গুচ্ছ কবিতাঃ শিহাব শাহরিয়ার
গুচ্ছ কবিতাঃ শিহাব শাহরিয়ার
কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক, সমালোচক, সম্পাদক, উপস্থাপক ও ভ্রমণপিয়াসী। তাঁর লেখালেখির শুরু ১৯৮০ সালে। নিয়মিত কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও মাঠ পর্যায়ে ফোকলোর বিষয়ে গবেষণা ও দীর্ঘ চার যুগ ধরে বেতার ও টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে চলেছেন। সম্পাদনা করেন লোকনন্দন বিষয়ক ছোটকাগজ ‘বৈঠা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স এবং এমএ করেছেন। ২০১০ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। শিহাব শাহরিয়ার-সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। জাতীয় জাদুঘরের জনশিক্ষা বিভাগের কীপারের দায়িত্ব পালন করেছেন।
জন্ম;১৯৬৫ শেরপুর, বাংলাদেশ।
#১
আত্মহনন
নাভিতে চোখ রেখো না
ওখানে কালো বিড়ালের ছায়া পড়েছে
তুমি বরং দুপুর-রোদে আঁকো দীর্ঘশ্বাস
অথবা কফিমগের ধোঁয়ায় ওড়াও জিহ্বা
গাঙ্গিনাপার অনেক দূর…
নজর এড়িয়ে তাই আমিও ঢুকে গেছি
খোলপেটুয়া নদীর পেটে…
আমাকে খুঁজতে আসে নি কেউ
যেমন মানিকের ‘কুসুম’ খোঁজে নি ইছামতি
তুমিও না?
আমি নদীতলে নির্মাণ করেছি—শব্দঘর
তুমি কিছুতেই জড়িয়ে পড়ো না
ঠোঁট ও কফিমগের দ্বন্দ্বে…
টের পাচ্ছি
মনোদুঃখে পুড়ে যাচ্ছে
তোমার রৌদ্রাক্রান্ত বারান্দা
যে বিকেলকে তুমি খুন করেছিলে
সেটি আত্মহনন ছিল…
#২
লাইটপোস্ট অথবা দূরপাল্লার ট্রেন
আমি যদি চলে যাই—
লাইটপোস্টের হলুদ আলো থেকে
তুমি কি পারবে একা দাঁড়িয়ে থাকতে?
আমি চলে গেলে
ফাঁকা হয়ে যাবে কি তোমার জন্মশহর?
আমি যদি চলেই যাই—
কে তবে তোমাকে দেখাবে চোখের মায়া?
কে তবে তোমাকে দেবে বরফের সাদা ছায়া?
কে তবে নীল শাড়িতে আঁকবে হিরন্ময়ী কায়া?
আমি ছাড়া এই শহরে কেউ কি আছে তোমার?
যে তোমাকে হাত ধরে নিয়ে যাবে ফাগুনের কাছে?
আমি চলে গেলে—
মুছে যাবে কি তোমার চোখের কাজল?
তোমার ঘুম কেড়ে নেবে কি ঘর্মাক্ত নদী?
তুমি কি আমাকে ফেরাতে চাও?
ট্রেন এসে গেছে
যদি না ফিরাও—
আমি তবে চলে যাবো প্লাটফর্মের দিকে
উঠে যাবো দূরপাল্লার ট্রেনে…
#৩
ট্রেনের জানালা একটি ধূসর সময়
ট্রেন থেকে নামলেই
তুমি দূর থেকে ছুটে আসতে
আমার পকেটে থাকতো মফস্বলের গন্ধ…
থাকতো কাগজি লেবুর ঘ্রাণ…
গন্ধ ও ঘ্রাণ নিতে—
আমাকে জড়িয়ে ধরতে তুমি
তখন তোমার নাক ঘামতো
কণ্ঠে ওঠতো সোহাগী সুর
আমার চোখ থেকে তখন সরে যেত
ধাবমান ট্রেন আর পিছনে ফেলে আসা
মাইল মাইল পথ, কালো ধোঁয়া আর হুঁইসেল
ট্রেন আর তুমি—তুমি আর ট্রেন
আমাকে বাজিয়ে যাচ্ছো সমান্তরাল
তোমাকে দেখলেই ট্রেনগুলোর নাম মনে পড়ে
কত কত দিন এসব ট্রেনে গিয়েছি নিশ্চিতপুর
এগারসিন্ধু, বনলতা, উর্মি গোধূলি, নীল সাগর
প্রভাতী, উপকূল, উপবন, ধূমকেতু, তিস্তা, সুবর্ণ এক্সপ্রেস
ট্রেনে উঠলেই মনে পড়ে
স্টেশন নান্দিনা, বাহাদুরাবাদ, জগন্নাথগঞ্জ ঘাট, পার্বতীপুর
পঞ্চগড়, ঈশ্বরদী, শায়েস্তাগঞ্জ, গচিয়াহাটা, ভৈরববাজার জং
সবশেষ গন্তব্য কমলাপুর জং…
এখানেই বার বার দেখা হয়
বার বার চোখ থেকে সরে যাও তুমি
সরে যায় ট্রেন…
পড়ে থাকে ঘন প্রেম-পিপাসা
শূন্যে উড়ে যায়—সব স্পর্শ, বুক, উঠা-নামা, ওম
ভিতরে কি যেন খেলা করে, শিহরণ জাগে
তোলপাড় করে—কে যেন কাকে খোঁজে?
সে কি তুমি?
ময়ূরাক্ষী নদী না আমি কপোতাক্ষ নদ?
তুমি তখনও কি দাঁড়িয়ে থাকো
তাও জানি না, বুঝি না?
শুধু বোধের ভেতর টোকা দেয়, নড়ে ওঠে
শ্যাওলা ডাঙা, হরিরামপুর, জন্মদাগ, বাবার হাত
আর তুমি তুমি…
গঞ্জের দিকে যাচ্ছে আমার ট্রেন
ট্রেনের জানালা একটি ধূসর সময়…
#৪
ঘর পর্ব
দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকি
যাতে রংগুলো ওড়ে না যায়
রং নিয়ে তোমার যত কৌতূহল
আজ নীল শাড়ি না হলুদ টিপ
খয়েরি চুড়ি না আকাশি ওড়না
আগেই যাচাই করে নাও আয়নায়
তারপর বলো মেচিং হয়েছে?
কেমন লাগছে গো?
তখনও দেয়ালের দিকেই তাকিয়ে থাকি
বললাম—তোমাকে বৃষ্টির মতো লাগছে
তুমি বললে—
এবার একটি সাদা শাড়ি এনে দিও তবে?
#৫
দূরের গল্প
ফোনেই কথা হয় এখন
সরাসরি নয়—
হয় হোয়াটসঅ্যাপে
হঠাৎ এক রাতে:
: তোমার পুত্রের নাম কি সেই?
: হ্যাঁ, কেন?
: তুমি কি জানো আমার কন্যা তোমার পুত্র একইসঙ্গে পড়ে?
: তাই?
: ওদের সম্পর্ক অনেক সুন্দর।
: ওরা কি জানে—আমরা একই বেঞ্চে বসে রবীন্দ্রনাথ গিলেছি?
: জানে কিনা জানি না ভাবছি, মিলে গেল কীভাবে?
: ওরাও কি একটি কমলা ভাগ করে খায়?
: ওরা হয়তো দু’জনে দুটি বার্গার খায় মধ্য দুপুরে
: রিসাইক্লিং
: হয়ত বা
: ওরাও হয়তো ছিটকে পড়বে আমাদেরই মতো
আর কথা বাড়েনি, শেষ রাত শেষ হয়ে যাচ্ছে তখন…