Email: info@kokshopoth.com
February 1, 2026
Kokshopoth

একটি উদ্যত ভল্লঃ সুধীর দত্ত

Dec 12, 2025

একটি উদ্যত ভল্লঃ সুধীর দত্ত

পাঠকের কাছে কবি সুধীর দত্তের পরিচয় দান অনাবশ্যক। তন্নিষ্ঠ কবিতা পাঠকের কাছে সুধীর এক অত্যুজ্জ্বল নাম। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য কবি। তাঁর কবিসত্তা, কাব্যশরীর, কবিতাদর্শন সবই একটি স্বতন্ত্র  ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। তাঁর স্থির সত্যের ধারণাও। সব ছাপিয়ে তাঁর কবিতার ক্লাসিক আবহ তাঁকে এক মর্যাদাময় অবস্থান দিয়েছে।

তাঁর প্রকাশিতব্য মহাকাব্যের অংশ কক্ষপথকে প্রকাশ করতে দিয়ে তিনি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন।

পাঁচটি প্রবাহ দুটি ভাগে প্রকাশিত হবে। আজ তিনটি। ৫৮, ৫৯, ও ৬০। পরের সংখ্যায় ৬১, ও ৬২।একটি উদ্যত ভল্ল ‘ দশ পিটকে বিভক্ত  প্রায় দশ সহস্র পাঙক্তির একশত প্রবাহযুক্ত  একটি মহাকাব্য। কাব্যটির নায়ক কোনও পৌরাণিক চরিত্র নয়, বাস্তব জগতের মানুষ, যিনি তাঁর কিশোরবেলা থেকে জানতেন, তাঁর জীবনের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য আছে, যে-উদ্দেশ্যের কথা তিনি তাঁর বন্ধুকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, মাত্র সতেরো বছর বয়সে। সেই উদ্দেশ্য হল,  to become an embodiment of the past, product of the present & prophet of the future , ঐতিহ্যের প্রতিমূর্তি, সময়ের জাতক এবং ভবিষ্যতের বার্তাবহ। এই চরিত্রকে কেন্দ্র করে মহাকাব্যটিতে গ্রথিত হয়েছে জ্ঞানবিজ্ঞানে প্রোজ্জ্বল যে-বর্য, যাকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে, পুনরুত্থিত হবে স্বমহিমায়।

প্রবাহ: ৫৮, ৫৯, ও ৬০

#৫৮

খড়্গ হাতে কালপুরুষ

যত দূর যেতে পারে যন্ত্রমেধা, আমাদের চোখ —
এ এক রহস্যময় সুপ্রাচীন দেশ,
শোনা যায় –খ্রিষ্ট নাকি স্নানদীক্ষা সেরে এখানেই,
পুনরুত্থিত,
দীর্ঘকাল এখানেই জীবিত ছিলেন ; কে-বা জানে হিমবান কৈলাশ পর্বত
কোনও এক পিরামিড কিনা !
আন্তঃনাক্ষত্রিক স্বর, যেন প্লুত, ভেঙে ভেঙে দ্রবীভূত নাদ
ভেসে আসে, মন্ত্রধ্বনি ; দুঃসাহদিক কোনও আরোহী

আজতক
চূড়া ছোঁয়নি,পৃথক আয়াম, সময়ের
গজকাঠি অচল, হঠাৎ বয়স বাড়ে, নখ-দাঁত, কুঁচকে ওঠা চামড়ার রং
ক্রমশ ধূসরতর, চারদিকে তড়িচ্চুম্বক, কুয়াশার ঘন মেঘ, শোনা যায়,
এই দেশে আলেকজান্ডার তাঁর অভিযান কালে কিছু উলঙ্গ মানুষ দেখেছিলেন।
নিষ্প্রয়োজন তারা, আরণ্যক, সময়-সুড়ঙ্গপথে চলে যায় মাটি আর আকাশের চৌহদ্দি পেরিয়ে।
তাদের অণিমা-সিদ্ধি, লঘিমাও, পালকের মতো হালকা দেহ,
পৃথিবীর কঠিনতা,এমনকি দুষ্প্রবেশ্য পাথর-দেওয়াল
ভেদ করে
হাঁটাচলা ; অদৃশ্য, ভিন্ন ভিন্ন স্থানে তারা অবস্থান করতে পারে
একইসময়ে। হয়ত-বা লোকটারও সেরকম সিদ্ধি-টিদ্ধি–প্রাকাম্য ও পরাশক্তি আছে।
তাঁকে কি ভাবাচ্ছে কেউ, বাধ্য করছে ভাবতে এরকম— ম্যাক আর্থার
স্বগতোক্তির মতো একা একা বিড়বিড় করছিলেন : আমরা বিস্তৃত যত, ততখানি গভীরতা অর্জন করিনি,

এবং উপরভাসা বস্তুকেন্দ্রিক।
হারানো সত্তার বোধে আমরা পীড়িত নই, ব্যক্তির সীমানা ভেঙে
এই বিনশন তীর্থে এঁরা সব বিশ্বাত্মা হয়েছেন।
বিশ্বজয়ে উদ্ভ্রান্ত, নিজেদেরই জয় করতে শিখিনি।
এই যে পৃথিবী, তার পার্থিব ও নৈসর্গিক শক্তিবিন্যাস,
মনে হয় তার সঙ্গে লোকটা ওতপ্রোতো।
তাই তার জন্তুর সদৃশ ঘ্রাণ। রোমকূপ জুড়ে চোখ। আসন্নের কম্প টের পায়।
কদাচিৎ পড়তে পেরেছি তার ভিতর-বাহির।
ঝড়েরও তো কোনো-না কোনো উঁকিঝুঁকি থাকে।
অথচ ঘনিয়ে আসে ধূলিঝড়, বিনা মেঘে বজ্র ও বিদ্যুৎ। আর
ঘূর্ণির ভিতর এক অশ্বারূঢ় ছায়ামূর্তি,
মেঘের ভিতর থেকে নেমে আসে, উষ্ণ তবু নিরুত্তাপ ; কুয়াশার পুরু আস্তরণ
চারদিক ঘিরে থাকে যেন কোনো দুর্নিরীক্ষ্য জাদুদণ্ড হাতে নিয়ে ঘোর পসেডন।
স্বয়ং প্রকৃতি যেন অনুগত তার। কিংবা সে নিজেই মায়ামেঘ, অনৈসর্গিক
মৃত্যু রচনা করে–শবাধার,
শোকবার্তাটিও যেন লিখে রাখে পূর্বাহ্নেই, অর্ধনমিত

পতাকা ,
এমন গভীরভাবে লোকটা গেড়ে বসে আছে আপামর হৃদয়ের কোন তলদেশে,
কে জানে, সে কোন মন্ত্র, উদাত্ত বা অনুদাত্ত স্বরে !
দৃশ্যমান বৃক্ষদের সারি আর নক্ষত্রের অদৃশ্য খামার জুড়ে
বায়বীয় সে চলমানতা, কখনও স্থবির ভিক্ষু,
অচল চলেছে যেন—শান্ত, ঘোর, মূঢ়।
আবার তির্যক অগ্নি সতত সূর্যের দিকে ধাবমান, যেন এক তরুণ গরুড়।
গলে না ডানার সন্ধি–মোমজোড় যখনও উড্ডীন,
তার কপালে ত্রিপুণ্ড্র মাটির।
শব্দের ভিতর যেন সে কোনও বোধশব্দ, অর্থ ও অনর্থে গড়া ,
মৃত্যু যাকে ছুঁতেই পারে না, হায়
আমাদের স্বস্তি নেই, ভাবা গিয়েছিল
এবার অন্তত শেষ, দু’চোখের পাতা পরিজনদের সাথে এক করা যাবে,
এবং শীঘ্রই ফেরা, যেরকম রণক্লান্ত গ্রিক সেনাদের হৃদয় তোলপাড় করা ভয়, আর গৃহকাতরতার বিষাদ ; মহানিষ্ক্রমণের পর ঘাতকেরা বহুভাবে খুন করতে চেয়েছে , আজ আর

আমাদের ঘুম যেন তার হাতে খুন হয়ে গেছে। চারদিকে নৃত্য করে হ্রস্ব-দীর্ঘ প্রেতচ্ছায়া ;
অথচ এখন তো আমাদের বিজয়ের আহ্লাদ ও ধূমের সময়।
মানুষটার কাছে আমরা পরাস্ত বারবার।
সাময়িক হয়ত-বা পট থেকে তার এই প্রস্থান–পুনঃঅন্তর্ধান ;
কূটতর আরও কোনো অভিসন্ধি, গূঢ় কোনো পরিকল্পনা পশ্চাতে,
যা হয়ত কদাচিৎ মানুষেরা স্বপ্নে ভেবেছে।
কোন দিক থেকে তাক করা বিষ-তির ছুটে আসবে হাওয়ায় ভেতর !
কী জানি কী ভাবে চতুর নিক্ষেপ, ভবিষ্যতে পেড়ে ফেলবে অসতর্ক। পুনরুত্থিত
ইশার চেয়েও ভয়ংকর এই স্বঘোষিত আশ্চর্য মৃতটি।
মৃত্যু তাকে জীবিতেরও অধিক শক্তি, অমরতা দান করে গেছে।
সে এখন মহাকাব্য, অনশ্বরতা।
আমরা তার মৃত্যু চাই — অন্তিমতা। মৃত্যু তাকে উচ্ছিষ্ট করুক।
সত্যি কিংবা মিথ্যা হোক, অন্তত এ স্বরচিত কাহিনিটি বিশ্বাসের যোগ্য হোক,

অন্তত, আমরাও বিশ্বাস করি,
কৃত্রিম স্বস্তি লাভে ডুবে যাই লাল মদে আঙুরের ক্ষেতে।
তারাভরা আজ এই রাত্রিটুকু আমাদের হোক,
যদিও অরণ্য জানে, জানে নদী, পশুপাখি, বৃক্ষলতা, , অন্তরিক্ষ, সমুদ্রসৈকত
শান্ত কোনও শব নয় , হাতে খড়্গ সে কালপুরুষ
স্যান্ড্রোকেটাসের চেয়েও দুর্জয়,
দুর্জ্ঞেয় গতিবিধি, এশিয়ার প্রতিটি কবর মাত্র একটি ইশারায়
হাসতে পারে শেষ ভয়ংকর হাসি, ভল্ল হাতে এক একটি জ্যান্ত ল্যাজারাস ।
সে কি তবে টের পেয়েছিল
আজাদী ও নিপ্পন সেনার মধ্যে স্পাই-ওয়্যার পাতা আছে,
যেরকম সমুদ্র-গর্ভে জাল, আত্মসমর্পণের প্রাক্কালে?
এরকম জাল ছিঁড়ে যদিও আশ্চর্য এই মানুষটি একদিন
জীবনকে বাজি রেখে
নিরাপদ আইসল্যাণ্ড-সমুদ্র ছেড়ে ইংলিশ চ্যানেল বরাবর
মাদাগাস্কার দক্ষিণপথে পেনাং-এ পৌঁছে গিয়েছিল।

এমন দক্ষতা, ঝুঁকি একমাত্র সামরিক দ্রষ্টাদের থাকে,
যারা দূর দেখতে পায়, এমনকি করালদ্রংষ্টা মৃত্যুর হাঁ-মুখ ;
ছিন্নভিন্ন করে দ্যায় তারও আগে বিপক্ষের যাবতীয় সুরক্ষা-বলয়।
বেপরোয়া, তবু এক প্রাকৃতিক সমর্থন তাকে নিত্য রক্ষা করে চলে।
একটি গভীর লম্বা শ্বাস আরও দীর্ঘ –দীর্ঘতর ,
হাই তুললেন জেনারেল ম্যাক আর্থার।
ধূর্ততর এই যোদ্ধা, ঐশ ইঙ্গিত পেয়ে সক্কলকে শেষমেশ বেওকুফ বানাল ?
আকাশে চক্কর কাটল বিমানটি, যখন সকলে বন্দর ত্যাগ করে
ফিরে গেল বিদায় জানিয়ে, পাখিটি কি ঝুপ করে মাটি ছুঁয়েছিল?
নাকি সে বিমানে ছিল না ?
এবং সে হ্যানয়ে, সাইগনে কিংবা সিঙ্গাপুরে ফিরে গিয়েছিল?
আর সালি বোমারুটি হারিকিরি করেছিল নোজ-ডাইভ মেরে ?
কেননা কাপড় ঢাকা মমি ছাড়া আর কেউ কিচ্ছু দ্যাখেনি।

মমি-টি কি অন্য কারও ছিল ? সারা গা পেট্রল -পোড়া ব্যান্ডেজ-জড়ানো?
সে কি কোনও শুয়ে থাকা, নিঃস্পন্দ জ্যান্ত মানুষের ?
যে ছিল দ্বিতীয়জন হবিবের সাথে,
পূর্ব পরিকল্পনার মতো যার কথা উহ্য থেকে গেছে।
সামরিক মর্যাদায় বিধিবৎ অন্তত হাবিবও তার সঙ্গ নেয়নি !
কাকে ওরা দাহ করেছিল? কেউই দ্যাখেনি সাদা কাপড়ের নীচে
সম্পূর্ণ আবৃত দেহ কার ? মৃত ওকুরার?
দেহটি কি আদৌ কোনো মানুষের ছিল?
তামার পবিত্র পাত্রে কার ভস্ম রাখা হয়েছিল,একমাত্র তথাগত বলতে পারেন।
আমরাও কি এই মৃত্যু বিশ্বাস করেছি ?
সম্ভাব্য প্রতিটি ঘর ওই অঞ্চলের , তালাশ নিয়েছি, সঙ্গে মাউন্টব্যাটেন,
তাঁর দীর্ঘ নিদ্রাহীনতার কথা, উচ্চ রক্তচাপ বিলক্ষণ জানি ;
বহু চেষ্টা জীবদ্দশায় তাকে বাগে আনবার জন্য মাঠে মারা গেছে।
অন্য ধাতুতে গড়া, ভাঙেনি সে হাটে হাঁড়ি, প্রতিটি প্রলোভন—

ভগ্নদূত বারবার ফিরেই এসেছে।
পাঁজি নিঙড়ে এক আড়াও জল মেলেনি, কেননা লোকটির
বুকপকেটে গোলাপ থাকত না , আর মাংসকাম রক্তে ছিল না, কী জানি
কোন লোক থেকে নেমেছিল !
তার হাতেও বাঘনখ, কৌটিল্যের মন্ত্র আর চাপরাশ ছিল।
শুনেছি, একটি চীনা স্পাই-রমণীকে জাপানি সেনার হাতে না তুলে দেওয়ার জন্য
কীভাবে সে ছুটে গিয়েছিল।
হানি-ট্র‍্যাপ। তবুও সে মায়ের জাত। তাকে ছেড়ে দেওয়া যায় না হিংস্রদের হাতে।
ইঙ্গ-মার্কিন চর জানিয়ে গিয়েছে কীভাবে
সে সয়েছে বহু ক্লেশ রানিদের নিরাপত্তার কারণে।
প্রতিষ্ঠার বিষ্ঠা থেকে শতহস্ত সে সতত দূরেই থেকেছে।
শত্রু, তবু আমরা যোদ্ধার জাত, কুর্নিশ করেছি।
সঙ্কল্প মানুষের। দেবতারা সিদ্ধ করেন , যদি তা দশের হিতে ,
যদি তা অক্ষরের প্রশাসন মঞ্জুর করে।
নির্গুণ আকাশ জুড়ে এভাবেই খর তাপে হাহাকার

কালো মেঘে রূপান্তরিত,
এভাবেই ধারাসারে পৃথিবীও শস্যগর্ভা হয়।
একিলিসের মতো তার গোড়ালিতে কোনও ক্ষত নিরন্তর সন্ধ্যান করেছি।
শুধু শিরস্ত্রাণ নয়, জন্মমুহূর্ত থেকে তার দেহগাত্র ঢাকা দূর্ভেদ্য কবচে ।
জনশ্রুতি, মা স্বয়ংই ঢেকে রেখেছেন।
ইচ্ছামাত্র দৃশ্যমান, অদৃশ্যও, ইথার তরঙ্গ থেকে সে নাকি মুহূর্তে জেগে ওঠে !
সে কি তবে ঘাপটি মেরে ডুবে থাকা সাবমেরিনে সাইগন সৈকত থেকে
ব্লাডিভস্টকের পথে জলের আড়াল নিয়েছিল?
দুর্ঘটনা একটি রটনা –ফেনা, কবি-কল্পনার মতো শব্দদের সাজানো বুদবুদ ?
জলের নীচেই ছিল এতকাল , ফিরে যায়নি জার্মান মেরিন
অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে নিয়ে এসেছিল তাকে নিপ্পনের দিকে !
সমুদ্রের তল থেকে ওরাই কি ধ্বংস করে দিয়েছিল মার্কিন বিমান ?
তখন তো যুদ্ধের শেষ। জানুভাঙা নাৎসীরা কাতরাচ্ছে মৃত্যু-যন্ত্রণায়।

রাশিয়ার চর ভেবে একদিন নাৎসীরাও চোখে চোখে তাকে রেখেছিল !
সংশয় কুরে কুরে খায়।
একদিন দু-দিন নয়, চারদিন পর কেন যে রটানো হল এই বার্তা, দাউদাউ
আকাশের লেলিহ জিহ্বায় ।
এবং ভাসছে কথা সেই থেকে। এবং ভাসছে কথা সেই থেকে ,
আমরা কি পাগল হয়ে যাব?
এমন আষাড়ে গল্প, আমরা কি পাগল হয়ে যাব?

#৫৯
ব্রহ্মার তৃতীয় ‘দ’

জীবিতরা ভয় পায় যখন মৃতরা হেসে ওঠে।
তাই রাত্রি ভয়াবহ
কবরের ঢাকনা খুলে না-বলা কথারা অন্ধকারে মেঘ হয়,
মেঘে মেঘে ধাক্কা লাগে, ব্রহ্মার তৃতীয় ‘দ ‘ ঢুকে পড়ে গরাদের ফাঁকে।
মগজ গুলিয়ে ওঠে, জলের আয়নায় তার দেহবিম্ব দেখে অ্যাব্রাহাম।
এ ছিল পরীক্ষা তার : ক্ষয় নেই, মৃত্যু নেই, অমরতার আদলে এক তীব্র নশ্বরতা :
জঙ্গল রয়েছে বাঁধা কোটি কোটি শিকড়ের পায়ে, এবং
পাহাড় বহু দূর।
আমি এক মরা ভূত, জানি কেউ ঘুমোতে পারবে না,
কেননা ঘুমের সঙ্গে যা ঘটতে চলছে তার বিষ জীবিতের রক্তে মিশে গেছে।
এ যুদ্ধ অনন্তকাল, যারা গেছে, বুকে রক্ত, বারবার বৃষ্টি থেকে, ব্রীহিশস্য থেকে ফিরে আসে।
আমরা সকলে আছি, থাকবও, ভেস্তে দিয়ে শেষ

বিচার,
যতকাল না এশিয়া ও আফ্রিকার রুগ্ন দেহ
স্বাস্থ্য ফিরে পায় ।
তারপরও ঘুমাবার আগে বহু পথ, যোজন-বিস্তৃত হাঁটা
বাকি,
পৃথিবীও তার কেন্দ্রবিন্দু থেকে একদিন
ফিরে পাবে পাখিসমাজেরর সুখ, জ্যোৎস্নার অনন্ত প্লাবন।
তাই এই বেঁচে থাকা, যা ছিল এবং আছে
অলৌকিক, পলাশ-পাহাড়
এখনও আমাকে ডাকে, সুঁড়িপথ, বেহস্তের দিকে

#৬০

পিছন ফিরে দেখা

পালটে যায় সবকিছু, তলে তলে জলের হিংস্রতা, এমনকি বন্ধুদেরও রক্তের ভিতর

ঘোরে ফেরে দুমড়ে যাওয়া বিষাক্ত কালাচ,

এবং আঁধার থেকে আয়নায় জেগে ওঠে ভাঙাচোরা মুখের গোপন–

যা দৃশত ঝকঝকে, বলিরেখাহীন ।

ঈশ্বর চেয়েছেন, তাই বেঁচে আছি।

এক বিঘৎ দূর থেকে ফিরে গেছে কতবার গুপ্ত  ঘাতকেরা।

একচুল আগে পিছে বুলেটের উদ্যত ছোবল

মৃত্তিকা দংশন ক’রে ধূলির ভিতর তার  চিহ্ন রেখে গেছে।

পৃথিবীর রেজিস্ট্রার থেকে

কোনও কোনও জীবিতের  নাম কাটা যায়,

ডাকিনি হাকিনি আর হেকেটদের পৃথিবীতে এখন সময়।

মহাত্মা কি ভেবে দেখেছেন,

ভিতর থেকে যে-সকল রহস্যময় উচ্চারণগুলি সহসা

প্রকট হত

তারা আদৌ অপৌরুষেয় ছিল?

গোটানো পালের মতো পাটাতনে পড়ে থাকা চম্পারণ-হাওয়া আজ দুঃখমেঘ , 

যতটা গর্জায়, ঠিক ততটাই বৃষ্টিহীন, ঝুলে আছে মাথার ওপর। 

যেন জীর্ণ গৃ্হসজ্জা,পুরনো আসবাব, অথচ একদিন জয়, তাঁর জয়গাথা

প্রেরণাসম্ভব ছিল, উদ্বেলিত করেছিল মোসুমী বাতাসের মতো।

তামসিক নিশ্চেষ্টতা যত বেশি ক্ষতি করে তত ক্ষতি যুদ্ধ করে না।

আত্মশক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্র ও সময় নয় বলে, রাক্ষস-বধের তরে

ঋষি বিশ্বামিত্র তাঁর অলৌকিক অস্ত্রাগার শ্রীরামকে খুলে দিয়েছিলেন।

কে কবে না যুদ্ধ করে এই রূঢ় পৃথিবীতে বাঁচতে পেরেছে?

শাবকদের রক্ষার তরে পক্ষীমাতা ভয়ংকর হিংস্র জন্তুদের সামনে

কীভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, আর মানুষ বসে থাকবে নিশ্চেষ্ট শ্বাপদসঙ্কুল ঘোর রাত্রিঅন্ধকারে? 

একদানা অন্নের জন্য, এক ফোঁটা আলোর জন্য স্বয়ং প্রকৃতি

কীটপতঙ্গ, পশুপাখি, বৃক্ষলতা, প্রাণীদের নিত্য যুদ্ধে, রত রেখেছেন।

সংঘাত কি ভেঙে দেয়নি পাথরের নিশ্চলতা, রূঢ় রৌদ্র, অন্নের কঞ্চুক?

প্রাণ এক প্রতিস্পর্ধা । দশজিহ্বা তার মৃত্যুকে লেহন করে

পাতালের গর্ভ থেকে বারবার জীবনকে উদ্ধার  করেছে।

জীবিত লোকের ভাষা পৌঁছায় না যেখানে, মৃত জানে

অন্ত এক আরম্ভের শুরু,

যখন শীতল যুদ্ধ আর ক’দিন পরে ,তার জন্য প্রস্তুতি– আর এক ইম্ফল।

ডাক দেয় উপত্যকা গিলগিট–পাহাড়, চিত্রল।

এই-ই পথ–উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত বরাবর।

তখন কীভাবে অস্ত্র, কাকে বা নিশানা করবে ? ধূর্ত সব সমাজতান্ত্রিক,

যখন নিপ্পন নেই, আর এক আজাদ হিন্দ,মুক্তিফৌজ  রুশভারতীয়?

তোমাদের এই ভূত সেদিনও  তো একটি চন্দ্র আকাশে উঠেছিল

যখন কমিন্টার্ন, চতুর্থ কংগ্রেস, আর জ্যাকারিয়া স্ট্রিটের অবনী

চিহ্নিত করেছিল, দেশের প্রকৃত বন্ধু-র ডান হাত।

যখন এলগিন রোড ঘিরে আছে বাঘা বাঘা আটষট্টি চর ,

কাদের নিঃশব্দ পায়ে মড়মড় করে উঠত দেবদারুর শুকনো পাতা, আর

আকাশ-জোড়া আবছা একটি ঘোলাটে লণ্ঠন

নিয়ে যেত চুপিচুপি রিষড়ার গোপন ডেরায় ?

কে ছিল অচ্ছর শিং—স্টালিনের প্রিয় লারকিন?

কারা বা ডিঙিয়ে গেল বাড়ির প্রাচীর,

ভবিষ্যতে লেখা হবে দিস্তা দিস্তা রম্য রচনা,

বৃষ্টি বাজবে রিমঝিম–কামেশরী,

পাহাড়ে ঘনাবে জল, জল নয়, জলশব্দ, আহা

তোমাদের এই মৃত মানুষটি কদাচিৎ সুখের দাসত্ব করেছে, কেননা

তার সামনে একটি অগ্র মা সদৈব ধরে দিয়েছেন,

সে আগাম জেনে যায়,

অথবা জানানো হয় তাকে,

যে-পথ গিয়েছে বেঁকে হিমসাদা ভালুকের দেশে

যেখানে বসন্ত আর শীত মাখামাখি,

এবং যে-দেশ থেকে উড়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী শীতার্ত পাখিরা,

অকূল সমুদ্র মাঝে  চারদিকে হা হা জল, জাহাজের মাস্তুলের ‘পরে। 

মেরু প্রদেশের এই অন্ধকারে অজস্র বন্দি-শিবির সাক্ষাৎ এক একটি মৃত্যুপুরী,

নাৎসীদের বহু আগে যা চালু হয়েছে এই দেশে।

তবে কিনা স্টালিন লোকটি বেশ শক্তপোক্ত –দড়।

শরিকদের কাছে তারও কিছু বাধ্যবাধকতা আছে।

একবার এক বন্ধু বলেছিল হেসে :

কে এলে একগ্লাস জল, কার জন্য কড়া পাক, একগাল হাসি,

তার জন্য নিউটনীয় সুগভীর  কোনও সূত্র নেই।

কপিল বা ব্যাসসূত্রে পররাষ্ট্রনীতি আর বিশুদ্ধ আদর্শ বিষয়ক

অথাতো জিজ্ঞাসা কোনও লিপিবদ্ধ নেই।

বিষ্ণুগুপ্ত কে আর পড়ছেন !

স্বর্গ,পাতাল আর ভূলোকটি গাঁথা আছে এই একটি উদ্দণ্ড শিখায়। 

মাত্র বছর আগে, উনিশ চুয়াল্লিশ সালে  ফিরে গেছি রুশ থেকে সব কিছু বোঝাপড়া সেরে,

কীভাবে দ্বিতীয় বার সংগঠিত করা হবে পর্যুদস্ত ভাঙা সেনাদল,

শুধুই স্বদেশ নয়, সমগ্র এশিয়া আর  আফ্রিকার জন্য মুক্তিফৌজ।

এক ব্রিগেড সেনা নয়, সঙ্গে আছে মাত্র ছ’জন।

তোমাদের এই প্রেত চিরকাল নিষ্প্রয়োজন।

রেশম বস্ত্রের মতো এই শরীর, যা পরিয়ে মা তাকে ভূমণ্ডলে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

মা আমার রাজরাজেশ্বরী।

যতক্ষণ না দিশা পায় এই দেশ, তার চারদিক ঘিরে গড়া আছে সুরক্ষা-বলয়।

এমনকি আণবিক কোনও অস্ত্রে ঘায়েল হবার আগে সুগোপনে তাকে তিনি সরিয়ে নিয়েছেন।

দেহও কি জড় কিছু, যেরকম বলা হয়ে থাকে ?

সেও এক শক্তিপুঞ্জ, আন্তরাণবিক

ফাঁকগুলি বিস্তৃত হলে ষাটকৌষিক শরীর

এক দণ্ডে অদৃশ্য হয় আকাশের মতো, আর মানুষের দৃষ্টির বাইরে চলে যায়,

এবং আত্মার পিছে তার ষড় ঐশ্বর্য ছায়ার মতন ধাওয়া করে।

সকলে তো কলনস নয়, আত্মহা হবে।

আমার শুধুই চেষ্টা, দণ্ডবৎ — শুধুই প্রণাম।

এই যোগে আরূঢ়ের নিজস্ব এজেন্ডা নেই কোনও ।

যেরকম হৃষিকেশ  নিযুক্ত রাখেন—-

আমার দক্ষিণ পাশে কেউ একজন সারাক্ষণ ঘোরে ফেরে,

উপস্থিতি টের পাই ,যেমন পাইনবনে আড়ালে কোথাও

গান গায় থ্রাশ-পাখি,

ভেসে ওঠে শাংগ্রিলা, গুপ্ত পীঠ, একটি সময়শূন্য অভৌম স্থলী।

তোমাদের এই প্রেত দেখে এক সমাসীন দীর্ঘকায় কঙ্কালশরীর,

অর্ধনিমীলিত চোখ, শ্বাসহীন, যুক্ত হয়ে আছে কোন নক্ষত্রমণ্ডলে।

লেখাটির উপর আপনার অভিমত জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *