কর্মজীবন। বর্তমানে পূর্ণ সময়ের লেখক ও সম্পাদক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে গ্রন্থ সংখ্যা ৬৫-রও বেশি। সাহিত্য অকাদেমির ভ্রমণ অনুদান, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার সহ পেয়েছেন অন্যান্য বহু পুরস্কার। হিন্দি, মালয়ালম, ওড়িয়া ভাষায় গল্প অনূদিত। মৈথিলী থেকে অনুবাদ ও কল্পবিজ্ঞান রচনায় সাবলীল ।

# ৫

তরল তব সজল দিঠি

 

অনেক, অনেক বছর পরে একটা আইলাইনার হাতের কাছে পেয়ে গেলাম। আর হাত নিশপিশ করে উঠল অমনি। ঝটিতি লাইন টেনে ফেললাম  চোখের পাতার ওপর, আর চমৎকৃত হয়ে দেখলাম বয়স এক জায়গাতেই থেমে আছে, সেই কুড়ি বছর আগে যেমন আনাড়ি হাতে এবড়োখেবড়ো থ্যাবড়া লাইন টানতাম, আজও একইরকম , হুবহু একইরকম এবড়োখেবড়ো লাইন টানলাম। অবিকল র‍্যাডক্লিফ লাইনের মতো। মানে লাইন টানায় জনাব র‍্যাডক্লিফের যেমন দক্ষতা, আমারও ঠিক তেমনি। রান্নাঘর ভারতে পড়লে, শোবার ঘর বাংলাদেশে পড়বেই। কিংবা যেন সাইন কার্ভ, ঢেউ উঠছে আর পড়ছে।

 

‘জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার

অনভ্যাসের দাগ চড়চড় আজো আইলাইনার!’

 

ভারি নস্টালজিক হয়ে পড়লাম। চারিদিকে এত উন্নয়ন উন্নয়ন শুনিতে পাই।  কাহার উন্নয়ন ? কীসের উন্নয়ন? রামা কৈবর্ত, রহিম শেখ কিংবা এই শ্রীল শ্রীযুক্তা তৃষ্ণা বসাকের কোন উন্নয়ন চোখে পড়ে না তো! সত্য ত্রেতা দ্বাপর, প্রস্তর, লৌহ, সিলিকন কাল থেকে কালান্তরে তাহাদের অবস্থা আরশোলার মতোই অপরিবর্তনীয় রহিয়া গিয়াছে।

 

অথচ, অথচ বললে প্রেত্যয় হবে না, জীবনের ফুটি ফুটি বেলায় লিপস্টিকের পরেই যে প্রসাধনী সামগ্রীটির নাম প্রথম শুনি, এবং কিনি, এবং যেটি আমাদের  টিনবেলা সম্মোহিত করে রেখেছিল,    তা এই আইলাইনার। তিন চারটে মেয়ে একজায়গায় হলেই প্রেম ট্রেম নয়, এই আইলাইনের গল্প। কে প্রেম করছে, কে করছে না, কে করবে করবে করে পিছিয়ে আসছে, কে ওসব ছাইপাঁশ জিন্দেগিতে করবেই না (যেন মদ বা সিগারেটের নেশা!) তা নিয়ে যেমন একটা চাপা রেষারেষি, উদ্বেগ এবং পিয়ার প্রেসার থাকেই সে বয়সে, তেমন আমাদের ছিল আইলাইনার নিয়ে। কে আইলাইনার কিনে ফেলেছে, কে কেনেনি, কে কিনব কিনব ভাবছে, আর কারা একদম কিনবেই না বলে ধ্নুকভাঙ্গা পণ করেছে- আইলাইনার আমাদের এইরকম স্পষ্ট চার ভাগে ভেঙে ফেলেছিল। ক্লাস এইট অব্দি আমি ছিলাম অনেকটা রবীন্দ্রনাথের কুমু, লাবণ্য, অমলের বিতিকিচ্ছিরি ককটেল। সাজগোজের ক্ষেত্রে ভয়ানক পিউরিটান। খুব ছোটবেলায় আয়নার সামনে শিঙ্গার কুমকুম নিয়ে টিপ পরার চেষ্টা ছিল, চুল বাঁধা ছাড়া কোন কিছুতে মাকে হাত লাগাতে দিতাম না।  কিন্তু তারপর অক্ষরজ্ঞান হবার পর থেকে  সেসব আমি সযত্নে এড়িয়ে চলেছি। এমনকি দিনের পর দিন চুলও আঁচড়াইনি আমার স্ব -কল্পিত আঁতেল ভাবমূর্তি পাছে টাল খেয়ে যায় এই ভয়ে। তাতে লাভের মধ্যে আমার সেই তৎকালীন স্প্যানিয়েলের গায়ের লোমের মতো ঝাঁকড়া চুল উকুনের মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠে আমাকে আঁতেল থেকে একেবারে হিপি তে প্রোমোশন দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু মা ও গুরুজনস্থানীয়াদের অতি তৎপরতায় সে ভাল ব্যাপারটাও আমার ভাগ্যে ঘটতে পারল না।

 

সেই সময় রবি ঠাকুরের অন্ধ অনুসারী আমি বিশ্বাস করতাম ‘অসভ্য দেশের মেয়েরাই মুখে চিত্তির করে, মুখে রঙ করে মেয়েরা কি অসভ্য দেশের মেয়ে সাজতে চায়?’ এখন এই কথাটা আর পলিটিকালি কারেক্ট মনে হয় না। অসভ্য দেশ বলতে কি আফ্রিকা বলতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ? অনেক আদিবাসী মেয়েরাও মুখে নকশা করে, গায়ে উল্কি আঁকে। উল্কি তো এখন ট্যাটু নামে এই সময়ের উন্মাদনা। লিওনেল মেসি থেকে লিলিমাসি সবাই গায়ে ট্যাটু করিয়ে ঘুরছে।  এখন এই সব কথা বললে রবীন্দ্রনাথ বডি শেমিং –র  দায়ে পড়তেন। যারা শেষ যাত্রায় তাঁর বিদেশি শ্যাম্পুতে ধোয়া চুল দাড়ি ছিঁড়ে নিয়েছিল, তারাই নতুন করে জন্ম নিয়ে  সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে ট্রোল করত, এ আমি হলফ করে বলতে পারি।

 

যাই হোক, তিনি আমার মাথাটি এমন খেয়েছিলেন, যে   বিলিতি বর্জনের কায়দায়, অত লড়াই করে আদায় করা সবেধন নীলমণি লিপস্টিকটি ছুঁড়ে ফেলেছিলাম পুকুরে। হয়েছে কি, এক গ্রামে বিয়েবাড়িতে গেছি। সেখানে সবাই লাগাচ্ছে দেখে আমিও লিপস্টিক লাগিয়েছি। এক মেসোমশাই স্থানীয় মানুষ বললেন ‘মা তোমাকে তো এমনিই ভাল দেখায়। এসব আর্টিফিসিয়াল জিনিসের কী দরকার?’ ব্যস হয়ে গেল। সেই ‘কৃত্রিম’ জিনিসটি অকৃত্রিম ঘৃণার সঙ্গে পুকুরে নিক্ষিপ্ত হল। হিসেব করলে দেখা যাবে সেই ঐতিহাসিক নিক্ষেপের পর থেকেই সমস্ত মারমেডের ঠোট লাল!

 

 এখন মনে হয়, ছুঁড়ে ফেলার মধ্যে বেশ নাটকীয়তা ছিল বটে, আখেরে ফারাক বিশেষ হয়নি। অনেক বায়নার পরে  বাবা  যে লিপস্টিক  কিনে দিয়েছিলেন,   চাঁদ সদাগরের বাঁ হাতে পুজোর মতো,   সেটা ছিল সেই আমলের আদর্শ মেনে ন্যাচারাল কালার বলে একটা ‘না দেবায় না ধর্মায়’ গোছের জিনিস।  সে লিপস্টিক আসলে লিপ বামের বেশি কিছু ছিল না, তাতে ঠোট একটু চকচক করত মাত্র। ক্লাস এইটের মাঝামাঝি কোথা থেকে ভেসে এল উদারীকরণের হাওয়া। (আমার জীবনেই, জাতির জীবনে আসতে কয়েক বছর বাকি ছিল!) একটু একটু পাথর গলতে শুরু করল, লিপস্টিক- আবার সে আসিল ফিরিয়া, বোধহয় একটু অপেক্ষাকৃত রঙ্গিন হয়ে। ততদিনে বন্ধুরা অনেক এগিয়ে গিয়েছে। তারা আইলাইনার, মাস্কারা এসব ধরে ফেলেছে, আমিও হাঁচড় পাঁচড় করে তাদের বাসে চড়ে ফেললাম। কিন্তু যে স্কেল ছাড়া একটা সরলরেখা টানতে পারে না, সে চোখের মতো এমন উত্তল জমির ওপর রেখা টানবে কী করে, সে প্রশ্ন আমার মনে ওঠেনি। আমি তখন ‘গো উইথ দা ফ্লো’ তে বিশ্বাসী। অনভ্যাসের ফোঁটা যেমন চড়চড় করে, তেমনি অনভ্যাসের আইলাইনার লাগানোর পর, মনে থাকত না। ছিল ঘন ঘন চোখে মুখে জলের ঝাপটা দেবার রোগ। কোন একটি বন্ধুর দিদির বিয়ের নেমন্তন্নে গিয়েছি সকাল থেকে, আইলাইনার সুদ্ধুই, অতক্ষণ বসে বসে আড্ডা, উঠে  গিয়ে চোখে জল দিয়েছি যথারীতি, আইলাইনার ধুয়ে সারা মুখে, সালোয়ারে কালি, যেন আমি বৈষ্ণব কাব্যের কবির কল্পনার রাধা, যাকে নিয়ে গান বাঁধা যেতেই পারে-

‘কুলে কালি দিলে, সইগো, কুলে কালি দিলে।‘ কুল হলে  তবু রক্ষে ছিল, এ তো ধোপদুরস্ত সালোয়ারে কালি লেগেছে, রাতে শাড়ি পরার কথা, এখন এ কলঙ্ক কোথায় রাখি!

সেদিন কারো স্পেয়ার পোশাক পেয়ে ‘কুল’ হয়েছিলাম বটে, কিন্তু ততক্ষণে কানে চলে এসেছে নন স্মাজ  ওয়াটার প্রুফ আইলাইনারের কথা, যেরকম কানে এসেছে ইন্ডিলাইবেল লিপস্টিকের কথা। নাহ, সেসব কেনার আগেই কানের ভেতর দিয়ে মরমে পশিল-

 

‘চোখের নজর কম হলে আর কাজল দিয়ে কী হবে?

রূপ যদি না থাকে সখি গরব কেন তবে?’

 

রবীন্দ্রনাথ তো মাথা খেয়ে গেছেন কবেই

‘যেমন আছ তেমনি এসো আর করো না সাজ

 

কে দেখতে পায় চোখের কাছে

            কাজল আছে কি না আছে?

            তরল তব সজল দিঠি

                 মেঘের চেয়ে কালো।

            আঁখির পাতা যেমন আছে

                 এমনি থাকা ভালো।‘

আবার আমার জীবনে ফিরে এল বর্জনের ঢেউ, সে অবশ্য  কেবল প্রসাধনী বর্জনের বিশুদ্ধ তাগিদে  নয়, খানিকটা পকেটের কথাও ভেবে। তাছাড়া   কেনার আগ্রহ বই আর ক্যাসেটে সরে গেছিল। সেইসময়ের দু চারটে কেনা প্রসাধনীর মধ্যে ছিল সদ্য বাজারে আসা রেভ্লন লিপস্টিক। যার দাম সেই সময়ের সর্বোচ্চ -১০০ টাকা। শহরতলির ট্রেনের মহিলা কামরায় যখন ব্যাগ থেকে বার করে লাগাতাম , তখন চরম ফ্যাশনেবল মহিলারাও ঈর্ষার সবুজ চোখে আমাকে দেখতেন। এতে আমি কিঞ্চিত শ্লাঘা অনুভব করি। মানে ওয়ান ডে ক্রিকেটে একদম ডার্ক হর্স  কেউ আচমকা তিনটে উইকেট নিলে বা সেঞ্চুরি করে ফেললে, তার যেমন মাথা  তাঝিম মাঝিম করে,  আমারও ঠিক তেমনটা হল। আমি  হুপে পড়ে বাজারে সদ্য আগত সানস্ক্রিন ক্রিম আর হেয়ার কন্ডিশনার কিনে ফেললাম। সানস্ক্রিন মেখে রোদ্দুরে বেরোনোর পরে লক্ষ্য করি ঘেমে নেয়েই শুধু যাচ্ছিনা, মদীয় কালচে বেগুনি রঙ , অনেকটা তিন ফুটের চায়ের মতো হয়ে যাচ্ছে। সূর্যকে পর্দা করার বদলে এ দেখি কুন্তীর মতো সূর্যকে আহবান করে আনছে!। ওখানেই সে স্ক্রিনের যবনিকা পাত।

আর কন্ডিশনারের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। শ্যাম্পুর পর মাথায় লাগাতেই সব  চুল উঠে  মাথা একেবারে অবাক পৃথিবী হয়ে গেল। সেটি সেই মুহূর্তেই ত্যাগ করা হল। এত বছর পরে  রহস্য ভেদ হল। কন্ডিশনার লাগানোর কথা চুলে,  আমি সেটা পরম যতনে স্ক্যাল্পে লাগিয়েছিলাম! সেই থেকেই মনে হয় মাথাটা একটু ঘেঁটে গেছে।

 

আর এই সদ্যআগত  দুই প্রোডাক্টের দুখ ভরি কহানির পর, আমি আর কখনো ওয়াটার প্রুফ আই লাইনার কেনার কথা ভাবিইনি। যেটি ছিল, সেটি একা একা এক্সপায়ার করে গেল একদিন। তারপর দীর্ঘ পথ কাজল, আইলাইনারহীন। কখনো টিভি চ্যানেলের স্টুডিওতে জবরদস্তি মেক আপ ছাড়া  ওরা রাবীন্দ্রিকই রয়ে গেল। আর এটাও ঠিক,  ‘এত কালো মেখেছি দুহাতে এত কাল ধরে’, আর আলাদা করে  চোখে কালি মাখার দরকারই পড়েনি!

4 Comments

  • […] তৃষ্ণা বসাক-এর মায়া গদ্যঃ- মায়া-মফস্বল… […]

  • শেষটা চমৎকার।

  • ‘একটা নাম লিখ আমার জন‍্য’ কিশোর বয়সে এই গানঠি অনুরোধের আসরে প্রায়ই বাজত।নিজের গড়নের কথা,সেই মৃৎ শিল্পীর কাজটি গুরুদেবের পরে,মুজতবা আলি ছাড়াও অনেকেই করেছেন।তবে অনেকর লেখাতেই ঘামতেল অসুরের গায়ে বেশি লেগেছে।দুগগারউন্মুক্ত হাত ম‍্যারমেড়ে।আর এই বহুগামী লেখকের কলমে সব যেন ঝংকার দিয়ে উঠছে।শুভেচ্ছা🙏

  • ‘একটা গান লিখ আমার জন‍্য’।কিশৌর বয়সেএই গানটি অনুরোধের আসরে প্রায়ই বাজত। গুরুদেব,পরে মুজতবা আলিসাহেব নিজেকে নিয়ে নানারকম গড়নের কথা বলেছেন।অনেকের লেখাতে ঘামতেল অসুরের গায়ে বেশি লেগেছে।দুগ্গার উন্মুক্ত হাত অনুজ্জ্বল।আর এই বহুগামী লেখকের কলমে সবকিছু ঝংকার দিয়ে উঠেছে।🙏

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *